প্রতিমন্ত্রী এটা কি বললেন????

Child Marriageস্নিগ্ধা রহমান: মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাবে যখন সকল মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে, চারদিকে সমালোচনা চলছে, সভা-সেমিনার হচ্ছে এর ক্ষতিকর দিকগুলি নিয়ে, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বললেন, অল্প বয়সী মেয়েরা আজকাল পালিয়ে বিয়ে করছে বলেই বিয়ের বয়স কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

কিন্তু মূলধারার মিডিয়াগুলো যেমন নিউজ করেছে, সেটাকে সত্য ধরে নিলে তো, এই যুক্তিটা মোটেও বোধগম্য হলো না আমার। তিনি পাশাপাশি এটাও দাবি করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর বিয়ের বয়স কমানোর জন্য মারাত্মক চাপ রয়েছে। তো, সেই চাপটা কোথা থেকে? নিশ্চয়ই বাইরের দেশের চাপ নয় এটি! বিশ্বের কোন উন্নত দেশ এরকম চাপ প্রয়োগ করতেই পারে না। মন্ত্রী বলেছেন, চাপটা মূলত গ্রামের মানুষের কাছ থেকেই। তিনি বলেছেন যে, গ্রামাঞ্চলে বাল্য বিয়ের নানান কারণ থাকে, সেখানকার বাস্তবতা ভিন্ন, সেখানে আর্থিক দীনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, লাভ ম্যারেজ, পালিয়ে বিয়ে করার মতো বেশ কিছু পরিস্থিতির কারণেও বিয়ের বয়স পরিবর্তনের কথা ভাবছে সরকার।

আমরা জানি যে, বাল্যবিয়ে রোধ করার পাশাপাশি আমরা সামাজিক/স্বাস্থ্যগত অনেক সমস্যা থেকেও মুক্তি পাই। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন যখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য, তখন তাদের অল্প এবং অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দিয়ে কোন ক্ষমতায়ন হবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। পালিয়ে বিয়ে করা থেকে মেয়েদের মুক্তি দিতে তাদের বিয়ের বয়স কমিয়ে এনে বিয়েটা জায়েজ করে দেয়া হচ্ছে? মেয়ের বাবা-মায়ের সামনে একটা সুযোগও থাকছে না নিজের মেয়ের জীবনটা শুধরানোর? একটা মেয়ের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন তো সে নিতান্তই শিশু, তার বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা কতটুকু থাকে যে, তার পালিয়ে করা বিয়েকে বৈধতা দিতে হবে আইন করে? তাছাড়া আমরা যখন মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার ওপর জোর দিচ্ছি, তখন কি করে এটাকে সমর্থন করি? একটা মেয়ে ১৬ বছর বয়সে তো এসএসসিও পাশ করতে পারে না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই।

পত্রিকার খবর অনুযায়ী আজ এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘স্কুলগুলোয় মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, এমনকি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মেয়েদের হার এখন বেশি। এ সবকিছুই গর্ব করার মতো ব্যাপার। ইদানীং বিয়ের বয়স নিয়ে কথা হচ্ছে। আপনারা পত্রপত্রিকা মারফত শুনেছেন। আসলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের খুব চাপ। মেয়েরা নানা প্রয়োজনে বাইরে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, আকছার ঘটছে এসব ঘটনা। এটা বাস্তবতা।’

জাহিদ মালেক বলেন, কন্যা শিশুদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে জোর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘ঘর ছেড়ে পালানোর’ প্রবণতা বন্ধ করতেই মেয়েদের বিয়ের আইনসিদ্ধ বয়স কমিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বর্তমান আইনে বাংলাদেশে মেয়েরা বিয়ের যোগ্য হয় ১৮ বছর বয়সে, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ওই বয়সেই শৈশব শেষ হয়। সম্প্রতি লন্ডনে কন্যাশিশু সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাল্যবিয়ের হার কমিয়ে আনার বিষয়ে নিজের অঙ্গীকারের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশে বিয়ের বয়স পরিবর্তনের অর্থ দাঁড়াবে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা সরে আসা। বাল্যবিয়ের হারের দিক দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশে রয়েছে সামনের  কাতারে, যা মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধিরও অন্যতম কারণ। সম্প্রতি বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য দুই বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রেখে নতুন আইন করার প্রস্তাবে সায় দিয়েছে সরকার। তবে ওই প্রস্তাবে অনুমোদনের সময় সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে বিয়ের বয়স কমানো যায় কিনা- তা পর্যালোচনা করতে বলেছে মন্ত্রিসভা।

গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে ছেলেমেয়েরা কম বয়সে বয়োপ্রাপ্ত হয়- এই বাস্তবতা বিবেচনা করে আইন মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করতে বলা হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এমন মন্তব্য করা সম্ভব না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি একবার নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলতেন, তাহলে হয়তো এমন মন্তব্য করতে পারতেন না।

এতোদিন বিয়ের বয়স ১৮ ছিল বলেই অনেক মেয়ের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া মেয়েদের আবার ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসন করা গেছে। প্রথমত আমরা যদি আলোচনা করি, মেয়েরা বা ছেলেরা কেন পালায়, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। অপ্রাপ্ত বয়সে একটা ছেলে বা মেয়ে এই ভুল করতেই পারে। কিন্তু তাদের ভুলকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে, এমন কোন কথা নেই।

অনেকেই মেয়েদের স্বাস্থ্যের বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে বলেন, কম বয়সে বিয়ের কারণে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, নারীরা নানা রোগে ভুগছেন। কাজেই এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত নারীর স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় নিয়ে একটা প্রস্তাব দেওয়া।

অনেকের মতে, বাল্য বিয়েতে স্বাস্থ্য সমস্যা ছাড়াও ‘বড় ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা’ তৈরি হয়। কম বয়সে বিয়ে হলে ছেলে-মেয়েরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে না। ফলে এতে পরিবারে অসন্তোষ তৈরি হয়ে সহিংসতা ও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করবে। মাতৃমৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রেও বাল্যবিয়ের ভূমিকা রয়েছে। এ ধরনের বিয়েতে অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান হয় এবং সারাজীবন ধরে অপুষ্টিতে ভোগে।

তবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ করার পর এই বিধানের যে নয়ছয় হয়নি, তা নয়। পালিয়ে বিয়ে করার পর দেখা গেছে, মেয়ের বাবা-মা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছেলেটার বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা ঠুকে দিয়েছেন। যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক বেগ পেতে হয় ছেলেটার পরিবারকে।

কিন্তু এই সমস্যার সমাধান তো এভাবে সম্ভব না। গোড়াতেই যদি আমরা সচেতন না হই, পরিবারগুলোকে সচেতন না করি, তবে বিয়ের বয়স ১৬ই হোক, আর ১৮ই হোক, অনিয়ম ঘটতেই থাকবে। যে দেশে জন্ম তারিখ, নাম-পেশা, এমনকি বাবার নামও পাল্টে যেতে পারে টাকার কল্যাণে, সেখানে এই আইন কতটা কাজে আসবে, তা বলাই বাহুল্য।

ফেসবুকে মন্ত্রীর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় একজন লিখেছেন- হায়রে, মন্ত্রী….শুধু কি মেয়েরাই? যে মেয়েটা পালিয়ে যাচ্ছে সে তো একা যাচ্ছেনা। একটা ছেলের সাথে যাচ্ছে। এক হাতে তো তালি বাজে না। এখন ছেলেটার বয়স নির্ধারন করে দিন। কত বছর হলে সে অল্প বয়সী পালিয়ে যাওয়া মেয়ের সাথে যেতে পারবে।
আর সরকার থেকে প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করে দিন এইসব পালিয়ে যাওয়া coupleদের জন্য।

 

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.