Women Chapter https://womenchapter.com বাংলাদেশের প্রথম নারী বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ পোর্টাল। Tue, 04 Aug 2020 12:18:07 +0000 en-US hourly 1 https://womenchapter.com/wp-content/uploads/2013/07/logo-2-50x50.jpg Women Chapter https://womenchapter.com 32 32 ‘সাম্প্রদায়িকতা নয়, আমাদের পাথেয় হোক মানবতা’ https://womenchapter.com/views/35268 https://womenchapter.com/views/35268#respond Tue, 04 Aug 2020 12:18:07 +0000 https://womenchapter.com/?p=35268 (গণসমালোচনার মুখে বাসদ এর বিবৃতি)

আপনারা অনেকেই জানেন এবার ঈদুল আযহা উপলক্ষে বরিশালে বাসদ এর উদ্যোগে প্রায় দেড় হাজার দরিদ্র নিম্নবিত্ত পরিবারে ঈদ আনন্দ পৌঁছে দিতে এক কেজি পোলাও এর চাল ও এক কেজি মাংসের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া হিন্দু ও খ্রিস্টান প্রায় ৪০০ পরিবারের জন্য মুরগির তেহারি রান্না করে বিতরণ করা হয়।
ঈদের আনন্দ যেন শুধু বড়লোকদের ঘরে বন্দী না থেকে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত পরিবারের কাছেও পৌঁছে যায় সেলক্ষ্যে বরাবরের মতো এবারেও আমরা এই আয়োজন করেছি। কারণ আমাদের দেশে সকল ধর্মীয় উৎসবেই আমরা সবাই এক সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। ঈদে হিন্দু, খৃষ্টানদের মুসলিম বন্ধু, প্রতিবেশিদের বাসায় দাওয়াত খাওয়া বা পুজো-বড়দিনেও হিন্দু-খৃষ্টান পরিবারে মুসলমানদের দাওয়াত খাওয়াটা খুবই সাধারণ বিষয়। মুসলিম বা হিন্দু মৌলবাদীরা এগুলোকে বিভিন্ন সময় ধর্মের পরিপন্থি বললেও তা কখনোই আমাদের দেশে হালে পানি পায়নি। গত রমজানের ঈদেও আমাদের দল বাসদ এর উদ্যোগে ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীর উপস্থিতিতে পাঁচ হাজার পরিবারে খাদ্য বিতরণকে কেন্দ্র করা হয়। যা সারাদেশেই সমাদৃত হয়।

গত চার মাস ধরে করোনা নিয়ে গণ মানুষকে সতর্ক করা, সরকারের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা, জনগণের বিভিন্ন অংশের সহায়তা নিয়েই জনগণের প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা আমরা করছি। এতে সমাজের বিভিন্ন অংশের অকুণ্ঠ সমর্থন আমরা পেয়েছি। যা আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের মনোবল বাড়িয়েছে, মানুষের প্রতি দায়বোধকে আরও উন্নত করেছে। জনগণের বিভিন্ন অংশে যোগাযোগ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি দরিদ্র মানুষের কাছে উৎসব কী পরিমাণ বেদনা নিয়ে আসে। একটু ভাল খাবার, পোশাক দিতে না পারার বেদনা কী গভীরভাবে বাবা মা’কে পীড়িত করে। তাই গত রমজানের ঈদে আমরা কিছু খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করেছিলাম করোনায় কর্মহীন ও সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য। অনেকে সহায়তা করেছিলেন সেই উদ্যোগে এবং পরামর্শ দিয়েছিলেন কোরবানি ইদেও যেন আমরা এরকম উদ্যোগ নেই। অনেক দরিদ্র পরিবারে মাংস কিনে খাবার সামর্থ্য নেই, তাদের পাশে যেন আমরা দাঁড়াই।

ফলে বাসদের উদ্যোগে সস্তায় দুটি গরু কিনে এক সমর্থকের মাধ্যমে দুই মাস ধরে লালন-পালন করে এবং সমর্থক ও শ্রমিকদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার মাধ্যমে আরও তিনটি গরু কিনে এবং যারা কোরবানি দিয়েছে এই আয়োজনে তাদের দেয়া কিছু কিছু মাংস দিয়ে দেড় হাজার দরিদ্র মানুষের ঘরে তা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। পাশাপাশি চার শতাধিক হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী দরিদ্রদের জন্য রান্না করা মুরগির তেহারি সরবরাহের ব্যবস্থাও করেছিলাম।

যেকোনো ধর্মীয় উৎসবের একটি সামাজিক দিকও থাকে। আমরা সেটাকেই বিবেচনায় রেখেছি সবসময়। অতীতের যে কোন কাজের কথা মনে করলে তার স্বাক্ষর পাবেন যে কেউ। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে বাসদ এবং মনীষা চক্রবর্তীকে হেয় করার তৎপরতায় নেমেছেন অনেকে। সৌজন্য এবং শালীনতার সীমাও মানছেন না কেউ কেউ।

এবার ঈদে বাসদ বরিশাল জেলা শাখার পক্ষ থেকে হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে এক কেজি পোলাওয়ের চাল এবং ১ কেজি মাংস বিতরণকে কেন্দ্র করে অনেকেই সমালোচনা করছেন। আমরা সবসময় সমালোচনাকে স্বাগত জানাই, এমনকি তা আমাদের জন্য কষ্টকর হলেও। কারণ এর মাধ্যমেই আমাদের কাজের দুর্বলতা, ত্রুটি আমরা বুঝতে পারি, বন্ধু এবং প্রতিপক্ষের সীমানাটা ধরতে পারি, আমাদের কাজ এবং সমালোচকের মানসিকতার পার্থক্য চিহ্নিত করতে পারি। সামগ্রিকভাবে না দেখে কোন একটি বিষয়কে প্রধান করে যারা হেয় করতে চান আর যারা সঠিক পরামর্শ দেন তাদের পার্থক্যও বুঝতে চেষ্টা করি।

এবার করোনা মহামারীর মধ্যে এই আয়োজন করতে গিয়ে আমরা দেখেছি অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে কোরবানি দিচ্ছেন না, কিন্তু তাঁরা কোরবানির একটা অংশের টাকা দিয়ে আমাদের এই আয়োজনে শরীক হয়েছেন। আমাদের শ্রমজীবী কমরেডরাও অনেকে ২০০/৩০০ টাকা দিয়ে যার যার সাধ্যানুযায়ী এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।

যেখানে এই মহামারির সময়ে ঈদ নিয়ে কোন রাজনৈতিক দলেরই বিশেষ আয়োজন ছিল না, সেখানে বাসদ এর এই গণমুখী আয়োজনের ব্যাপকতা অবশ্যই চোখে পড়ার মতো। মানুষজন এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরেও অনেক হিন্দু ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই আয়োজনে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। বাসদের পক্ষ থেকে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আমাদের দেশে রাজনীতির এটা একটা দৈন্যতা যে আমরা অপরকে ভালো কাজ করতে দেখলে উৎসাহিত না করে নিরুৎসাহিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যাই। আমরা লক্ষ্য করছি, বাসদের এই আয়োজনের ভিডিওতে যারা কটুক্তি ও অশ্লীল মন্তব্য করছেন তাদের অধিকাংশের আইডি ফেক ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী মন্তব্যে পরিপূর্ণ। তাদের অভিযোগ – বাসদ এর সদস্য সচিব ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী গরু কোরবানি দিয়েছেন ও মাংস বিতরণ করেছেন, এতে সনাতন ধর্মের অপমান হয়েছে।
আবার মুসলিম মৌলবাদী বা রাজনৈতিক পতিপক্ষরাও হিন্দু মানুষের কোরবানির মাংস হালাল না হারাম এই প্রশ্ন তুলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

প্রথমত, এই আয়োজনটা ছিল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের দরিদ্র নেতাকর্মীদের এবং এই আয়োজনে সকল সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দই সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল সেই মানুষদের কাছে উৎসবের স্বাদ পৌঁছে দেয়া যাদের ঘরে ক্ষুধার আগুন মহামারির চেয়েও প্রবল। আগেও বলেছি, এই ঈদ আয়োজনে অন্য সম্প্রদায়ের দরিদ্র (হিন্দু ও খৃষ্টান) মানুষের ঘরে ঘরে রান্না করা মুরগীর তেহারি পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আয়োজনের সার্বিক তত্বাবধান করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ। স্বাভাবিকভাবেই বাসদের আহ্বায়ক প্রকৌশলী ইমরান হাবিব রুমন ও সদস্য সচিব ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী পুরো বিষয়টা মনিটরিং করেছেন।

দলের সদস্য সচিব হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই এই আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী। কারণ তার কাছে সবচেয়ে বড় ধর্ম মানবতার ধর্ম, সবচেয়ে বড় ধর্ম শোষণ-বঞ্চনা থেকে মানুষের মুক্তি। ডা. মনীষা হরিজন কলোনিতে গিয়েও দুপুরের ভাত খান, খৃস্টানের ঘরেও ছুটে যান বড়দিনে, মুসলমানদের জন্যও তিনি নিবেদিতপ্রাণ। ধর্মীয় সংস্কার পালন করতে গিয়ে তিনি মানবসেবা থেকে বিচ্যুত হতে চান না কারণ তিনি জনগনের নেতা, কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতা নন।

জনগণের রাজনীতি করেন বলেই, আদর্শের সাথে আপোষ করেন না বলেই বরিশালে অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে বরিশাল কলেজের নামকরণের দাবিতে বরিশালে বাসদ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার সত্ত্বেও লড়াই থেকে পিছু হটেনি।

আজও এই মানবতার কাজে যারা মানুষের কল্যাণ না দেখে ‘জাত গেল’ ধোয়া তুলছেন, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক- শুধু এই কামনাই আমরা করতে পারি। অনেক হিন্দু, মুসলিম ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁদের বাবা-মার মৃত্যুদিবসে মসজিদ-মন্দিরে কোন আয়োজন না করে সেই অর্থ এই মানবতার বাজারে দিয়েছেন গরীব মানুষদের সহযোগিতা করার জন্য। এমনকি তারা বলেনওনি যে গরীব হিন্দু বা মুসলমানদের সহযোগিতা করো।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও ধর্মান্ধ বা সাম্প্রদায়িক না। তাই দরিদ্র মানুষের জন্য একটা ভাল কাজ করার পর শুধু ধর্মীয় বাতাবরণে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেটাকে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টা কখনোই সফল হবে না।

আরেকটি বিষয়- অনেকেই মন্তব্য করেছেন পূজা উপলক্ষে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত হিন্দুদের জন্য মানবতার বাজার বসবে কিনা? আমাদের উত্তর- আমরা অবশ্যই এ ধরনের মহৎ কাজ করতে চাই। এমনকি আপনাদের সহযোগিতা পেলে উত্তরবঙ্গের বন্যাকবলিত মানুষের পাশেও দাঁড়াতে চাই।
আপনারা জানেন যে আমরা আমাদের সমস্ত আয়োজন জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত সহায়তার ভিত্তিতেই করে থাকি। কোরবানিতে যেরকম অনেক ব্যক্তিই নিজে কোরবানি না দিয়ে আমাদের এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন, নিশ্চয়ই যারা এই প্রশ্ন তুলেছেন যে পূজাতেও এমন আয়োজন হবে কিনা, তাঁরা নিশ্চয়ই সেই আয়োজন সফল করতে আর্থিক সহযোগিতাও করবেন। আমাদের কাছে সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা আমাদের পেইজে দেয়া আছে।

বন্ধুগণ, অন্যদের কথায় বিভ্রান্ত হবেন না। ধর্ম পালন আর ধর্মীয় কুসংস্কারের পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করবেন। আপনারা সবাই দেখেছেন, সবদিক থেকেই আমাদের বিরুদ্ধে একদল কুচক্রি মহল উঠেপড়ে লেগেছে। মানবতার বাজার, ফ্রি অক্সিজেন সার্ভিস, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সবকিছু বানচাল করার জন্য বন্ধ করে দেয়ার জন্য হামলা পর্যন্ত করেছে। কিন্তু সফল হয়নি। সফল হতে পারেনি কারণ এই গুটিকয়েক মানুষের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী, আমাদের কাজকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালবাসার সহযোগিতা করার মানুষ আছে আমাদের পাশে। আমরা দমে যাওয়ার মানুষ না। আমরা মানুষের জন্য সবকিছু দিয়ে শেষপর্যন্ত লড়াই করার ব্রত নিয়েই রাজপথে নেমেছি।

আজ শুধু লালনের একটা কথাই বারবার মনে পড়ছে,

‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সবই দেখি তা-না-না-না
জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা..’
সবাই ভাল থাকুন, সত্য-ন্যায় ও মানুষের পাশে থাকুন।

(লেখাটি ডা. মনীষার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)

]]>
https://womenchapter.com/views/35268/feed 0
জীবন মানেই থামতে মানা https://womenchapter.com/views/35265 https://womenchapter.com/views/35265#respond Tue, 04 Aug 2020 11:51:46 +0000 https://womenchapter.com/?p=35265 কৃষ্ণা দাশ:

মেয়েটির মাত্র বারো ক্লাস পাশের পরই বিয়ে হয়ে যায়, যেখানে অন্য সবাই নতুন কলেজে ভর্তির দৌড়ঝাঁপ নিয়ে ব্যস্ত, মেয়েটি তখন নতুন পরিবেশে খাপ-খাওয়াতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছিল। এক মধ্যবয়সী লোকের হাতে কী জানি কী বুঝে তুলে দিয়েছেন বাবা-মা, এখনও মাঝরাত্রিরে তার হিসেব মেলাতে বসে মেয়েটি। লোকটি যখন সংসারের হিসেব কষায় ব্যস্ত, মেয়েটি তখন ঘাস ফড়িং এর ডানায় স্বপ্ন বুনে৷ বিয়ে মানে কী বুঝেছিল, ওই ছোট্ট প্রাণ কী জানি! তবু প্রচণ্ড স্বপ্নবাজ মেয়েটি সব ছেড়েও স্বপ্ন ছাড়েনি।

বিয়ে মানেই থেমে থাকা না, জীবন মানেই থামতে মানা, এটা মেয়েটি বুঝতো। তাইতো মেয়েটির প্রথম সন্তান যখন ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষা দিচ্ছে, মেয়েটিও মাস্টার্স পরীক্ষার হলে বসেছিল। থামতে মানা, এই শ্লোক মনে গেঁথে নিয়েছিল, এরপর একে একে আরো নানাবিধ কোর্স করে নিজেকে যোগ্য করার পণে নেমে পড়েছিল। একসময় দ্বিতীয় সন্তানের মা হয়, তারপরও ছুট ছিলো, ওই যে থামতে মানা। একে একে বিভিন্ন চাকরি করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্রতে নেমেছিল।
থেমে যেতে পারতো মেয়েটি, থেমে যেতে পারতো স্বপ্ন। গল্পটা পড়তে যতোটা ছোট, বয়ে নেয়ার পথটুকু অতটা ছোট আর মসৃণ ছিল না মোটেও। কোথায় যেন জিদ ছিলো, থামা যাবে না।

চাইলেই অন্য যেকোনো নারীর মতই হেঁসেল ঠেলে, বাচ্চা সামলিয়ে দিব্যি সংসার ধর্ম পালন করতে পারতো৷ করছে তো অনেকেই, এরপর অদৃষ্টের দোষও দিয়ে নিজে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব কি ওই অদৃষ্ট/নিয়তির দোষ? ইচ্ছা শক্তিরও কি অভাব না? জীবন চলার পথ কি এতো সোজা?

মেয়ে/নারীদের জীবন আরো কঠিন। তাই বলে কি থামলে চলবে? কিছু করার ইচ্ছা শক্তিটা নিজের মধ্যে জাগ্রত হতে হবে, তবেই হয়তো মুক্তি সম্ভব। মুক্তিটা কেবল নারীর না, মুক্তিটা চেতনা বোধের, জাগরণের। যুগে যুগে সমস্ত ভালো কাজের ক্ষেত্রেই হাজার হাজার বাঁধা এসেছে, আসবেও, তাই বলে থামলে চলবে কেন?

এরকম ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন তো কিছু না৷ বাবা-মায়ের এরকম অবিবেচনাও নতুন কিছু না। মেয়ে মানেই বোঝা, বোঝা যত তাড়াতাড়ি অন্যের ঘাড়ে চাপানো যায় ততই মঙ্গল। সেটা যেমন আগেও ছিল, এখনও আছে। এখনো আমাদের সমাজে অনেক মেয়েদেরই ১২/১৩ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। যতই বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা হোক না কেন, যতদিন আমাদের সমাজ তা না মানবে, যতদিন সমাজের বোধগম্য হবে যে, বাল্য বিবাহ আসলেই একটা কুপ্রথা ততদিন তা আটকানো সম্ভব না। সদরে না হোক, গোপনে ঠিক তা চালু থাকবে।

কয়েকমাস আগে আশাপূর্ণা দেবীর ‘সত্যবতীর ট্রিলজি’ উপন্যাসটি পড়ছিলাম, তিনটি উপন্যাস, একেকটা পড়ছি আর অবাক হচ্ছি। ওই সময়ে কি করে নারী মুক্তির সম্পর্কে এতোটা পরিষ্কার ধারণা সম্ভব? উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ বাংলা সন ১৩৭১, সময়কালটা অবাক করছে। তার মানে আগেও নারীর পদমর্যাদা যেমনটি ছিল, এখনও তাই আছে৷ একই জিনিস, শুধু চাকচিক্যময় প্যাকেটজাত। তখন নারীদের শোষণ করা হতো, এখনও হচ্ছে৷ এখন হয়তো নারীশিক্ষার পথ অনেকটাই খোলা, লাভ কী তাতে? সেই তো ডিগ্রিগুলো বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকছে। বিশেষ একটা অংশ হয়তো ঘরের বাইরে বেরুচ্ছে জীবিকার তাগিদে, তারপরও যে বিষয়টা আজও প্রশ্নবিদ্ধ, এই বিশেষ অংশ কি আদৌ পরাধীনতার রুদ্ধদ্বার ভেঙে বেরুতে পেরেছে? আদৌ কি তাদের মনে চেতনাবোধ জাগ্রত হয়েছে?

কেন বলছি? কারণ বেশিরভাগই দেখি আইন প্রয়োগের বেলায় নিজের জন্য এক আইন আর অন্যদের বেলায় ভিন্ন আইন। এরা এদের পছন্দ মতো আইনের যথেচ্ছা অপপ্রয়োগ করে। নারী মুক্তি মানে সমাজের সকল স্তরের নারীর জন্যই এক আইন। নারী মুক্তি মানেই সুবিধা মতো আইনকে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে নিজের মতো ব্যবহার করা না। নারী মুক্তি মানেই সংসারবিমুখ হওয়া না। কিংবা নারী মুক্তি মানে পুরুষ বিরোধিতা নয় মোটেও, সৃষ্টিকে থামিয়ে দেয়া মোটেও নারী মুক্তির লক্ষ্য না, হতে দেয়াও ঠিক না।

নারী মুক্তি মানে নিজেকে এবং সমাজের সকল স্তরের লোকেদের সমান ভাবা। এখানে পুরুষ যেমন সুপ্রিম না, তেমনি সমাজের নিচুস্তরের কাজ করা মেথরানীও ছোট না। সমাজের উঁচু স্তরে থাকা যে কারোর মতই মেথরানীরও নিজের ন্যায্য দাবি, অধিকার, বাকস্বাধীনতা, অবস্থা আর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করবার অধিকার আছে। ইচ্ছে করেই আমি বারবার নারীমুক্তি শব্দটা ব্যবহার করছি, নারীবাদ শব্দটা এড়িয়ে যাচ্ছি। কারণ আমাদের কিছুসংখ্যক স্ব-ঘোষিত নারীবাদীরা নারীবাদ শব্দটাকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন। এরা আসলে নারীবাদীর চাইতেও অধিক পরিমাণ সুবিধাবাদী। ভয় হয়, এদের আইন আর অধিকারের ব্যাখ্যা শুনলে। তাই নারীবাদ শব্দটা এড়ায়, আসলে তা ওইসব মুখোশধারী নারীবাদীদের এড়ানো।

উপন্যাসটি পড়ার পর থেকেই যে প্রশ্নগুলো বারবার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল তা হচ্ছে, কী করে নারীদের অধিকার নিয়ে লেখকের এতো পরিষ্কার ধারণা ছিলো? তথাকথিত কোন জেন্ডার-ইকুয়ালিটি কোর্স কি লেখকের ছিলেন? পরে যে জায়গায় এসে উপন্যাসটির মর্ম উপলব্ধি করেছিলাম তা হচ্ছে, বাংলার সমাজ ও পরিবারের অন্তঃপুরে আজ থেকে শতবর্ষ পূর্বে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল তা লেখক তার লেখনীতে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, কারণ যে ব্যক্তির নিজের মানমর্যাদা নিয়ে সচেষ্ট, নিজের আত্মসম্মান বোধ নিয়ে টনটন, তার মধ্যে পরাধীনতা মেনে নেয়া কিছুতেই সম্ভব না। তার মনে প্রশ্ন জাগবেই, এবং সে উত্তরগুলো খুঁজে ফিরবেই। মানুষ, নারী পুরুষ মাত্রই। তবু সামাজিক মর্যাদা, অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন, আইন ও অধিকারের ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য। আর তা যেকোনো বিবেকবান মানুষেরই দৃষ্টি এড়াতে পারবে না কিছুতেই।

থাপ্পড় মুভিটা নিয়ে অনেক রিভিউ ইতিমধ্যে চোখে পড়েছে। এক কথায় বললে বলা যায়, সবার আগে নিজেকে নিজের সম্মান করা। পথটা কঠিন, কিন্তু দুর্গম নয়। মুভির ক্ষেত্রে খুব রিসেন্ট একটা মুভি খুব ভালো লেগেছে তা হচ্ছে, বিদ্যা বালানের ‘শকুন্তলা দেবী’। আর পাঁচজনের মতই শকুন্তলা দেবীর মেয়েও সারাজীবন শকুন্তলার মধ্যে মাকে খুঁজেছে। সাধারণ একজন মা খুঁজেছে। যখন মেয়েটি নিজে মা হলো, তখন গিয়ে বুঝলো তার মা শকুন্তলা দেবী মায়ের সাথে সাথে, একা ধারে এক নারীও বটে। তাঁরও ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে, তাঁরও নিজের মতো বাঁচার অধিকার আছে। তিনি কেবল মা-ই ছিলেন না, ছিলেন জিনিয়াস মা।

ভাললাগা আর মুগ্ধতা কাজ করে এমন উপন্যাস পড়ে, দৃষ্টি আরও পরিষ্কার হয়। পাশাপাশি এ ধরনের মুভিগুলো চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটায়। মেয়েরা/নারীরা স্বপ্নবাজ হোক, কল্পনার পাখা মেলুক, চোখের সাথে মন দিয়েও দেখুক চারিপাশটাকে, প্রচুর আশাবাদী হোক, আলো আসবেই।

]]>
https://womenchapter.com/views/35265/feed 0
‘একটি সভ্য দেশের আখ্যান’ https://womenchapter.com/views/35261 https://womenchapter.com/views/35261#respond Tue, 04 Aug 2020 11:39:08 +0000 https://womenchapter.com/?p=35261 নাহিদা আক্তার:

১) আমাদের পাশের বাসার আন্টি আংকেল, তিন-চার বছর আগে, আমাদেরই বাসার সামনে মেইন রোডে একসাথে মারা যায়, সাত সকালে। উনারা মারা যায়, কারণ খালি রাস্তায় ঈদের পরের দিন ভোরবেলা উনার দুইজন দাঁড়িয়ে ছিলেন সিএনজির জন্য, হঠাৎ একটা গাড়ি খুবই দ্রুতগতিতে এসে উনাদের আঘাত করে, আন্টির বোরখা নাকি ওড়না পেঁচিয়ে যায় গাড়ির সামনের বাম্পারে। ওই গাড়ি আংকেলকে চাপা দিয়ে আন্টিকে ওই পেঁচানো অবস্থায় গাড়িসহ টেনে নিয়ে যায় আমাদের পরের এলাকা পর্যন্ত। এই নিউজ টিভিতে আসছে মানববন্ধন হইছে, কিন্তু ওই ছেলেগুলোর কি কোন বিচার হইছিল কেউ জানেন? ওই গাড়িতে সব ফেন্সি ইয়াবা খেয়ে টাল ছিল, ওদের গাড়িতেও মদ ফেন্সি ইয়াবা পাওয়া গেছিলো। গাড়ি যে চালাচ্ছিল সে এমপির ছেলে, একদংগল বন্ধু নিয়ে সারারাত নেশা করে ওরা এই কাজ করছিল, সব নিউজপেপার, টিভিতে দেখাইছে, এবং হঠাৎ একদিন ওই ঘটনা বিচার সবকিছুই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে।

নাহিদা আক্তার

২) এক মেয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল, একদল বাইকার একই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওই মেয়ের ওড়না ধরে টান দেয় চলন্ত বাইক থেকে, স্পট ডেথ ওই মেয়ের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে। ওই ঘটনায় যে ছেলে জড়িত সেও এমপি মন্ত্রীর ছেলে, কোন বিচার হইছে কেউ শুনছেন? ওই ছেলের শাস্তি হইছে কেউ জানেন? এই ঘটনাও কিন্তু টিভিতে, নিউজপেপারে আসছে।

৩) রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে এমপি হোস্টেলে ঢুকেছে। যারা ওই এক্সিডেন্ট দেখেছে তাদের মধ্যে দুইজন বাইক নিয়ে ওই গাড়ি ফলো করতে যেয়ে দেখে ওই গাড়ি এমপি হোস্টেলে ঢুকে গেলো, এটাও নিউজে আসছে, ওই গাড়ি চালাচ্ছিল কোন এক অঞ্চলের এমপির ছেলে গাড়িতে ছিল তার এক দংগল বন্ধু, ওই পুরা ঘটনা পরে কেমনে ধামাচাপা দেওয়া হইছিল মনে আছে, কোন বিচার শাস্তি নামক কোন গল্প কেউ জানেন?

৪) কিছু হলেই একপাল মাদ্রাসার ছেলে লাঠি হাতে বের হয় যায় কখনও গান কেন বাজাচ্ছে কখনও কেন নাচের অনুষ্ঠান কেন, কখনও মেয়েরা ফুটবল খেলতেছে কেন, কখনও তাদের দু’পয়সা ঠুনকো অনুভূতিতে আঘাত লাগছে, একপাল ছেলে বের হয়ে গেলো কাউকে মেরে ফেললো কারও ঘর জ্বালায়ে দিলো জীবনে কোনদিন শুনছেন যে একপাল ছেলে নিয়ে ইতরামি করলে, তাদের বিচার হইছে বা তাদের কোন শাস্তি দেওয়া হইছে?

৫) কারা দুইদিন পরপর এক, দুই হাজার হোন্ডা নিয়ে পুরা রাস্তা দখল করে নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখায়? কোনদিন তাদের কেউ কিছু বলছে, নাগরিকদের বিরক্ত করে তাদের কাজকর্ম সব বন্ধ করে ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় সবাই বসে ছিলাম, কেউ কি প্রতিবাদ করছিল?

একপাল ছেলে থাকলেই ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতা বলে আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন এইসব কাদের থেকে শিখছি আমরা, কারা আমাদের পথ দেখাচ্ছে এইসব কাজে? আমরা নাকি গণপ্রজাতন্ত্রী … তো এই গণপ্রজাতন্ত্রে খালি এমপি মন্ত্রীর ছেলেরা, হেলমেট বাহিনী, আর মাদ্রাসার হুজুর তাদের ব্রেন ওয়াশ করা ধ্বজভঙ্গ অনুভূতি সম্পন্ন ছেলেদের নিয়ে রাস্তা দখল করে যা ইচ্ছা তাই করবে, তাদের কোন শাস্তি বিচার কিছুই হবে না, কেউ প্রতিবাদ করবে না?

(এমনি হাজার হাজার উদাহরণ সামনে এনে হাজির করা যাবে যেগুলোর কোনো শাস্তি তো দূরে থাক, অপরাধীদের ছোঁয়াও হয়নি)

]]>
https://womenchapter.com/views/35261/feed 0
বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নারী মহলে সেভাবে চর্চিত নয় কেন? https://womenchapter.com/views/35257 https://womenchapter.com/views/35257#respond Tue, 04 Aug 2020 00:54:53 +0000 https://womenchapter.com/?p=35257 ডালিয়া চাকমা:

বাংলাদেশে করোনার শুরুর দিকে কোনো এক ইন্টেলেকচুয়াল লোককে পোস্ট দিতে দেখেছি, যেখানে তিনি বলেছিলেন, করোনার এই দুঃসময়ে অনলাইনভিত্তিক যেসব আলাপ আলোচনা চলছে সেখানে নারীর উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় খুবই নগণ্য। এছাড়াও চারপাশের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারি লোকে একজন নারী ও একজন পুরুষের কাছ থেকে সম আলাপ প্রত্যাশা করে।

অন্যান্য জেন্ডারের কথা বাদই দিলাম যেহেতু এই সমাজে জেন্ডারের বাইনারি ফ্রেমে অন্যান্য জেন্ডারের মানুষকে এক্সক্লুড করে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে সমাজের সর্বস্তরেই, তাই তাদের কাছ থেকে সম আলাপ প্রত্যাশা তো দূর কী বাত, তাদের ভাবনা ও জীবনের সমগ্র আলাপের পথই এই সমাজে রুদ্ধতার আলাপ হিসেবে গণ্য। তাই আমার কথাগুলোও আপাতত জেন্ডারের ওই বাইনারির মধ্যেই রাখছি।

মাস ছয়েক আগে আরেকজন ইন্টেলেকচুয়াল ফিগারের পোস্ট আমার নজর কাড়ে যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন একজন নারীর কনভারসেশনে কী কী থাকলে তিনি পুরুষদের কনভারসেশনে জাম্প করতে পারেন। লেখাটি তিনি লিখেছিলেন প্রবাসে বাঙালীদের কোনো এক গেট টুগেদার পার্টি থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে। তবে তিনি যে তরিকা দিয়েছেন তা ছিলো সমগ্র বঙ্গনারীর জন্যই তার সাজেশান, যা বেশ লাইকড এন্ড শেয়ারড হয়েছিলো। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, আজকাল আমাদের দেশের নারীরা পুরুষের পাশাপাশি অর্থোপার্জন করছেন ঠিকই, কিন্তু নারীদের আলাপ এখনও সেই সংসার কাঠামোর ফ্রেম ভেঙে আসতে পারেনি। তারা স্পোর্টস নিয়ে আগ্রহী না, তাই পুরুষদের স্পোর্টস নিয়ে আলাপে তারা এক্সক্লুড হয়ে যায়। নারীরা ওয়ার্ল্ড পলিটিকস, পলিটিকাল ডিপ্লোম্যাসি এসবের খবরাখবর রাখে না, যার ফলে পুরুষদের এসব আলাপ থেকেও তারা বাদ পড়ে যায়। তারা লিকার প্রেজেন্টেশনের প্রক্রিয়া জানে না, যা পুরুষদের কোন গ্রুপের কনভারসেশনে ইন করার একটা সহজ উপায়। তিনি তার এলিট লেন্সের মধ্য দিয়ে আপামর বঙ্গীয় নারীর জন্য উপায় বাতলে দিয়েছিলেন কীভাবে তারা আলোচনায় পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে এবং ‘আমরাও পারি’ সেই ভাব নিতে পারে। তো ওই এলিট ও প্রিভিলেজড লেন্সের মধ্য দিয়ে দেখতে ও দেখাতে গিয়ে তিনি বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন একজন ব্যক্তি আলাপ করে তার দৈনন্দিন জীবনের অরিয়েন্টেশন থেকেই। ব্যক্তি যা পড়েন, যা দেখেন, সেখান থেকেই তার ভাবনার খোরাক আসে। খালি ভাবনা আসলেই হয় না, সেই ভাবনা চর্চার একটা জায়গাও থাকতে হয় সমাজে।

জানার এই যে সিস্টেম অব নলেজ সেটা আমাদের পরিবারে-ঘরে কতটুকু চর্চিত বা এলাউড? ঘরের চার দেয়ালের বাইরে একজন পুরুষের যতটুকু এক্সেস, একজন নারীর জন্য সেটা কতটুকু প্রযোজ্য? একাডেমিক প্রতিষ্ঠান কি ঘরের চার দেয়ালের বাইরের সমসাময়িক জগত নিয়ে আলাপ করে? না করে থাকলে তাহলে সেইসব আলোচনা লোকে কোথায় গিয়ে করতে পারে?

পরিবার-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গেলো, রইলো বাকি বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডা। ঘর ও প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের বাইরে নারীদের যাতায়াত সমাজ এখনও মেনে নিতে পারেনি, যা একজন পুরুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক। ‘পাড়াবেড়ানি’ নামক নেতিবাচক কনোটেশনটি একজন বহির্মুখী নারীর জন্যই সৃষ্টি, যার পুরুষবাচক শব্দ আপনি সমস্ত ডিকশনারি খুঁজলেও পাবেন না।

এককালে পাড়ায় পাড়ায় তরুণদের মধ্যে পাঠ ও জ্ঞান চর্চার জন্য বিভিন্ন সংগঠন বা ক্লাব চালুর রেওয়াজ ছিলো, যেখানে নারীদের এক্সেস অবাধ না হলেও খুব একটা ক্রিঞ্জড ছিলোনা। ধীরে ধীরে ইউরোসেন্ট্রিক আইডিয়ালিজমের বিপরীতমুখী ঠ্যালায় সেসবের চর্চা সমাজ ও ব্যক্তির মনন থেকেও উঠে গেলো। আজকাল মার্কেট বা রেস্টুরেন্টের অত্যাবশ্যকীয় যে আবশ্যকতা, সেরকম আবশ্যকতা ওইরকম সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ অনুভব করে কি? সংগঠন বা ক্লাব নামে যাও বা আছে, সেসবে আর যাই হোক খুবই কদাচিৎ পাঠচক্র হয়। শোনা কথা, আজকাল ওইসব সংস্থা-ক্লাব-সংগঠনের সাথে দলীয় রাজনীতির সম্পৃক্ততা ওপেন সিক্রেট ব্যাপার স্যাপার, যার মধ্যে ঘরের ছেলের সম্পৃক্ততা মেনে নেয়া গেলেও, ঘরের মেয়ের জন্য নাকি তা ‘নষ্টামি’।

যাই হোক আমরা এনলাইটেনমেন্টের ঠ্যালায় আসা প্রযুক্তির কল্যাণে গুগল মামা পেয়েছি। আলাদীনের জিনের মতোই চাইলেই যখন তখন পাওয়া যায়। যা জানতে চাই, সবই হাজির। এই যে ‘হাতের মুঠোয় দুনিয়া’ বলে যে প্রচারণা, তা লোকের শ্রেনী, লিঙ্গ, ক্ষমতা ও সামর্থ্যভেদে কতটা সত্য? একজন অর্থোপার্জনকারী নারীর জন্য সংসারের যে কাঠামো, একজন অর্থোপার্জনকারী পুরুষের জন্যও কি তেমন? সন্তান লালন পালনের দায়িত্ব যেভাবে একজন নারীর উপর বর্তায়, সেভাবে কি একজন পুরুষের উপর বর্তায়? পরিবারে নারী ও পুরুষের অবসর বা ব্রিদিং স্পেস একই কি? দায়িত্ব ও কর্তব্যের পারিবারিক পরিষেবার যে সংজ্ঞায়ন তার সমবন্টন না হওয়াতক ‘একজন নারীর আলাপ পুরুষদের মতো বৃহৎ পরিসরের হওয়া উচিত যাতে তারা সমান তালে পুরুষদের সাথে আর্গুমেন্টে জড়াতে পারে’ – এরকম ভাবনা অত্যন্ত একপেশে এবং অতি অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি ঠিকই বলেছিলেন আমাদের সমাজে স্পোর্টস, পলিটিকস, তথ্য পুরুষদের চর্চা হিসেবেই ধরে নেয়া হয় (যদিও এটা কে ঠিক করে দিয়েছে, কীভাবে হলো আমরা কেউই জানি না)। খুব সচেতনভাবেই পুরুষকূল নিজের ঘরের নারীদের এসব থেকে দূরে রাখেন (এখানে আছে ক্ষমতার রাজনীতি যার চর্চার মধ্য দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে অন্তরাল করার রাজনীতি চলে)।

‘পুরুষের আলাপ’ বলে এই যে পলিটিকো-সোশিও-ইকোনোমিক কন্সট্রাকশন, এটাকে নারীরাও বিশ্বাস ও পালন করছেন সচেতনভাবেই। যদিও তথ্যের ও আইডিয়ার অবাধ এক্সেসের এই যুগে নারীদের মধ্যে চিরাচরিত সেসব পুরুষতন্ত্র সংজ্ঞায়িত নীতি ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে অনেকক্ষেত্রেই, কিন্তু সমগ্র পরিসরে তা যেনো খুবই কিঞ্চিত মনে হয়। ছাত্রাবস্থায় রাজনীতিতে নারীর দাপট পুরুষের সমানতালে চলতে দেখা গেলেও, একটা পর্যায়ে তেমনটা আর হয়ে উঠে না। নারী সংসার কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করলে কর্মজীবন-পরিবার এসব নিয়েই পুলসেরাত পার হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে যায়, এর বাইরে জানা বোঝা তো আরো দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী স্ত্রীর স্বাভাবিক ঘুম একজন কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কম। আগে নারী স্ত্রীরূপে সেবিকা হলেও ক্যাপিটালিজমের চাবুকে নারীকে আজকাল ‘নার্স উইথ পার্স’ রোল নিতে হচ্ছে। এইটা পরিবারে নারীর রোলকে আরও জটিল করে তুলেছে। ‘উই কান্ট ব্রিদ’- কথাটা এই জটিল রাজনীতিতে নারীর প্রত্যেকটা মুহূর্তের জন্য ভয়াবহ বাস্তবতা। রাজনৈতিক এক আড্ডা শেষে ফিরতি পথে এক আপু বলছিলেন, ‘আমাদের মতো মেয়েরা কেনো যে সংসারে ঢোকে!’ এই যে কীভাবে আর কেনোই বা সংসার এবং রাজনীতি একজন নারীর জন্য দুইটা আলাদা কন্ট্রাডিকটোরি জগত হয়ে গেলো তার আলোচনা বাদ দিয়ে ‘নারীরা কেবল সংসারের গল্প করে বেশি’ এই টোকেন চালু হলো, তার দায় সমাজকে না দিয়ে কীভাবে নারীর উপর ছেড়ে দেন?

এইসব আলাপ ব্যতিরেকেই ওইসব এলিট বা প্রিভিলেজড লেন্সের মধ্য দিয়েই অনেক রকমের তরিকা দেয়া যায়, যাতে আর কোনোকিছু না হলেও ক্যাওস তো হয় নিশ্চয়ই। আমরা বরং প্রশ্ন তুলতে পারি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নারী মহলে সেভাবে চর্চিত নয় কেনো। করোনাকালীন ঘরবন্দী পুরুষদের জন্য যেরকম অবসর তৈরি করেছে, একজন নারীর জন্য কি সেটা প্রযোজ্য? এইসব নুয়েন্স আমলে নিয়ে ‘মেয়েলোকের বুদ্ধি’, ‘এসব বাইরের ব্যাপার স্যাপার তুমি বুঝবে না’ সমাজে প্রচলিত এইসব ফ্রেজ যতদিন পর্যন্ত বদলানো যাচ্ছে না, ততদিন নারীরাও ‘সংসারের সিলি টক’ ছেড়ে বাইরের দুনিয়ার আলাপ করবে এই প্রত্যাশা অনুচিত।

এই সমাজে নারীদের এই ইন্টারসেকশনাল অভিজ্ঞতা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যই সত্য। যদিও বা পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক কাঠামোয় সামর্থ্য ও ক্ষমতা কিছুক্ষেত্রে শ্রেণি চরিত্র বদলে দিচ্ছে, যেখানে অনেক ট্যাবু কিংবা ব্যারিয়ার ভাঙা অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে আমাদের মতো ডেভেলপিং কিংবা লেস ডেভেলপড কান্ট্রির জন্য ওইসব সুবিধা আঙুর ফল টক হিসেবেই বেশি গণ্য করা হচ্ছে।

এবার আসি মাস ছয়েক আগের আলাপ কেনো আজ টানলাম। ইনবক্সে অনেকেই জানতে চেয়েছেন বাড়ি আসার পর থেকে আমি লাপাত্তা কেনো, কী নিয়ে এতো ব্যস্ততা? ঘরের কাজে ব্যস্ত আছি – আমার এই কথাটা একজন নারী যেভাবে অতি সহজে ‘বুঝে নিতে’ পেরেছেন, সেটা আমি কোনো পুরুষকেই ‘বোঝাতে’ পারিনি। তাদের না বুঝতে পারাটা তাদের ডিজঅরিয়েন্টেশনের ফলাফল।

পুরুষের প্রিভিলেজড অবস্থান থেকে তারা আমাকে ইনসিস্ট করেছেন, এর মধ্য থেকেই জানতে হয়, ভাবতে হয়, বলতে হয়, লিখতে হয়। ধারণা করি জানার ওই উৎস কিংবা সেইটা কীভাবে এক্সেসড হয় সেটা তারা না বুঝেই বলেছেন। কারণ আমি হাজারও তাড়নাতেও সেটা সম্ভব করতে পারিনি বা পারছি না। বাস্তবতা ও তাড়নার এই বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার ফলতঃ যে যন্ত্রণা সেটা ব্যক্তিগত বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও আমি জানি এটা আমার চারপাশের অধিকাংশ নারীর জন্যই সত্য। শেয়ারড এক্সপেরিয়েন্স আমাকে কিংবা আমাদেরকে এই বোধগম্যতা দিয়েছে। যাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরকে আসলে কী বলা যায় জানা নেই আমার। কারণ যে শেয়ারড অভিজ্ঞতা নারীদেরকে এক কাতারে করে, ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই পুরুষদের থেকে নারীদের দূরত্ব তৈরি করেছে। এই দূরত্ব ঘোচাতে কী দরকার সেসব নিয়ে আলাপ হওয়া দরকার সমাজে। তারপর নাহয় ‘পুরুষদের মতোই বাইরের দুনিয়া নিয়ে ভাবা’ যায় কীনা তা আলাপ করা যাবে।

]]>
https://womenchapter.com/views/35257/feed 0
তিন অক্ষরের মানুষ https://womenchapter.com/views/35254 https://womenchapter.com/views/35254#respond Tue, 04 Aug 2020 00:14:01 +0000 https://womenchapter.com/?p=35254 ফারজানা সুরভি:

হেনাকে কখনো ওর পুরো নাম জিজ্ঞাসা করিনি। হাসনাহেনা থেকে হেনা এসেছে কি? মাথা নিচু করে হাঁটতো সবসময়। ফাঁটা ঠোঁটের কোণায় বারো মাসের মধ্যে ছয় মাস জ্বরঠোসা। হেনার নিশ্চয়ই খুব জ্বর আসতো। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘেমে যেত। কখনো তার শরীরে ফুলের গন্ধ পাওয়া যেত না। হাসনাহেনার ঘ্রাণ শুধু গাড়ি থেকে নেমে টুকটুক করে হাঁটা ক্রিস্টালের মতো চকচকে মেয়েদের গায়ে থাকে।

মাঝে মাঝে তার চশমার ডাঁটি বেঁকে যেত। তখন সে দুই হাতে চেপে চেপে নিজে নিজে চশমা মেরামতের চেষ্টা করত। আরেকটা চশমা কিনতে গেলেই টাকা খরচ হবে শুধু শুধু। হেনা একদিন একটা কাগজ ফটোকপি করতে দোকানে গিয়েছিল। তখন পাশ থেকে বেশ ভদ্র চেহারার একটা ছেলে বলে, “কাক-ও একটা পাখি। এইটাও একটা মেয়েমানুষ।” চেহারা খারাপ হওয়ার অপরাধবোধে ফটোকপি না করিয়েই সে দোকান থেকে চলে যায় হেনা। রিকশার ভাড়া বাঁচাতে সে হেঁটে হেঁটে টিউশনিতে যেত। রোদে সে দিন দিন আরো কালো হতে থাকে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এসব কারণেই শুভ তাকে ভালোবাসে না। নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে তার লজ্জা হত। আশেপাশের মেয়েদের পেডিকিউর করা নখে ফ্রেঞ্চ পলিশ। গোড়ালিতে রূপার নুপূর। এইসব সাজগোজ করতে তার লজ্জা লাগত। মনে হত, কোনদিন কেউ বলে বসবে- কাক হয়ে সে ময়ূরের পাখনা লাগাতে চাইছে। শুভ বন্ধুদের সাথে বসে সিগারেট খেতে খেতে কায়দা করে বলত, মেয়েরা তার জন্য যে কোন কিছু করতে রাজি থাকে! উদাহরণ হিসেবে সে হেনাকে দেখাতো। শুধু একটা ফোন! তার একটা ফোন পেলে, ঢাকা শহরের বীভৎস ট্র্যাফিক পার হয়ে মেয়েটা চলে আসবে। এরকম পোষা মেয়ে মানুষ দেখলে পোষা কুকুরের কথা মনে পড়ে। ‘তু তু তু’ করে আঙ্গুল নাচালে ঝাঁপিয়ে পড়বে কুকুর। ভুলে যাবে মালিকের দেয়া সকালের লাথি।

হেনা এইসব দেখে অন্ধ থাকার ভান করতো। সে জানতো, শুভ তাকে ভালো বন্ধু ভাবে। সে মানতো, মাটির পুতুল বালকদের হৃদয় কাড়ে না। মেলার মধ্যে বিক্রি হয় গ্রামের কোন বৌয়ের কাঁচা হাতে বানানো পুতুল। বালক সেই পুতুল ভেঙ্গে ফেলে মেলা শেষ হওয়ার আগেই। শপিং মলে দামি ক্রিস্টালের পুতুল পাওয়া যায়। চকচকে পুতুল। সে পুতুল দেখলে বালকেরা বাড়িতে নিয়ে যায়। পুতুলের মালিকানা দাবি করে। তবু হেনা বসে থাকতো কলা ভবনের সিঁড়িতে। পাশে শুভ। এরকম অনাকর্ষণীয় একটা মেয়ের পাশে বসতে তার লজ্জা লাগতো। কিন্তু হেনার কাছ থেকে মাসের সিগারেটের খরচ আর ফোনের ফ্লেক্সিলোডের টাকাটা নিতে তার ভালো লাগতো।

শুভ একদিন হেনাকে রিকশাতে বসে চুমু খায়। প্রেম ছিল না। প্রতিশ্রুতি ছিল না। তবু চুমু খায়। এই দাবির উৎস হেনার একতরফা ভালোবাসা। সেদিন সারা রাত মেয়েটি পানি খায় নি। পানি খেলে ঠোঁট থেকে স্পর্শ মুছে যাবে। শুভ ক্রমাগত দাবি বাড়িয়ে চলে। হেনা দাবি পূরণ করতে থাকে।

যেদিন শুভ ফেসবুকে বিয়ের ছবি পোস্ট করে, হেনা কাঁদে। এরকমই তো হওয়ার কথা ছিল! তবু মনে হয়েছিল, মানুষ বদলায়। হয়তো শর্তহীন ভালোবাসা শুভকে প্রেমিকে রূপান্তর করবে। ফেসবুকে যুগল ছবিতে ক্রিস্টালের পুতুলের মতো একটি মেয়ে বউ সেজে আছে। ক্রিস্টালের বউয়ের মাথার ঘোমটা মিথ্যামিথ্যি ঠিক করে দিচ্ছে শুভ। এরকম হয়েই থাকে। তবু হেনার কান্না পায়। জোরে কাঁদার মতো তার নিজস্ব ঘর নেই। তাই বাথরুমে কল ছেড়ে কাঁদে। তার ফাঁটা ঠোঁট আরো ফেটে যায়।

পরদিন টিউশনিতে যাওয়ার সময়ে হেনা হাঁটে না। রিকশা ডাকে। নিজস্ব আরামের জন্য টাকা খরচ করতে তার ভালো লাগে। টিউশনি থেকে ফেরার পথে “এই খালি” বলে আরেকটি রিকশা ডাকে। তখন গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দঙ্গল থেকে একজন বলে, “এই কালি! এই কালি”। সেই প্রথম হেনা ঘুরে তাকায়। রিকশার হুড তুলতে তুলতে গালি দেয়, “শুয়োরের বাচ্চা!” গালি শুনে রিকশাওয়ালা চমকে তাকায়। ইস্ত্রি করা সালোয়ার কামিজের কোণা ঠিক করতে করতে সে এবার গালি দেয়, “কুত্তার বাচ্চা!”।

বাসায় ফিরে হেনা ফেসবুকে লগ ইন করে। সে জানে, শুভ বদলাবে না। কয়েক মাস পরেই তাকে মেসেজ পাঠাবে। লিখবে, তার ক্রিস্টালের বউ তাকে কত কষ্ট দিচ্ছে। হেনা ছাড়া তাকে কেউ আসলে কখনো বুঝেনি! হেনা হাসে। হাসতে হাসতে বলে, “সব শালা শুয়োরের বাচ্চা!” সেদিন প্রথম হেনার নিজেকে ভালো লাগে। বাঁকা চশমার ফাঁক দিয়ে সে আয়না দেখে। ক্রিস্টালের পুতুল নয়, আয়নায় সে একটি মাটির পুতুল দেখে। রোদে পুড়ে যাওয়া শক্ত মাটির পুতুল। প্রথমবারের মতো সে নিজেকে ভালোবাসে। ব্যবহৃত হতে হতে নিজের ছায়াকে হারিয়ে ফেলেছিল হেনা। দুই শব্দের একটি গালিতে তার মুখে থুতু জমে। দলা দলা থুতু সে বেসিনে ছুঁড়ে মারে। মানুষের উদ্দেশ্যে।

সে জেনে যায়, মানুষ শব্দটি তিন অক্ষরের। এর ক্ষুদ্রতা মাপতে দুই শব্দের একটি গালিই যথেষ্ট। দুই শব্দের গালি তাকে শক্তি দেয়।

]]>
https://womenchapter.com/views/35254/feed 0
যখন বিয়েই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য! https://womenchapter.com/views/35251 https://womenchapter.com/views/35251#respond Mon, 03 Aug 2020 22:54:29 +0000 https://womenchapter.com/?p=35251 শাহরিয়া দিনা:

ঈদের ছুটিতে পত্রিকায় পড়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে দুইটা ঘটনা বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। প্রথমটা হচ্ছে শ্বশুরবাড়ি যেতে রাজি না, তবু জামাইকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মাঝপথে ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে বিষ হাতে অনশনে বসেছে প্রেমিকা। ছবিও দেয়া হয়েছে তার। প্রেমিক যথারীতি পলাতক। তো এই প্রেমিকার বয়স ১৯ এবং আট বছর তাদের প্রেমের বয়স। মানে কী দাঁড়ালো? ১১ বছর বয়স থেকেই প্রেম শুরু!

১১/১২ বছরে প্রেম বুঝবার বা উপলব্ধি করবার মতো কোন বিষয় না নিশ্চয়ই। তো এতো ছোট থাকতেই কেন তাদের ভাবনা এদিকে ধাবিত হচ্ছে ভাবা জরুরি। খেলাধুলার মাঠ নেই, নেই পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ। পরিবারে কিংবা আশেপাশে এমন কোন আইডল নেই যা তাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে জীবনের বড় অর্জনের দিকে কিংবা ভাবাতে পারে ক্রিয়েটিভ কিছু করার জন্য।

প্রথম ঘটানায় আসি। এক দম্পতিকে জানি তারা ফ্যামিলি লাইফে মোটামুটি সুখী, কিন্তু স্বামী ভদ্রলোক শ্বশুরবাড়ির লোকদের পছন্দ করে না, যেতেও চায় না। প্রতি বছর ঈদ ধরনের উৎসবে তাকে শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে তেল, ঘি, ডালডা, বাটার সবই মাখে একবার পদধূলি দেবার জন্য। উনি শেষমেষ যায় ঠিকই। শ্বশুরবাড়ির লোক হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, যাক সমাজের সবাই তো দেখলো জামাই এসেছে! পরে যা হবার হবে। তো ভদ্রলোক গিয়ে হাজারটা ভুল ধরবে, তা নিয়ে সারাবছর কচলাকচলি চলবে, আবার বছর ঘুরে ঈদ আসবে, এইভাবেই চলছে গত ১৭/১৮ বছর ধরে।

আরেক নতুন দম্পতি যারা দু’জনেই ডাক্তার। প্রেমের পর খুব কষ্ট করে দুই পরিবারকে রাজি করিয়েছিলেন বিয়েতে। কিন্তু বিয়ের সময় এমন কিছু বিষয় নিয়ে বিবাদ হলো যে বিয়ের পর থেকে দুই পরিবারের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এরা পরিবার থেকে আলাদা থাকে। ঈদ বা তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যে যার বাসায় গিয়ে পালন করে। অর্থাৎ ছেলে ছেলের বাবার বাড়ি, মেয়ে মেয়ের বাবার বাড়ি। তাদের দাম্পত্য জীবন আপাতত সুখের, যদিও এক পরিবারের খবর অন্যজন জানে না।

শ্বশুরবাড়ি একজন যেতে না চাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তেমনি নিচ্ছে বলে আত্মহত্যা করতে হবে সেটা স্বাভাবিক তো দূর, হাস্যকর কথা।

দ্বিতীয় ঘটনায় যে ছেলে বিয়ের আগেই পালাতে পারে, সে বিয়ের পর আজীবন দেখেশুনে রাখবে এটা ভাবার জন্য চূড়ান্ত রকম নির্বোধ হতে হয়। ভালোবাসা আছে বলেই মেয়েটা বিষের বোতল হাতে বসে আছে মানলাম, কিন্তু অপাত্রে অমৃতও মূল্যহীন, না বুঝলে বা মানতে না পারলে তার জীবন এমনিতেও শেষ।

স্কুলে এইম ইন লাইফ রচনা সবাই লিখে। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক হতে চায়, সত্যি কথাটা কেউ লিখে না বোধহয়। আসলে আমাদের দেশের বেশিরভাগের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বিয়ে করা, বিশেষ করে মেয়েদের। সিনেমার মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আচমকা ধাক্কা; মনের মধ্যে লা লা লা সুর বেজে উঠা এমন রোমান্টিক স্বপ্ন দেখা খারাপ কিছু না। কিন্তু বিপত্তি তখনই যখন সবকিছু তুচ্ছ করে এমনকি জীবন বাজি ধরে প্রেম অথবা বিয়ের জন্য।

আমরা মজা করে ছোট বাচ্চাদের আদর করে জিজ্ঞেস করি, বাবু, তুমি কাকে বিয়ে করবা? বাবুও জেনে যায় বিয়ে আমাকে করতেই হবে। বাবু থেকে বুড়ো বিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে সবাই। একটু বড় হলে পড়াশোনা শেষে চাকরি পেলেই, আচ্ছা তুমি বিয়ে করছো না কেন? বিয়ে কবে করবা? পছন্দ আছে কেউ? অবধারিত প্রশ্ন ঘুরেফিরে এগুলাই।

বয়স বেড়ে যাচ্ছে বিয়ে করছো না এখনো! কিছু আত্মীয়-পরিচিত এমনভাবে বলবে যেন আজরাইল আপনার দুয়ারে দাঁড়িয়ে, উনারা তা দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু আপনি দেখছেন না। উনাদের অবশ্য প্রশ্ন করে না কেউ যে, আপনি বিয়ে করে কোন মহৎ কর্ম সম্পাদন করেছেন? এবং আপনার জীবন কোন ফুলের বাগান? প্রশ্নের যার দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয় সে ভেতরে কুঁকরে যায়। আর্থিক, মানসিক প্রস্তুতি না থাকলেও বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যায়।

আগে প্রেম ছিল লুকিয়ে-চুরিয়ে করার জিনিস, আর আজকাল স্কুল থেকেই বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ড থাকাটা গর্বের ব্যাপার। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ‘বাবু খাইসো’ প্রজন্মের কাছে শো-অফের বিষয়। শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই চলছে এই প্রেমের মহামারী। রাজকুমার, ডালিম কুমার বা শাহাজাদী রাজরানীর যুগ নাই তো এরা একেকজন হয় প্রেম-কুমার/প্রেম-কুমারী। প্রেম শাশ্বত সুন্দর। প্রেম করাও খারাপ কিছু নয়, কিন্তু আর সবকিছু ছেড়ে যখন ফার্স্ট প্রায়োরিটি হয়ে ওঠে এই প্রেম, তখন তা ব্যাধি।

জীবন ছোট। এক জীবনে কত কী দেখার বাকি, কত কী করার আছে! নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার মতো। জীবন একটা সফর, আমরা তার পথিক। এখানে আমাদের সঙ্গী হয় অনেকেই। কারও প্রতি থাকে দায়িত্ব-কর্তব্য, কারো প্রতি স্নেহ-মমতা। এখানে মাঝপথে কেউ হারিয়ে যেতে পারে, কেউ গন্তব্য পরিবর্তন করতে পারে, কেউ বা অবিচল ঝড়-ঝঞ্ঝায় থেকে যাবে ছায়ার মতো। হাত ধরে পাশে হাঁটবে। পরিস্থিতি যাই হোক, পথ চলতেই হবে। নিজেকে থামিয়ে দেয়া যাবে না। সময় চিনিয়ে দেবে কে পাশে থাকার যোগ্য, আর কে পরিত্যাজ্য।

একবার কলকাতার এক সাংস্কৃতিকমনা ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, আচ্ছা বিয়েটা কি জীবনে খুব দরকারি? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটাও খুব কঠিন না নিশ্চয়ই। দেরিতে বিয়ে করে অথবা একদমই বিয়ে না করার জন্য কেউ মরে যায়নি কোথাও, কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে করে অশান্ত দাম্পত্যে থেকে মরেছে, খুন হয়েছে বহুজনে। বিয়ে জীবনের অংশ, কিন্তু বিয়েই একমাত্র লক্ষ্য নয়।

]]>
https://womenchapter.com/views/35251/feed 0
সম্পর্কে ‘স্পেস’ থাকা জরুরি https://womenchapter.com/views/35248 https://womenchapter.com/views/35248#respond Sun, 02 Aug 2020 11:44:31 +0000 https://womenchapter.com/?p=35248 পলি শাহীনা:

পৃথিবীর নানান প্রান্তে ঘটে যাওয়া ভালো কিংবা মন্দ যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এখনকার দিনে আমরা খুব দ্রুত জেনে যাই, সামাজিক শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা ফেসবুকের মাধ্যমে। খুব বেশিদিন আগের খবর নয় এটি, কয়েকমাস আগের কথা। সৌদি আদালতে এক নারী বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। খবরটি গতানুগতিক হলেও কারণটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উক্ত নারী উল্লেখ করেছেন, স্বামীর অতিমাত্রায় ভালোবাসায় তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন। চমকপ্রদ এই খবরটি তখন অনেকদিন ধরে ফেসবুকের নিউজফিডে হামাগুড়ি খেয়েছে। এটিও অতি সাধারণ বিষয় ফেসবুক দুনিয়ায়। যেকোনো চাঞ্চল্যকর সংবাদ কিছুদিন ফেসবুকে দোল খায় বেশিরভাগ মানুষের দেয়ালে, তারপর হারিয়ে যায় নতুন কোন খবরের ভিড়ে। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এমন একের পর এক বৈচিত্র্যময় সব সংবাদে। এক সংবাদ যাবে, অন্য নতুন কিছু আসবে। অন্য সব প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় সংবাদগুলোর মতো চিরাচরিত নিয়মে আমিও ভুলে গিয়েছিলাম, সৌদি আদালতে দায়েরকৃত চমকপ্রদ খবরটির কথা। এতো এতো টক, ঝাল, মিষ্টি খবরের ছড়াছড়ি চারপাশে, চাইলেও তো সব খবর মনে রাখা যায় না। মস্তিষ্কের তো একটা নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।

সপ্তাহখানেক আগে নিউইয়র্কের পাশের রাজ্য নিউজার্সিতে এক আত্মীয়ের নিমন্ত্রণে তার বাসায় গিয়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে আলোকিত দুপুরের গায়ে হেলান দিয়ে, যে যার মতো আনন্দে সময় কাটাচ্ছে গল্প, আড্ডায় মশগুল হয়ে। প্রকৃতির উদাস আমন্ত্রণে আজন্ম প্রকৃতিপ্রেমী আমি তাদের ঘরের পেছনের বিশাল আংগিনায় গিয়ে বসি। প্রকৃতিতে এখন শীত ও উষ্ণতার খুনসুটি চলছে তীব্রভাবে। তাদের গাঢ় খুনসুটির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষগুলো কুলিয়ে উঠতে পারছে না। এই শীত তো এই গরম। সেদিন চমৎকার আবহাওয়া ছিল। স্বচ্ছ নীলাকাশের বুক থেকে যেন রুপা গলে গলে পড়ছিল। রূপার নূপুর পায়ে সবুজ পাতারা ছন্দে ছন্দে দুলছিল। ভ্রমরের গুঞ্জন আর ফুলেদের আদরে বিমোহিত আমি ভালোলাগার দোল চেয়ারে দুলতে দুলতে রুপকথার রাজ্যে হারিয়ে যাই।

নিউইয়র্ক শহরের বাইরের বাড়িগুলোর সামনে-পেছনে অনেক প্রশস্ত জায়গা থাকে। নিউইয়র্কের বাইরে গেলে বাংলাদেশের গ্রামের সবুজ ঘ্রাণ পাই, যে ঘ্রাণ আমি প্রাণভরে উপভোগ করি। প্রায়শই ছেলে-মেয়েকে বলি, বড় হয়ে যেন শহরের বাইরে বাড়ি কিনে নেয়। যে বাড়ির চারপাশ জুড়ে বিশাল জায়গা থাকবে। আমি সেখানে সব্জি, ফলমূলের চাষাবাদ করবো, কবুতর-পাখি পালবো। ওরা আমার কথা শুনে হাসে, কিছু বলে না। তবুও স্বপ্ন দেখি, একদিন নিউইয়র্কের জনারণ্য ছেড়ে নির্জনতায় চলে যাবো।

কবুতর পোষার শখ আমার ছোটবেলা থেকেই। আমাদের ঘরের চতুর্দিকে কবুতরের বাসা ছিল। তাদের বাক-বাকুম শব্দের অনিন্দ্য সুন্দর সুরে রোজ ভোরে ঘুম ভাংতো আমার। মনে আছে, একবার নানু আমাকে উপহার হিসেবে একজোড়া শুভ্র সাদা কবুতর দিয়েছিলেন। নিজের হাতে খড়কুটো দিয়ে পরম মমতায় ওদের জন্য ঘর বানিয়েছিলাম। ছোট্ট বুকের সবটুকুন আদর, যত্নে কবুতর জোড়াকে খাঁচায় পুষেছিলাম। যেদিন মনে হলো কবুতর জোড়া পোষ মেনেছে, সেদিন তাদের খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিলাম। খাঁচার দুয়ার খুলতেই তারা উড়ে যায় মুক্ত আকাশে। আমি তাদের পথের দিকে তাকিয়ে থাকি। একসময় উড়ে উড়ে ওরা আমার দৃষ্টির আড়ালে হয়ে যায়। আমি ওদের অপেক্ষায় থাকি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। ওরা আর ফিরে আসে না আমার কাছে। তবুও আমি আশায় ছিলাম, হয়তো একদিন ভালোবাসার টানে ফিরবে আমার কাছে এই ভেবে। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। দিন, সপ্তাহ, মাস গড়িয়ে যায়, ভালোবাসার টানে ওরা ফেরেনি। চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। শৈশবের অবুঝ মনকে প্রবোধ দিয়েছিলাম এই বলে, হয়তো আমার আদর, যত্নে ঘাটতি ছিল। ওদের চাওয়ার মতো করে ভালোবাসতে পারিনি। জীবনের এই বেলায় এসে আজও সে কবুতর জোড়ার ভালোবাসায় আমি একাই হাবুডুবু খাচ্ছি, কিন্তু ওরা আমাকে ভালোবাসেনি। একতরফা ভালোবাসা বড়ই নির্মম। অবশ্য একতরফা কোনকিছুই ভালো নয়। যাই হোক, ওদের উজ্জ্বল চোখগুলো মনের গহীনে এখনো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।

তেজোময়ী দুপুরের সূর্য ততক্ষণে ম্লান হয়ে পড়েছে। ঝিরিঝিরি শীতল বাতাস বইছে। আত্মীয়ের পোষা কবুতর জোড়ার চোখের গভীর মায়ায় তলিয়ে যাই। তাদের স্থির চোখ জোড়া আমায় চুম্বকের মতোন টেনে নিচ্ছে। কিছু বলতে চাইছে। আমি তাদের চোখের ভাষা বুঝতে মনোনিবেশ করি। পাতা ঝরার দিন এখনও আসেনি, তবুও পায়ের কাছে পড়ে থাকা ঝরা পাতাগুলোর দীর্ঘশ্বাস বুকে এসে বিঁধচ্ছে। পাতা ঝরার দিন সবসময় আমাকে ব্যথিত করে। এই সময়ে নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে ফেলি নিজেকে। যে নি:সঙ্গতার নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই।

প্রকৃতির বুকে গভীর প্রশান্তিতে ডুবে থাকা, আর অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের সখ্যতায় সম্ভিত ফিরে পাই ভেতরের ঘর থেকে আত্মীয়ের ডাকে। চা খেতে ডাকছেন। ঘরে ঢুকতেই কানে ভেসে এলো কয়েক মাস আগে সৌদি আদালতে দায়েরকৃত ঘটে যাওয়া সংবাদটির কথা। কয়েকজন মিলে পুরনো সে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে বেশ রসিয়ে গল্প করছেন। চা খাচ্ছি আর তাদের গল্প শুনছি। যে যার মতো যুক্তি দিয়ে কথা বলছেন। আমি শুনছি, ভেতরে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। আমি জানি এঁদের আড্ডায় কথা বলা আর উলুবনে মুক্তা ছড়ানো একই কথা। আমি তাঁদেরকে বহু বছর ধরে চিনি। তাঁদের মন-মানসিকতা জানি। তাঁদের বিশ্বাস যে কোনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেই ছাড়বে, অন্যপক্ষের কথা শুনবে না।

‘কাউকে জ্ঞান বিতরণের আগে জেনে নিও যে তার মধ্যে সে জ্ঞানের পিপাসা আছে কিনা। অন্যথায় এ ধরনের জ্ঞান বিতরণ করা হবে এক ধরনের জবরদস্তি। জন্তুর সাথে জবরদস্তি করা যায়, মানুষের সাথে নয়। হিউম্যান উইল রিভল্ট’ – শ্রদ্ধেয় আহমেদ ছফার এই মহামূল্যবান উক্তিটি সবসময় মেনে চলি আমি।

তাদের যুক্তিগুলো শুনতে শুনতে আমার শব্দগুলো বিশালকার এক ভাবনার সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকে।

বেশ অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি কোন ক্লাশে পড়ি তাও মনে নেই আজ আর। আমার দূর সম্পর্কের এক খালা ঢাকায় থাকেন। পেশায় শিক্ষিকা। গ্রামে বাপের বাড়িতে বেড়াতে এলে বিকালবেলা আম্মার সংগে এসে গল্প করেন। একদিন বিকেলে আম্মার সংগে খালার কথাগুলো শুনে ভীষণ ধাক্কা খাই মনে মনে। কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝি না। ছোট ছিলাম বলে আম্মাকে জিজ্ঞাসা করার সাহসও পাইনি। কিন্তু প্রশ্নগুলো আমার মনের অন্দরমহলে থেকে যায়।

আম্মার সংগে খালার কথাগুলো ছিল এমন, ‘বুবু মাঝেমধ্যে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে ছুটে আসি গ্রামে বাপের বাড়িতে। জানেন তো একমাত্র মেয়ের বিয়ে নিয়ে কতটা খুঁতখুঁতে ছিলাম। মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল না বলে অনেক ছেলে দেখেছি, বাদও দিয়েছি। অসম্ভব স্বপ্নবিলাসী মেয়েটির জন্য একদিন আমরা রুপকথার ডালিম কুমারের মতো ছেলে পেয়ে যাই। মহা ধুমধাম, হৈ-হুল্লোড়ে বিয়ে হয়। জানি না বুবু, কীভাবে কী হলো? মেয়ে এখন বাসায় চলে এসেছে আমার কাছে। মেয়ের অভিযোগ, জামাই ঘরের কুনোব্যাঙের মতো সারাদিন তার কানের কাছে ঘ্যাংগর ঘ্যাংগর করে। জামাই এর এমন ভাব মেয়ের পছন্দ নয়। জামাই সারাক্ষণ পেছনে লেগে থাকে বাইরের কাজকর্ম ফেলে। একাকি বই পড়তে মেয়ের ভালো লাগে। ঠিক বই পড়ার সময় জামাই এসে বসে বলবে চা খেতে। হয়তো বাবা-মায়ের সাথে মেয়ে কথা বলছে, তখন জামাই এসে চুলে বিনুনি কাটবে। বন্ধুর সাথে শপিং এ যাবে, একটু সময় কাটাবে, তখনও জামাই চায় সংগে থাকতে। রান্নাঘরেও গাব গাছের আঠার মতো লেগে থাকবে। পছন্দের গান শোনা, মুভি দেখতেও পারে না। নিরিবিলি থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করা চুপচাপ মেয়েটার কাছে এগুলো অস্বস্তিকর লাগছে। জামাই’র ভালোবাসার যন্ত্রণায় মেয়ের জীবনে ব্যক্তিগত কোন সময় নেই বললেই চলে। মেয়ের ভাষায় এগুলো ভালোবাসার যন্ত্রণা। ভালোবাসার নামে আসলে এসব শৃংখলেরই নামান্তর। জামাইকে অনেক বুঝিয়েও কোন ফল পায়নি। মেয়ে এমন বন্দিদশা থেকে পরিত্রাণ পেতে একদিন বিকেলে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা আমার বাসায় চলে আসে।’

আম্মা একঝলক তৃপ্তির হাসি দিয়ে খালাকে বললেন, এটি তো খুবই আনন্দের বিষয়। জামাই মেয়েকে অনেক ভালোবাসে, যত্ন নেয়। খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কী জানি বুবু, মেয়েতো বলে এসব ভালোবাসার নামে মানুষিক অত্যাচার বৈ তো অন্য কিছু নয়। মেয়ের কথা হলো, সম্পর্কে স্পেস থাকা জরুরি। খালা চা, বিস্কুট খেয়ে বিদায় নিলেন। আমার অবুঝ মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকে, সম্পর্কে স্পেস থাকা জরুরি মানে কী? অনেক ভেবেচিন্তেও কোন উত্তর পেলাম না সেদিন।

সে প্রশ্নের জবাব পেলাম বড় হয়ে নিউইয়র্ক শহরে আমার এক পরিচিতার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে। বছর দশেক আগের কথা। ঝলমলে আলোকিত সকাল। ঘুম ভেংগে রৌদ্রজ্বল আকাশ দেখছি আর চা খাচ্ছি। লাটিমের মতো ঘুরে ঘুরে শূন্যে ভেসে ভেড়াচ্ছে পাখীদের দলবদ্ধ সারি। এমন স্নিগ্ধ সুন্দর সকালে হঠাৎ চোখে পড়লো, চোখ মুছতে মুছতে এলোমেলো হেঁটে যাওয়া সুমি আপার দিকে। তার মন খারাপ আমাকে ছুঁয়ে গেলো। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত সুমি আপাকে এমন বিধ্বস্ত দেখতে পেয়ে বাসায় ডাকলাম চা খেতে। সেই ছোটবেলায় দেখা মা-খালার মতো আমিও চা, বিস্কুট নিয়ে সুমি আপার সংগে গল্প করতে শুরু করলাম।

তার চোখগুলো লাল, ফোলা। স্পষ্ট বোঝা যায় অনেক কেঁদেছে, সারা রাত ঘুমায়নি। সকালে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফিরছেন৷ উনি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। আমি তার কথা শুনতে ভালোবাসি। খুলনার মেয়ে সুমি আপার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার সূত্র তার এমন মোলায়েম কন্ঠস্বর। অবশ্য, এই সুন্দর করে কথা বলাও নাকি আজ তার অশান্তির কারণ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সুমি আপা নিজেই বলতে লাগলেন, ‘কখনও সখনও সুন্দর হওয়াটাও মেয়েদের জীবনে অভিশাপ বয়ে আনে। বিয়ের পর বেশিরভাগ মেয়েরাই চরম অবহেলা করে থাকে নিজেকে। নিজের শখ, আহ্লাদ, ভালোলাগা কিছুই যেন আর মূল্য পায় না বিয়ের পর। একসময় গলা ছেড়ে গান গাইতাম, ছেড়েছি। বই পড়া ভুলে গেছি। বাগান করার শখ ছিল, সময় পাই না। নিজের পছন্দের খাবার কবে রেঁধেছি মনে নেই। বেড়াতে যাওয়া সে তো স্বপ্নের মতো। নিজের আত্মাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। মন বলে যে কিছু আছে তাও ভুলে গেছি। দায়িত্বের নিচে চাপা পড়ে নিজেকে হত্যা করেছি। এখন মনে হয় বিয়ে মানে নিজেকে হত্যা করার প্রজেক্ট ছাড়া আর কিছু নয়। ‘

তার কথাগুলো শুনে তাজ্জব বনেে যাই। প্রশ্ন করি এভাবে কেন ভাবছেন? সুমি আপা আবার বলতে শুরু করেন, ‘বাচ্চা, সংসার নিয়ে অনেকগুলো বছর গৃহবন্দী হয়েই কাটিয়ে দিলাম। বিদেশে বাবা-মা, আপনজন বলতে তো কেউ নেই পাশে। বাচ্চারা এখন বড় হয়েছে। তোমার হারুন ভাই ১৬/১৭ ঘন্টা কাজ করেন। আমার সংগে প্রয়োজনীয় কথা বলারও সময় পায় না। অবসর সময়ে বুকের গহীনে ছোটবেলার শখ গান গাওয়া মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। গান গাইতে মাঝেমধ্যে বের হই। বলতে পারো এটি ব্যক্তিগত ভালোলাগার বিষয়। নিসঙ্গ জীবনে বেঁচে থাকার আশ্রয়। গতকাল এক বন্ধুর সংগে গান গাওয়ার প্রসংগে কথা বলছিলাম দেখে সে রেগে যায়। অশালীন মন্তব্য করে। ঘর এবং বাইরের কাজ ছাড়া বাকি সবকিছুই খারাপ তার কাছে। তার ভাষায়, বিয়ের পর আমার ব্যক্তিগত জীবন বা ভালোলাগা বলে কিছুই থাকতে পারবেনা। ভীষণ হাঁপিয়ে উঠে গতরাতে বলেছি, প্রতিটি মানুষের জীবনে নিজের সময় থাকা জরুরি। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। এই একঘেঁয়ে চরম স্বাধীনতাহীন জীবন আর চাই না।’

সুমি আপার এমন বিঃধ্বস্ত অবস্থার যন্ত্রণাকাতর কথাগুলো শুনে আমার ছোটবেলার সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলাম। সুমি আপা বিদায় নেন। তাঁর চলে যাওয়ার পথের দিকে নির্বাক আমি চেয়ে থাকি।

সৌদি আদালতে দায়ের করা ওই নারীটির মামলা মোটেও অযাচিত ছিল না। এটিই বাস্তবতা। অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না। ভালোবাসা বা যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য। ভালোবাসার বাড়াবাড়িও যন্ত্রণায় রুপ নেয়। পোলাও-মাংস খুব প্রিয় হলেও প্রতিদিন খেতে ভালো লাগে না। কোথায় যেন পড়েছিলাম, প্রিয়জনের সব কথা জানতে নেই, বিশেষভাবে যে কথা জানলে পরে কষ্ট হবে, সম্পর্কে অবনতি ঘটবে, সে কথা না জানাই শ্রেয়। প্রতিটি মানুষ আলাদা। তাদের ভালোলাগা, পছন্দগুলোও আলাদা হয়। দুই মেরুর দু’জন মানুষ যখন একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন, তাদের উচিৎ একজন আরেক জনের ভালোলাগা, ভালোবাসা, পছন্দের বিষয়গুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, আলাদা সময় বের করা। কেউ কারো ব্যক্তিগত সময়ে হস্তক্ষেপ না করা। একজন মানুষকে বাইর থেকে যতটা দেখা যায় সে আসলে ওইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, নিজের জগতে সে একজন উজ্জ্বল, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মানুষ।।

মানুষের ব্যক্তিগত দিকগুলোর পরিচর্যার জন্য নিজের একান্ত সময় প্রয়োজন। মানুষ রহস্যময় জীব। মানুষের মনের অবস্থা পরিবর্তন হয় দ্রুত। একজনের মনের উপর আরেক জনের হাত নেই। সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট সময় পর ঠিক হয়ে যায়। সময় দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম ওষুধ। আর এই ঠিক হয়ে যাবার জন্য তার নিজস্ব সময় খুব দরকার। এককথায়, যে কোন সুন্দর, মসৃণ সুসম্পর্ক রক্ষায় ‘স্পেস’ থাকা অতীব জরুরি।

]]>
https://womenchapter.com/views/35248/feed 0
ইসলামের শত্রু কারা? https://womenchapter.com/views/35245 https://womenchapter.com/views/35245#respond Sun, 02 Aug 2020 10:56:59 +0000 https://womenchapter.com/?p=35245 শান্তা মারিয়া:

দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখার অনুরোধ জানিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বাংলাদেশের কথা ভাবতেই চোখে ভেসে উঠলো কতগুলো খবর। খবরগুলো ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয় না কখনও। সাধারণ পত্রিকার মফস্বল পাতায় এক কলাম দুই ইঞ্চি জায়গা পায় কি না পায়, সেগুলো হলো প্রতিমা ভাঙচুরের খবর। প্রতিমা ভাঙচুরের খবর দেখলেই বুঝতে পারি দেশে দুর্গা পূজা আসন্ন। আর কিছু খবর পত্রিকায় বা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় দেখা যায় না। এগুলো শুধু চোখে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সনাতন ধর্মের অনুসারী বন্ধুদের টাইমলাইনে দেখা যায় কিছু ছবি। মন্দিরের সামনে কে বা কারা কোরবানির গরুর হাড় গোড়, বর্জ্য, রক্ত ইত্যাদি ফেলে রেখে যায়। কখনও কখনও মন্দিরের ভিতরে ঢুকে প্রতিমার গায়ে এসব ফেলে, কখনও ফেলে দেবীর থানে। এসব পোস্টের নিচে মুসলমান বন্ধুরা যখন মন্তব্য করেন তখন প্রায়শই এগুলোকে ঘৃণা জানান। অনেকেই বলেন, এরা প্রকৃত মুসলমান নয়।

আমিও এরকম মন্তব্য করি। করে বিবেকের ভার লাঘব করার চেষ্টা করি। মনে প্রশ্ন জাগে, এরা যদি প্রকৃত মুসলমান না হয়, তাহলে ‘প্রকৃত মুসলমান’ কারা? যারা ‘প্রকৃত মুসলমান’ বলে নিজেকে মনে করছেন তারা কি এদের ‘অপ্রকৃত’, ‘অপ্রকৃতিস্থ’, মুসলমান বলে কখনও ঘোষণা করেছেন? তারা কি কখনও বলেছেন, যারা প্রতিমা ভাঙে, যারা সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন করে, যারা সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেয়, তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করবো না, তাদের সঙ্গে পাশাপাশি নামাজ পড়বো না, তাদের বাড়িতে খাদ্য পানীয় গ্রহণ করবো না? তাহলে কেমন প্রতিবাদ জানালেন? কেমন আপনি প্রকৃত মুসলমান হলেন?

ইসলাম ধর্ম কী এটা জানার জন্য মহানবীর (স.) বিদায় হজের ভাষণটি পড়লেও চলে। সেখানে স্পষ্টভাষায় ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেখানে শান্তিতে থাকা (যুদ্ধরত নয়) অন্য ধর্মের মানুষদের নিরাপত্তা বিধান করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হযেছে।

কিন্তু একজন অমুসলিম কখনও আপনার বাড়িতে ঢুকে আপনার কিতাব পড়বে না। তিনি দেখবেন আপনার আচরণ। দুনিয়া কখনও ইসলামের আসল বিধান দেখতে আসবে না, দেখবে মুসলিমের আচরণ।

আপনার আচরণ যদি হয় প্রতিবেশির উপাসনালয় ধ্বংস করা, প্রতিবেশির বাড়িঘরে আগুন লাগানো, মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর, দেবীর থান আর অন্যধর্মের মানুষের পবিত্রস্থানে গরুর বর্জ্য ফেলা, নোংরামি করা, তাহলে আপনার ধর্মগ্রন্থে মানবতার যতবড় বাণীই থাকুক না কেন কারও কিচ্ছু আসে যায় না। নির্যাতিত মানুষ আপনাকে একজন ‘মুসলমান’ হিসেবেই গালি দিবে। গালি দিবে ইসলামকে। তাহলে ইসলামকে গালি খাওয়ানোর এই ‘মহৎ’ কর্মটি আপনি করলেন বলে অনায়াসে অন্তরে প্রভূত শান্তি লাভ করতে পারেন।

বাংলাদেশের সাধারণ সংখ্যাগুরু মানুষ কতটা সাম্প্রদায়িক সেটার একটা উদাহরণ দেই। সত্তর ও আশির দশকে আমার শৈশব কেটেছে। তখন প্রায়ই শুনতাম আমাদেরই খেলার সাথী সনাতন ধর্মের কোন শিশুকে অন্য ছেলেমেয়েরা গরুর মাংস খাইয়ে দিয়েছে। শিশুটিকে বলেছে ‘মুসলমান না হলে তোকে খেলায় নিবো না। তুই গরুর মাংস খা তাহলে তোর সঙ্গে খেলব।’ প্রায় প্রতি মাসেই একটি বা দুটি এমন ঘটনা ঘটতো। পাড়ায় এমন ঘটনা ঘটলে তেমন কোন সালিশ বিচার হতো না। স্কুলে ঘটলে শিক্ষক অপরাধী শিশুদের অভিভাবককে ডাকতেন। ধমকটমক দিয়ে ছেড়ে দিতেন। কোথাও অপরাধীদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে শুনিনি। তার মানে এটাকে গুরুতর কোন অপরাধ বলে ধরাই হয়নি। এতো গেল শিশুদের কথা। বড় বয়সে, চাকরিতে ঢুকেও দেখেছি কোন হিন্দু সহকর্মীকে(নারী হলে তো কথাই নেই) কৌশলে, লুকিয়ে গরুর মাংস খাওয়ানোর মতো ইতরামি করতে। আবার কখনও কখনও সেই সহকর্মীকে গেরুর মাংস খেতে প্ররোচিত করতেন অনেকে। ‘কি হবে, খাও না’ ‘আরে খেলে কিছু হয় না’, ‘আপনি তো আধুনিক মানুষ বলে জানতাম, একটুকরো খেয়ে দেখুন কত মজা’ ইত্যাদি মন্তব্য তো প্রায়ই করতে শুনেছি। যারা এইসব মন্তব্য করে, তাদের সবসময় বলতাম, ‘আপনাকে যদি কেউ শুয়োরের মাংস খাওয়ায়, বা খাওয়ার জন্য প্ররোচিত করে, আপনার কেমন লাগবে?’

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর উপর নির্যাতন হচ্ছে, তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে একথা যদি প্রিয়া সাহা বা অন্য কেউ বিদেশে গিয়ে বলে, তখন আমাদের খুব গায়ে লাগে। আমি নিজেও প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু সত্যিই যে সংখ্যালঘুরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেকথা কি আমি অস্বীকার করতে পারি? শাক দিয়ে মাছ আর কত ঢাকবো? ৩১ শতাংশ থেকে সংখ্যালঘুরা কেন ৮ শতাংশ হয়ে গেল, সে সত্যের দিকে কত আর চোখ বন্ধ করে থাকবো? জেগে জেগে আর কত ঘুমাবো? আমি নিজেও আন্তর্জাতিক অনেক সেমিনারে বলেছি, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। কিন্তু বিদেশে নিজের দেশ বিষয়ে ভালো ভালো কথা বললেই কি দেশপ্রেমের সবটুকু পরিচয় দেয়া পরিপূর্ণ হয়? আমি নিজে যদি এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এতটুকু ভূমিকা না রাখি, একটুও প্রতিবাদ না করি তাহলে কীসের আমি দেশপ্রেমিক হলাম?

এদেশের সংখ্যালঘুরা যদি সম্প্রীতির স্বর্গেই থাকবেন তাহলে তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন কেন? শখে, ঠ্যালায়, ঘুরতে? ছলে, বলে তাদের সম্পত্তি দখল করা হচ্ছে না একথা কি অতি বড় ভণ্ডও স্বীকার করতে বাধ্য নন?

আমি নিজে একজন প্র্যাকটিসিং মুসলমান। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, কোরআন শরীফ পড়ি, কোরবানিও দেই। কিন্তু আমার তো কোনদিন মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা কোন উপাসনালয় ভাঙচুর করার, নোংরা করার ইচ্ছা জাগে না। কখনও তো মনে হয় না গরুর হাড়গোড় নিয়ে মন্দিরের সামনে ফেলে আসার। যার যার ধর্ম সে সে পালন করুক। সমস্যা কোথায়? অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে গালাগাল করে, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়ে, তার ধর্ম নষ্ট করার সুচতুর কৌশল করে কি আপনি কাউকে মুসলমান বানাতে পারবেন? বরং আপনার মানবিক সুন্দর আচরণ দেখে অন্য ধর্মর কেউ মুসলমান হতে চাইলেও হতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষের আরেকটি প্রবণতা আছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কোন নির্যাতনের কথা বললেই তারা বলেন, ‘ভারতের মুসলমানের তুলনায় এদেশের হিন্দুরা অনেক ভালো আছে’। এই তুলনাটা কেন? ভারতের মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে কি এদেশের হিন্দুদের উপর নির্যাতনটা জাস্টিফায়েড হয়? নাকি এদেশের হিন্দুরা রাতের আঁধারে ভারতে গিয়ে তাদের মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালিয়ে চুপি চুপি আবার এদেশে ফিরে আসে? ভারতে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হলে সেটা ভারতের সমস্যা। বাংলাদেশের নয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের কারণে যদি আপনার মন খারাপও লাগে তাহলে সেটার প্রতিবাদ করুন। কিন্তু অন্য দেশে মুসলমান নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে আপনি নিজের দেশের সংখ্যালঘুর কোনরকম অধিকার হরণ করতে পারেন না। এটুকু যুক্তি পাগলেও বোঝে, কিন্তু আপনি বোঝেন না।

আমি যদি বলি, আপনি যখন মন্দিরে গিয়ে গরুর বর্জ্য ফেলেন, যখন প্রতিমা ভাঙচুর করেন, যখন হিন্দুদের গালি দেন, অমানবিক আচরণ করেন, তখন একজন মুসলমান হিসেবে আমি লজ্জা বোধ করি, আপনি আমার ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেন তখন আপনি কি জবাব দেবেন? আপনার বর্বর আচরণের কারনে সারা বিশ্বে মুসলিমরা ছোট হয়ে যায়। আপনার জঙ্গীবাদের কারণে সারা বিশ্বে ইসলাম নিন্দিত হয়। আপনার কুআচরণের কারণে সারা বিশ্বে ইসলাম একটি বর্বর, জংলি ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়। আপনি যদি অশান্তি সৃষ্টি করেন তাহলে ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’ বলে গলা ফাটালেও কেউ সেটা বিশ্বাস করে না। করতে পারে না।

একজন মুসলমান হিসেবে, ইসলামের একজন অনুসারী হিসেবে আমি আপনাকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই। আপনিই ইসলামের শত্রু। যে ইসলামের নামে অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করেছে, ইসলামের নামে সমাজের শান্তি বিনষ্ট করেছে, ইসলামের নামে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, নিজের পরিবারের ও সমাজের নারীর উপর নির্যাতন চালিয়েছে, শিশুদের মধ্যে সা্ম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়েছে তারা প্রত্যেকেই ইসলামের শত্রু।ইসলাম অবমাননার অভিযোগে আমি আল্লাহর দরবারে আপনাদের নামে বিচার দিলাম। আমি বিশ্বমানবতার কাছে, সকল মুসলমান ভাইবোনের কাছে আপনাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানালাম।

]]>
https://womenchapter.com/views/35245/feed 0
১ আগস্ট: ‘বাংলাদেশ’ নামটি যেদিন জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছিল বিশ্বের বুকে https://womenchapter.com/views/35232 https://womenchapter.com/views/35232#respond Sat, 01 Aug 2020 09:25:09 +0000 https://womenchapter.com/?p=35232

আজ ১ আগস্ট, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনেই নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, আর সেখানে স্বরচিত ‘বাংলাদেশ’ গানের মাধ্যমে লাল-সবুজের এই দেশকে গোটা বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসন।

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

আপনি যদি আমেরিকা কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের কোনো দেশে যান এবং নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেন, প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে আপনার সামনের মানুষটির কিছুটা অদ্ভুত উচ্চারণে, সুর করে ‘বাংলাদেশ’ বলে ওঠার। এর কারণ জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি। এবং আজ ১ আগস্টই হলো সেই দিন, যেদিন অমরত্ব লাভ করেছিল এই গানটি, এবং ৪৯ বছর পরও, বিশ্বাঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার এই ছোট্ট দেশটির পরিচয়ের অনেকটাই নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে।

১৯৭১ সালের ১ আগস্ট ছিল রবিবার। এ দিনই নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। তবে আদতে কনসার্ট একটি হওয়ার কথা থাকলেও, মানুষের চাপে শেষ পর্যন্ত আয়োজকরা বাধ্য হয় দুইটি কনসার্ট আয়োজনের। একটি দুপুর আড়াইটায়, আরেকটি রাত আটটায়।

এই কনসার্টের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্বখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ যখন বিপর্যন্ত, দলবেঁধে সবাই শরণার্থী হিসেবে পাড়ি জমাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে, এবং তারও আগে থেকে ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে অধিকাংশ বাঙালিই যখন অসহায়, তখন তাদের সাহায্যার্থে কিছু করার জন্য তিনি প্রথম যোগাযোগ করেন জনপ্রিয় বিটলসের অন্যতম সদস্য জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে। হ্যারিসন এগিয়ে আসেন এবং উদ্যোগী হয়ে অন্য শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের প্রস্তুতিতে কনসার্টটির আয়োজন করা হয়।

হ্যারিসন প্রথমে তার প্রাক্তন দল দ্য বিটলসের সদস্যদের অনুরোধ করেন এই কনসার্টে যোগ দিতে। কিন্তু সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়ে বসেন পল ম্যাকার্টনি, কেননা দলের সঙ্গে ওই মুহূর্তে কোনো সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন নারাজ। জন লেনন অবশ্য রাজিই ছিলেন, কিন্তু একই সময়ে আদালতে তার সন্তানের ব্যপারে তার স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সঙ্গে আইনি লড়াই চালাচ্ছিলেন বলে শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি। এদিকে মিক জ্যাগার তখন দক্ষিণ ফ্রান্সে। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তার পক্ষেও আসা সম্ভব হযনি।

শেষ পর্যন্ত কনসার্টে যোগ দেন বিটলসের প্রাক্তন তারকা রিঙ্গো স্টার, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন, লিওন রাসেল, হ্যারিসনের নতুন দল ব্যাড ফিঙ্গারের যন্ত্রীদল ও আরো অনেকে। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এটিই ছিল হ্যারিসনের সরাসরি অংশগ্রহণ করা প্রথম কোনো অনুষ্ঠান। প্রায় পাঁচ মাস পর এই কনসার্টের মাধ্যমে সরাসরি কোনো অনুষ্ঠানে গান করেন এরিক ক্ল্যাপটনও। আর ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবারের মতো দর্শকদের-শ্রোতাদের সামনে আসেন বব ডিলান।

‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর সূচনা হয় পণ্ডিত রবিশঙ্করের একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়ে। এ কনসার্টের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন ‘বাংলাদেশ ধুন’ বলে নতুন একটি সুর। তার সঙ্গে সরোদে যুগলবন্দী ছিলেন ওস্তাদ আলী আকবর খান। এছাড়া তবলায় সহযোগিতা করেছিলেন বিখ্যাত আল্লারাখা, এবং তানপুরায় ছিলেন কমলা চক্রবর্তী।

কনসার্টের প্রধান আকর্ষণ, প্রতিবাদী গানের রাজা ডিলান গেয়েছিলেন মোট ছয়টি গান। এর মধ্যে ‘মি. ট্যাম্বুরিনম্যান’ যেমন ছিল, তেমনই ছিল তার নিজের লেখা ও সুর করা ৫০ লাইনের বিখ্যাত গান ‘আ হার্ড রেইন ইজ গোননা ফল’। অপরদিকে কনসার্টের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা জর্জ হ্যারিসন নিজেও গেয়েছিলেন ছয়টি গান। তার গাওয়া সর্বশেষ গানটি ছিল এই কনসার্টকে সামনে রেখে লেখা বিখ্যাত সেই গান, ‘বাংলাদেশ’।

গানটির শুরুটা ছিল এরকম:

My friend came to me
With sadness in his eyes
He told me that he wanted help
Before his country dies

Although I couldn’t feel the pain
I knew I had to try
Now I’m asking all of you
To help us save some lives…

এই কনসার্টে মোট লোকসমাগম হয়েছিল ৪০ হাজার। কনসার্টের প্রাথমিক গেট রিসিপ্ট থেকেই উঠে যায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫০ ডলার, যা ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যবহৃত হয়। ৪০টি মাইক্রোফোনে অনুষ্ঠানের গান ও কথা রেকর্ড করে তিনটি লং প্লেয়িং নিয়ে একটি বড় অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়, সঙ্গে ছিল বহু রঙে মুদ্রিত সেই অনুষ্ঠানের একটি সুদৃশ্য সচিত্র পুস্তিকা। এছাড়াও প্রকাশিত হয় একটি বেস্টসেলিং লাইভ অ্যালবাম, আর অ্যাপল ফিল্মসের ব্যানারে কনসার্টের তথ্যচিত্র সিনেমাহলে মুক্তি পায় ১৯৭২ সালের বসন্তে।

১৯৮৫ সাল নাগাদ ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ লাইভ অ্যালবাম, তথ্যচিত্র এবং আনুষঙ্গিক থেকে আনুমানিক ১২ মিলিয়ন ডলার ওঠে, যা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপরেও অ্যালবাম ও চলচ্চিত্রের ডিভিডি থেকে আয়ের পরিমাণ বাড়া অব্যাহত থাকে, যে অর্থ ঢোকে ইউনিসেফের জর্জ হ্যারিসন তহবিলে।

সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্য গায়ক-শিল্পীদের সবচেয়ে আয়োজন ছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। অনেকেই বলে থাকে, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না। কিন্তু এই কনসার্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি যা-ই হোক, দেশটির সাধারণ মানুষ ঠিকই ছিল শোষিত-নির্যাতিত বাঙালির পক্ষে। তাই তারা শুধু কনসার্টের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থ সাহায্যই করেনি, বরং এই কনসার্টের মাধ্যমে গোটা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অবস্থা।

এর কয়েক দশক পর, ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে পণ্ডিত রবিশঙ্কর বলেছিলেন, “মাত্র একদিনেই গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছিল বাংলাদেশের নাম। সত্যিই এটা ছিল অসাধারণ একটি অনুষ্ঠান।”

সত্যিই এই কনসার্টের অসাধারণত্ব কোনোদিন মলিন হওয়ার নয়। সঙ্গীত, রাজনীতি ও মানবতাকে যে একই সুতোয় গাঁথা যায়, তার সার্থক প্রমাণ মিলেছিল এই কনসার্টের মাধ্যমে। তাই বিশ্ব ইতিহাসে এই কনসার্ট চিরকাল হয়ে থাকবে অবিস্মরণীয়।

]]>
https://womenchapter.com/views/35232/feed 0
আমার বন্ধন নেই, মুক্তিও নেই https://womenchapter.com/views/35222 https://womenchapter.com/views/35222#respond Thu, 30 Jul 2020 00:34:22 +0000 https://womenchapter.com/?p=35222 সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

আগে স্বামী মারা গেলে সহমরণের জন্য চিতায় নেয়া হতো হিন্দু মেয়েদের, এরপর সেটা বন্ধ হলো আইন করে। এরপর শুরু হলো স্বামী মারা গেলে গয়নাগাঁটি খুলে, চুল কেটে,সাদা থান পরিয়ে, নিরামিষ খাইয়ে বিধবাকে সংযত ভাবে রাখা। মোডিফাইড ওয়েতে এটার ধারাবাহিতা এখনও চলছে হিন্দু পরিবারে, যদিও অনেক ব্রাহ্মণ নারীও এইসব কুসংস্কার মানতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছেন এখন। কিন্তু ইদানিং একটা ভয়াবহ নিউ ট্রেন্ড দেখছি হিন্দু পরিবারে, সেটা হলো স্বামী মারা যায়নি, বিধবা নয়, ডিভোর্সডও না, কিন্তু সম্পূর্ণ একা স্ত্রীকে সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে চলতে হচ্ছে। স্বামীটি তার সঙ্গী হিসেবে একাধিক মানুষ বেছে নিচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে যা তা করছে লাগামহীনভাবে। সাতজন্মের বন্ধন তার ক্ষেত্রে শাস্ত্রে প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে হচ্ছে না।

আর স্ত্রীটি সন্তানকে একা মানুষ করছে, ভরণপোষনসহ সব করছে আর আর জীবিত স্বামী ওরফে পিতা তার পছন্দমতো কোনপ্রকার জবাবদিহিতাহীন জীবন যাপন করছে। একটা মেয়ে একা সব দায়িত্ব পালনে বাধ্য, কারণ সে মা, সন্তানকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই, নিচে নামার ক্ষমতা নেই, একবার বিয়ে হয়েছিলো তাই তার জীবনে নতুন করে প্রেম, ভালবাসা নিয়ে ভাবার অধিকার নেই, কিন্তু যে স্বামী, বাবা, সে কিছুতেই বাধ্য নয়। বিষয়টা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। ষাট বছরের একজন হিন্দু ব্যক্তি সেদিন শুনলাম স্ত্রীর মৃত্যুর সাথে সাথে একাকিত্ব ঘুচানোর জন্য পারিবারিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু এরাই আবার বুঝেন না জীবিত স্বামীর সংসার করার অক্ষমতায়ও হিন্দু নামকা ওয়াস্তে বিবাহিতা অল্প বয়সী মেয়েরও একাকিত্ব হয়, তারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে, তারও শরীর থাকে।

হিন্দু বিবাহিত পুরুষের জীবনে স্ত্রী জীবিত অবস্থায় স্ত্রী, সন্তানের দায়িত্ব অস্বীকার করে একাধিক নারীসঙ্গের উপস্থিতির শাস্ত্রসম্মত বিধান শাস্ত্রের কোন পাতায় আছে একটু দেখতে চাইছি। হিন্দু ব্রাহ্মণসহ অন্যান্য পরিবারের মেয়েকে বিয়ের নামে তিলে তিলে মেরে, তাদের জীবন নষ্ট করার অধিকার হিন্দু শ্বশুরবাড়িগুলো কী করে পেলো, তা একটু জানতে চাচ্ছি! হিন্দু সমাজের নির্লিপ্ততা, প্রশ্রয়ের ফলে এই নোংরামির চর্চা হিন্দুদের মধ্যে জঘন্যভাবে হচ্ছে সেটাই দেখছি! যদি ডিভোর্স দিয়ে আবার বিয়ের অধিকার একটা হিন্দু মেয়ের না থাকে, তাহলে তার সংসার কেড়ে নেয়ার অধিকার কী করে তার স্বামী ও তার পরিবারের থাকে, সেটাও জানতে চাচ্ছি! কারো বিবাহিত স্বামী হয়ে নিজেকে যত্রতত্র বিতরণের অধিকার কোনো হিন্দু পুরুষ রাখে কিনা তাও জানতে চাচ্ছি।
ব্রাহ্মণত্ব, হিন্দুত্ব বজায় কিংবা টেনে নেয়ার দায় শুধু হিন্দু বিবাহিতা মেয়েদের উপর অর্পিত হয়ে গেলো কেন বুঝতে পারছি না!

সীমাহীন কাণ্ডকীর্তির কোন জবাবদিহিতা নেই এই হিন্দু সমাজে! যা ইচ্ছা করা যায়! আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার যোগ্যতা কয়জনের আছে? চুপ সব চোখের সামনে দেখে! কোন নারী, শিশুর জীবন নিয়ে খেলার একছত্র অধিকারী কীভাবে একটা শ্বশুরবাড়ি হয় হিন্দু পরিবারে? এরপরও এরা যখন হিন্দুত্ব ফলায় এবং ধর্ম শেখায়, জাস্ট ঘেন্না লাগে! এরা মাটির মায়ের আরাধনায় বসে জ্যান্ত মায়ের জীবন দুর্বিষহ করে, এরা ঠাকুরের মাথায় দুধ ঢালে শিশুর জন্য এক প্যাকেট দুধের ব্যবস্থা না করে…বিয়ের নামে একটা মেয়ের সন্তানসহ আজন্মের নরক যন্ত্রণা চলে বন্ধনহীন, মুক্তিহীনভাবে!

হিন্দু মেয়ের জীবন নরকে পরিণত করার, সন্তানের জীবন দুর্বিষহ করার অধিকার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি কারো নেই… অথচ এই হিন্দু সমাজের নাকের ডগায় এটা হচ্ছে…আর মেয়েরা সেটা সহ্য করতে করতে শেষ হচ্ছে।

ঐসব মানুষ হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা উড়ায় কীভাবে? হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে মেয়ে, শিশুর জীবন নষ্ট করে কীভাবে? হিন্দু সমাজের উচ্চস্তরে বসে যারা এসব করে পার পেয়ে যাচ্ছে, তারা কি হিন্দু সমাজের সকল স্তরের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে না যে একটা উচ্চশিক্ষিত হিন্দু পরিবারের মেয়ের সাথেও যা তা করা যায়! এখানে সব মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকা ছাড়া মেয়ের পরিবারের কোন করণীয় নাই? জীবন তো একটা হিন্দু মেয়েরও একটাই, দশটা না যে শ্বশুরবাড়ির নামে বলি চড়াবে! সেও তো সন্ন্যাস নেয়নি যে যৌথ জীবনের আশা ত্যাগ করবে? তবে কেন এই অন্যায়?

এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই বলতে পারেন মেয়ে কেন দ্বিতীয় বিয়ে করছে না ডিভোর্স দিয়ে! দ্বিতীয় বিয়ে করার স্কোপ কোথায়? দ্বিতীয় বিয়ে তো স্বীকৃত নয়। একটা শিশু, একটা মেয়েকে এই সমাজে বাবা এবং স্বামীর জন্য যেভাবে হ্যারাসম্যান্ট এর শিকার হতে হয়, সেটা সহ্য করতে না পেরে হিন্দু মেয়েদেরর সকল রকম উল্টাপাল্টা স্টেপ নেয়ার দায়ভার এই হিন্দু স্পেশালি ব্রাহ্মণ সমাজের সচেতন মানুষ কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। চুপ করে বসে থাকলে অন্তত ব্যর্থ দাম্পত্য জীবন ছুঁড়ে ফেলে, সন্তানকে বাবা নামক ট্রমা থেকে বের করে নতুন জীবন যাপন সম্ভব নয়। বিয়ের মতো একটা পবিত্র বিষয়কে যেসব হিন্দু পরিবার মডিফাইড রেপের সমতুল্য করে দিয়েছে, যারা আমৃত্যু যন্ত্রণা ভোগের জন্য হিন্দু মেয়েদের জীবন নিয়ে কোনরকম জবাবদিহিতা ছাড়া যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে, তাদের সেই বিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আসলেই প্রয়োজন। সবাই সরব হোক, এই অন্যায়ের সমাপ্তি ঘটুক।
না হয় ডিপ্রেসড হিন্দু বিবাহিতা মেয়ে আর ফুলের মতো শিশুর মানসিক বিপর্যয় নিয়ে বেড়ে উঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইন্ডিয়ায় তো হিন্দুদের জন্য ডিভোর্স স্বীকৃত, কিন্তু এখানে তা নয়… তাই নিউ ট্রেন্ড চালু হয়েছে… স্বামী বেঁচে আছে কিন্তু কোন দায়িত্ব পালনে নাই, বিবাহিত, কিন্তু সংসার নাই….বাচ্চার গলায় স্কুলের আইডি কার্ডে ঝুলে থেকে শিশু নির্যাতন, আর স্ত্রীর ত্রিসীমানায় না থেকে হ্যাজব্যান্ড নাম নিয়ে নারী নির্যাতনের এক অন্য মাত্রা এটা! সংসার করার কোন ক্ষমতা না থেকে বিয়ে করে একটা হিন্দু মেয়ের জীবন আর বাচ্চা জন্ম দিয়ে সেই শিশুর জীবন নিয়ে নোংরামো জনসম্মুখে করে হিন্দু সাত জন্মের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের ট্যাগ ঝুলিয়ে ফাইজলামির চূড়ান্ত সীমা বেশ ভালোভাবেই এখানে হচ্ছে!

সন্তান, স্ত্রী বিবেচ্য না হলে হিন্দু নামও তাদের জন্য প্রযোজ্য কেন হবে? কেন সেই পরিচয়ে বর্ণ, গোত্র মিলিয়ে বিয়ে করে স্মৃতি শক্তি ভ্রষ্ট হবে! এই হিন্দু সোসাইটির হিপোক্রেসির খেসারত কেন কোন শিশু এবং নারী দেবে? সভ্য মানুষ এই একতরফা হিন্দুত্বের, ব্রাহ্মণত্বের ঘানি টেনে নেয়া বন্ধন কিংবা মুক্তিহীন ব্রাহ্মণ বা অন্যান্য হিন্দু বিবাহিতা মেয়েদের দেখলে জ্ঞান হারাতে পারে!

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে মেয়েই এই অবস্থার সম্মুখীন হয় সেই মেয়েই তো পুরুষবেষ্টিত। এই জায়গায় পুরুষ কাঁদেন, কষ্ট পান স্নেহের কাছের মেয়েটির জন্য… কিন্তু প্রতিরোধ গড়তে পারেন না…যতক্ষণ পর্যন্ত পুরুষেরাও তার ঘরের মেয়েটির সাথে হওয়া অন্যায়ে তীব্র প্রতিবাদী হবেন না ততক্ষণ এসব বন্ধও হবে না…হিন্দুত্ব বয়ে নেয়ার দায়িত্ব শুধু নারীর নয়…যে বন্ধন শুধু একটা মেয়ের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথে বেড়ি হয় সেটা আর বন্ধন থাকে না নির্যাতনের সমতুল্য হয়…সংসারও করবে না, ডিভোর্সও হবে না.. এটা কী জীবন..! হিন্দুদের ডিভোর্স নেই খুব ভালো, তাহলে সংসার নেই কেন?

পুরুষেরা এসব কীর্তি সনাতন ধর্মের কোন রুলস ফলো করে করছে? সনাতন ধর্মে ব্যাভিচারী পুরুষকে প্রশ্রয় দেয়ার কথা তো দেখলাম না…তাহলে আইনের কোন ফাঁক গলে তারা তা করছে? ধর্মীয় রীতি মেনে যে স্ত্রী বা সন্তান তার জীবনে এসেছে তাদের নির্যাতন করে, বঞ্চিত করে সে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অন্য মেয়েদের নিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করবে তা সনাতন ধর্মের কোন পাতায়, কোন পৃষ্ঠায় উৎসাহিত করা হয়েছে? পুত্রবধুকে শ্বশুর, শাশুড়ি কেনা গোলাম ভেবে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, নির্যাতন, নিপীড়ন করবে, তাকে সংসার ত্যাগে বাধ্য করবে, তাইবা কোন শাস্ত্র মেনে তার জবাবদিহিতাও থাকতে হবে।

জৈবিকভাবে রিপুর তাড়না যদি সেসব পুরুষের নিকৃষ্ট লেভেলে চলে যায় তাহলে তাদের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ। যে অপদার্থ পুত্র নিজের স্ত্রী, সন্তানের দায়ভার এড়ায়, সেসব পুত্রের বাবা,মায়ের উপর পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনির সমস্ত দায়িত্ব বর্তানো উচিৎ। দুশ্চরিত্র ছেলের বাবা, মা হয়ে, বধূ ও নাতি-নাতনির জীবন দুর্বিষহকারী হয়ে তাদের কোন অধিকার নেই বুক ফুলিয়ে, মুখ উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ানোর। যেহেতু হিন্দু পারিবারিক বিয়েতে বর শুধু না বরের বাবা, মাও বিয়েতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাই তারা নাটের গুরু হয়ে সব দায়িত্ব কীভাবে এড়ান?

তাদের জন্য ধর্ম তো হুমকির মুখে পরতে পারে না। কারণ যে ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েরা নির্যাতিতা হলেও ডিভোর্সের অধিকার স্বীকৃত হয় না, যার দোহাই দিয়ে নারী উত্তারাধিকারী স্বয়ংক্রিয়ভভাবে হয় না, সেই ধর্ম তো পুরুষকে ব্যাভিচারী হতেও শিক্ষা দেয় না, সেই ধর্ম তো শ্বশুর-শাশুড়িকে বধূ নির্যাতনে পুত্রকে মদদসহ নিজেদের অংশগ্রহণকে সমর্থন করে না!

ছেলেদের নোংরামি না দেখার জন্য যে হিন্দু সমাজ চোখে পট্টি বেঁধে গান্ধারী সাজে, এরাই আবার শেখায় শ্বশুর -শাশুড়ি অমানবিক হলেও তাদের পা ধরে, বরের গোপিনীদের সাথে ঠেলাঠেলি করে সংসার করতে পারলে না..
মেয়েগো তুমি বড্ড বাজে…

Shame on hindu society… তোমরাই মারছো মেয়েদের, আর মরলে ন্যাকা কান্না কাঁদছো!

]]>
https://womenchapter.com/views/35222/feed 0