Women Chapter https://womenchapter.com বাংলাদেশের প্রথম নারী বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ পোর্টাল। Wed, 28 Oct 2020 15:23:13 +0000 en-US hourly 1 https://womenchapter.com/wp-content/uploads/2013/07/logo-2-50x50.jpg Women Chapter https://womenchapter.com 32 32 মৃত্যুদণ্ড কি ধর্ষণ বন্ধ করবে? https://womenchapter.com/views/36273 https://womenchapter.com/views/36273#respond Wed, 28 Oct 2020 15:23:13 +0000 https://womenchapter.com/?p=36273 বাসন্তি সাহা:

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ও এর প্রতিবাদে সামাজিক আন্দোলন ও দাবির প্রেক্ষিতে এই আইন করা হলো। ধর্ষণবিরোধী এই আন্দোলন শুরু হয় নোয়াখালির বেগমগঞ্জে একজন গৃহবধুকে নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। একথা সবাই এখন আমরা জানি। ইতোমধ্যে একজন ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়েছে এই আইন পাশের পর।

কিন্তু এই আইন কি সমাজে নারীদের উপর নির্যাতন ও ধর্ষণ বন্ধ করতে পারবে? এইটা নিয়ে ভাবছিলাম আইন পাশ হওয়ার পর থেকেই। কথাও বলেছি অনেক মানুষের সাথে। কেউ কেউ বলেছেন, না, বন্ধ হবে না। কারণ বিচার পর্যন্ত যাওয়ার পথে এতো বাধা যে সেটা সরিয়ে ওখানে যেতে পারে মাত্র শতকরা তিনভাগ নারী। বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বাদী আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সাক্ষীদের পাওয়া যায় না। বাদীপক্ষ টাকা পয়সা নিয়ে আপোস করে ফেলে। ভয়ে পিছিয়ে আসে। এমন আরও বহু আলোচনা আছে। কেউ কেউ বলেছেন, এটাতে ধর্ষণের পর মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে, কারণ নির্যাতিত নারীকে বাঁচিয়ে রাখলে নিজের জীবনের সংশয় হবে ভেবে ধর্ষণের পরই হত্যা, গুম বেড়ে যাবে!

কিন্তু সর্বশেষ যে জবাবটি পেয়েছি গতকাল। রিকশায় ফিরছিলাম—দুজন শ্রমিক ও একজন পথচারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাসছিল। একজন শ্রমিকের কথা শুনলাম—‘তারা লেংটা হয়ে চলবে সেইডা দেইখা যদি আমার —-লাফায়, তাহলে আমার মৃত্যুদণ্ড কেন হবে? তারপর সমবেত হাসি। যারা ভেবেছিলাম ধর্ষণকারীরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে তাদের মুখের উপর এর চেয়ে ভালো জবাব আর হয় না।

মানব সভ্যতায় নারীদের উপর হওয়া অপরাধের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধটি হলো ধর্ষণ। নারীর শরীর তার নিজস্ব। সেই শরীরকে অপমান করার যে নির্লজ্জ, নৃশংস প্রক্রিয়া, প্রবণতা ধর্ষকের তার জন্য কোনো শাস্তিই যথেষ্ট নয়। দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় বেড়ে উঠছে এই ধর্ষকের দল। কেউ কেউ এটাকে বলছেন পুরুষতন্ত্রের সেই পুরনো রাজনীতি। মেয়ে, তুমি ঘর থেকে বের হবে না। বের হলেই তোমার বিপদ হবে। তুমি ঘরে থাকো।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা, নারীরা পরিবারের বাইরে যে পরিমাণ সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তার চাইতে অনেক গুণ বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে পরিবারের ভেতরেই, যার অধিকাংশ ঘটনা বিভিন্ন কারণে প্রকাশিত হয় না। বাংলাদেশে ৭৭ শতাংশ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পরিবারের মধ্যে (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি, ২০১৮)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তাদের কাছের মানুষ দ্বারা।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটিতে বলা ছিলো—ধর্ষণের পর যদি হত্যা করা হয়, সে ক্ষেত্রে ধর্ষককে আইনে থাকা সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। ধর্ষক যদি স্বীকার করে যে সে ধর্ষণ করেছে, সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি হবে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ধর্ষণের চেষ্টা করলে অনধিক ১০ বছর ও অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান আছে। নারী নির্যাতন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ, ১৯৮৩, এবং১৯৯৫ ও ২০০০ সালের আইনেও শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই ছিল। কিন্তু বিচার সম্পন্নের হার সাড়ে তিন ভাগের মতো। শাস্তির হার এক ভাগেরও নিচে।

আইন তৈরি হয় সমসাময়িক প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য দরকার হয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এই আইনের প্রয়োগ কীভাবে হয়েছে! পত্রিকার তথ্য থেকে জানা যায় ২০১৮ সালের ১৫ হাজার মামলার অভিযোগের চার হাজারটির কোনোই সত্যতা মেলেনি। ২০১৭ সালে মাত্র সাড়ে ৭০০-র মতো মামলার বিচার হয়েছে। জামিন-অযোগ্য অপরাধ বিধায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বা প্রতিশোধ নিতে অনেক নারীকে এসব মিথ্যা মামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রবণতা ধর্ষণের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। আইনটিকে রক্ষাকবচ হিসেবে না রেখে যদি প্রতিপক্ষকে ফাাঁসানোর কাজে ব্যবহার করা হয় তবে সমাজে আইনটি যর্থাথতা হারিয়ে ফেলে প্রকৃত ভুক্তভোগী বঞ্চিত হয়। অনেক সময়ই প্রেমের শারীরিক সম্পর্ক বদলে যায় ধর্ষণের অভিযোগে। এই প্রবণতাও কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

ধর্ষণ একটি অপরাধমূলক আচরণ এবং সেই আচরণের প্রাথমিক ভিত্তি হলো নারীর প্রতি ক্রমান্বয়ে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ও বিকৃত চিন্তাপ্রক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি। যুগ যুগ ধরে নাটক, সিনেমা জোকস এ নারী হয়ে উঠেছে ভোগ্যপণ্য বা একটি শরীর। তাই কঠোর শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন নারীর বিরুদ্ধে এই নিগ্রহ বন্ধ করতে পারবে না। কেবল তো ধর্ষণ নয় সমস্ত যুদ্ধ, মহামারী নারীর জন্য মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ অভিঘাত নিয়ে হাজির হয়। সম্প্রতি মহিলা পরিষদের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসেই ৮৩ জন কন্যাশিশুসহ মোট ১২৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এবছরের গত নয় মাসে ৯৭৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর বাইরে বহু ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয় না।

প্রযুক্তির ব্যবহার নারীর প্রতি নিগ্রহকে বহুমাত্রিক করেছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ছোট বোনের নগ্ন ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে দুই বোনকে ধর্ষণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিপন (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। আটক শিপন ওই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নুর আলমের ছেলে। প্রতিবেশী শিপন বিয়ের জন্য তাবিজ করতে হবে বলে আমার কাছে ছোট বোনের নগ্ন ছবি চায়। আমরা না বুঝে তাকে ওই ছবি দেই। পরে ওই ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আমাদের দুইজনকেই সে কৌশলে ধর্ষণ করে। (কালের কণ্ঠ ২৮ অক্টোবর ২০২০।
কোথায় নেই তারা? পরিবারে বাবা চাচা খালু মামা কেউ এর বাইরে নয়। তাদের আলাদা শিং নখ নেই। তারা আমাদের মধ্যেই মিশে আছে আপনজনের মতো। তাই খুঁজে খুঁজে ধর্ষকামী পুররুষদের আলাদা করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না। ধর্ষণ হবে, ধর্ষণের পর ভিকটিমকে মেরে ফেলা হবে। বাদীর পরিবার ধৈর্য সাহস নিয়ে সমাজের ক্ষমতাবানদের সমস্ত হুমকি অগ্রাহ্য করে মামলা চালাবে। অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে, তারপর হবে মৃত্যুদণ্ড। এতোটা পথ কী যেতে পারবে নির্যাতিতার পরিবার? বেশিরভাগই পারবে না।

তাই ধর্ষকরা এই সমাজে রয়ে যাবে। কিন্তু নতুন করে যাতে তৈরি না হয় তার জন্যতো কাজ করা যায়! লেখাপড়ার বাইরে কী আছে তরুণদের সম্পৃক্ত করার জন্য? সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো তো একে একে ধ্বংস হয়ে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব নেই, নাটক নেই, কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই ফুটবল, ক্রিকেটও নেই সেভাবে। আছে রাজনীতি আর নেশা। এর পরবর্তী ফল হিসেবে আছে নারীর প্রতি অসম্মান আর নিগ্রহের প্রবণতা। প্রযুক্তির আবিস্কারের সাথে সাথে সময় পাল্টে গেছে। কোভিডের পর নতুন স্বাভাবিক সময়ে হয়তো আরও পাল্টে যাবে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কী হবে কেবল ক্রেতা আর বিক্রেতার; শোষক, অত্যাচারিতের। মানুষের মধ্যে মানবিক নৈতিক সম্পর্কের কোন দায় থাকবে না! সমাজ কী হবে কেবল একটা বাজার!

কেউ কেউ বলবে ধর্ষণের মতো চরম হেনস্থা হয়তো কম, কিন্তু চারপাশে নারীকে দেখে অশ্লীল উক্তি, ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া, কর্মক্ষেত্রে নারীকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়া না হলে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ছুড়িকাঘাত করে মেরে ফেলা বা এডিস নিক্ষেপ যৌতুকের দাবিতে খুন গুম এগুলোতো কম নয়। কিছুদিন আগে মিটু র ঝড়ে আমরা তথাকথিত ভদ্র শিক্ষিত সমাজের নারী নিগ্রহের কিছুটা আঁচও আমরা পেয়েছি।

অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
ঝাঁপ খুলে লেলিয়ে দেন কলঙ্কের অজস্র কুক্কুর _
আমার কলঙ্কের প্রয়োজন আছে !
যুদ্ধরীতি পাল্টানোর কোনও প্রয়োজন নেই
তাই করমর্দনের জন্য
হাত বাড়াবেন না।
আমার করতলে কোনও অলিভচিক্কন কোমলতা নেই—কবিতা সিংহ

নারীদের আইন সুরক্ষা দেবেই ঠিকই তবে নারীকে নিজেকেও তৈরি হতে হবে। শরীরের অপমানের স্টিগমা ছুঁড়ে ফেলে নারীকে উঠে দাঁড়াতে হবে। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। তবে সেটা নারী-পুরুষের বিভেদ বাড়িয়ে নয়। সব পুরুষ ধর্ষক নয়। নারীর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো শর্টকাট নেই। ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলে পরম্পরের হাত ধরে দাঁ[ড়াতে হবে।

বাসন্তি সাহা
প্রোগ্রাম ডিরেক্টর
দর্পণ, ঢাকা।

]]>
https://womenchapter.com/views/36273/feed 0
নূর নাহার মরে যায়নি, ওকে খুন করা হয়েছে https://womenchapter.com/views/36260 https://womenchapter.com/views/36260#respond Tue, 27 Oct 2020 16:25:07 +0000 https://womenchapter.com/?p=36260 সুপ্রীতি ধর:

মা-বাবা হয়তো শখ করেই মেয়েটির নাম রেখেছিল নূর, মানে আলো। তার কথা ছিল বেঁচে থেকে চারদিকে আলো ছড়িয়ে যাবার, কিন্তু তার বদলে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই নারী জনমের কঠিন অন্ধকার এক রূপ দেখে বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার নারীদের একজন হয়ে সে চলে গেছে।

ভালোই হয়েছে একদিক দিয়ে। বাকি জীবনের কষ্টগুলো তাকে আর পোহাতে হবে না। ও যে কী ভয়াবহ এক গণ্ডমূর্খ জাতির ঘরে জন্ম নিয়েছিল, মরে গিয়ে তা প্রমাণ করে গেছে। ওর মা-বাবা নিশ্চয়ই এখন শান্তিতে থাকবে আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে! মেয়েরা তো আপদই! নইলে যে মেয়েটি বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল, বন্ধুদের সাথে খুনসুঁটিতে মেতে থাকতো, পুকুরে লাফালাফি করতো, সেই মেয়েটিকে ধরে-বেঁধে কেনই বা স্বামী নামের ধর্ষকের খোয়াড়ে ঢুকাবে বাবা-মা? দীর্ঘ বছর ধরে লাগাতার আন্দোলন-প্রতিবাদের পরও বাল্যবিয়ের বয়স নিয়ে আইন, বাস্তবতা এবং এর প্রয়োগের মধ্যে যে ফারাক তৈরি হয়ে আছে সমাজে, মরে গিয়ে তারই মর্মান্তিক এক দৃষ্টান্ত তৈরি করে গেল নূর নাহার।

শিশুদের বিয়ে যে এক ধরনের যৌন নির্যাতন, মতান্তরে ধর্ষণ, এ বিষয়টি এখনও বিশ্বাস করে না বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ। তাদের কাছে কন্যাশিশু এখনও বাড়তি বোঝা বৈ তো নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বিয়ে দিয়ে বিদায় দিলেই ভালো। গ্রামেগঞ্জে প্রবাসী শ্রমিকরা মূল্যবান পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, তা তাদের বয়স যাই হোক না কেন। নূর নাহারও বলি হলো তার মা-বাবার লোভের কাছেই। কেবল ও মা-বাবাকেই বা দোষ দিই কী করে? একটা রাষ্ট্র যখন কোনো নাগরিকের দায়িত্ব নিতে পারে না, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্রের দরিদ্র বাবা-মায়েদের দোষ কোথায়?

১৪ বছরের কিশোরী নূর নাহার তার ৩৫ বছর বয়সী স্বামী রাজীবের সাথে

মেয়েটি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলো। মা-বাবা গার্মেন্টস কর্মী। প্রবাসী পাত্র পেয়ে তারা মেয়ের বয়সের কথা ভাবেননি। ১৪ বছরের এক কিশোরী মেয়ে যে শারীরিকভাবেই তৈরি হয়নি বিয়ের জন্য, সেই অপ্রস্ফুটিত শরীরেই বিয়ের রাত থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে উপুর্যপরি ধর্ষণ করে গেছে ৩৫ বছরের সোমত্ত পুরুষ স্বামীটি।
বিয়ের মতোন সার্টিফিকেট পেয়ে আস্ত একটা নারী শরীরের মালিক বনে যাওয়া স্বামী নামের পুরুষটি কিশোরী মেয়েটির নাজুকতা দেখেনি। দেখেনি ও যে নারী হয়ে ওঠেনি এখনও, দেখেনি ওর চোখে-মুখের ভয়! ওর কান্না! শারীরিক সম্পর্কের পর রক্তক্ষরণ হলে এমনকি ডাক্তারের কাছেও নেয়নি। উপরন্তু প্রায় একমাস ধরে ধর্ষণ করে গেছে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে শাশুড়ি তাকে কবিরাজ ডেকে চিকিৎসা দিয়েছে। শেষে যখন আর রক্ষা হচ্ছে না তখন হসপিটালে নিয়ে গেছে। কিন্তু নুর নাহার বাঁচেনি। আহারে মেয়েটা!

নূর নাহার মরে গিয়ে আমাদের গালেও কষে থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়েছে। আমরা যারা নারী অধিকারের কথা বলি, তাদের গালে। আমরা এখন কোথায় মুখ লুকাবো? বাল্যবিবাহের ভয়াবহতা কী তা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এতো সভা-সেমিনার, প্রচারণা, মিটিং-মিছিল-প্রতিবাদ কোথায় গেল? নূর নাহার কি আমাদের সবাইকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়নি তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে?
নূর নাহার কি একাই মরে গেল? এরকম কতশত মেয়ে ছিঁড়ে যাওয়া যোনি আর রক্তাক্ত শরীর আর মন নিয়ে মরছে, ধুঁকছে তার খবর কে রাখে! এদের কোন পরিসংখ্যান হয় কি? নারীর আবার সংখ্যা!

মনে পড়ছে একবার ইউনিসেফ এর হয়ে মধুপুরের এক স্বাস্থ্য ক্লিনিকে গেছিলাম রিপোর্ট করতে। আমার সামনে ১৪/১৫ বছরের এক কিশোরী মা আর ১৬/১৭ বছরের কিশোর বাবা, আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম মেয়েটির প্রসবপরবর্তি জটিলতার কথা। ও চিকিৎসকের কাছে এসেছে। নারী চিকিৎসকটি সেদিন বলছিলেন বাল্যবিয়ের কী ভয়াবহ চিত্র গ্রামবাংলায়, যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করে তারাই জানে। প্রতিদিনই এমন অসংখ্য মেয়ের চিকিৎসা তাকে করতে হয়।

ইউনিসেফসহ বহু বেসরকারি সংস্থা, এমনকি সরকারিভাবেও বাল্যবিবাহ বন্ধে অনেক কার্যক্রম আছে। সচেতনতামূলক অনেক কর্মসূচি আছে, টেলিভিশনে দেখানো হয় বিভিন্ন প্রচারণা। তারপরও এর প্রয়োগ কোথাও বন্ধ হচ্ছে না। হয়তো কমেছে বাল্যবিয়ের হার। কিন্তু এখনও পর্যন্ত শুনিনি যে বাল্যবিয়ের কারণে কোথাও কারও কোন শাস্তি হয়েছে।

আমরা জানি যে বিশ্বে বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম। ইউনিসেফ এর তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শতাংশের অধিক বাংলাদেশের নারী যাদের বয়স এখন ২০ এর মাঝামাঝি তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হবার আগেই বিয়ে হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের নিচে। সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, যেসব পিতা-মাতা মেয়ে শিশুদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তারা মেয়ে শিশুর বয়ঃসন্ধির শুরুতে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশংকায় ভুগে। কিন্তু অধিকাংশ বিবাহিত কিশোরীও যে দৈহিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বা এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় এবং সেটা হয় স্বামীর দ্বারাই, সেই জানাটা অজ্ঞাতই থেকে যায়। কিশোরী বয়সে মা হওয়াটাও আরেক নির্যাতন। সেই কথাটাও উহ্য থেকে যায়।

নূর নাহার সেই তাদেরই একজন। ও বেঁচে গেলে এটা কোনো খবরই হয়ে আসতো না পত্রিকার পাতায়, আমরাও রাগে-ক্ষোভে-হতাশায় ভুগতাম না। জানতামই না যে দেশে একটা বিরাট সংখ্যক মেয়ে শিশু বয়সেই বিয়ের শিকার হয়ে যৌন নির্যাতন ভোগ করছে! মেয়েটির কথা ভাবতে গিয়ে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কী অসহায় একটি বাচ্চা মেয়েকে এক জওয়ান পুরুষের ঘরে ঠেলে দিল তারই মা-বাবা! আর মেয়েটি লাশ হয়ে গেল!

বিয়ের রাতের পর আরও ৩৪ দিন মেয়েটা বেঁচে ছিলো। যৌনাঙ্গের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলেও স্বামী তাকে ছেড়ে দেয়নি, সেই রক্তাক্ত যোনী দিয়েই স্বামীর হক আদায় করেছে। প্রতিদিন মেয়েটা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তো ম্যারিটাল রেপ এর কথা তুললেই বলে, এ আবার কী জিনিস! তারা ভাবে, মূলত পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সকলেই ভাবে, বিয়ে হলেই স্বামীটি স্ত্রীর যৌনাঙ্গের মালিক হয়ে যায়! স্ত্রীর ইচ্ছে বা অনিচ্ছা কোনটারই আর কোন মূল্য থাকে না, যেভাবেই হোক, যখনই হোক, স্বামী তার হক আদায় করেই নেয়।

এই যে বিবাহিত জীবনের ৩৪ দিন পর্যন্ত কিশোরী মেয়েটির উপর দিয়ে কী গেলো কেউ ভাবতে পারে তা কতো ভয়ংকর? শুধু কি ওই স্বামী রাজিব খানের দায় এই হত্যার পিছনে? যে বাবা মা এই বয়সে বিয়ে দিলো, যে রাষ্ট্রে দারিদ্র্যের জন্য বাচ্চাদের বিয়ে হয়ে যায়, যে বাবা মা মেয়ের এই অবস্থা জেনেও শ্বশুরবাড়ি ফেলে রেখেছিলো, যারা সময়মতো চিকিৎসা দেয়নি, সবাই তো দায়ী এই ঘটনায়। সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই যদি কিছুটা হলেও টনক নড়ে।

আর জাল বার্থ সার্টিফিকেট দেওয়াও বন্ধ করতে হবে সর্বস্তরে। তবেই হয়তো কিছু মেয়ে বেঁচে যাবে এই অন্যায়, অন্যায্য নির্যাতন, ধর্ষণ থেকে, অসময়োচিত মাতৃত্ব থেকে। বাল্যবিয়ে বন্ধের পাশাপাশি আমাদের বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধেও এখন সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সোচ্চার হতে হবে।

]]>
https://womenchapter.com/views/36260/feed 0
অপরাহ্নের আলো https://womenchapter.com/views/36256 https://womenchapter.com/views/36256#respond Tue, 27 Oct 2020 12:25:30 +0000 https://womenchapter.com/?p=36256 পলি শাহীনা:

মাঝরাত থেকে আকাশ নির্জনে একাকি কেঁদে যাচ্ছে। বরফ জড়ানো বাতাস, নুয়ে পড়া গাছের ডাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দুর্দান্ত প্রতাপে ছুটছে। অন্ধকার রাতে মানুষ যেমন লুকিয়ে কাঁদে তেমনিভাবে মাঝরাতের বৃষ্টিও একাকি জমিনের বুকে লুটিয়ে পড়ে নীরবে। গতকাল থেকে মিনুর মনের মতো আকাশেরও ভীষণ মন ভারী হয়ে আছে। আকাশ যেন মিনুর মনের কষ্টে স্নান করে অঝোরে ঝরছে। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আধো আলো আধো অন্ধকারে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মিনু ভাবছে – কত কত অন্ধকারের পাহাড় ডিঙিয়ে ভোর হয় তা শুধু একজন নির্ঘুম মানুষ জানে, অন্য কেউ নয়। তবে অন্ধকারে এক ধরনের গভীর প্রেম থাকে। দিনের ঝলমলে আলোর চেয়েও রাতের গাঢ় অন্ধকার মিনুর বেশি ভালো লাগে। অন্ধকারে মনের দেয়ালে থরে থরে সাজিয়ে রাখা স্মৃতিগুলো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠে চোখের মণিতে। অন্ধকারে মিনুর মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা স্মৃতিরা গল্পের আসর জমায়, সে তাদের সঙ্গে একান্তে প্রাণ খুলে কথা বলে, হাসে, কাঁদে। অন্ধকারে গোটা জগৎ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তার নিজেকে মনে হয় মূল্যবান এক হীরের টুকরো।

ভোরের আলো এখনো ফোটেনি ভালভাবে। শীতকালের শুরুর সময় এখন। বাতাসের শরীরজুড়ে হিমের আভাস বইছে। পাতাঝরার দিন চলছে প্রকৃতিতে। এই সময়টায় ঝরা পাতাদের দীর্ঘশ্বাসে মিনুর মন খারাপ থাকে অহর্নিশি। শীতের শুরুতে বাড়ীর আঙিনা পরিষ্কার করতে গেলে কষ্টে চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসে ওর। বাড়ির সামনে নির্বিকার গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল একটা বড় গাছ আছে। যে গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মিনু নিজের মধ্যেও প্রচণ্ড একটা নির্বিকারত্ব ধারণ করেছে। ঝড়-ঝঞ্ঝার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা গাছটি থেকে মিনু শিখেছে – যে কোনো দুঃখ-কষ্টে বেঁচে থাকার নিরন্তর নেশায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে অনায়াসে।

গ্রীষ্মের শুরুতে সবুজ পত্র পল্লবে ন্যাড়া গাছটি যখন ভরে উঠে তখন আনন্দে মিনুর চোখ চিকচিক করতে থাকে। মিনু রাত জেগে ওদের সঙ্গে কথা বলে, ভাব বিনিময় করে৷ গলা ছেড়ে গান গায়, প্রাণ খুলে কবিতা-গল্প লেখে। নিঝুম রাতে মিনুকে সবুজে আচ্ছাদিত গাছটির দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে ওর স্বামী ‘মাথা গ্যাছে ‘ বলে কত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো! এতে মিনুর কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। মিনু স্পষ্ট বুঝতো সবুজ পাতাদের ভাষা, ওরাও বুঝতো মিনুর ভাষা। ওরা একে অপরের নিঃস্বার্থ বন্ধু!

শীতের শুরুতে আস্তে আস্তে গাছটি যখন পত্রশূন্য হয়ে পড়ে, মিনু যখন ঝরা পাতাদের কুড়াতে যায়, তখন ওদের আর্তচিৎকার শুনে মিনুর বুক চৌচির হয়ে যায়।
ওরা অনর্গল মিনুর পা জড়িয়ে বলতে থাকে, ‘যেদিন আমাদের বর্ণ ছিল, গন্ধ ছিল, যৌবন ছিল, স্পন্দন ছিল, সুর ছিলো – সেদিন তো আমাদের পাশে ছিলে! কত নিশি জেগে আমাদের রুপে, গন্ধে, ছন্দে, মর্মরে তুমি শিহরিত হয়েছো! প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়েছো! আমাদের স্নিগ্ধতা ধার করে কবিতা-গল্প লিখেছো! আমাদের শীতল বাতাস গায়ে মেখে স্বর্গ সুখে দু’চোখ বুঁজে সুখ স্বপ্নে বিভোর থেকেছো! আমাদের সান্নিধ্য ছাড়া রাত নিশিথে তোমার দম আটকে আসতো, মনে আছে? ‘
ঝরা পাতাদের গগন বিদারী আর্তনাদে বিমর্ষতা পেয়ে বসে মিনুকে।
ও ভাবতে থাকে, ‘জানি না ঝরা পাতাদের মত কবে, কখন, কোথায় – আমার সময়ও ফুরিয়ে আসবে! কাছের মানুষেরা আমাকে ফেলে আসবে অজানার পানে।’

রোদ বাতাসে বরফ সকাল। এরই মধ্যে নিয়মের কোন ব্যত্যয় না ঘটিয়ে সূর্যের তীক্ষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে রোজকার মত। মিনু পর্দা সরিয়ে কাচের জানালার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। গ্রীষ্ম কালীন দীর্ঘ ছুটি শেষে স্কুল খুলেছে। বাচ্চারা স্কুল বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। সত্তোর্ধ নিলডা হাঁটতে বের হয়েছে সঙ্গি কুকুরটি কে নিয়ে। রাস্তার ল্যাম্প পোস্টগুলো নিভে গেছে। মুক্ত আকাশে ডানা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে মনের সুখে উড়ছে পাখীর দল। মিনুর স্বাদ জাগে জীবনের উপর আরোপিত সব শৃঙ্খল ভেঙে পাখীদের মত উড়তে।

‘সাধ আছে সাধ্য নেই। পাখীর মত মন দিলেই যদি প্রভু, উড়বার শক্তি কেন দিলে না।’ মিনুর স্বগতোক্তি।

শীতের আধিপত্যে কাবু হয়ে মিনু গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে নিয়েছে। নিজের হাতে কফি বানানোর সুগন্ধি অবকাশটুকু মিনু নিংড়ে নিংড়ে অনুভব করে রোজ। মেশিনে কফি চাপিয়ে বুক শেলফ থেকে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ বইটি পড়তে শুরু করে। কয়েক পাতা উল্টানোর পর আর পড়তে ইচ্ছে করে না। নিজ হাতে বানানো কফি হাতে মিনু আবার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ততক্ষণে উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছে পৃথিবী। হরেক রঙের পাখীদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। বনের পাখীদের এমন কোলাহল মিনুকে সবসময় আনন্দ দিলেও আজ ওর ভালো লাগছে না। কারণ, ওর ঘরের পাখীটি গতকাল অভিমান করে বাপের বাড়ি চলে গেছে।

মিনুর অসহায় লাগছে। চুপচাপ কফি মগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তিন্নির জন্য মন ছটফট করছে। বই যেভাবে না পড়ে শেল্ফে রেখে দিয়েছে, তেমনি ভাবে কফিও না খেয়ে ডাইনিং টেবিলে রেখে দিয়েছে।

মিনু বেগমের একমাত্র ছেলে মাহিনের বউ তিন্নি। সারল্যে ভরা তিন্নিকে প্রথম যেদিন দেখেছিল মিনু সেদিন-ই মেয়েটিকে তার খুব ভালো লেগে যায়। মাহিনের সঙ্গে তিন্নিকে প্রথমবার দেখার পর অবাক বিস্ময়ে মিনু ভাবতে থাকে, বিদেশে জন্ম – বেড়ে উঠা মেয়েটি কেমন করে এমন খাঁটি বাঙালিয়ানা ধারণ করেছে জীবনে! মনে মনে নীরস প্রকৃতির ছেলেকে ধন্যবাদ জানায় মিনু। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে তিন্নিকে এমন স্ব দেশীয় সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্যের মধ্যে বড় করে তোলার জন্য তিন্নির বাবা-মা কেও আপনমনে ধন্যবাদ জানায় মিনু।

মাহিন বরাবরই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে অধ্যয়নরত তিন্নির সঙ্গে মাহিনের প্রথমে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। পরে তাদের সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়।
মাঝেমধ্যে মাহিনের আরো কিছু বন্ধুর সঙ্গে তিন্নিও বছরের বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে বাসায় আসতো। তখুনি মিনুর মন কেড়ে নেয় তিন্নি। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানোর সময় মিনুকে সাহায্য করতো তিন্নি। খাবার শেষে টেবিল পরিষ্কার করে দিত। বাসায় আসা- যাওয়ার সময় জড়িয়ে ধরে মিনুর বুকে লেপ্টে থাকতো তিন্নি। মাহিনের অন্য বন্ধু দের মত হাই, হ্যালোর পরিবর্তে সালাম দিত। শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলতো। তিন্নির মুখে শুদ্ধ বাংলা ভাষা শুনে মিনুর বুকে সুখের বাতাস বয়ে যেত। তিন্নির জন্য বুকে গর্ব হতো। মাহিন এতো সুন্দর, শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে পারতো না। কাঁধ ঢেকে থাকা চুলে ফুল গুঁজে, হাতে মেহেদির আলপনা এঁকে, পায়ে নুপুর পরে তিন্নি যখন বাসায় আসতো, মিনু তখন নস্টালজিক হয়ে পড়তো।
অন্যকে ভালোলাগার শুদ্ধ আবেশে প্রভাবিত করার অসম্ভব ক্ষমতা রয়েছে তিন্নির।

জগতে অসংখ্য মানুষ আছে, কিন্তু অন্যকে বদলে দেয়ার ক্ষমতা খুব কম মানুষের আছে। তিন্নি বদলে দেয়া মানুষদের একজন। ওর সরলতা ভরা ভালোবাসা মিনু কে বদলে দেয়।

দুই পরিবারের সম্মতিতে মহা ধুমধামে তিন্নি আর মাহিনের বিয়ে হয়। তিন্নি ঘরের পুত্রবধূ হয়ে আসার পর থেকে মিনুর মনে হতে থাকে – এই যেন পরীর দেশের মেয়ে ভুল করে চলে এসেছে তার ঘরে। তিন্নির হাসিতে চাঁদের আলো ঝরে, কথা বললে যেন পাখী ডাকে, হেঁটে গেলে মনে হয় কাঁচা ফুলের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে। অসাধারণ গুণবতী মেয়ে তিন্নি আসলেই অন্য সবার চেয়ে আলাদা; একদম আলাদা।

ঘুম জড়ানো চোখে মিনু কফির ঘ্রাণ পায়, চোখ মেলে দেখে তিন্নি গরম কফি কাপ হাতে তার শিউরে দাঁড়িয়ে আছে। মিনুর নিঃসঙ্গ সকাল-দুপুর রাত্রিগুলো গল্প – হাসি- গানে ভরিয়ে তুলেছে সে। মিনুর পছন্দগুলো জেনে নিয়েছে তিন্নি। সপ্তাহান্তে মিনুর পছন্দের খাবার তৈরি করে নিজ হাতে। মিনুর শোবার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় তিন্নির হাতে লাগানো বেলি ফুলের গন্ধে ম ম করে পুরো বাড়ি।

মিনুর নিয়মমাফিক খাওয়া -দাওয়া, ঘুম, ওষুধ খাওয়া, বিশ্রাম নেয়া- সবকিছুতেই তিন্নির তীক্ষ্ণ মনোযোগ তাকে আপ্লুত করে তোলে, মানসিক শান্তি দেয়। জীবনভর ঘরে -বাইরে অক্লান্ত খেটে যাওয়া মিনু নিজের প্রতি খেয়াল করতে না পারার কষ্ট ভুলে যায় তিন্নির যত্ন – আদরে জীবনের শেষাংশে এসে৷

তিন্নির হাতে লাগানো বেলি ফুলের ঘ্রাণ মিনুকে স্মৃতিকাতর করে তোলে।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনায় মিনু তখন প্রজাপতির মত উড়ছে। কত স্বপ্ন দু’চোখ জুড়ে। মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। মানুষ সবসময় যা চায় তা হয় না। নিয়তির কাছে মানুষ অসহায়। ভাগ্যের জালে আটকা পড়ে মাত্র সতেরো বছর বয়সে মিনু বিয়ের পিঁড়িতে বসে। ছোটবেলা থেকেই মিনু খুব ফুল ভালোবাসতো। ফুলের বাগান করতো। বাগাতে ফুল ফোটাতো যত্ন করে। ফুলের ঘ্রাণে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে অন্ধকারে একা ফুল বাগানে চলে যেত। এজন্য মায়ের কত বকুনি খেয়েছে সে।

মা প্রায়শই বলতো, ‘একদিন পরী এসে তোরে নিয়ে যাইবো তাদের দেশে। আর ফিরতে দিব না আমার কাছে।’
মায়ের এসব কথা ভেবে হাসি পায় মিনুর।
বাবা-মায়ের কড়া শাসনে বড় হওয়া মিনু – প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ না পেলেও, কল্পনাবিলাসী মনে স্বপ্ন দেখতো তার প্রিয় মানুষটি প্রতিদিন ফুল হাতে ঘরে ফিরবে। ফুলের ঘ্রাণে চমকে পেছন ফিরে দেখবে, তার মানুষটি ঘরে এসেছে। মিনুর স্বপ্ন, স্বপ্ন-ই থেকে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার স্বপ্ন নিয়ে মিনু ভর্তি হয় কোচিং সেন্টারে। একদিন সকালে কোচিং এ যাবার আগে দেখতে পায় একটি মোটরসাইকেল এসে থামে ঘরের সামনে। আরোহী বড় মামার সঙ্গে এক আগন্তুক কে দেখে ও। কোচিং থেকে ফেরার পর মিনু বেশ খুশি খুশি দেখে তার মা কে। বাবা বাড়ীর সামনের বট গাছটির মত মাথা নুয়ে নীরব দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চুপ বাবাকে বিপর্যস্ত দেখালো। বাবার জন্য মায়া হয় মিনুর। মা -ই প্রথম মিনু কে বিয়ের কথা বলে। প্রবাসী ছেলের গুণকীর্তনে ব্যস্ত মা সুপারি কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলে। মায়ের কথা একটাই, ‘ কোনভাবেই আমরা এ ছেলে কে হাতছাড়া করবো না। ‘

উচ্ছ্বসিত মায়ের চোখজোড়া মিনুর রাজকীয় ভবিষ্যৎতের কথা ভেবে হীরার মত জ্বলতে থাকে। মিনু নির্বাক। রাগী মায়ের মুখের উপর কথা বলার ক্ষমতা, সাহস কোনটাই তার নেই।
মিনুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন তখন ঘরের এক কোণে অন্ধকারে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা বাবার শূন্য দৃষ্টির মত আস্তে আস্তে অসীমে মিলিয়ে যায়। অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রবাস থেকে আনা বাইশ ক্যারেটের ১০০ ভরি ওজনের সোনার গয়না, আর সিঁদুর লাল বেনারসির ফাঁদে মুখ থুবড়ে পড়ে মিনু। স্বপ্নগুলো আটকা পড়ে সংসার নামক অদৃশ্য কারাগারে।

মিনুর স্বামী নাজমুল খুবই কর্মঠ মানুষ। বিয়ের পর ঘরের মানুষদের সঙ্গে মিনুকে ভালোভাবে পরিচয় করিয়ে না দিয়েই এক সপ্তাহের মধ্যেই নাজমুল ফিরে যায় তার কর্মস্থলে।
বাঁচার অনেক ধরন আছে। নিঃশ্বাস নেয়া আর ফেলা কে যদি বেঁচে থাকা বলে; তবে সেভাবেই বেঁচে ছিল মিনু শ্বশুর বাড়ীর অচেনা মানুষগুলোর মহাসমুদ্রে, সেসব দিনগুলোতে।

মিনুর আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হয় না। সংসার নামক মহাসমুদ্রে মিনু তলিয়ে যায়। যে সময়টায় মিনুর বন্ধুরা ক্লাসের পড়ায় মগ্ন ছিল, সে সময় হাত ভর্তি এঁটো প্লেট নিয়ে সে পুকুর ঘাটে ছুটেছে। যে সময় মিনুর বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় দলবেঁধে গ্রুপ ওয়ার্ক করছে, সে সময় মিনু নাজমুলের বিশাল পরিবারের বাজারের ফর্দ লিখছে, যে সময় মিনুর বন্ধুরা হৈ হুল্লোড় করে শিক্ষা ভ্রমণে যাচ্ছে, সে সময় দেবর-ননদের জন্য ডুবো তেলে নকশা আঁকা পিঠা ভাজছে সে।

বড়ো দেবর খাবে গুঁড়ো মাছের শুকনো চচ্চড়ি, মেঝো দেবরের পছন্দ কাঁচা মরিচ-টমেটো দিয়ে ঝোল মাখা বড় মাছ ভাজি, ছোট দেবর ভালোবাসে নারিকেল দুধ দিয়ে পোলাওর সঙ্গে খাশির রেজালা। মিনুর আহ্লাদী ননদরা আবার মাছ একবারে পছন্দ করে না। তাদের জন্য টেবিলে রাখতে হবে মুরগির ঝোল, হরেক পদের সব্জি ভাজি। মিনুর শ্বশুর আবার ভর্তা ছাড়া ভাত খেতেই পারেন না। হাতে বানানো ভর্তা হলে চলবে না। শিল-পাটায় ভর্তা করতে হবে তাঁর জন্য। কাজের মেয়ের ভর্তা তাঁর পছন্দ নয়। মিনুর হাতের ভর্তা খাবেন উনি। শাশুড়ি এক পাতিল পানির মধ্যে কচুর লতি ছেড়ে দেন বলে, মিনুর জেঠা শ্বশুর খেতে পারেন না। জেঠা শ্বশুর আদর করে মিনুকে বলেছে, ‘তোমার হাতের রান্না ছাড়া ইদানীং অন্য কারো রান্না ভালো লাগে না। পেট ভরে খেতে পারি না বৌমা! ‘

সবার ফরমায়েশ পালন পালন করতে করতে শ্রান্ত মিনুর মনে বাষ্প জমে উঠে। চোখের বিল উপচে পড়ে। রাতের বুকে মাথা রেখে অন্ধকারের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলে। অন্ধকার ছাড়া যে তার আর কথা বলার কেউ নেই।

আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে মিনু চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আমি শুধু ভালো রাঁধতে জানি না, আমার কন্ঠে সুর আছে, আমি গাইতেও জানি। আমি ভালো গল্প, কবিতাও লিখতেও পারি। তোমরা কেউ তো আমাকে গাইতে বলো না, লিখতে বলো না। তোমরা আমার কবিতা শুনতে চাও না কেন! তোমরা কেউ আমার মনের খবর নাও না! শুধু নিজেদের কথা ভাবো, আমার কথা ভাবো না! ‘

মিনু আকাশে ভেসে বেড়ানো তারাদের সঙ্গে ভাসতে থাকে- কল্পনায় পরীর মতো। আকাশের নীল বিছানায় খুনসুটিতে নক্ষত্রদের সঙ্গে মত্ত হয়ে পড়ে। বেগুনি রঙের ঘুড়ি হয়ে নিঝুম রাতে জোছনার সঙ্গে উড়তে থাকে। পাশ ফিরে মিনুর ঘুমের ঘোর কেটে গেলে, ভোরের সূর্য উদিত হবার সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্ররা হারিয়ে যায়। দিনের আলো জ্বলে উঠার পর, মিনু ও ভুলে যায় তার মনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নিঃসঙ্গ রাতের অশ্রু গাঁথা।

নাজমুল যখন ফোন করতো, তখন মিনুর ইচ্ছে হতো তাকে গান, কবিতা শুনাতে। নিজের লেখা গল্প পড়ে শোনাতে। কর্মঠ নাজমুল ওসব একদম পছন্দ করে না। সারাদিন কাজ শেষে সে সংসারের প্রয়োজনীয় কথা এবং সবার খোঁজখবর নিয়ে ফোন রেখে দিত। মিনুর গান, কবিতা, গল্প শোনার সময় ওর হতো না।

নাজমুলের কাছে প্রথমবার বিদেশে আসার সময় নীল রঙের জামদানী শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে নীল পাঞ্জাবি নিয়ে আসে মিনু। বিয়ের পর নাজমুল বিদেশে চলে আসায় হানিমুনে যাওয়া হয়নি। মিনু ভেবেছে বিদেশে এসেই ওরা আগে হানিমুনে যাবে। সমুদ্র মিনুর আজন্ম প্রিয়। সমুদ্রের থৈ থৈ জল ঘেঁষা একটা হোটেলে উঠবে ওরা। সকালে সমুদ্র থেকে উঠে আসা ভেজা শীতল বাতাসে হোটেলের বারান্দায় বসে নাজমুলকে গলা ছেড়ে গান, কবিতা শোনাবে। নাজমুলের হাত ধরে সমুদ্রের পানিতে পা ভিজাবে। মিনুর হাতে থাকবে তখন নাজমুলেত দেয়া কাঁচা বেলি ফুলের মালা।

বিদেশে এসেই মিনু হানিমুনে যাওয়ার জন্য বায়না ধরলে প্রথম প্রথম নাজমুল হাসতো। কর্মঠ নাজমুল ১৬/১৮ ঘন্টা কাজ শেষে বাসায় ফিরেই ঘুমিয়ে পড়তো। পরের দিকে মিনু একান্তে কথা বলার জন্যও নাজমুলকে কাছে পেতো না আর। একসময় মিনু ভুলে যায় হানিমুনের কথা।
তাদের হানিমুনে আর যাওয়া হয় না।

একসময় মিনুর কোল আলো করে আসে একমাত্র সন্তান মাহিন। ছেলের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় মিনু।

মাহিন আর নাজমুলকে ঘিরে মিনুর সংসার সমুদ্রের অসীম জলরাশিতে সবাই থৈ থৈ সুখ দেখেছে বাইরে থেকে, কিন্তু সে সমুদ্রে চিরদিনের জন্য তলিয়ে যাওয়া মিনুর শখ, স্বপ্ন, নিজস্বতা, গান, গল্প, কবিতা, সুর কেউ দেখেনি; কেউ না। সম্ভবত স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও না।

দীর্ঘ ৩৮ বছর পর মিনুর হারিয়ে যাওয়া সুর, কবিতা, গান, গল্প, ফুলের গন্ধ নিয়ে হাজির হয়েছে আকাশ থেকে নেমে আসা পরী তিন্নি।

‘নিজের প্রতি অনেক অবহেলা করে সারাজীবন সংসারে শুধু খেটেই গেছেন। এবার আপনার যত্ন নেব আমি।’ তিন্নির কথায় মিনু হাসে।

ইউটিউব দেখে শাশুড়িকে নিয়ে একসঙ্গে রুপচর্চা করে তিন্নি, ছুটির দিন বিকেলে বেড়াতে বের হয়, লং ড্রাইভে যায়, শাশুড়ির পছন্দের গান, কবিতা শুনে, গল্প করে।

এসব দেখে তিন্নির কর্মঠ শ্বশুরমশাই গুজগুজ করতে শুরু করেছে। সাহস পায় না কিছু বলার। নাজমুল আজীবন মিনুর সঙ্গেই ঝামেলা করতে পেরেছে, অন্য কারো সঙ্গে কিছু করার, বলার সাহস পেতো না। মিনু ছাড়া অন্য কেউ নাজমুলের কৃপণ ধরনের এই আজগুবি ব্যক্তিত্বকে পাত্তা দিত না।

বাইরে যাওয়ার আগে তিন্নি যখন মিনুকে পরিপাটি করে সাজিয়ে দেয়, তখন তার চোখে আনন্দের প্লাবন নেমে আসে।
‘কী মায়াভরা মুখ!’ মিনু অপলক তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়ে রয়।

ইদানিং মাহিন বেশ রাত করে বাড়ি ফিরে। মাহিনের অপেক্ষায় তিন্নি এ ঘর ও ঘর পায়চারি করতে থাকে। মাহিন নামকরা আর্কিটেক্ট। মাঝে-মধ্যে কাজের প্রয়োজনে শহরের বাইরে থাকতে হয়। সে সময়টায় তিন্নি একাকিত্বে ভোগে। মিনু সব বুঝতে পারে। তিন্নির জন্য মন খারাপ হয়।
ওদের বিয়ে হয়েছে এখনো বছর গড়ায়নি। এরমধ্যেই মাহিন সময় দিতে পারছে না ঘরে। মিনুর দুঃশ্চিন্তা হয় তিন্নির মেঘে ঢাকা মুখের দিকে তাকিয়ে। চশমার কাঁচ মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিনু।

গত পরশু তিন্নির জন্মদিন ছিল। ওর পুরো পরিবারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে জন্মদিন উপলক্ষে। মিনু শুনেছে, মাহিন অফিসে যাওয়ার আগে তিন্নি আহ্লাদী কন্ঠে বার বার বলেছে, ‘তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে এসো আজ।’ মা ও তিন্নির থেকে বিদায় নিয়ে মাহিন অফিসে চলে যায়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেলকে তাড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগে। মাহিন বাসায় আসেনি এখনও। মিনু ছেলেকে ফোন করেছে বাসায় আসার জন্য। ‘আসছি মা’ বলে মাহিন ফোন কেটে দেয়।
মিনু দীর্ঘশ্বাস টেনে আপনমনে বিড়বিড় করতে থাকে, ‘আম গাছে জাম ধরে না। জিন বলে একটি কথা রয়েছে। ছেলেটা কি তাহলে বাবার মতোই হলো? ‘
মিনু কোন দরকারি কাজে নাজমুলকে ফোন করলে ঠিক এভাবেই কথা শেষ না করে তড়িঘড়ি করে ফোন রেখে দিত।
নাজমুলের কন্ঠে রুঢ়তা থাকতো, মাহিনের কন্ঠে সে রুঢ় ভাব নেই – পার্থক্য এতোটুকুই!

নির্ধারিত সময়ে তিন্নির বাসার লোকজন এসেই অনেকবার মাহিনের খোঁজ করছিল। বুদ্ধিমতি লক্ষ্মী মেয়ে তিন্নি হাসিমুখে সবাইকে বলেছে, মাহিন খুব জরুরি কাজে আটকা পড়ে গেছে। খাওয়া -দাওয়া, কেক কাটা শেষে মাহিনের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে তিন্নির পরিবার বিদায় নেয়।

মাহিন সেদিন মাঝরাতে বাসায় আসে। রাতভর মাহিন ও তিন্নির কথা কাটাকাটির শব্দ পায় মিনু নিজের ঘর থেকে।

অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। তিন্নি ব্যাগ গুছিয়ে মিনুর ঘরে আসে। তিন্নির হাতে সুটকেস দেখে মিনু বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছে। শিশুর মতো তাকিয়ে আছে বাকরুদ্ধ মিনু। তার গলা ধরে আসছে, মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। মাথা ঝিমঝিম করছে। কী করবে, বলবে ভেবে পায় না। অসহায় বোধ করে।

মিনুর বিপর্যস্ত মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তিন্নি তাকে স্বাভাবিক করার জন্য বলে, ‘মা, আপনার নাইট ময়েশ্চারাইজারটা বেশ ভালো কাজ করছে। আয়নায় দেখেন, বয়স কমপক্ষে ১০ বছর কমে গেছে। কী যে সুন্দর লাগছে আপনাকে!’
মিনু শিশুর মতো খিলখিল করে হেসে উঠে।

তিন্নি শাশুড়ির মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে, ‘মা যুগ যুগ ধরে চলা এই অনিয়ম ভাঙতে হবে। এই জং ধরা তালা খুলতে হবে। আমার মা আপনাকে শুধু চিনতো না, আপনার জীবনের অনেক অবহেলা, কষ্টেের গল্পও জানতো। আপনার কষ্টের কথা, ত্যাগের কথা আমার মা বলেছে মাহিনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হবার পর। আপনার জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়েছে তখন। ভেবেছি, মাহিন ব্যতিক্রম হবে। এখন দেখছি মাহিনও বাবার মতই হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করবেন মা। আমি আপনার মতো মুখ বুঁজে সকল অন্যায়, অবহেলা মেনে নিতে পারবো না। আমার খুব কষ্ট হবে আপনাকে ছেড়ে থাকতে। মাহিন যেদিন ভুল বুঝতে পারবে, নিজেকে শোধরাতে পারবে, সেদিন আমি ফিরে আসবো। চিন্তা করবেন না একদম।’
মিনুর পা ছুঁয়ে সালাম করে তিন্নি বিদ্যুৎ গতিতে ভারী বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যায় ঘর হতে।

তিন্নিকে বাধা দেয়নি মিনু। কারণ সে চায় না তার মতো জীবন হোক তিন্নির।

মিনুর বুক খাঁ খাঁ করছে তিন্নি চলে যাওয়ার পর থেকে। তার বুকে অসীম নিঃস্তব্ধতা নেমেছে। মিনু আদরে করে তিন্নিকে তোতা পাখী বলতো। তিন্নি ছিল মিনুর কথা বলার পাখি। তিন্নি এ বাড়িতে পুত্রবধূ হয়ে আসার পর কত কত বছর বাদে মিনু প্রাণ খুলে হাসতে, কথা বলতে শুরু করেছে। শাশুড়ি -বউ নয়, দু’জন যেন বান্ধবীর মতন ছিল।

মিনুর অস্থির লাগছে। কোন কিছু ভালো লাগছে না। সকালের ওষুধ, খাবার কিছুই খায়নি৷ তার ঘরের পাখি বেরিয়ে গেছে বলে, বাইরের পাখির ডাক অসহ্য লাগছে। সারাদিন তিন্নির জন্য মিনুর চোখে বৃষ্টি ঝরে।

মাহিন অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যা বেলায় কয়েকবার আম্মু, আম্মু বলে ডেকেছে। মিনু কোন উত্তর দেয়নি। তবে ছেলের জন্য টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখেছে। খাওয়ার সময়ও কয়েকবার ডেকেছে, তাও মিনু সামনে আসেনি। রাতের খাবার একা একা খেয়েছে মাহিন।

খাওয়া শেষ করে মায়ের ঘরে যায় মাহিন। মিনু ঘরের আলো জ্বালায়নি, অন্ধকারে বারান্দায় বসে আছে। মাহিন রুমে ঢুকে আলো জ্বালালে দু’হাতে চোখমুখ ঢেকে আলো নিভিয়ে দিতে বলে। মাহিন লাইট অফ করে অন্ধকারে মায়ের পাশে গিয়ে বসে। মায়ের কোন ভাবান্তর না দেখে মাহিন তার কোলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।

ছেলেকে কাঁদতে দেখে মিনু বুকের সঙ্গে ওকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘বাবা, আমি তোদেরকে সুখী দেখতে চাই। তোদেরকে নিয়ে আমি একটি স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন চাই। তোদের মধ্যে কোন মানসিক দূরত্ব দেখতে চাই না। তিন্নির প্রতি তোর অমনোযোগ, অবহেলা, নির্লিপ্ততা দেখতে চাই না। বিয়ে অতি সুখের একটি বিষয়। বিবাহিত জীবনে যদি আনন্দ না থাকে সে জীবন সামনে বয়ে নেয়া ভীষণ যন্ত্রণার। দাম্পত্য জীবনকে মধুময় করে তোলার বেশিরভাগ দায়িত্ব কিন্তু তোর-ই। কারণ তিন্নি তার পরিবার ছেড়ে তোর কাছে এসেছে। টাকা-পয়সা জীবনের জন্য, জীবন টাকা -পয়সার জন্য নয়। আমি চাই না টাকা-পয়সার কাছে তুই জিম্মি হয়ে যা, তোর সুখ বেছে দে। সম্পদে সুখ নেই। সুখ খুঁজতে হয় মনে, নিজের ঘরে। তোর সুখ অভিমান করে চলে গেছে ঘর ছেড়ে। তুই তার অভিমান ভেঙে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আয় বাবা।’

মাহিন সম্মতি জানিয়ে মায়ের কপালে আদর করে ঘুমাতে যায়।

জগতে সবাই পরিপূর্ণ জীবন পায় না। নিজের জীবনের অসম্পূর্ণতার কথা ভেবে মিনু সারারাত ঘুমাতে পারে না। সে চায় না ছেলের জীবন তার মতো কোনদিক হতে অসম্পূর্ণ হোক।

মাহিন আজ সকালে মাকে বলে তিন্নির বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। মিনু বারবার জানালার পাশে গিয়ে বাইরে দেখছে। মিনুর আর তর সইছে না। কলিং বেল বাজার অধীর অপেক্ষায় সে সময় গুনছে।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের পাল্টে যাওয়া রুপ দেখছে মিনু। মেঘ কেটে গেছে। আকাশের গায়ে রংধনু জেগেছে। শেষ বিকেলের উজ্জ্বল আলো গাছের ফাঁকফোকর গলে মিনুর মুখে এসে পড়েছে। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠে। মিনু দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলেই তিন্নিকে বুকের ওমে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। মাহিন পাশে দাঁড়িয়ে এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে।

মাহিনকে কাছে ডেকে তিন্নির হাত ওর হাতের উপরে রেখে মিনু বলে, আমাকে একটি কথা দিবি বাবা?
– কী কথা?
– আকাশের ওই সাতরঙা রংধনুর মতো আজীবন তিন্নির জীবনকে রাঙিয়ে রাখবি? কথা দে, কোন দূরত্ব যেন কোনদিন না আসতে পারে তোদের মাঝখানে!

শেষ বিকেলের কমলারঙা অদ্ভুত সুন্দর আলোয় মাহিন হাসিমুখে মায়ের বুকে মাথা রাখে।

]]>
https://womenchapter.com/views/36256/feed 0
একজন রুচিশীল সংস্কৃতিবোদ্ধার নিপীড়ক এবং ধর্ষকরূপী চেহারা – ৫ https://womenchapter.com/views/36246 https://womenchapter.com/views/36246#respond Mon, 26 Oct 2020 12:21:03 +0000 https://womenchapter.com/?p=36246 সুমু হক:

এ পর্যন্ত এই সাক্ষাৎকারটার যে ক’টা পর্ব আমরা প্রকাশ করেছি, তার প্রত্যেকটি প্রকাশিত হবার পর পরই একটি প্রশ্ন বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে, সেটি হলো, রোকসানার (রোকসানা আক্তার ঝর্ণা) মতো একজন আত্মমর্যাদাপূর্ণ, আধুনিক, একজন নারী কী করে পলাশের মোট একজন নির্যাতকের সাথে এতোগুলো বছর থেকে গেলেন, কেন তিনি অনেক আগেই সেই সংসার ছেড়ে বের হয়ে এলেন না।

এই প্রশ্নগুলো আমিও করেছিলাম তাঁকে।

প্রথমদিকে পলাশের (মনজুরুল আজিম পলাশ) প্রতি ভালোবাসা এবং পরিবারের সামনে নিজের এবং নিজের বৈবাহিক জীবনের জটিলতাকে পরিবারের সামনে এনে নিজের সম্মান এবং নিজের সিদ্ধান্তের মর্যাদা বজায় রাখবার একটা জেদ রোকসানার ভেতর কাজ করেছিল।

তারপর সেই স্থানটা দখল করে নেয় সারভাইভাল ইনস্টিংকট। প্রথম প্রবাস জীবনে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবার সময় প্রধান দরখাস্তকারী ছিলেন পলাশ, তাই সেই কারণে কিস্তির সমাধান হওয়া পর্যন্ত রোকসানার পক্ষে আলাদা হবার সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি। সেটা করলে তাঁকে তাঁর সন্তানদেরসহ ডিপোর্টেড করা হতো, দেশে ফিরে তাঁর সন্তানদের নিয়ে একটি অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হবার মতো সাহস তিনি করতে পারেননি। তবে যে মুহূর্ত থেকে তাঁদের এসাইলাম নিশ্চিত হয়ে যায়, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি উদয়াস্ত পরিশ্রম করে গেছেন শুধুমাত্র একটি কথা মাথায় রেখে, তাঁর সন্তানদের জন্যে একটি নিরাপদ, সুন্দর এবং সফল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

“আমার বাচ্চারা তখন স্কুলে, আমি নিজে তো তখন এই কাজ করি, তখন যদি আমি কিছু একটা করি, বের হয়ে যাই, তাইলে ওদের ওপর একটা মানসিক চাপ পড়বে, পড়ালেখার ক্ষতি হবে ওদের,” বলেন রোকসানা।
ইতিমধ্যেই একটি কোর্স করে নিয়ে তার পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন রোকসানা।

রোকসানা

কাজে দক্ষতার জন্যে দ্রুত কাজে উন্নতিও হচ্ছিলো রোকসানার। এমনকি ২০১০ এ তাকে বলা হলো, যে তিনি চাইলে সরাসরি, সোশ্যাল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করবার জন্যে প্রয়োজনীয় কোয়ালিফায়েড সোশ্যাল ওয়ার্কারের ডিগ্রিটি নিতে ইউনিভার্সিটিতেও ভর্তি হবার সুযোগ পাবেন, এবং সেজন্যে প্রয়োজনীয় লোনও পাবেন, শর্ত একটাই, তাঁর সন্তানদের দেখাশোনা করবার জন্যে তাঁর স্বামী যে বাড়িতে থাকছেন, এর নিশ্চিত প্রমাণ তাঁকে সাবমিট করতে হবে।
একথা শুনেই ক্ষেপে উঠলেন পলাশ! যতরকমভাবে সম্ভব তাঁকে অসহযোগিতা করতে লাগলেন এবং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার সময় এলে পলাশ দেশে চলে গেলেন, যাতে করে রোকসানা ডিগ্রিটি নিতে না পারেন। অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র পলাশের ঈর্ষার কাছে বলি হলো রোকসানার এম্বিশন, কোয়ালিফায়েড সোশ্যাল ওয়ার্কারের ডিগ্রিটি করা আর হলো না তাঁর।

এমনকি এতো বছর ধরে কাজ করে রোকসানা সমস্ত খরচ এবং ট্যাক্স দিয়ে গেলেও, সরকারি কাউন্সিল থেকে একটি সাবসিডাইজড বাসার জন্যে যখন এপ্লাই করার সময় এলো, পলাশ চালাকি করে এপ্লিকেশনটা নিজের নামে সাবমিট করলেন, যাতে করে বাড়িটা পেলেও যেকোনো মুহূর্তে ইচ্ছে করলেই তিনি রোকসানা এবং বাচ্চাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেন।

শুধু তাই নয়, ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে চাইল্ড সাপোর্টের জন্যে যে ৭০০ পাউন্ড করে তারা প্রতি মাসে পেয়েছেন, সেই টাকার সবটুকুও এসে জমা হতো পলাশের একাউন্টে, তার কারণ তিনি একাউন্ট ইনফরমেশন দেবার সময় রোকসানার একাউন্ট ইনফরমেশন না দিয়ে তার নিজেরটাই দেন। সেই প্রায় ৪২০০০ পাউন্ডের মধ্যে পাঁচ বছরে মাত্র ১২ হাজার পাউন্ড সংসারের কাজে খরচ করে বাকি ৩০ হাজার পাউন্ড পলাশ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন এবং এই অর্থ তাদের সন্তান লুম্বিনী এবং নির্বাণের পড়াশোনার জন্যে সঞ্চিত থাকার কথা থাকলেও, তার থেকে কোন অর্থই তিনি রোকসানা বা তাঁর সন্তানদের আজ অবধি ফেরত দেননি। এর কিছুটা পলাশ তার পৈতৃক জমিতে একটি বাড়ি তৈরিতে কাজে লাগান আর বাকি অঙ্কটা নিজের নামে ব্যাংকে জমা রাখেন।

শুধু তাই নয়, ২০১২ সালে ইংল্যান্ড ছাড়ার আগে পলাশ দুটো ব্যাংক থেকে আরও ২৫ হাজার পাউন্ড তুলে নিয়ে সেই অর্থ ফেরত না দিয়েই বাংলাদেশে চলে যান। পলাশের বর্তমান প্রেমিকা রুমা চৌধুরী রোকসানাকে জানিয়েছেন যে পলাশ তার একাউন্টে থাকা টাকার কিছুটা দিয়ে ৩০ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন এবং পলাশ আর রোকসানার সন্তানদের লেখাপড়ার জন্যে সঞ্চিত সেই অর্থ চুরি করে কেনা সঞ্চয়পত্রের সুদের টাকা তিনি নিয়মিত তোলেন এবং খরচ করে থাকেন।

(প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পলাশের সাথে রুমার সম্পর্কে ছিল ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত, তারপর পলাশের হাতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে নিগৃহীত হয়ে তিনি আমেরিকায় ফিরে আসতে বাধ্য হন, যদিও এখন কোন কারণে তিনি আবার পলাশের কাছে ফিরে যেতে চলেছেন)

সেই ভোরে একটুখানি চা আর হালকা কিছু নাস্তা খেয়ে কাজে বেরিয়ে পড়তেন রোকসানা। এমনকি দুপুরবেলা তিনি যে কিছু খাবেন, সেই পয়সাটুকুও পলাশ তাঁকে দিতেন না। আর অত ভোরে উঠে সংসারের সব কাজ সেরে নিজের জন্য যে কিছু খাবার বানিয়ে নিয়ে যাবেন, সেই সময়টুকু তিনি পেতেন না।

সারাদিন কাজের ফাঁকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়ার সুযোগ হতো না বলে আবার সেই গভীর রাতে বাড়ি ফিরে চারটে ভাত খাবার সুযোগ হতো।
পলাশ ইচ্ছে করেই বেশিরভাগ দিন সব খাবার শেষ করে রাখতো যাতে করে অত রাতে আসায় ফিরেও রোকসানা খাবার না পান।
“একদিন রাতে ভাতের কন্টেইনারের ঢাকনাটা খুলে দেখি, একটুকুও ভাত নাই, সবটা ও শেষ করে রাখসে! সেইদিন আমি যে কী ক্লান্ত, মানে আমার তখন আর এনার্জি ছিল না আবার রান্না করে খাওয়ার! আমি আর পারি নাই, ওইখানে কিচেনে বসেই কেঁদে ফেলসি। আমার ছেলেটা মনে হয়, বুঝছে, কেমন করে যেন দেখে ফেলছে। তারপর থেকে আর কোনদিন ও একা খেতে চায় না, মানে খাওয়ার আগে সবসময় চেক করে, বলে যে “বাবা, আম্মুর জন্য ভাত আছে তো?” আমার জন্য খাবার আছে সেইটা দেখে তারপর সে খেতো, নাহলে আর খেতে চাইতো না,” বলেন রোকসানা।

এমনি করেই চলছিল তাঁদের জীবন।

দু’হাজার বারোর কথা।
“এই সময়টায় এসে ওর অত্যাচারের মাত্রাটা হঠাৎ ভয়ংকর রকম বেড়ে গেলো।
সবরকমভাবেই! মানে মারধর, গালাগালি তো আছেই। বিছানাতেও ও কেমন যেনা পশুর মতো হয়ে গেলো।
ও তো তখন, মানে ওরকম জঘন্য আচরণ করতো বলে আমি আর ওর কাছে যেতে চাইতাম না, ওর বিছানায় ঘুমাতে চাইতাম না, যে ও যদি আবার এসে কিছু করে।
কিন্তু তবুও ও আমাকে ধরে, মানে…উফফ,” বলে হাঁপিয়ে উঠে থামলেন রোকসানা।

মেসেঞ্জারের এইদিক থেকে আমি শুনছি তাঁর দ্রুত নিঃশ্বাসের ওঠানামা, আর ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি ঠিক আছেন কিনা।
“আমরা নাহয় আরেকদিন কথা বলি?” আমি বললাম।
“তুমি আমাকে একটু শুধু দুইটা মিনিট একটু সময় দাও,” বললেন তিনি।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করলেন।
“প্রায় রাতেই ও আমাকে ধরে বিছানায় উন্মত্ত হয়ে উঠত।
শুধু যে আমার অসম্মতি সত্ত্বেও ও আমাকে ধর্ষণ করতো তাই নয়, ও এমন করে পশুর মতো আমাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলতো, মনে হতো যেন আমাকে ছিঁড়েই ফেলবে, কিংবা একেক দিন মনে হতো যে আমাকে মেরেই ফেলবে।

ও আগেও আমাকে নির্যাতন করেছে, কিন্তু এই সময়টায় এটা এতো বেড়ে গেলো যে আমি আর নিতে পারছিলাম না। ভাবতাম যে ওকি আমাকে চায় যে আমি মরেই যাই! এমনকি আমি সুইসাইড করার কোথাও ভেবেছি বহুবার, শুধু আমার বাচ্চাগুলোর কথা ভেবে আমি সেটা করতে পারিনি।
তখন অনেক ভেবেও বুঝতে পারিনি হঠাৎ করে ওই সময় ওর অত্যাচারটা কেন হঠাৎ এত বেড়ে গেলো!
সেটা বুঝলাম মাত্র কাল রাতে,” বললেন রোকসানা।

এই ইন্টারভিউয়ের আগের রাতে, অর্থাৎ গত ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ এ, পলাশের প্রেমিকা রুমা চৌধুরী রোকসানাকে ২০১২ তে পলাশ এবং জুঁই খান নামে একজন নারীর মাঝে মেসেঞ্জারে চলা কিছু কথোপকথনের স্ক্রিনশট পাঠান। অর্থাৎ সেই সময় এই সম্পর্কটিতে জড়ানোর কারণেই পলাশ রোকসানার ওপর তার অত্যাচার ভীষণরকম বাড়িয়ে দেন।

“ও বোধহয় চাচ্ছিলোই যে হয় আমি বাড়ির থেকে বের হয়ে যাই, আর নয়তো সুইসাইড -টুইসাইড কিছু একটা করে ফেলি”, বলেন রোকসানা।
পলাশের কাছে অত্যাচারিত হতে হতে এই সময়টাতে এসে প্রায় মরিয়া হয়ে উঠলেন রোকসানা।

যেমন করেই হোক, তাঁকে তাঁর সন্তানদের মানুষ করতে হবে, আর তাঁর নিজেকেও খুব দ্রুতই পায়ের নিচের মাটি খুঁজে পেতে হবে।

আগের পর্বগুলোর লিংক:

https://womenchapter.com/views/36164

https://womenchapter.com/views/36041

https://womenchapter.com/views/35909

https://womenchapter.com/views/35830

 

]]>
https://womenchapter.com/views/36246/feed 0
উগ্রপন্থীরা, কার্টুন বোঝো, শিক্ষকের রক্তের দাম বোঝো না… https://womenchapter.com/views/36238 https://womenchapter.com/views/36238#respond Sun, 25 Oct 2020 17:09:39 +0000 https://womenchapter.com/?p=36238 কাজী তামান্না কেয়া:

গত ১৬ই অক্টোবর ফ্রান্সের একজন মিডল স্কুল শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করে চেচনীয় বংশোদ্ভুত এক মুসলিম রেফিউজি। এই হত্যার পর ফ্রান্সের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর উপর চাপ বাড়তে থাকে মুসলিম রেফিউজিদের উপর নজরদারি বাড়াতে। ফ্রান্স সাময়িকভাবে ৭০টি মসজিদ বন্ধ ঘোষণা করেছে, দুইশো’র অধিক মানুষকে ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত করতে যাচ্ছে, যারা মৌলবাদী ধ্যান-ধারণা বহন করছে, আরও ২৫৮ প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির ভেতর রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোর মৌলবাদের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থানের জন্যে মুসলিমদের সমালোচনার শিকার হচ্ছে। এই সমালোচনা যারা করছেন তারা শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটির জীবনের দাম ভুলে যাচ্ছেন, ২০১৫ সালে শার্লি হেব্দোর অফিসে দফায় দফায় হামলা, পত্রিকা অফিসে আগুন, সম্পাদকসহ কমপক্ষে ১২জন মানুষকে হত্যার বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছেন, এবং এর পরে ফ্রান্সে মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা সংঘটিত বাকি হামলাগুলিও ভুলে যাচ্ছেন।

ফ্রান্স পৃথবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উদার দেশ হিসেবে পরিচিত। এই দেশের উদার মানবিকতা এবং জীবনদর্শন সারা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলিম এবং অন্য ধর্মাবলম্বী এবং নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী রেফিউজিকে ফ্রান্সে মাইগ্রেট করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে ফ্রান্সে ৫৮ লাখ মুসলমানের বসবাস যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৯% (২০১৭)। ফ্রান্সে দ্রুত বর্ধমান ধর্মের তালিকায় ইসলাম আছে দ্বিতীয় অবস্থানে। ইউরোপের মুসলিম ইমিগ্রান্টদের উপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে ইউরোপের সবগুলো দেশের ভেতর ফ্রান্স মুসলিমদের পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিকভাবে গ্রহণ করার এই প্রক্রিয়ায় ফ্রান্স যদি উদার গণতান্ত্রিক না হতো, মুসলিমরা ফ্রান্সে এতো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না।

এমতাবস্থায় ফেইসবুকে এক বন্ধুর পোস্টে চোখ আটকে গেল। তিনি লিখেছেন, ফ্রান্স রিলিজিয়াস প্লুরারিজম প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তিনি ফ্রান্সকে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন ধর্মের সহবস্থানের কৌশল শিখে যেতে আহবান করেছেন। কদিন আগে ‘ফ্রিডম অফ স্পিচ’ এর উপর আমার অন্য একটি পোস্টের উপর প্রায় একই কথা বলেছিলেন- ফ্রান্সকে তিনি বাক স্বাধীনতার সংজ্ঞা শিখাবেন। ভেবে পাচ্ছিলাম না, উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ বারবার রক্তাক্ত হওয়া ফ্রান্সকে কেন ভিক্টিম ব্লেইম করছে!

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ফেইসবুক ভরে শুধু যে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা মৌলবাদ ধ্যান ধারণার মানুষই ফ্রান্সের প্রতি বিষোদগার করছে বিষয়টি তা নয়, এই মূর্খের দলের সাথে সুর মিলিয়েছেন শিক্ষিত মানুষজনও, এবং বড় বড় ডিগ্রিধারী মানুষও। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই লোকদের কেউই একজন নিরপরাধ শিক্ষককে কার্টুন দেখানোর কারণে যখন হত্যা করা হয়েছিল, তার প্রতিবাদ করেননি। তারা ভুলে যাচ্ছেন যে, শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছিল ক্লাসে ফ্রান্সের সংবিধানের মূলনীতি –স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব শেখাতে গিয়ে। তারা ভুলে যাচ্ছেন স্যামুয়েল প্যাটির শিক্ষা উপকরণে অন্যান্য ধর্ম প্রচারকদের সাথে নবী মোহাম্মদের কার্টুন দেখিয়েছিলেন, যেটা কোনভাবেই অন্যায় ছিল না। তারা ভুলে যাচ্ছেন যে তিনি কার্টুন দেখানোর আগে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। আজ যখন ফ্রান্স কঠোর অবস্থানে গেছে তখন তারা ফ্রান্সের কট্টর সমালোচনা করছে। বিষয়টা এলার্মিং।

আজ থেকে ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশে মৌলবাদ ছিল, কিন্তু শিক্ষিত লোকদের এতো অজ্ঞ আর অযৌক্তিক আচরণ করতে দেখা যেত না। দিনকে দিন এই ট্রেন্ডটা কমন হচ্ছে– জোব্বাধারী মোল্লারা যা বলে, প্যান্ট শার্ট পরা ক্লিন শেইভ করা লোকগুলি সেই একই রাবিশ বলছেন। স্কলার গ্রুপের সমর্থন পেয়ে মৌলাবাদী গ্রুপ বাংলাদেশে ফ্রান্সের পণ্য বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। এইটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ফিলিস্তিনের একজন মুসলিম ইজরাইলের হামলার শিকার হলে বাংলাদেশের উগ্রপন্থীরা ইজরাইলি তথা ইহুদি/নাসারাদের পণ্য বর্জনের ডাক দেয়। পণ্য বাংলাদেশীরা বর্জন করলে ফ্রান্স বর্জন করতে পারে না? অবশ্যই পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় চালানটি যায় ইউরোপে। ফ্রান্স যেহেতু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ, ফ্রান্স এবং ইইউ চাইলে কিছুদিনের জন্যে পোশাক কেনা বন্ধ করতে পারে বাংলাদেশ থেকে। সত্যি সত্যি যদি ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাজটি করে বসে, বাংলাদেশ তখন কোন অবস্থায় পড়বে, তা কি এই মৌলবাদীরা জানে?

মূর্খদের প্রতিশোধের ভাষা যেমন কার্টুনের বদলে রক্ত, তাদের প্রতিবাদের ভাষাও তেমন বয়কট, হুমকি ধামকি। ফ্রান্স যেখানে বড় বড় দেয়ালে কার্টুন দেখাচ্ছে, ফ্রান্সের জনগণ যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট যেভাবে স্যামুয়েল প্যাটিকের শেষযাত্রায় রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়েছেন, এর মাধ্যমে তারা কিন্তু মৌলবাদীদের একটা বার্তা দিতে চাচ্ছেন এবং বার্তাটি খুব ক্লিয়ার– ফ্রান্সে মৌলবাদের কোন স্থান নেই। একই বার্তা আমরা বুঝতে পারি চীনের উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের অবস্থান থেকে। বার্তাগুলো যত তাড়াতাড়ি মৌলবাদীরা ধরতে পারবেন, ফ্রান্সের সাধারণ মুসলিমরা তত তাড়াতাড়ি ফ্রান্সের মূলনীতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন, এবং শান্তির স্বপক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারবেন।

(উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত লেখার দায় সম্পূর্ণই লেখকের)

Feature Photo Source: The Independent

]]>
https://womenchapter.com/views/36238/feed 0
প্রথম বিয়ের পরে কিংবা দ্বিতীয় বিয়ের আগে https://womenchapter.com/views/36234 https://womenchapter.com/views/36234#respond Sat, 24 Oct 2020 22:26:29 +0000 https://womenchapter.com/?p=36234 শাহরিয়া দিনা:

‘আমরা একবার বাঁচি, একবার মরি, বিয়েও একবার করি, আর প্রেমও একবার’ কুচ কুচ হোতা হ্যায় সিনেমার শাহরুখ খানের ডায়লগের দিন এখনো বহমান আছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। সিনেমার মতো জীবন হলে মন্দ হতো না আসলে। কিছু প্রেম, কিছু ট্রাজেডি, শেষমেষ হ্যাপি এন্ডিং! অথবা রুপকথার গল্পের মতো, অবশেষে তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো।

জীবন তো আর গল্প, উপন্যাস বা সিনেমার মতো নয়। মার্ক টোয়েন যেমনটা লিখেছিলেন, ট্রুথ ইজ স্টেঞ্জার দেন ফিকশান। জীবনের গল্প অদ্ভুত। একেকজনের একেকরকম। যে কাটায় জীবন সে জানে ব্যাথ্যা কেমন। অনুভব কত মধুর। নিজের অবস্থানে থেকে কাউকে দেখে একটা রায় দিয়ে দেয়া নির্বোধের পক্ষেই সম্ভব। কাউকে বিচার করতে হলে তার পরিস্থিতিতে নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিন্তা করতে হয় বৈকী!

বিয়েটা মানুষ একবুক স্বপ্ন নিয়েই করে। একজনের সাথে জীবনটা ভাগাভাগি করে পরিবার গড়ার উদ্দেশ্যে। সেটা কোন কারণে সম্ভব নাহলে নিত্যদিনের মারামারি-কাটাকাটি বাদ দিয়ে স্বস্তির পথ ধরাই শ্রেয়। ধর্মীয় এবং আইনগত ভাবে বিয়ে একটা চুক্তি। আর চুক্তি মানেই সেটা বাতিলের ক্ষমতাও থাকে। তবে শখ করে কেউ-ই সংসার ভাঙ্গেনা। ইচ্ছে হল ভেঙ্গে দিলাম এমনও না। নিশ্চয়ই দুজনের মধ্যে অসহনীয় কিছু একটা তো থাকেই।

এইতো মাত্র কয়েকদিন আগে কক্সবাজারে আফরোজা নামের একটা মেয়ে খুন হয়েছে। খুন করেছে তার স্বামী বাপ্পি। খুন করে লাশটা উঠোনে পুঁতে রেখে প্রচার করেছিল পরকিয়া প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেছে আফরোজা। আফরোজার এটা দ্বিতীয় বিয়ে আর বাপ্পির ছিল তৃতীয় বিয়ে। বাপ্পির আগের দুই বউ তাকে ছেড়ে গেছে অমানুষিক নির্যাতনের জন্য। আফরোজা যায়নি, তাই লাশ হতে হয়েছে তাকে। প্রথম বিয়ে ভেঙে যাবার পর একটা মেয়ে কার্যত পরিবার এবং সমাজের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ে ভেঙে যাওয়া মানে তো মরার উপর খাঁড়ার ঘা। দ্বিতীয় বিয়েটা মেয়েদের জন্য বড় ধরনের জুয়া খেলা, যেখানে জীবন বাজি রাখতে হয়। এখানে ফেইল করলে তুমি শেষ। প্রথমবার যাও কষ্টমষ্ট করে বলে এক্সিডেন্ট, কিন্তু দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হলেই বলে এর স্বভাব খারাপ। সমস্যা এর মধ্যেই। এখন দ্বিতীয়বারে কেউ যদি আফরোজার বরের মতো বর পায়, তার কিছু করার থাকে না আসলে। এখানে বলে রাখি আফরোজার স্বামী বাপ্পি কিন্তু অশিক্ষিত না, সে একজন কলেজ শিক্ষক।

এবার আসি সমাজের উঁচু তলায়। শমী কায়সারের তৃতীয় বিয়ে নিয়ে অনলাইনে বেশ ভালোই ট্রল হলো। যদিও শমীর এতে কিছুই যায়-আসে না। শমী কায়সার শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী নারী। তিনি একা থাকবেন নাকি বিয়ে করবেন সে সিদ্ধান্ত একান্তই তার। বাস্তবায়নও তারই হাতে। আমাদের এতো হাসির কারণ কী তবে? কারণ একটা মেয়ের তিন নম্বর বিয়ে শুনলেই কেমন জানি লাগে। অথচ আবার দেখেন, আমাদের নবীজী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রথম স্ত্রী খাজিদার তিন নম্বর বিয়ে ছিল তাঁর সাথে।

বিয়ে শুনলেই আমাদের চোখে ভাসে যৌনতা। যেন শরীরের জন্যই বিয়ে করা। একটা মেয়ের কিন্তু পঞ্চাশের পরে মেনোপজ হয়ে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে তখন তার যৌন চাহিদাও কমে আসে। সেক্ষেত্রে গুলতেকিন বা শমী কায়সার নিশ্চয়ই শুধুমাত্র সেক্সুয়্যাল কারণে বিয়ে করেননি! দিনশেষে নিজের একটা মানুষ লাগে। আজকে মনটা ভালো নেই বলার মতো, বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে এক কাপ চা খাওয়ার মতো সঙ্গী দরকার। যে মানুষটা থাকে আমার জন্য। যার জন্য ঘরে ফিরবার ইচ্ছে হয়। ঘরটাকে সংসার মনে হয়।

কারো দ্বিতীয় তৃতীয় বিয়ে শুনলে তেড়ে আসা মানুষের চাইতে আধুনিক এবং বাস্তব চিন্তার অধিকারী নাটোরে সেই শতবর্ষী বৃদ্ধ। যিনি ১০৫ বছরে বিয়ে করেছেন ৮০ বছরের কনেকে। ধন্যবাদ ওই বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার সন্তানদের যারা উৎসবমুখর পরিবেশে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন করেছে। আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত শহুরে সমাজও কিন্তু বাবা-মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে সহজে মানতে পারেনা। বিধবা মা কিংবা বিপত্নীক বাবা’র বিয়ে প্রায় অসম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভাড়াটে খুনী দিয়ে খুন করানোর ঘটনাও এলো পত্রিকার পাতায়।

বিয়ের জন্য জীবন না, জীবনের জন্যই বিয়ে। বিয়ে টিকিয়ে রাখতে পরে পরে মার খেয়ে আফরোজাদের মতো লাশ হয়ে প্রাপ্তির খাতায় কিছু সমবেদনা হয়তো জোটে। তবে লাশের কাছে কারো কান্নাতেও লাশের কিছু যায়-আসে না। বিয়ে চিরকাল টিকবে এমন গ্যারান্টি যেমন নেই তেমনি বিয়ে ভাঙা মাত্রই আবার বিয়ে করতে হবে এমন কথাও কোথাও বলা নেই। বাবা/ভাইয়ের সংসারে বোঝা হবার ভয়ে কারো দাসী হওয়াটাও কোন ভালো সমাধান হতে পারে না কখনোই। নিজের বোঝা নিজেই বহন করার সামর্থ্য অর্জন জরুরি।

মানুষ সামাজিক প্রাণী তার পক্ষে একা বাস করা কঠিন। একলা থাকাটা অনেক বড় যোগ্যতা যা সবার থাকে না। সুতরাং মানুষ সঙ্গী চায়। পোড় খাওয়া মানুষ মানসিক দিক থেকে যেমন শক্ত হয় তেমনি কেউ কেউ আরও দুর্বল হয়ে পরে। দুর্বল হলেই ভুলভাল সিদ্ধান্ত নেয়, যা আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়। একলা বলেই কাউকে দরকার এমন না হয়ে হওয়া উচিত তোমাকে দরকার বলেই একলা আছি। অন্যে কী বলবে বলে নয়, নিজে মন থেকে চাইলেই কেবল বিয়ে, তার আগে নয়।

]]>
https://womenchapter.com/views/36234/feed 0
ধর্ষণের প্রতিকার: প্রতিবাদের সাথে চাই কঠিন প্রতিরোধ https://womenchapter.com/views/36230 https://womenchapter.com/views/36230#respond Sat, 24 Oct 2020 21:48:01 +0000 https://womenchapter.com/?p=36230 মুশফিকা লাইজু:

ধর্ষণ একটি মামুলি ব্যাপার, এই সংস্কৃতি কত বছর আগে বাঙালির সামাজিক মগজে ঢুকে গেছে? ৫০০ বছর? ১০০০ বছর? না তারও বেশি, কিংবা আরো বেশি সময় ধরে। অধ:স্তনকে পীড়ন করা যেনো একটি অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সমাজে অবস্থানগত দিক থেকে নারীর চেয়ে আর সহজলভ্য কেউ নেই পীড়ন কিংবা নিপীড়ন করবার। একটি গরুর চেয়েও নারী মূল্যহীন, সে কথা প্রাচীন প্রবাদ, জারি-সারি, প্রচলিত গল্প এবং রুপকথা বিশ্লেষণে আমরা পেয়ে যাই। ‘ভাগ্যবানের বউ মরে অভাগার মরে গরু”, ‘বউ গেলে বউ পাওয়া যাবে, ভাই গেলে ভাই পাওয়া যাবে না’, আবার ‘ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন, যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ’। আরও আরও হাজারও শ্লোক বা উপকথা ছড়ানো আছে নারীকে অধঃস্তন ভাবার এবং করার।

অর্থাৎ মনুষ্য জগতে বুদ্ধিমান দুটি প্রজাতির মধ্যে একের উপর অন্যের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যে খুবই জরুরি ছিল, পুরুষতান্ত্রিকরা সেকথা সভ্যতা বিকাশের খানিক পরেই বুঝতে পেরেছিল। মূল্যহীন সেবা, স্বার্থহীন ত্যাগ এ জগতে নারীরা ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারে! তাই যত জিঘাংসা-প্রতিহিংসা-নৃশংসতা এবং নির্যাতন সবই নারীর উপরে করা যায়। এটা যেন বিধির বিধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কপট মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করতে যুগে যুগে পুরুষেরা ধর্মে আশ্রয় নিয়েছে। নারীর মাতৃত্বের সুযোগ নিয়েছে। সেইসাথে করেছে শক্তির অপপ্রয়োগ। রচনা করেছে সামাজিক বিধান নামাংকিত নির্বাক ঈশ্বরের। পুরুষ তার নিজের প্রয়োজনে সম্মান-সম্ভ্রমের বিলি-বণ্টন করেছে। পুরুষতন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে নারীর জীবনের বাঁকে বাঁকে। নারীর যোনীর একটি সামাজিক বাজার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর এই বাজারের নিয়ন্ত্রণ পুরুষ নিজের হাতেই রেখেছে। যাতে সমান বুদ্ধিসম্পন্ন একদল প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জাগতিক ভোগবিলাসকল্পে উপভোগ করা যায়। সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেছে, এই আদেশ ঐখান থেকে প্রাপ্ত হয়েছে, অতএব তোমাকে মানতে হবে। নারী মেনে নিয়েছে। কখনও বিদ্রোহ করেছে, কখনও পুড়ে মরেছে।
প্রাকৃতিকভাবেই যারা সৃষ্টি করে তারা সহনশীল স্থির প্রজ্ঞাবান এবং মহাত্মা। যেমন ভূমি, বৃক্ষ, পাহাড়। নারীও সৃষ্টিশীল- তাই জগতে একমাত্র নারীই মহাত্মা।

বলতে চাই ধর্ষণ নিয়ে, নারীর যোনী আর দশটা অঙ্গের মতো একটি অঙ্গ সেখানে সম্মানকে প্রোথিত করেছে সেই স্বার্থান্ধ পুরুষ, যা শুধুমাত্র নারীকে ঘায়েল করার উপাত্ত মাত্র। অথচ একই কর্মে যুক্ত পুরুষের লিঙ্গের সাথে কিন্তু সম্মান-সম্ভ্রম যুক্ত নয়। পুরুষের এই অঙ্গটি যেন বারোয়ারী। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভারতীয় উপমহাদেশে উন্মুক্ত রাস্তায় প্রস্রাব করা এবং পশ্চিমাদেশে কোন নির্দ্দিষ্ট একটি ঘরে দরোজাহীন সারি সারি টয়লেট তৈরি করা এবং ব্যবহার করা।

কথা বলতে চাই ধর্ষণ নিয়ে। এ বিষয়ে অনেক লিখেছি, আরও লিখবো। হয়তো লিখতে লিখতে উত্যক্ত করে ছাড়বো এই সমাজ ব্যবস্থাকে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন জোয়ারের জলের মতো বাড়ছে ধর্ষণের মতো সহিংস ঘটনা। হাজারও ঘটনার মধ্যে দু’একটি চলে আসে প্রচার নিষেধের প্রাচীরের ফাঁকফোকর দিয়ে। আমরা কাঁদি, চিৎকার করি, প্রতিবাদ করি, অত:পর ক্লান্ত-বিষন্ন হয়ে থেমে যাই। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ঘেরাটোপে পড়ে ফিরে যেতে হয় ঘরে। এবারের বিষয়টি একটু ব্যতিক্রম। রাষ্ট্রের কাছে প্রতিকার চেয়েছিলাম, ধর্ষকের জন্য যেনে রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়। তো রাষ্ট্রতো এতো নিলর্জ্জ হতে পারে না। আমাদের আপামর জনগণের দাবিটা রেখেছে। কিন্তু সেই দাবি মেনে নেয়ার মাঝেই যে সবচেয়ে বড় শুভংকরের ফাঁকিটা লুকানো আছে, তা আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারবো।

বাংলাদেশের সমসাময়িককালে যতগুলি মহাগুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় চলছে ধর্ষণ তার মধ্যে প্রথম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিদিন প্রতিটা প্রহরে গণমাধ্যম ধর্ষণের খবরকে উপজীব্য করে তাদের ধর্ষকপ্রিয়তাকে তুঙ্গে উঠিয়ে ফেলেছে। সেখানে অনেক আলোচনা, অনেক ভালোচনা আমরা শুনতে পাই, দেখতেও পাই। তবে প্রতিকারের নির্দেশনা খুবই কম, আলোচনা হয় নাই বললেই চলে। কখনও কখনও দেখা যায়, একজন চিহ্নিত যৌননিপীড়ক বা ধর্ষকই আবার ধর্ষণ নিরোধের আলোচনা করেছে। ধর্ষণের চলমান এই উৎসবের সময় অনেক প্রতিবাদ হয়েছে, রাষ্ট্রের কাছে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে, রাষ্ট্র মোটাদাগে আইনও পাশ করেছে। কিন্তু প্রতিরোধের কোনো ডাক কেউ তেমনভাবে দেয়নি। প্রতিকার হিসেবে অনেকেই ভেবেছে, পারিবারিক শিক্ষা, প্রাইমারির শিক্ষার সাথে নৈতিক ও লিঙ্গ-বৈষম্যহীন শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নসহ আরও অনেক কার্যকরি পরামর্শ উঠে এসেছে। যদিও জানি প্রতিকারের পথটা অনেকখানিই বিলম্বিত। এর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। তবে কঠিন প্রতিরোধ কিন্তু সম্ভব মুহূর্তেই।

যে এলাকায় ধর্ষণ সংঘটিত হয় সেই এলাকার এবং আশেপাশে সামাজিক মানুষজন যদি সামাজিকভাবে ঐ ধর্ষককে বয়কট করে, যেমন কোনো পরিবার তার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবে না, কোনো দোকানদার তার কাছে কোনো পণ্য বিক্রয় বা ক্রয় করবে না, কোনো এলাকার যানবাহন তাকে বহন করবে না, কোনো ডাক্তার তার চিকিৎসা করবে না (মানবিক প্রয়োজনে চিকিৎসার দরকার হলে স্থানীয় থানার বা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি লাগবে) কোনো দর্জি তার পোষাক বানাবে না, কোনো সেলুন তার ক্ষৌরকর্ম করবে না, কোনো আইনজীবী তার হয়ে মামলা লড়বে না, ধর্ষণের তো নয়ই, অন্য মামলাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। কোনো ব্যাংক তার হিসাব পরিচালনা করবে না। যদি আগে ব্যাংক একাউন্ট থেকে থাকে তবে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার সাথে সাথে তা বন্ধ করে দেবে, তার জমানো টাকা ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুকে প্রদান করা হবে। অন্যথায় সরকারি কোষাগারে জমা হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা সনদ বাতিল করা হবে। তার পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্র বাতিল করা হবে। সে কোনোদিন ভোটাধিকার পাবে না। দেশের প্রতিটি থানায় ধর্ষকের জন্য আলাদা বোর্ড তৈরি হবে যেখানে তার ছবি টানানো থাকবে কমপক্ষে ১২ বছর এবং লেখা থাকবে সে মানবতাবিরোধী একজন ধর্ষক।

আমি নিশ্চিত রাষ্ট্র এবং সমাজ যদি এভাবে ধর্ষণের ঘটনাগুলি প্রতিরোধ করা শুরু করে তবে অতি অল্পসময়ে বাংলাদেশে ধষর্ণের প্রতিকার করা সম্ভব। আমি এও জানি সরকার বা সমাজ এত সাধুসন্ত নয় যে, সত্যিকারেই ধর্ষণের প্রতিকার চেয়ে প্রতিরোধের কঠিন বলয় গড়ে তুলবে। কারণ এদেশে ধর্ষণ যে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ সেই ধারণাই নেই, আর জনগণ সেটা বিশ্বাসও করে না। অথচ ধর্ষককে রক্ষা করাই যেনো আমাদের সুশীল সমাজের সংস্কৃতি। প্রতিরোধহীন সমাজ প্রতিকারহীন বিচার ব্যবস্থা এবং বিচারহীন সংস্কৃতি বাংলাদেশকে ধর্ষনের মহাযজ্ঞে পরিণত করেছে।

]]>
https://womenchapter.com/views/36230/feed 0
আত্মপলব্ধি https://womenchapter.com/views/36227 https://womenchapter.com/views/36227#respond Sat, 24 Oct 2020 16:09:31 +0000 https://womenchapter.com/?p=36227 ফাহমিদা খানম:

আজকে নিয়ে তৃতীয়বারের মতো আমি নীতুর গায়ে হাত তুললেও কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না, বরং মনে হচ্ছে অকৃতজ্ঞ নারীকে যদি আমি মনের সুখে আচ্ছামতো পিটাইতে পারতাম মনের জ্বালা কিছুটা হলেও কমতো, ওকে ভালো রাখতে গিয়ে কতো কী ছেড়েছি, তবুও মনের লাগাম ধরতে পারলাম আর কই? বাইরে আড্ডা দেওয়া, বন্ধু-বান্ধব সবই ছেড়েছি তবুও –

“টেবিলে খাবার দিয়েছি, খেতে এসো”
নীতুর এই নির্বিকার ভাবটাই আমার সবচে বেশি অসহ্য লাগে, ফর্সা গালে আঙ্গুলের দাগ বসে আছে, তবুও সে কেন কিছুই বলবে না? এতো তেজ, দেমাগ কীসের? হ্যাঁ, সে রূপসী আর সেই সাথে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার মেয়ে – আগে মুগ্ধ হলেও এখন অসহ্যকর লাগে, কেনো কাঁদবে না? কেনো অনুনয় করবে না? এই নির্লিপ্ত ভাবই আমার এখন অসহ্য মনে হয়।

“আমার খিদে নেই, তুমি খেয়ে নাও গিয়ে”
“তুমিতো খিদে সহ্য করতে পারো না, আমি তো জানি”
“এতোই যখন বুঝো, তখন আমার কথামতোন কেনো চলো না? কেনো বন্ধুবান্ধবদের ছাড়তে পারছো না? আমি কি ছাড়িনি?”
“আমি তোমাকে অসংখ্যবার বুঝানোর চেষ্টা করে এখন ক্লান্ত আশিক, ওরা আমার শুধুই বন্ধু—অথচ তুমি অহেতুক সন্দেহ করো সবসময়ই”
“আমাকে ভালবাসলে এই ছাড়টুকু তুমি নিশ্চয় দিতে”
“শুধু তোমার ভাললাগাটুকুর প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমি যে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়েছি এটা কি তুমি বোঝো ?”
“আমি কি তোমার জন্যে কিছুই করিনি?”
“যদি বলি সেসব নিজের স্বার্থেই করেছ?”

কথাটি বলেই নীতু রুম থেকে বেরিয়ে গেলো, আমিও ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় টেবিলে পানি খেতে গিয়ে দেখি নীতু ডাইনিং টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছে – হয়তো আমার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে, দিনে সময় হয় না বলে রাতে একসাথেই খাই আর খাবার সময় নীতু সবসময়ই পাশে থাকে, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে খারাপ লাগলো, তারপরেই মনে হলো এই মেয়েটা না চাইতেই আমি কত কী করি, তবুও অকৃতজ্ঞই রয়ে গেলো!

নীতুর কথা – আশিক আমার গায়ে হাত তুললেও আমি ওকে ছেড়ে যাবার কথা কখনো কল্পনাই করতে পারি না, কারণ আমার যাওয়ার জায়গা আসলে নেই।

একই পাড়ায় আমাদের বাসা ছিলো –ওর সংগ্রাম আমরা নিজেরাই দেখেছি, শুনেছি এক্সিডেন্টে ওর বাবা যখন মারা যায় তখন ওরা খুবই ছোট ছিল, একটু বড় হবার পর ওর মামারা এক রকম জোর করেই ওর মাকে আবারও বিয়ে দেন কারণ আশিকের দাদীর সাথে মায়ের ঝগড়া লেগেই থাকতো আর বিয়ের পর উনি যতবার বাচ্চাদেরকে দেখতে বাসায় আসতেন ওর দাদী গেটই খুলতো না, কিন্তু বাসা থেকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন, ছেলের মৃত্যুর জন্যে উনাকে দায়ী করতেন, রাস্তার পাশে বসে উনি কাঁদছেন এই দৃশ্য দেখে পাড়ার মুরুব্বীরা কয়েকবার এগিয়ে গেলেও দরজা কখনই খুলতো না, এই দৃশ্য সবার এক সময় সয়ে গেলেও সেই মা তবুও আসতেন – তারপর একদিন সেই আসাটা কমে গেলো। দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন করার পর আশিক মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে পাড়ি জমায়, আস্তে আস্তে ওদের ভাগ্য বদলালেও দাদী মারা যাবার পর আশিক দেশে আসা কমিয়ে দেয়, ততদিনে ছোট ভাই বিয়ে করে সংসার শুরু করলেও আশিকের যে বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে এটা বলার মতোন আসলে কেউ ছিলো না –

আমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না হলেও হুট করে বাবার মৃত্যুতে আমরা অথৈ সাগরে পড়লাম, বাবার মৃত্যুর দুই মাস পর দেশে ফিরে আশিক বিয়ের প্রস্তাব দিলেও আমি একদমই রাজি ছিলাম না কারণ আমার চাইতে বয়সে অনেক বড় আর সত্যি বলতে কী আশিককে আমার ভয় লাগতো কেনো লাগতো সেটা আগে না বুঝলেও এখন বেশ বুঝি – অনার্স পড়া অবস্থায়ই আমার ওর সাথে বিয়ে হয়ে যায়, পারিপার্শ্বিকতা চিন্তা করে আমিও রাজি হয়েছিলাম।

বিয়ের পর নিজের বাসায় রাখলেও যাবার আগে আমাকে মায়ের কাছে রেখে আসে
“আমি যত দ্রুত সম্ভব তোমাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবো, ততদিন তুমি এখানেই থাকো, তোমাদের দায়িত্ব এখন আমার”
আশিক কথা রেখেছিল – ভালো অংকের টাকাই পাঠাতো কিন্তু কখনো সেসবের হিসাব চায়নি, বরং আমার ছোট তিন ভাইবোনদের পড়ালেখার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস ছিলো, আমি আবিষ্কার করলাম আমার পড়ার প্রতি ওর অনীহা আর কারও সাথে কথা বলাও পছন্দ করছে না, পরের বছর ফিরেই বাচ্চা নেবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠলো, আমার আপত্তিতে বলেই বসলো—

আমি নাকি ওর সংসার করবো না সেজন্যে বাচ্চা নিতে চাই না, পেটে বাচ্চা নিয়ে অনার্স দেবার পর আমার কাগজ-পত্র রেডি হয়ে গেলো, মায়ের ইচ্ছা ছিলো বাচ্চা হবার পর আমি যাতে যাই, কিন্তু সে নিজে এসে আমাকে নিয়ে গেলো। ও কখনো রান্নায় খুঁত ধরে না, কোনো কিছু নিয়ে কিচ্ছু বলে না, শুয়ে থাকলে নিজেই রান্না করে অথবা চা খাইতে মন চাইলে নিজেই বানিয়ে খায়, দোকান থেকে একগাদা জিনিস নিয়ে আসে অথচ সেসবে যে আমার আগ্রহ নেই এটাও বুঝে না –
“এসব জিনিস এনে টাকা নষ্ট করো কেন? গহনা বা কসমেটিক্সের প্রতি আমার মোহ নেই”
“অন্য মেয়েরা এসব পেলেই খুশী হয়, তুমি যেনো কেমন নীতু!”
“আমি ঘুরতে পছন্দ করি, আড্ডা দিতে পছন্দ করি”।

প্রথমে বাচ্চা ছোট ছিলো বলে তেমন বেরুতে পারতাম না, তবুও ওর কলিগদের বা বন্ধুদের বাসায় দাওয়াতে যেতাম বা আমাদের বাসায় কেউ না কেউ আসতোই কিন্তু প্রথম থেকেই আবিষ্কার করলাম কেউ আমার প্রশংসা করলে আশিকের চেহারায় একটা বিরক্তি ভাব চলে আসতো, এক বন্ধু হেসে বলেছিল –
“তুই দেখি হাঁটুর বয়সী মেয়ে বিয়ে করেছিস!”

ব্যস, সামান্য ছুতো ধরে সেই বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে দিলো। এভাবে ওর বন্ধুদের সাথে নিজেই দূরত্ব করলো – প্রথমে না বুঝলেও এক সময়ে বুঝে যাই আশিক আসলে হীনমন্যতায় ভুগছে, দুজনের বয়স, গায়ের রঙ আর উচ্চতা নিয়ে কেউ কিছু বললেই ওর রিএক্ট দেখাতো খুব – প্রথমে অনেক বুঝিয়েছি তারপর অনুনয় করতাম কোনো কাজই হয়নি বরং দাওয়াতে যাওয়া বা বাসায় দাওয়াত দেওয়া চুকিয়ে দিয়েছে, অথচ বুঝতেই চায়নি একা বিদেশে এভাবে থাকা যায় না, তারপর দেশে ফিরে আবার চেষ্টা করে ইতালি চলে এলো আমাকে নিয়ে, আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হলো না আর! স্বামী বা বাবা হিসাবে আশিক দায়িত্বশীল – ছুটির দিনে বাসার কাজে সাহায্য করে, আমার পরিবারের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্ববান শুধু আমার সাথেই সম্পর্কটা সহজ আর হলো না, রাজা-প্রজার মতোই শুধু চাপিয়ে দেয়া –

“তিন বছরের বেশি হয়ে গেলো, আমি বাবুকে নিয়ে একটু দেশে ঘুরতে যেতে চাই”
“আমি ছুটির জন্যে দরখাস্ত করবো, কিছুদিন সময় লাগবেই”
“আমি না হয় বাবুকে নিয়ে যাই তুমি পরে এসো”।

আশিক এমনভাবে তাকালো যেনো এমন উদ্ভট কথা সে জীবনেও শুনেনি, হ্যাঁ আমাকে একা এখন পর্যন্ত কোথাও যেতে দেয় না, এখানে এসে জব করতে চেয়েছিলাম – অনুমতি মেলেনি। দেশে বেড়াতে গেলেও কোথাও একা বেরুতে পারি না, সে সাথে থাকবেই! সবাই দেখে আর ভাবে, আশিক কতো কেয়ারিং টাইপ, অথচ আমি জানি, অনুভব করি এটা রোমান্টিকতা নাহ,  এটার চিকিৎসা দরকার, কিন্তু এটা বললেই ও প্রচণ্ডরকম রেগে যায়– অশ্রাব্য ভাষায় গালি-গালাজ করে, আমার মনে পড়ে গেটের বাইরে ওর মা যখন দুই বাচ্চাকে দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতো, ভেতর থেকে এমনই গালিগালাজ সবাই শুনতাম। সবকিছু ছাপিয়ে যখন ভালবাসা হিংস্র হয়ে উঠে তখন দমবন্ধ হয় আসে, হাঁসফাঁস লাগে, অথচ মুক্তির পথটাও ঠিক জানা থাকে না, তখন ভুক্তভোগীই জানে সে ভালবাসা কতটা অসহনীয়!

]]>
https://womenchapter.com/views/36227/feed 0
ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব https://womenchapter.com/views/36224 https://womenchapter.com/views/36224#respond Sat, 24 Oct 2020 11:56:23 +0000 https://womenchapter.com/?p=36224 তাছলিমা আক্তার:

মনস্তত্ত্ব বা মনোজগত যাই বলি না কেন বিজ্ঞানের ভাষায় আচরণকেই বোঝায়। প্রতিটি মানুষের আচরণ তৈরি হওয়ার সময় তার শৈশব। শিশুর বিকাশ বলতে শারীরিক, ভাষা, চিন্তাভাবনা এবং মানসিক পরিবর্তনের ক্রমকে বোঝায় যা জন্ম থেকে যৌবনের শুরু পর্যন্ত ঘটে। কিন্তু শূন্য থেকে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ব্যক্তিত্ব গঠনের মূল অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়। এসময়টাতে বাবা-মা পরিবারের সদস্য এবং পারিপার্শ্বিকতা অনেকটা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অনেকগুলো প্রভাবক কাজ করে যার মধ্যে রয়েছে জেনেটিক কিছু বিষয়, পরিবেশ, পাশাপশি শিশুর শেখার ক্ষমতা।

গত সাতদিনের বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রতিদিনে গড়ে ৫টি ঘটনা চোখে পড়ছিল ধর্ষণের। যখন মোটামুটি সব শ্রেণীর প্রতিবাদে উত্তাল দেশ। এতো প্রতিবাদ, আইনে পরির্তনের উদ্যোগ সবকিছু মিলিয়ে ঘটনার নিম্নগামিতার কোন চিত্র আমার নজরে আসেনি। সমাধানের পথ হয়তো অজানা। ওপরের কথাগুলো এই অজানা পথকে খুঁজে নেয়ার প্রয়াস মাত্র।

প্রথমে এটি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন যে ধর্ষণ কোন আচরণমূলক বা মানসিক ব্যাধি নয়। এটি একটি অপরাধ এবং ফৌজদারী অপরাধ। মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি ধর্ষক হতে পারে, কিন্তু এটা প্রমাণিত যে এমন কোন ব্যাধি নাই যা মানুষকে ধর্ষকে রুপান্তর করে।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধে বাস করছে বিষাক্ত পৌরুষ। রাজনৈতিক ও সামাজিক এই ব্যাধি একদিনের তৈরি নয়। যুগ যুগের চর্চায় সমাজ কাঠামো, সংস্কুতির চর্চা আর ধর্মীয় লেবাসে জিইয়ে রাখা হয়েছে এই বিষ। ভাবার কোন অবকাশ নেই আমি আপনি এ থেকে মুক্ত। ধারণ, লালন, চর্চা বা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থনের মাধ্যমে এই বিষাক্ত পৌরুষের বেঁচে থাকা। নিজেকে প্রগতিশীলতার প্রলেপে উপস্থাপন করে প্রতিক্রিয়াশীলতার সূক্ষ আচরণ ক্ষমতা এবং বৈষম্যপূর্ণ সম্পর্ককে স্থায়ীত্বশীল করে।

২০২০ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা জরিপে বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া এক তথ্য অনুযায়ী ৩৫ ভাগ নারী যৌন সহিংসতার শিকার। জাতিসংঘ বলছে ৭০ ভাগ নারী তার জীবদ্দশায় শারীরিক এবং যৌন সহিয়সতার শিকার হন তার সহযোগীর মাধ্যমে। ক্ষমা করবেন ‘সহযোগী’ শব্দটির ব্যবহারে ত্রুটির কারণে।

ওটারবেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নর্ম শপ্যান্সার ২০১৪ সালে সাইকোলজি টুডে নিবন্ধে কেন পুরুষরা ধর্ষণ করে তার বিবর্তনমূলক মনোবিজ্ঞানের কারণগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শপ্যান্সার-এর মতে ‘পুরুষ শারীরিকভাবে শক্তিশালী মনে করে: অতএব সে মনে করে সে ধর্ষণ করতে পারে’। যদিও খুব সূক্ষভাবে জীনগত কিছু বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে এখানে।

ধর্ষণকারী নারীকে যৌন সামগ্রী হিসেবে দেখে। তারা মনে করে নারী মাত্রই সে পুরুষের যৌন চাহিদা মেটাবে। যেকোন ধর্ষণের ঘটনা বেদনাদায়ক এবং যে নারী এই সহিংসতার শিকার হয় তার মানসিক অবস্থা ভয়াবহ পরিণতির দিকে যায়। সহিংসতার শিকার নারী কোন ক্ষেত্রে স্ব-ঘৃণা, স্ব-দোষ, ক্রোধের কারণে অনেক সময় পোস্ট ট্রমাটিক সিনড্রোমে পরিণত হয় (পিটিএসডি)। আমরা কি কখনো ধর্ষক সম্পর্কে ভেবেছি? একজন ধর্ষক তৈরিতে সমাজের কোন কোন কারণগুরো ভূমিকা পালন করে? একজন ধর্ষক সামজের যেকোনো শ্রেণী, পেশা এবং স্তরের হয়।

আমেরিকার সাইকোলজিস্ট ডঃ স্যামুয়েল স্মিথম্যান ৫০ জন ধর্ষকের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন যারা স্বীকার করেছিলেন যে তারা জীবনের কোন না কোন সময়ে ধর্ষণ করেছিলেন। এরা ছিল বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড, সামাজিক স্ট্যাটাস এবং বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের। ডঃ স্যামুয়েলকে অবাক করেছিল যে এ ধরনের ফৌজদারী অপরাধ করার পরও তারা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিলেন। ৫০ জন ধর্ষকের সাক্ষাতকার থেকে তিনি তাদের ব্যক্তিত্বের তিনটি বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন: সহানুভূতির অনুপস্থিতি, মাদকতা এবং নারীর প্রতি বৈরী মনোভাব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনিস রাজ্যের সাউথ ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের গবেষক শেরি হামবির মতে, ‘যৌন নিপীড়ন যৌন তৃপ্তি বা যৌন আগ্রহ থেকে প্রভাবশালী একধরনের মানসিকতা কাজ করে বা প্রভাব প্রতিপত্তির প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। যাকে তিনি একধরনের বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র বা পুরুষালী আচরণের বহি:প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন’

আমেরিকার সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের জার্নাল সাইকোলজি অফ ভায়োলেন্সের প্রতিষ্ঠাতা হামবি ব্যাখ্যা করেছিলেন কী করে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র ধর্ষণ সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়। তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নকারী অনেক পুরুষই মনে করেন সমবয়সীদের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো উচ্চতর যৌন অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং নিজের পুরুষত্ব প্রমাণ করা। যৌন সক্রিয়তা না থাকা প্রায়শ কলঙ্কজনক তাদের জন্য। অনেকে আতঙ্কে থাকেন যৌন অভিজ্ঞতা আবিস্কার না করার কারণে। তার মতে, এধরনের পিয়ার চাপ থেকে পুরুষ যৌন আপরাধী হয়ে উঠে। এছাড়াও সমাজ কাঠামো, সংস্কৃতি এবং মিডিয়ার বিভিন্ন পরিবেশনাও পুরুষকে পুরুষতন্ত্রের নকল আবরণে আবৃত করে তাকে নারীর উপর অধিপত্য বিস্তারে অনুপ্রাণিত করে। যাদের নারীর উপর আধিপত্য নেই বা অধিক যৌন সক্রিয়তা নেই তাদের কলঙ্কিত পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করে’।

প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধ উত্তম। আমার চাই না একটি ঘটনাও। প্রতিরোধে সোচ্চার হই প্রতিটি আঙিনা থেকে। গাছের ফলো উৎপাটনের পাশাপাশি মূল উৎপাটনে এগিয়ে আসি সবাই। আমার শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠনে আমার ভূমিকা হোক অগ্রগামী।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী এবং ডেপুটি ম্যানেজার- উইমেন রাইটস এন্ড জেন্ডার ইক্যুইটি, এ্যাকশনএইড বাংলাদেশ

]]>
https://womenchapter.com/views/36224/feed 0
ধর্ষণ মামলা ও আমাদের গতানুগতিক চিন্তাভাবনা https://womenchapter.com/views/36217 https://womenchapter.com/views/36217#respond Fri, 23 Oct 2020 20:51:52 +0000 https://womenchapter.com/?p=36217 রিতু জাহান:

জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত বাংলাদেশ। সেদেশে আইনের প্রয়োগ ও তা মানার ক্ষেত্রে অনীহাও সর্বত্র বিরাজমান। যারা মানে তাদের সংখ্যা তাই যেনো খুব নগণ্য। সামাজিক উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হচ্ছে সমাজে আইন ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত পুলিশ বাহিনী। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এদেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা অনেক কম। এদের প্রশিক্ষণ সুবিধা অপ্রতুল, আধুনিকায়ন সুযোগ সুবিধা এমনকি বাসস্থানের কোনো নিরাপদবেষ্টিত পুলিশ কোয়ার্টার নেই। তাই আরও ভালো, আরও ভালো কাজের আশা করাটা অনেকটা কষ্টসাধ্য বটে৷  অনেকক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে তদন্ত কর্মকর্তা পারিবারিক নিরাপত্তার কথাও ভেবে থাকে, এতে করে মামলা পরিচালনা ব্যাহত হয়।

কখনও কখনও আমরা দেখি চেকপোস্ট নামক জায়গাগুলোতে জনগণের তীব্র আপত্তি। মনোভাবটা তখন এমন যে তার চৌদ্দপুরুষের মানসম্মান সব ধুলোতে মিশে গেলো।

হ্যাঁ, এ ক্ষেত্রে আপনি জনগণ হিসেবে যেটা করতে পারেন তা হলো আপনি কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে সে সময় কাছে রাখার দাবি রাখতে পারেন৷
আমরা দেখি পাবলিক প্লেসে তল্লাশির সময় তারা স্পষ্টই পুলিশকে গালি দিতে থাকেন। একটা জিনিস মনে রাখা উচিৎ, তিনি পুলিশ হলেও রক্তে মাংসে মানুষ। আপনার এই গালিটা, উচ্চবাচ্য শব্দটা সে সহ্য করতে নাও পারে।

স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত অপরাধ বিষয়বস্তুগুলো সামনে আনলে দেখা যাবে, সামগ্রিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা ও অপরাধ পরিস্থিতি অবনতির দিকেই যাচ্ছে। অপরাধ বৃদ্ধির প্রবণতা এ দেশের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তারা প্রায়শই তাদের জীবনে হুমকি অনুভব করছে। যুব সম্প্রদায় কর্তৃক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে খতিয়ান ও অপরাধের কলরবকে যথেষ্ট বৃদ্ধি করেছে। হেরোইন, মদ মোবাইল ফোনের পর্ণ ইত্যাদিতে আসক্ত শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়৷

অপরাধ একটি স্বাধীন সত্তা ও আপেক্ষিক ধারণা।
দণ্ডবিধানে যেসব কাজের শাস্তির বিধান রয়েছে সেগুলোকে রাষ্ট্রের জন্য অনিষ্টকর আখ্যায়িত করা হয়। কেননা ঐ কাজগুলো অসামাজিক ও নৈতিকতাবিহীন। কিন্তু দণ্ডবিধির প্রণেতাগণ স্বীকার করেন যে রীতিনীতি বহির্ভূত অসামাজিক ও নৈতিকতা বিরোধী সকল কাজকে উক্ত বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বহু নীতি সম্বন্ধীয় কাজ আছে যা দণ্ডবিধিবলে শাস্তিযোগ্য নয় অথচ দণ্ডবিধির অপরাধের চেয়েও নিকৃষ্ট।
যেমন একজন দরিদ্র ব্যক্তি যদি অনাহার সহ্য করতে না পেরে কোনো ধনী ব্যক্তির বাড়ি থেকে ভাত কেড়ে নিয়ে খায় দণ্ডবিধিতে তাকে চুরির অপরাধে তাকে শাস্তি দেবার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে অনাহারক্লিষ্ট ব্যক্তিকে যদি কোনো ধনি ব্যক্তি অন্ন-বস্ত্র দিয়ে সাহায্য না করে তাহলে দণ্ডবিধি দ্বারা উক্ত ধনী ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারে না। যদিও আপাতদৃষ্টিতে দরিদ্র ব্যক্তি উক্ত চুরির চেয়ে ধনী ব্যক্তি কতৃক উল্লেখিত কাজ নিকৃষ্টতম।
যা তিন চারদিন আগে আমার এক বন্ধুর পোস্টে পেলাম হারুন রশীদ এর শাসনামলের একটা গল্পের উদাহরণ।

কে অপরাধী বা কাকে অপরাধী বলা যায়?
এক বন্ধুর পোস্টে আমি এমন একটা মন্তব্য লিখেছিলাম।
আসলে এক কথায় হিসেব করে দেখলাম এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া বাস্তবিকই কঠিন।
আপাতদৃষ্টিতে যে অপরাধ করে সে অপরাধী।
‘টারডের’ মতে অপরাধীরা সমাজের নিকৃষ্টতম পদার্থ স্বরূপ।
আদালত শুধুমাত্র যাদের দণ্ড দিয়েছেন শুধুমাত্র তারাই কি অপরাধী?
মনে হয় না। যদিও আইন বলে রায় না হওয়া পর্যন্ত বা অপরাধীর অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী বলা দণ্ডনীয় অপরাধের মধ্যে পড়ে।

বলা হয়ে থাকে সমাজ যতোদিন থাকবে ততোদিন সমাজে অপরাধ থাকবে। অপরাধ আচরনের কারণ অনুসন্ধান বিষয়ক গবেষণার এক সময় সিজার লম্ব্রোসো ও তার সুযোগ্য ছাত্র এনরিকো, ফেরি জন্মগত অপরাধীতত্ত্ব আবিষ্কার করেন।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের এক ব্যাপক কাজ। একে মোটামুটি দুটি অংশে ভাগ করা যায়। তা হলো নিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ ও অপরাধ অন্ববেক্ষণ।

একজন মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রথমত একটা মামলার প্রথম বিচারকর্তা হিসেবে আমরা ধরতে পারি।
লতানো ফলধরা যে সমস্ত গাছ আর সে গাছ কেমন করে বেড়ে উঠবে তা নির্ভর করে মালীর উপর তেমনি মামলার অগ্রগতির ব্যপারটাও নির্ভর করে সে পুলিশ কর্মকর্তার মামলা তদারকির উপর৷ তাই বলা যায় প্রথমত চার্জশিট এবং ফাইনাল রিপোর্টের ব্যাপারে জবাবদিহিতার বন্দোবস্ত থাকা উচিৎ সে কর্মকর্তার।

এজন্য দরকার সেনসেটিভ মামলাগুলো সঠিক হস্তান্তর সঠিক কর্মকর্তার কাছে। দরকার এ বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা এবং সর্বপ্রাচীন শক্ত মনোবল। যেনো কোনো অপশক্তি তার মেরুদণ্ডকে ভাঙতে না পারে।
ধর্ষণ ও খুনের মামলায় একবার অভিযোগনামা দাখিল হলে তার তদন্তের ভার কোনো কর্মকর্তার উপর পড়লে তাকে হওয়া উচিৎ নিরপেক্ষ। সে হবে তখন মামলার বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষের।
ধর্ষণ এবং খুনের মামলায় আপোষ নামক শব্দের কোনো যায়গা নেই এটা তাকে আগে মানতে হবে।
ভিকটিমকে সর্বোচ্চ সেবাটুকু দেবার প্রত্যায় থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে মৃতের হয়ে আপোষ করার অধিকার কারো নেই। এমনকি জন্মদাত্রী মায়েরও না।
যেটা বলছিলাম, অপরাধ অন্বেষণের মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করা, মামলা সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতার করা, বিচারে সোপার্দ করা, কোর্টে বিচার কার্যে মামলা সঠিকভাবে পরিচালনা করা। এসব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত হলে অপরাধী শাস্তি পাবে।

দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো দেশে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। মোটামুটি সব ধরনের অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। সেই তুলনায় দেখা যায় বাংলাদেশে চুরি, ডাকাতি, খুন এ জাতীয় অপরাধের চাইতে নারী ও শিশু নির্যাতনের অপরাধের হার তথ্য বিবরণীমতে অনেক বেশি। তার প্রধান কারণ, আইন প্রণেতাদের আইন প্রণয়নে কঠিন শাস্তির বিধান ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনের বিধানে আইনের ফাঁক থাকায় এক শ্রেণীর মানুষ এই আইনকে তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যার প্রেক্ষিতে তথ্য বিবরণীতে নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধ হঠাৎ করেই বেশি বৃদ্ধি পায়। আর এ সকল মামলা রুজু থেকে শুরু করে তদন্তকারী সংস্থা, তদন্তকারী কর্মকর্তা, তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা, কোর্ট পুলিশের কার্যক্রম, পাবলিক প্রসিকিউটরের কার্যক্রম প্রতিক্ষেত্রে দুর্বলতা থেকে যায়। রুজুকৃত মামলার সঠিক তদন্ত থেকে শুরু করে সুষ্ঠু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না।

জনবহুল বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলাগুলোর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়ার জন্য মামলার জট একটা বড় কারণ। মামলা জট বলতে, বিচারক ও তদন্তকর্মকর্তার সংখ্যা কম অভিযোগনামা বেশি। আর এ মামলা জোটগুলো কেনো হয় তা আমাদের ভাবনার বিষয়। কারণ, প্রকৃতঅর্থে ধর্ষণের শিকার ভিকটিম ন্যায়বিচার পাক এটা আমাদের কাম্য ও একমাত্র চাওয়া এখন।
প্রকৃত জোরপূর্বক ধর্ষণ মামলাগুলো তদন্তে প্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায় ফুঁসলিয়ে (১৮ বছের উর্ধ্বে) ধর্ষণ মামলাগুলো। ফুঁসলানো শব্দটা আর জোরপূর্বক শব্দটার মাঝে ব্যাপক পার্থক্য এটা আমাদের মানতে হবে।

আমরা দেখতে পাই অনেক সময় একজন পূর্ণ বয়স্ক মহিলা নিজের দুর্বলতায় একটা দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজ কার্যসিদ্ধি হওয়ার একটা আশা রাখে। কিন্তু কোনো কারনে সে স্বার্থে আঘাত পড়লে বা সামাজিকভাবে ধরা পড়লে সে এ আইনের আশ্রয় নেয়। ফুঁসলিয়ে নামক ধর্ষণের অভিযোগ আনে। সে নিজের সম্মান বাঁচাতে মামলার আশ্রয় নেয়। সাধারণত ফুঁসলিয়ে ধর্ষণের অভিযোগটা আমরা দেখি সমাজে নামকরা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির উপরেই বেশি আসে।

আমরা দেখি ধারা অনুযায়ী জোরপূর্বক ধর্ষণ এবং ফুঁসলিয়ে! এ দুইটা ঘটনায় মামলার রুজু ধারা কিন্তু একই। ধারাটা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ (১)। আমি ফুঁসলিয়ে ধর্ষণ মামলাগুলোকে ভ্যাজাল মামলা বলি। ধর্ষণের ক্রাইম ক্লাসিফিকেশন নিয়ে সবাই একটু দ্বিধান্বিত। তাই নৈতিকতার বিবেচনায় ফুসলানো ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিটির পক্ষেই যাবে। কারণ, এখানে ভিকটিম তার দুর্বলতা মেটাতে নিজ ইচ্ছায় একটা সম্পর্কে জড়ায়। সে ক্ষেত্রে এমন সব মামলায় আমরা অর্থনৈতিক আপোষ দেখি বেশি। তো এখানে দেখা যায় ভ্যাজাল মামলার ভিড়ে প্রকৃত মামলা দুর্বল হয়ে যায়। এমনক্ষেত্রে এখন আমাদের মামলার ধারা নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। কারণ ফুঁসলিয়ে ধর্ষণ মামলার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত ধর্ষণ মামলাগুলো। যেটা খুব ক্ষতি হচ্ছে আমাদের।
কারণ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২০ এ রিপোর্টেড রেইপ ইন্সিডেন্ট ৯৭৫ টি (গড়ে ৩.৬) এবং ধর্ষণের প্রচেষ্টা ২০৪ টি (গড়ে ০.৭৫)।
আশংকাজনক কথা হলো সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্থ ভিকটিমদের বয়স ১৮ বছরের নিচে ;
১. ৪০% রেইপ ভিকটিম ( ২৮% এর বয়স ৭-১৮)।
২. ৪৩% ধর্ষণের প্রচেষ্টার শিকার ।
৩. ২১ জনের লাশ পাওয়া গেছে ( ৪৮% সর্বোচ্চ সিংগেল এইজ গ্রুপে)
৪. সুইসাইড করেছে ৭ জন (৫৮% সর্বোচ্চ সিংগেল এইজ গ্রুপে (১-৯ বছর বয়সি))
আর তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার উচিৎ জোরপূর্বক ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সে ঘটনার স্থান, ভিকটিমের জবান বন্দী, ভিকটিমের কাপড়, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা।

ভিকটিমকে সাহস দেয়ার জন্য কাউন্সিল এর ব্যবস্থা করা। অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, আইনের জটিলতা, কোর্টে বিচারকাজ বিলম্বিত হবার কারণে ভিকটিম মামলা থেকে সরে আসে, নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে আপোষে চলে যায়।
মামলা পরিচালনার জন্য নমুনা সংগ্রহ এবং তা সংরক্ষণের জন্য কোর্ট মালখানা এক বিরাট ভূমিকা রাখে। কোর্ট মালখানায় জব্দকৃত মালামাল সংরক্ষণ করার জন্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।

বাংলাদেশে কোর্ট মালখানাগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। পর্যাপ্ত পরিমাণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা নেই বললেই চলে। ইঁদুর কেটে সাবাড় করে ম্যাক্সিমাম নমুনা। তাই কতৃপক্ষের উচিৎ এদিকে সদয় দৃষ্টি দেয়া। যাই হোক, এমন সব নাজুক মামলার জব্দ কৃত নমুনা সংগ্রহের জন্য আলাদা আলাদা বক্স ট্যাগ সিস্টেম করে রাখা উচিৎ। যেনো মামলার ডেট বাই ডেটে তা কোর্টে উপস্থাপন করতে সুষ্ঠু বিচারকার্যে তদন্ত কর্মকর্তার বেগ পেতে না হয়।

বর্তমানে আমরা নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পদ রক্ষার চেয়ে নিজ সন্তানদের রক্ষা করার চিন্তায় অস্থির।
বাংলাদেশে ক্রিমিনালদের প্রোফাইলিং যা করা হয় তা অপ্রতুল। (আমাদের সেই লেভেলের সাইক্রিয়াটিস্ট ক্রিমিনোলোজিস্ট আছে কিনা সন্দেহ) তাই আমরা শিউর না আমাদের চারপাশে আসলে কোন ধরনের অপরাধী ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে অপরাধীরা ক্রিমানাল সাইকোলজির কোন ক্যাটাগরিতে পড়ছে। তবে আমাদেন দেশে ভিকটিমদের বয়স এবং আর্থ সামাজিক অবস্থা দেখে অনুমান করা যায় যে-
১. বর্বর সেক্সুয়াল এক্ট থেকে যৌন উত্তেজনা পেয়ে থাকে এমন কিছু সংখ্যক অপরাধী।
২. সুবিধাবাদী (যারা খুব সহজেই ভিকটিমের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পায়) এবং যারা বেশ এক্সপেরিয়েন্সড এবং এগ্রেসিভ ভাবেই যৌন চাহিদা মেটায়।
আমরা যেহেতু পরিপূর্ণভাবে ধর্ষকদের আর্থ সামাজিক এবং বয়স ভিত্তিক ডাটা পাচ্ছি না তাই ধর্ষক চিহ্নিত ও ধর্ষনের কারণ সঠিকভাবে ধারনা করা কঠিন।

তাই-
এইটার উত্তর আসবে যদি খুব নিবিড় ভাবে একটা Qualitative Research করা যায়, যেখানে কথা বলতে হবে ধর্ষকদের সাথে, ধর্ষকদের সাপর্টারদের সাথে( অনলাইন ফ্যান যারা বলে রেইপ খারাপ কিন্তু নারীদের অশালীন পোশাক দায়ী…….), অনলাইন এক্টিভিটি যাচাই বাছাই করলেও আমরা দেখি নারীর প্রতি এদের বিদ্বেষী মনোভাব। এতে আমারা বিভিন্ন বয়সের এবং আর্থ সামাজিক অবস্থার পুরুষদের দেখতে পাই। তা থেকে যে মনোভাব বোঝা যাবে তাতেই অনেকখানি প্রোফাইলিং করা সম্ভব। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলাতে Criminology নামের একটা বিভাগ আছে, যাদের কাজ এই টাইপের গবেষণা করা, কিন্তু আমরা এখন পড়াশুনা নামক গবেষণা থেকে এতোটাই বিমুখ যে আমাদের সঠিক তথ্য উপাত্তের উপর গবেষণা করা লাগে না। মৌখিক গতানুগতিক একটা ধারণা সেঁটে দিয়ে বসে থাকি।

আমরা অনলাইন এক্টিভিটি থেকে দেখতে পাই বিশাল এক জনগোষ্ঠী নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর পোশাককে দায়ী করছে। নারীর শালীনতার দিকে আঙ্গুল তুলছে। আমরা নারী এবং পুরুষদেরকে একে অন্যর মুখোমুখী করে দিয়েছি। এজন্য নারী আন্দোলনকারী সংস্থা কম দায়ী নয়। একটা ঘটনায় ঢালাওভাবে গোটা পুরুষজাতীকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবার মানসিকতা আমাদের পাল্টানো উচিৎ এটা আমরা ভেবেই যেন দেখছি না।

সাধারণ গড় করলে দেখা যায় গণধর্ষণগুলোতে আসামী হয় একেবারে নিম্নশ্রেণীর মানুষ। যারা ফেসবুক এক্টিভিটি সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। তারা পড়েও না এমন সব পুরুষবিদ্বেষী লেখা। এতে করে আমরা কী করছি? উল্টো তরুণ সমাজকে দোষারোপ করে তাদের নারীবিদ্বেষী করে তুলছি।
আর তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেনো দেখিয়ে দিচ্ছি, এখন নারী মানেই অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী এবং ক্ষমতার রদবদলের কাণ্ডারি। ফলে সামাজিকভাবে একটা পাওয়ার ইমব্যালান্স এসেছে এবং নারীর বিনয়ী বা বাধ্য রুপের বদলে বহির্গামী অর্থাৎ সংসার ও তার প্রফেশন রুপটা ভালোভাবে নিচ্ছে না বিশাল একটা তরুণ সমাজ। এটাও একটা বড় কারণ হতে পারে সাম্প্রতিক rape incident and violence aganist women এর পিছনে।

তার মানে দাঁড়ালো বিশাল এক তরুণ সমাজকে আমরা নারীর বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি। সেক্ষেত্রে আমরা তথাকথিত শিক্ষিত তরুণ সমাজে এগ্রেসিভ ধর্ষণ বেশি দেখতে পাচ্ছি।

একজন আইন কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য বিভাগ পরিবারেরই সদস্য হিসেবে এমন সব মামলায় আমি যেটা দেখতে পাই এদের সবার ফোনে পর্ণভিডিও ক্লিপ এর পাশাপাশি ধর্মীয় ওয়াজের ভিডিওক্লিপ সমপরিমাণে থাকে। ধর্মের বিকৃত ব্যাখায় তারা যেনো দিকবিদিকশুন্য।

এখন আমাদের ভাবতে হবে কী করে খুব দ্রুত এক একটি ধর্ষণ মামলা সঠিকভাবে নিষ্পত্তি হতে পারে৷ প্রথমত ভাগ করে ফেলতে হবে ফুঁসলিয়ে নামক ধর্ষণ মামলাগুলো, আর তার ধারা নিয়েও চিন্তা করার সময় এসেছে। অনেক সময় ভিকটিম তার পরিধেয় কাপড় না বুঝে ধুয়ে ফেলে বা নিজেও ধর্ষণের আলামত নষ্ট করে ফেলে৷ এক্ষেত্রে উচিৎ যিনি ধর্ষণের শিকার তার সেসব আলামত সংরক্ষণ করা। আর এ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনমূলক আলোচনাটা জরুরি বলে আমি মনে করি।

অন্যদিকে যেহেতু নারী ও শিশু নির্যাতন দণ্ডবিধি ৩৭৬ ধারাকে কেন্দ্র করেই বা ৩৭৬ ধারার কলেবর বৃদ্ধি করে একটি বিশেষ আইন তথা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি হয়েছে সেই সাথে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যাুনাল তৈরি হয়েছে কিন্তু মাঝে থেকে এই ধরনের অপরাধ তদন্তের জন্য স্পেশালাইজড কোসো সংস্থা গঠন করা হয়নি। যে স্পেশালাইজড সংস্থায় খুব দক্ষ তদন্তকারী কর্মকর্তা, মনোবিজ্ঞানে দক্ষ পরামর্শক, ডাক্তার, প্রভৃতি বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। তাহলেই হয়তো প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনায় প্রকৃত ধর্ষকের সাজার মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার নারীটি ন্যায়বিচার পাবে।

আসুন সচেতন হই, সুন্দর জীবন গড়ি সুন্দর দেশ গড়ি।

]]>
https://womenchapter.com/views/36217/feed 0