রোজ নামচা- ২৫

Leena Haq
লীনা হাসিনা হক

লীনা হাসিনা হক: অফিসের কাজে প্রায় একমাসের জন্য দেশের বাইরে থাকতে হবে, পুরোটা অক্টোবর। তিরিশ দিনের অনুপস্থিতিতে যাতে আমার জগতের – ঘরে এবং অফিসে কারও অসুবিধা না হয় তার জন্য প্রায় ষাট দিনের কাজ করে রেখে যেতে হচ্ছে।

সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে অফিস নামের খাঁচাটায় ঢুকি, কিন্তু বের হওয়ার সময় বাঁধা নাই। আজকে এই রিপোর্টে কমেন্ট করো, তো কালকে প্রজেক্ট প্রপোজালের উপরে ফিডব্যাক দাও তো, পরশুদিন হেড অফিসের নুতন ডিরেক্টরের জন্য বাংলাদেশের প্রোগ্রামের উপরে প্রেজেন্টেশন বানাও, আমার অনুপস্থিতিতে রিজিওনাল বস আসবেন, তাঁর ভিজিট প্ল্যান ফাইনাল করো, তাঁর মিটিং অ্যাপয়েন্টমেন্টস ফাইনাল করো, তাঁর টকিং নোটস তৈরি করো।

এদিকে উত্তরাঞ্চলে বন্যায় ভেসে গেছে আমাদের প্রকল্প এলাকা- মানুষের কষ্টের সীমা নাই। সেখানে মানুষকে সাহায্য করার দ্রুত ব্যবস্থা নাও, এরই মধ্যে নিজের নিয়মিত কাজ তো আছেই। মিটিংগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে যাতে কোনও ধরনের পেমেন্ট আটকে না থাকে তার জন্য গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমি শুধু চেক সাইন করে যাচ্ছি! এদিকে চলছে অডিট গোদের উপরে বিষফোঁড়া! ফাইন্যান্স অফিসার তো আমার রুমেই ঘাঁটি গেড়েছে! এতো গেলো অফিসিয়াল অফিস!

এখানেই শেষ নয়,  হেড অফিসের কিছু কাছের সহকর্মীর বায়না আছে, আসছোই যখন, তোমার তো আর ৪০ কেজি ওজনের পুরোটা লাগবে না, আমাদের জন্য মশলা আর চা নিয়ে এসো। অফিস থেকেও কিছু কাগজপত্র মোটামুটি দশাসই এক কার্টুনে ভরে দিয়েছে!

হোম ফ্রন্টের প্রস্তুতিও কিছু কম নয়। সাহেরা এই বড় এক লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে-লিস্ট দেখে আমার চোখ কপালে, চাল-ডাল-মসলা থেকে শুরু করে কাপড় কাচার গুড়ো সাবান বা বাথরুম পরিষ্কার করার হারপিক, কি নাই সেখানে! এমনকি সে আমাকে দিয়ে মাছ-মাংসও কিনিয়ে রাখছে!

বললাম, ও সাহেরা, আগামী একমাসে কি ঢাকা শহরে বাজার-সদাই কিছু পাওয়া যাবে না? ‘পাওয়া গেলেই বা আফা, তোমরা গুলা সগ করি রাখি যান, আমরা কেবল আন্ধিমু ( রাঁধবো) আর খাইমু’! উত্তর শুনে বাক্যিহারা আমি!

এদিকে আবার ঈদের হাওয়া লেগেছে। ঈদ বখসিশের লিস্টও বেশ বড় সড়- বাড়ীর গার্ড, কেয়ারটেকার, পেপারহকার, ময়লা নেয় ছেলেটা, বিল্ডিঙের সিঁড়ি মোছা মেয়েটা- সবার চাই বখশিশ। নিজের গাড়ীর চালক – হোক সে ক্রিশ্চিয়ান, তাকেই বা বঞ্চিত করি কেন?

কন্যার ঈদের জামা বানাতে দেয়া হয়েছে, এখনো দর্জিবাড়ীতে আছে, সে আরেক টেনশন, দিবে তো ঈদের আগে? আমি যে ছাই ঈদের আগের দিনই উড়াল দিচ্ছি। সব ঠিক করে রেখে না গেলে কেমনে হবে!

আরও আছে, বরাবর মায়ের কাছেই কোরবানির টাকা পাঠিয়ে দেই, যদিও আমি নিজে কোরবানি দেয়ার পক্ষপাতী নই, কিন্তু তাতে কি! আমার মতন বেকুফ নাদানের কথার মধ্যে কিই-ই বা যুক্তি! আর ধর্মীয় আজ্ঞা পালন না করার অজুহাত খুঁজি বলে মা মনে কষ্ট পান। অতএব আমাকেও দিতে হয় কোরবানি আমার ভাইয়ের সাথে একসাথে।

স্বস্তি একটাই, নিজের চোখে দেখি না, নিজেকে করতেও হয় না কিছু। আমার মায়ের বিশাল পোষ্য বাহিনীই সব করে। এইবার মা’র শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, বলেছিলাম গ্রামের বাড়ীতে কোরবানি দিতে, তাতে মায়ের কষ্ট কমবে। মায়ের পরামর্শ শুনে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে হলো- গ্রামের বাড়ীতে কোরবানি দিতে চাইলে কোনও সমস্যা নাই, কিন্তু তাহলে দুটোই দিতে হবে। কারণ শহরের বাড়ীতে মার কাছে যারা কাজ করে তারা ছাড়াও মাছঅলা, সবজীঅলা, দুধঅলা, ড্রেন পরিষ্কার করে যেই লোকটি, মিস্ত্রি, পাড়ার  রিকশাওলা- আরও বিশাল লিস্টের মানুষজন নাকি সারা বছর ধরে এই কোরবানির জন্য প্রত্যাশা করে! হায়রে, আমিও একটা মানুষ আর আমার উপরেও অজানা মানুষের প্রত্যাশা আছে! একটু চাপই ফিল করলাম।

বন্ধুরা বলছে, এতো দীর্ঘ সময়ের জন্য যাওয়ার কি দরকার! কেউ বলল, আমি কি করবো রে তোকে ছাড়া! কারো জন্য ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায় আমি না থাকলে! আসলেই কি তাই! একটু দোলাচলে পড়ি যেন!

এতো সব করে, নিজের দিকে আর নজর দেয়ার সময় কই। স্যুটকেস গোছাতে চেষ্টা করে দেখি নিজের বুট জোড়া খুঁজে পাচ্ছি না, আছেই একজোড়া, লাগে বছরে একবার! প্রতিবার ফিরে এসে এমন যত্ন করে তুলে রাখি যে এবার আর খুঁজেই পাচ্ছি না! অক্টোবরে কোপেনহেগেনে বৃষ্টি প্যাঁচপ্যাঁচে, একটু উঁচু বদ্ধ জুতো ছাড়া মুশকিল। ওখানে তো ঘর থেকে বের হলেই গাড়ী থাকে সা, হয় হাঁটা, ট্রেন অথবা সাইকেল। নুতন জুতো কিনতে হলে সর্বঅর্থেই সর্বনাশ!

কোনওরকমে প্রয়োজনীয় কাপড়জামা একত্র করেছি, শুক্কুরবারে গোছাবো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক সব ঝামেলা ঠিক-ঠাক মিটাতে পেরেছি। প্রায় পুরো একদিন সময় পাবো নিজের জন্য। সাধারণত আমি যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত দৌড়ের উপরে থাকি।

সকালে আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়েছি, সাহেরা এসে বসলো খাটের পাশে, কি ব্যাপার? কিছু বেশী টাকা যেন তাকে দিয়ে যাই, ঈদের সময়, আমিও থাকবো না, কোনও দরকার হলে সে কার কাছে চাইবে? মুহূর্তের জন্য মনে হল, আচ্ছা, এই যে আমার ধারে-কাছের মানুষেরা আমার উপরে ভরসা করে, এটাও তো জীবনের একটা বড় পাওয়া!

অনেক সময়ই নিজের জন্য ভরসার জায়গা খুঁজি, নাই যে একদম তাতো নয়, কিন্তু কেমন এক ধরনের চাপা আফসোস মনের ভিতরে থেকে যায়। আজ মনে হলো এটা নিয়ে বেদনাবোধ করার কিছু নাই, বরং আমার উপরে মানুষ ভরসা করে, আমি না থাকলে কারো খালি খালি লাগে- এই আনন্দবোধ সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যেন। (চলবে)

লেখক: উন্নয়নকর্মী

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.