সৃষ্টিলোকের রহস্যময়তায় সুরের সনজীদা

মাসকাওয়াথ আহসান:

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সাংস্কৃতিককালে সমাজের আমরা বনাম ওরা দিয়ে বিভাজিত করা হয়েছে; আমরা এর বাইরে এক উদার আনন্দময় স্বপ্নদায়ী ঢাকা শহরে বেড়ে উঠেছিলাম। ফলে ঢাকার সংস্কৃতি পাড়াটা ছিলো স্নেহের আঁচল। যেখানে সনজীদা খাতুন আমাদের খরগোশ জীবনে একটা যতি চিহ্ন এঁকে দিয়ে বলতেন, এসো শ্যামলও সুন্দরও।
রবীন্দ্রনাথ সারাবিশ্ব ঘুরে এমন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সমাজ পরখ করে দেখেছিলেন, আমাদের শিষ্টাচারে একটু কমতি আছে। শান্তি নিকেতন আসলে আদব শেখার জায়গা ছিলো। ভালো ভালো বই পুস্তক তো যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই পড়া যায়। কিন্তু বই পুস্তক পাঠ করে সেই শিক্ষাটা যাপিত জীবনে চর্চার শিক্ষাটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিতে চেয়েছিলেন।

সেই যে কবি মির্জা গালিব যখন কলকাতায় কবিতা পাঠ করতে এসেছিলেন; তখন তার বিনয় ও শিষ্টাচারে মুগ্ধ হয়েছিলেন কলকাতার শিল্পরসিকেরা। সেই থেকে কলকাতা ও লক্ষ্ণৌর কবিদের শিষ্টাচারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
সনজীদা খাতুন শান্তি নিকেতনের উজ্জ্বল ছাত্রী ছিলেন। তিনি ছায়ানট গড়েছেন শিষ্টাচারের মোমের আলোয়। ছাত্রজীবনে সনজীদা খাতুনের মেয়ে রুচিরা আপা ও তার স্বামী মানজারে হাসিন মুরাদের সঙ্গে ধানমন্ডিতে দেখা হতো। রুচিরা আপা ছিলেন ঢাকায় আমার স্থানীয় অভিভাবক হলিক্রসের শিক্ষক শারমীন আপামণির বন্ধু। লাবাম্বার সামনে তারা আড্ডা দিতেন। রুচিরা আপা ও মুরাদ ভাইয়ের স্নিগ্ধ কথোপকথন শুনে টের পেতাম; রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করলে মানুষ কতটা বিনয়ী হতে পারে।

আমার আব্বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র ছিলেন। সেখানে তার যে বন্ধুবৃত্ত ছিলো; সেখানে শান্তি নিকেতন থেকে গ্রাজুয়েশন করা ছাত্রেরা ছিলো। ফলে আব্বার মুখে শান্তি নিকেতনের সুনাম শুনে বড় হয়েছি। বিতর্ক চর্চার কারণে কন্ঠস্বরে অতোটা শিষ্টাচার ধরে রাখতে না পারলেও; বিনয় ধরে রাখতে সম্যক চেষ্টা করি।

সনজীদা খাতুন ৯১ বছরের একটি সফল জীবন যাপন করে অনন্তের পথে পাড়ি জমালে এইসব বিচূর্নীভাবনা আসছিলো। বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, ছায়ানট আসলে ছিলো শিষ্টাচার ও বিনয় শিক্ষার এক নানন্দিক পাঠশালা। রুটিন জীবনের বাইরে একটু সংগীত চর্চা, সুররসিক হলে মানুষের চিন্তাগুলো গুছিয়ে আসে। সনজীদা খাতুন যুগের পর যুগ মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।

রবীন্দ্র সংগীত চর্চাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান উপনিবেশের শাসকেরা বিধিনিষেধ আরোপ করলে সনজীদা খাতুন সংগীত মুক্তির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। সাংস্কৃতিক আন্দোলন কী করে একটি দেশকে মুক্তির গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে; বাংলাদেশ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সিভিল সার্ভিসে ঢোকার পর জাতীয় বেতার ভবনে পোস্টিং হলে সনজীদা খাতুনের সঙ্গে দেখা হওয়াটা নিয়মিত হয়। সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং-এর মানুষ তিনি। একদিন অনুযোগ করলেন, এই যে এতো ছাত্রী গান শেখে কিন্তু রেডিওতে অডিশন খুবই অনিয়মিত হওয়ায় তারা রেডিওতে গাইতে পারেনা। সেসময় সংগীত বিভাগে দুলাল ভাই, শামীম আপার মতো সংগীত রসিক মানুষ ছিলেন। সুতরাং আমরা ওয়াক ইন অডিশনের ঘোষণা দিলাম। সংগীত জগতের ভেতরটাকে শিল্পীদের মাঝে অল্প একটু খুনসুঁটি কাজ করে; একে আমি চাইল্ড লাইকই বলবো; ওটুকু হার্মলেস জেলাসি সংগীত প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয়।
এই অডিশনে আমার ছোট্ট একটা আইডিয়া ছিলো। তিনতলায় শিল্পী গান গাইবে; তার একটি নম্বর থাকবে। বিচারক শুধু শিল্পীর নম্বর দেখে; কন্ঠস্বর শুনে নম্বর দেবেন। অভাবনীয় ফলাফল এলো। ছায়ানটের সাধক ছাত্র-ছাত্রীরা বিপুল সংখ্যায় কৃতকার্য হলো। কারণ তাদের ধ্যান জ্ঞান তো সংগীত। সনজীদা খাতুন একদিন বাসায় ডাকলেন। অনেক গল্প হলো। উনি বললেন, আমি তো মনে করতাম আমলাতন্ত্রের কাজই বাগড়া দেয়া; তোমার কাজ-কর্ম দেখে মনে হলো; ব্যাপারটা সবক্ষেত্রে এমন নয়। সেদিন আলাপে বুঝলাম, রবীন্দ্র সংগীত চর্চা করলেও হিন্দুস্থানী ক্লাসিক্যাল ও ঊর্দু গজল পছন্দ করেন তিনি। জাতশিল্পী তিনি; উদারপন্থার মানুষ। সংকীর্ণ কোন চিন্তার অচলায়তনে কখনো বন্দী ছিলেন না।

লাইভ টিভিতে একদিন ভোরে রমনার বটমূল বোমার আঘাতে ধোয়া ধূসর হলে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন চোখ এসে পড়তে দেখলাম হারমোনিয়ামের ওপর। স্বাধীন দেশে সুরের বিরুদ্ধে এমন অসুর থাকতে পারে তা কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। সেই থেকে সনজীদা খাতুন, সংকোচের বিহবলতা নিজেরে অপমান প্রতিজ্ঞা নিয়ে সংগীতের লড়াই করেছেন। এরপর অবশ্য বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কোন আমলেই এমন ঘটনা ঘটেনি। ফেসবুকে যখন থেকে ছায়ানটের ফেসবুক লাইভ শুরু হয়েছে, আমি নিয়মিত দেখি। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজমের কালে সংগীতে সংগীতে ছায়ানটের প্রতিবাদ জারী ছিলো। ৫ অগাস্টের পর নৈরাজ্যে বিষণ্ণ ছায়ানট আবার জেগে ওঠার গান করেছে। ইউরোপ, আরব বিশ্ব, দক্ষিণ এশিয়ায় শিল্পীরা ঠিকই তাদের সুরের মাঝ দিয়ে অসুরের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।

ছায়ানটের সঙ্গে শান্তি নিকেতনের যে সম্পর্ক তা সুরের বন্ধুত্ব। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিজগত তো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ জুড়ে। আমির খসরু কিংবা গালিবের সৃষ্টিজগত যেমন ভারত-পাকিস্তান জুড়ে। শিল্পীরা তস্কর রাজনীতিবিদ ও সামরিক শক্তির বিভাজন রেখায় আটকে থাকেন না; তাদের পরোয়াও করেন না। সুরের কোন ভূগোল থাকে না।

সনজীদা সেই অখণ্ড পৃথিবীর মানুষ। শ্রেণী স্বার্থের ছ’আনা-পাঁচ আনার দলাদলির জগতের সঙ্গে তার কোন যোগাযোগ ছিলো না। জগতে আনন্দযজ্ঞে তিনি সবাইকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সবাইকে সুরের আপ্যায়ন করে তারপর সুরের সাম্পানে ভেসে চলে গেছেন সৃষ্টিলোকের রহস্যময়তায়।

 

লেখক পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন: