ডা. কামদাপ্রসাদ, আপনি বিবেক বেচে দিয়েছেন

ইশরাত জাহান ঊর্মি: একজন আমাকে বলেছিলেন, অনলাইনে অনেক কিছু দেখবেন, সবকিছু মাথায় নেবেন না। আমি সবকিছু মাথায় নিই না। হজম শক্তি ভালো আমার। সবকিছু মাথায় নিলে, মেয়ের গালে চুমু খাওয়া যায় না, সবকিছু মাথায় নিলে লেবু দিয়ে মেখে গরম ভাত আর ডালের স্বাদ নেওয়া যায় না, সবকিছু মাথায় নিলে সামনের মাসে বেতন পেয়েই যে শাড়ীটা কিনবো বলে ঠিক করে রেখেছি, সেটা আর কিনতে ইচ্ছা করবে না।

বুকে উড়ে বিতৃণষার মাছি। আমি আর আমরা সব মাথায় নিই না।

Urmi
ইশরাত জাহান ঊর্মি

কিন্তু কুমিল্লার সেনানিবাসে যে মেয়েটির লাশ পাওয়া গিয়েছিল, সেই সোহাগী জাহান তনু তো অনলাইন বা ফেসবুক থেকে উঠে আসেনি। রাজধানী থেকে দুঘন্টার দূরত্বের এক শহরের সবচেয়ে সুরক্ষিত বলয়ে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, খুন হয়েছে। আমরা বিচার চেয়েছি।

আরও অনেক অনেক হত্যা আর ধর্ষণের মতো এই বিচারের জন্যও আমরা, আমাদের সতীর্থরা রাস্তায় নেমেছি। বিচার কবে হবে, কীভাবে হবে, আদৌ হবে কীনা আমরা জানতাম না, কিন্তু আমাদের, সব পক্ষ-বিপক্ষের মনে হয়েছিল, এই অন্যায়ের বিচারটা হওয়া দরকার। কেন মনে হয়েছিল সে অনেক কথা।

প্রায় আড়াই মাস পর তনুর ময়নাতদন্ত হয়েছে দ্বিতীবারের মতো। কী অদ্ভুত সব কথাবার্তা তাতে! ধর্ষণ হয় নাই, ইন্টারকোর্স হয়েছে। ডাক্তার কামদাপ্রসাদ সাহা নামের ভদ্রলোকটি আসলে কী বলতে চাইছেন, তনু কারও সাথে ইচ্ছে করে সেক্সুয়াল রিলেশনে গেছিলো, আর তারপরই তাকে খুন করা হয়েছিল?

আমি জানি না, কুমিল্লায় সাংবাদিকরা ভদ্রলোককে এই প্রশ্ন করেছে কীনা, সরাসরি বলুন জনাব, তনু কি সেক্স করেছিল কারো সাথে স্ব-ইচ্ছায়? আমি হলে এ প্রশ্ন করতাম। দেখতাম, ডা. কামদা প্রসাদের চোখের তারা মুহূর্তের জন্যও কাঁপে কীনা মিথ্যা বলতে গিয়ে! বা মিথ্যা বলার জন্য তার ঘাড়ের ওপর কারও (ক্ষমতার) তলোয়ার ধরা থাকলেও তা ফুটে উঠার কথা গলার স্বরে, অথবা দৃষ্টিতে। আমি তা খেয়াল করতাম।

আমরা এখনও বলছি, আগেও বলেছি, নারীর সম্ভ্রম তার যোনিতে নয়। কিন্তু আমাদের চোখ ঠাহরিয়ে তাকানো সমাজ, মেয়েদের দেখলেই লোলটানা সমাজ, মেয়েদেরকে যেকোনো উপায়ে সেক্স অবজেক্ট ভাবা সমাজ-সে সমাজ কি বগল বাজানোর উপাদান পেয়ে গেল না এই রিপোর্টের মধ্য দিয়ে?

Shohagiতনুর লাশ উদ্ধারের পরপরই সব আলামত নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল ‘ওপরের নির্দেশে’। তো, পচা-গলা মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করে এখন বের হলো যে, ধর্ষণ হয় নাই?

এটা মিথ্যা, সর্বৈবভাবে মিথ্যা। ডাহা মিথ্যা কথা, মিথ্যা রিপোর্ট। ডাক্তার বাবু, আপনি কেন এই মিথ্যার আশ্রয়টা নিচ্ছেন? নিজেকে বাঁচাতে? চাকরি রক্ষা করতে?

“আমার প্রেমিক আমাকে চেনে, আমার নিজের প্রেমিক, কিন্তু সে-ও যদি ডাস্টবিনের পাশে আমার যোনিতে আঙুল রাখতে চাইতো, আমি তাকে চড় লাগাতাম। কোনো মেয়ে ওই পরিস্থিতিতে সম্মতি দ্যায় না দিতে পারে না। “

কদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভাসির্টিতে সাঁতারু ব্রুক টার্নারের ধর্ষণের শিকার মেয়েটি এই বিবৃতি দিয়েছিল কোর্টে। ইন্টারকোর্স কারে বলে আর কারে ধর্ষণ এখন নতুন করে শিখতে হবে জাতিকে।

বেশ, তনু ধর্ষণের শিকার হয় নাই। “ইন্টারকোর্স” হয়েছিল বা করেছিল সে। ডাক্তার বাবু, আপনি মনে হয় নতুন লেখক, নতুন গল্প লিখছেন বা লিখতে বাধ্য হয়েছেন কোনো ভয়ে, সিআইডি আর পুলিশে যখন তদন্ত করছিল, তখনও তো তনুর বাবা-মাকে শুনতে হয়েছে, “মেয়ে নাচ গান করতো? কার কার সাথে প্রেম ছিল? বিয়ে দ্যান নাই ক্যান?

“হায় নারী! একটাই জীবন, তুমি পারো না নিজের মতো যাপন করতে”…

কিন্তু সে যাই হোক,  খুন তো হয়েছে তনু। নাকি তাও হয়নি? যদি হয়ই, সেই খুনের বিচারটা তো আমরা চাইতে পারি। ধর্ষণ বললে যদি সেনসোটাইজ করা হয়, ঠিক আছে, করলাম না, খুনের বিচার করেন। জীবনের পরতে পরতে থাকা ভাঁজগুলো খোলার আগেই একটা ১৯ বছরের মেয়ে মরে গেছে, তার বিচার করেন।

আমরা খুনের বিচার চাই। বিচার হয় না বলে বিচার চাইবো না, এতো বড় অভিমানী আমরা না কিন্তু!

আর কামদাপ্রসাদ, আবারও বলছি, আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনি বিবেক আর ঋজুতা বেচে দিয়েছেন রাজনীতির পাঁকে। যদি তা সামান্যও  থেকে থাকে, আপনি কোনদিন আর শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন না, পারবেন না সন্তানের মাথায় হাত রাখতে, পারবেন না স্ত্রীর চোখের দিকে তাকাতে। অথবা আপনি ভয় পেয়েছিলেন, আপনাকে ভয় দেখানো হয়েছিল। আপনি একজন চিকিৎসক হিসেবে সেই ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন নাই।

আর যারা ভয় দেখাচ্ছেন তাদের বলি, এতো ভয় প্লিজ দেখাবেন না যাতে ভয়ের সকল আগল ভেঙে যায়। ভয়ের আগল ভাঙলে কী হয়, আপনারা দ্যাখেন নাই নব্বই-এ? ছায়া সরকার, দিন কিন্তু আসবেই। আজ বা কাল।  

শেয়ার করুন:

এখানে অপরাধ ছিল দুইটা , এক ধর্ষন , দুই হত্যা্‌, ধর্ষন যখন নিজের ইচ্ছায় সেক্স করায় পৌছে যায়, তখন আর আমাদের চুপ থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকেনা , তো বাকি থাকল হত্যা… সেটা তাহলে আত্বহত্যা ছিল …যাক জবাবদিহীতা থেকে মুক্ত হয়ে গেল আমাদের বিবেক…