কতবার বলবো যে যৌনকর্মিরও ‘না’ বলার অধিকার আছে!

দিনা ফেরদৌস:

আমাদের সমাজে বিভিন্ন পেশার লোকজন আছেন। কে কোন পেশা বেছে নেবেন তা নিজের যোগ্যতা ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। বড় ব্যবসায়ী / চাকুরিজীবী থেকে শুরু করে রাস্তার ঝাড়ুদার পর্যন্ত আমাদের প্রয়োজন আছে। তেমনি আমাদের সমাজে লাইসেন্সধারী বহু যৌনকর্মিও আছেন। তারাও আমাদের সমাজের অংশ। তাদেরকে আমরা ঘৃণার চোখে দেখলেও আমাদের সমাজের নম্র, ভদ্র, শিক্ষিত/অশিক্ষিত/জ্ঞানী/মূর্খ (বাপ, ভাই, ছেলে, চাচা, মামা, ফুফা, খালু, দাদা, নানারা) রাতের আঁধারে কেউ না কেউ তাদের কাছে যান বলেই তারা এই ব্যবসা সফলভাবে যুগের পর যুগ ধরে করে যাচ্ছেন।

এই যে আমরা সাহস করে রাস্তায় বের হই, আবার সুস্থভাবে যারা বাসায় ফিরি, ওই যৌনকর্মিরা আমাদের ‘ক্ষুধার্ত’ স্বজনদের ক্ষুধা মিটান বলেই আমরা এখনও নিরাপদে আছি। তারা জানেন, তাদের চোখ কাউকে ছাড় দেয় না। তাই তারা নিজের মা, বোন, মেয়ে, স্ত্রী সবাইকে আলখাল্লা পরে চলতে বলেন, কারণ আলখাল্লা ছাড়া নারী দেখলে ভুলেই যান কার সাথে কী সম্পর্ক আছে! এরা বড় বড় কথা বললেও বোরকা পরা নুসরাত, তনুদের কেউই তাদের কাছ থেকে রেহাই পায়নি এই সমাজে। তাদের কাছে, খুন, ধর্ষণ, সুধ, জুয়া, মদ, যৌনকর্মিদের কাছে যাওয়া, লোক ঠকানো থেকে ঘরের বুয়াকে প্রেগন্যান্ট করে দেয়া সবই হালাল।

মাদ্রাসার মতো পবিত্র জায়গায় ছোট ছোট বাচ্চাদের যেই সমাজে বলাৎকার হয়, যেই সমাজে ভালোবাসার নাম দিয়ে রক্ষিতা বানায়ে রাখা হয় স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে, ঠিক সেই সমাজের জাতি যখন কে নায়িকা, কে গায়িকা, কে মডেল, এইসব নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে তাদের চরিত্রকে নোংরাভাবে তুলে ধরে, তখন চরিত্রের সংজ্ঞাই প্রশ্নবোধক হয়ে উঠে।

বড়/ছোট যেকোন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী বা চাকুরিজীবী নারীর কাছে তার পেশা যেমন তার রুটিরুজি এবং সম্মানের; তেমনি মডেলিং, নাটক, সিনেমা,গান, নাচ থেকে শুরু করে রাস্তার ঝাড়ুদারনি বা যে ইট ভাঙে যে নারী, তার কাছেও সেই পেশা তার রুটিরুজি, তার সম্মানের জায়গা। নায়িকা /গায়িকা কোন বিশেষ ধর্ম সংগঠনের নেত্রী বা কর্মী নন যে, আলখাল্লা পরে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। যার শরীর দেখিয়ে ব্যবসা সে শরীর দেখাবে, সে সেই অনুযায়ী শরীরের যত্ন নেবে। তা সালমান খান হোক বা ক্যাটরিনা। মোবাইলে রাখবেন সানি লিওনের কোমর দুলানো ভিডিও, আর সমালোচনা করবেন নিজের দেশের নায়িকাদের নিয়ে, তা হয় না। নিজেদের চোখকে আগে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করুন। হলে গিয়ে ছবি দেখবেন না, মোবাইলে নিয়ে ঘুরবেন পর্নোগ্রাফি, আর সুযোগ পেলে নিজের দেশের নায়িকাদের চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধার করবেন, তা হয় না। আপনারা আগে হলে গিয়ে যতোগুলো ভালো ছবি আছে, সেইসব দেখে, পরিচালক, প্রযোজকদের উৎসাহ দিন। তারপর দেখুন তারা ইরানিদের মতো আলখাল্লা পরায়ে নায়িকাদের সামনে আনে কিনা!

জেনে রাখুন, রাস্তার যৌনকর্মিদেরও অধিকার আছে এই সমাজে তার ব্যবসা নিরাপত্তার সাথে চালিয়ে যাবার। কারণ লাইসেন্স নিয়েই সে এই ব্যবসা করে, এটা তার রুটিরুজি। যৌনকর্মি হলেই আপনি তার উপর, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অধিকার রাখেন না। সে যদি টাকা নেয়ার পরও শারীরিক সম্পর্কের আগে টাকা ফেরত দিয়ে বলে, তোমার সাথে আমার আগ্রহ নেই, তাহলেও এটা না বলেই বিবেচিত হবে, আপনার কোন অধিকার নেই তাকে জোর করার। এমনকি নিজের স্ত্রী যদি স্বামীকে বলে, আজ আমার আগ্রহ নেই, তার মানেও NO, মানে না’ই থাকবে, তার উপর স্বামীর অধিকার নেই জোর খাটানোর। আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেন, বলতে চাচ্ছি, ভালোবাসার মানুষের ভালো-মন্দ লাগাকে সম্মান করুন।

সম্মান করুন বাইরের একজন নারীকেও, সেও কারো না কারো মা, স্ত্রী, বোন, কন্যা। আপনি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারেন না, আপনার, স্ত্রী, কন্যা, বোন নিজেকে আপাদমস্তক ঢেকে বাইরে গেলেও সে নিরাপদ। আমি জানি, তারা যেকোনো কাজ নিয়ে যতো ভদ্রভাবেই বাইরে যাক, একটু দেরি হলে বাপ, ভাইয়ের চিন্তা ঠিকই আসে। সেটা আপনার মা, বোন বা কন্যার চরিত্র খারাপ বলে নয়, আপনি ভয় পান, কারণ আপনি জানেন এই সমাজে কিছু নোংরা পুরুষ আছেন, তারা ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে যেকোন বয়সী নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে সারাক্ষণ ওঁৎ পেতে আছে। আজ যদি আপনার কোন বোন বা মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বা খুনের হুমকি দেয়, তার কি প্রতিবাদ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন না?

আর কিছু নারীদের বলবো, ইতরদের কাছে ভালো হতে গিয়ে অন্যায়কারিকে প্রশ্রয় দিয়ে ভিক্টিমকে দোষারোপ করা বাদ দেন। সময় পাল্টাচ্ছে দ্রুত। কাল আপনার মেয়ে, বোন, ভাইজি, বোনঝিও একই পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। আপনার যদি জীবনে নায়িকা/গায়িকা হবার স্বপ্ন বা যোগ্যতা না থেকে থাকে, তবে ওদের সাথে নিজের তুলনা করতে যাবেন না। কাউকে ছোট করে বড় হওয়া যায় না। বরং নিজের হীনমন্যতা প্রকাশ পায়। মনে করে দেখেন এমন অনেক বান্ধবীর খবর আপনি জানেন, যারা বিয়ের আগে বয়ফ্রেন্ডের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছে, আপনি তাদের হয়তো হেল্পও করেছেন (হয়তো তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে বিয়েও করেছে)। তখন একটিবারের জন্যেও আপনার মনে হয়নি কাজটি অবৈধ, কারণ আপনি জানতেন তারা একদিন বিয়ে করবে।
এখন কেউ যদি মনে করে, এই মেয়ের তো অবৈধ সম্পর্ক একজনের সাথে আছেই, সে খারাপ, অতএব তাকে ধর্ষণ করাই যায় সকলে মিলে, তাহলে ব্যাপারটিকে কি আপনি সমর্থন করবেন?

আমি জানি আপনি করবেন না। হয়তো আপনার নিজেরও এমন অভিজ্ঞতা আছে বিয়ের আগে, আপনার হবু বরের সাথে। কার কী অভিজ্ঞতা আছে তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু যা অন্যায়, তা সবসময়ই অন্যায়। আর যাই হোক, একজন যৌনকর্মিও যদি কোন ধর্ষণকারির বিচার চায়, আর তখন আপনি তার চরিত্র নিয়ে টানাহেঁচড়ার করেন, তো হলে জেনে নিয়েন, আপনি তার চেয়েও বড় চরিত্রহীন।

শেয়ার করুন:
  • 403
  •  
  •  
  •  
  •  
    403
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.