দিনা ফেরদৌস:
কালকে একজনের ফেইসবুক পোস্টে দেখলাম, রাস্তায় পড়ে থাকা বাক্সের মধ্যে নবজাতকের ছবি। আশেপাশে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছেন বাক্সটিকে ঘিরে। কমেন্টে দেখলাম, বেশিরভাগেরই প্রশ্ন বাচ্চাটির মায়ের কাছে। কেন এই নিষ্পাপ শিশুটিকে পৃথিবীতে আসতে দেয়া, কেন এইভাবে ফেলে দেয়া, মা হয়ে এটি কীভাবে সম্ভব হলো, সঙ্গে গাল-মন্দ তো আছেই, যার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের চরিত্রের আসল রূপ তুলে ধরি।
(বাবার কথা অবশ্য কেউ জিজ্ঞেস করেনি। করার কথাও না। পাছে আমাদের ঘরের পুরুষটির চেহারা বা নিজের চেহারা উঠে আসে। জানি বলবেন,সব পুরুষ এক না। যাকে বলেছি, তার লাগার কথা ,আপনার এতো লাগে কেনো? আমাদের সমাজের বাপ, ভাই, স্বামী, ছেলে, শশুর,ভাসুর, দেবর, চাচা,মামারা’ইতো এইসব করেন। তারা’তো কারো না কারো পরিবারেরই। দয়া করে সাফাই গাওয়া বন্ধ করুন)।
যারা এই জাতীয় কথা বলেন তাদেরকে বলি, যদি কখনো শোনেন আপনার পরিবারের কোনো মেয়ে প্রেগন্যান্ট হয়েছে, আর তার গর্ভের সন্তানের কোনো পিতৃ পরিচয় নেই, তখন কী পরামর্শ দিবেন নিজের পরিবারের মেয়েকে? বলবেন, বাচ্চাটি নিষ্পাপ? তাকে বাঁচতে দাও। সে আমাদের সমাজেই বড় হবে! নাকি উল্টো বাচ্চাটির বাপ কে, কোথায়, কখন কী করে কী হলো ইত্যাদি বলে বলে মেয়েটিকে হয়রানি করবেন?
সেই বাপটি যদি দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে, তখন এই কাজটির জন্য আবারও মেয়েটিকে চাপ দিয়ে তার লাইফটাকে নরক বানিয়ে তোলেন। যা হয়ে গেছে তা’তো খণ্ডানো যাবে না। তাহলে সমাধান কী?
আমি বলবো, বাচ্চাটিকে যারা নিষ্পাপ বলছেন, তারা আগে সব ধরনের জন্মকে বৈধ ভাবার মতো মানসিকতা তৈরি করেন। নিজের কারও হলে বাক্স বন্দী করে ফেলবেন, আর অন্যের হলে ঢোল পিটিয়ে সমালোচনা করবেন, তা থেকে বিরত থাকুন।
প্রীতি জিনতা’র হিন্দি মুভি “ক্যায়া ক্যাহনা” তে দেখিয়েছিল, বিয়ে ছাড়া প্রীতি জিনতা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলে সারা সমাজ তাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। তাকে নিয়ে লোকজন নাটক বানায়, এই পরিস্থিতিতে তার বিষ খেয়ে মরে যাওয়া উচিত। কিন্তু সব কিছুর পরে কিভাবে তার বেঁচে থাকা উচিত, সেই সিদ্ধান্ত কোন সমাজ দেয় না। যেমন আমরা প্রশ্ন এবং গালি দিয়ে দায় সারি। মুভি বলেই পরিবার এসে তার পাশে দাঁড়ায়, মা-সন্তান দু’জনেই বেঁচে যায়, যা বাস্তবে হয় না।
তাই বলি, বড় বড় কথা আর গালাগালির চর্চা বাদ দিয়ে আগে নিজেরা প্রচলিত ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। নিজের বাচ্চাদের সেক্স এডুকেশন দিন। সেক্স এডুকেশন বাচ্চাদের নষ্ট করবে না, বরং সচেতন করবে। সেক্স বিষয়ে যখন বাচ্চারা বাইরে থেকে জ্ঞান নেয়, তখন অনেক ভুল তথ্য পায়। লুকিয়ে সেক্স করা থেকে তো বাচ্চাদের আটকাতে পারছেন না। ভুল জ্ঞানের অভাবে প্রেগন্যান্ট হয় বলেই রাস্তায়, ডাস্টবিনে, জঙ্গলে, ড্রেনে এইসব নবজাতকদের আমরা পাই। সেক্স এডুকেশন দিতে আপনাদের লজ্জা লাগে, রাস্তায় পড়ে থাকা নবজাতক দেখলে মায়া হয়, নিজের মেয়ের হলে বাক্সবন্দি করে ফেলেন, অন্যের হলে ছিঃ ছিঃ করেন, তার থেকে একটি সিদ্ধান্তে আসুন।
সমাজ, ধর্মের দোহাই দিয়ে আগেও কিছু আটকায়নি, আগামীতেও আটকাবে না। কাকের মতো চোখ বন্ধ করে কিছুই দেখিনি বলে, কোন ঘটনাকে আড়াল করার চান্স নেই। আমার ছেলে-মেয়ে এমন না, কিছুই বুঝে না, এই জাতীয় ন্যাকামো বাদ দিন। কী বোঝে, না বোঝে, আপনাকে বলবে নাকি?
তাই তার যখন যেটা বোঝার বয়স (বিশেষ করে বয়ো:সন্ধি কাল) আপনি অভিভাবক হিসেবে তাকে, সুন্দর করে বুঝিয়ে বলুন। আগে নিজেরা এগিয়ে আসুন। আমরা মিলেই তো সমাজ। আমরা পাল্টালে সমাজ পাল্টাবে।