নারীর হাতে নোবেল, নারীর হাতেই প্ল্যাকার্ড

রাহাত আহমাদ:

১.”ফরাসি এমানুয়েল শারপন্টিয়ের এবং মার্কিন জেনিফার এ. ডাউডনা জিনোম এডিটিং-এর পদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য এই দুই নারী বিজ্ঞানী এবছর নোবেল পুরস্কার পেলেন৷

তাঁরা ‘জেনেটিক সিজার্স’ আবিষ্কার করেছেন৷ নোবেল কমিটির মতে, এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে৷ এর জন্যই তাঁরা সোনার মেডেল ও নয় লাখ ৫০ হাজার ইউরো পুরস্কার পাবেন৷

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা পশু, গাছপালা এবং মাইক্রোঅর্গানিজম বা উদ্ভিজ্জাণুর ডিএনএ-তে বদল ঘটাতে পারছেন৷ এই প্রযুক্তি জীববিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে৷ এমনকি তার প্রভাব নতুন ক্যানসার চিকিৎসাতেও পড়বে৷ যেসব রোগ উত্তরাধিকার সূত্রে আসে, তাও নিরাময় করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে৷”

সাহিত্যেও নোবেল ছিনিয়ে আনলেন আমেরিকান নারী কবি লুইস গ্লুককো।
মেয়েরা বিজ্ঞানে ভালো না, এই বক্তব্যে নিশ্চয়ই রসায়নে নোবেল পাওয়া সেই দুই নারী যথাযথ উত্তর দিয়েছেন। অনেক নারীকে বিজ্ঞানে আরো উৎসাহী করে তুলবে।

নারীদের হাতে যতো নোবেল উঠবে ওদের মুখ তত আঁধারে ঢেকে যাবে, লুকিয়ে পড়বে। কারণ ওরা সবসময় নারীর সীমাবদ্ধতাকে মনে করিয়ে দিতে চায়। মানুষ হিসেবে নারীর সামর্থ্যকে ছোট করে দেখতে চায়। ওরা এখনও ছদ্মবেশে বা প্রকাশ্যে প্রচার করে নারী সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, সে ঘর সামলাবে। কেউ খুব আধুনিক হয়ে শর্তসাপেক্ষে নারীর বাহির সামলানোর পক্ষে কোমল মতামত দেয়। তা দেয় যাতে তার অর্জিত বিদ্যাবুদ্ধিকে প্রশ্নের মুখে পড়তে না হয়।

২. এদিকে বাংলাদেশের চিত্রটা একটু দেখি। এখানে ভয়াবহভাবে নারী বিদ্বেষ বেড়ে গেছে। আগে একটা নির্দিষ্ট রক্ষণশীল শ্রেণি এতে যুক্ত ছিল, এখন তা অতি সাধারণ মানুষ থেকে সার্টিফিকেটধারী অনেক শিক্ষিত মানুষজনও এতে শামিল হয়েছে। সচেতন মহলের দৃষ্টি নিশ্চয়ই এড়ায়নি।

মিন্নির ফাঁসির রায় ঘোষণা হওয়ার পরও তাকে যেভাবে সামাজিক মাধ্যমের নানা গ্রুপে ট্রল করে হেনস্থা করা হয়েছে তাতে আমাদের সমাজ কতটা নারী বৈরী তা বুঝতে বাকি থাকে না।

মিথিলাসহ বিভিন্ন নারী সেলিব্রেটিদের কমেন্ট সেকশনটা দেখলে বোঝা যায় মানুষের প্রতি মানুষের এতো ক্ষোভ থাকতে পারে?

সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনায় বন্ধু তালিকার একটা বিশাল অংশ ধর্ষণ ইস্যুতে নারীবাদীদের খুঁজছে ।তারা নাকি চুপ করে আছে, কেন আছে তা হন্যে হয়ে খুঁজছে। ব্যাপারটা এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যেন তারা ধর্ষণের সমর্থক।

বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার অনুপাতে যে গুটিকয়েক নারীবাদী, ব্লগার, সেকুলার মানবাধিকার এক্টিভিস্ট আছেন তারা কত অনিরাপত্তাহীনতায় থেকে মত প্রকাশ করে থাকেন, এটা শুধু সেই অল্প কজন মানুষই জানেন।

সুলতানা কামালকে মৌলবাদী গোষ্ঠীর হত্যার হুমকি দেয়ার ভিডিও এখনও ইউটিউবে আছে। লাল টিপ মানেই যেনো যম।

যাইহোক বাংলাদেশের সমাজে সামগ্রিক নারী বিদ্বেষের ঘটনা চোখ এড়ায়নি বাংলাদেশের জাতিসংঘের প্রতিনিধি মিয়া সিপ্পোর। তিনিও উদ্বেগ জানিয়েছেন।

২.
ধর্ষণ নিয়ে কত রব। ধরে নিলাম, সমস্ত ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো, তাতে কি নারী-মুক্তি মিলবে? তারা কি এই সমাজে, এই দেশে নিরাপদ হয়ে যাবে? তারা কি একটি নারী বান্ধব সমাজ পেয়ে যাবে? ভাইবোন ফেইসবুকে ছবি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে? সাকিব আল হাসানের ছোট্ট কন্যা শিশুটির সূর্যমুখি বাগানের সামনে নিষ্পাপ হাসিতে কি যৌনাত্মক সুড়সুড়ি মার্কা মন্তব্য বন্ধ হয়ে যাবে? বুকে ওড়না না থাকলে সেই মেয়ে চরিত্রহীনা হয়ে পড়বে?

ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডের পর এই সমাজে কোন নারী একাকি গভীর রাতে রাস্তায় বের হলে সমাজ কি বলা বন্ধ করে দেবে “এই মাইয়া পতিতা, মাগি না হলে এতো রাতে রাস্তায় ক্যা?
তাকে সেই রাতে ধর্ষণের শিকার হলে এই সমাজ কি বলা বন্ধ করে দিবে “একটা মাইয়া মানুষ রাইত বিরাইতে বাইরালে শেয়াল কুকুর তো খাইবো।

সে এমন পোষাক পরেছে যাতে তার তার শারীরিক অবয়ব স্পষ্ট এমন মাইয়ারা হলো লজেন্সের মতো, মাছি তো বসবোই, এমন পোষাক পরলে তো ধর্ষণ হইবই।

এখন শুধু আম জনতা না, অনেক অনার্স মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষিত লোকের সাথে সাথে অনেক সেলিব্রেটি পর্যন্ত তাল মিলিয়ে পোষাকে ধর্ষণের একটা বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরছে। ব্যবসায়ী, প্রযোজক, চিত্রনায়ক এবং ধনী প্রভাবশালী অনন্ত জলিলদের মতো মানুষরা যখন পোষাককে দায়ী করে কথা বলেন, তখন বোঝা যায়, একটা সমাজের মস্তিষ্ক কীভাবে পচে গেলে এমন দশা হয়।

৩.
পরিবার থেকেই একটা মেয়ে শিশুকে শিখিয়ে দেয়া হয়, তুমি মেয়ে তোমাকে পুতুল দিয়েই খেলতে হবে, বন্দুক দিয়ে নয়। কৈশোরে তুমি রান্নাবান্না ঘর গোছানো, হাতের কাজ শিখবে তোমার ভাইয়ের মতো সাইকেলের বাহানা দিলে চলবে না।
বন্ধুর সাথে সাথে বেড়াতে যাওয়া, রাতে বন্ধুর বাসায় থেকে যাওয়া চলবে না। টেন মিনিটস স্কুলের আয়মান সাদিক ও রাশিদ এই বিষয়ে মুখ খুলে কী তোপের মুখে পড়েছে তা তারা সারা জীবনেও ভুলতে পারবে না।

ততোদিনে ছেলে মটর সাইকেলে চড়ে আনন্দরাজ্যে ভ্রমণ করতে শিখে গেছে। পাশাপাশি মেয়ে মায়ের সাথে গোপি বউ বা জবার সংসার সিরিয়ালের প্রেমে পড়ে যায়, একটু শহুরে হলে রুপ চর্চার সামগ্রী, পোষাক আষাক নিয়ে ভাবনার জগৎ তৈরি হয়।

কলেজ ইউনিভার্সিটিতে ছেলে বিড়ি খাবে তাতে তার পৌরুষ উজ্জল হবে, “এ বয়সে এরম একটু আকটু খায়, সময় হলে ঠিক হয়ে যাবে।
মেয়ে হয়ে সিগারেট খায়? ওইটা মেয়ে নাকি …?
তখন মেয়ে চরিত্র হারায়।

৪.
প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, স্পিকার নারী হলেই নারীর ক্ষমতায়ন হয় না। একেকজন একেকভাবে রাজনৈতিক ময়দানে উঠে এসেছে। আজ তারা ক্ষমতাচ্যুতহলে আগামী ৫০ বছরেও পারিবারিক ঐতিহ্য ছাড়া তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতি করে প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলের নেত্রী হওয়ার আশা আপনারা করলেও আমি করি না।

৫.
নারীবাদ কী জানি না। কখনও আগ্রহও জন্মায়নি। কিন্তু দেখেছি খুব সামান্য গুটিকয়েক মানুষ শুধু লৈংগিক ভিন্নতার জন্য অর্ধেক জনসংখ্যার ভোগান্তির কথা বলছে, তাদের বঞ্চনার কথা বলছে, তাদের অধিকারের কথা বলছে, তাদের সুযোগের কথা বলছে, তাদের ক্ষমতায়নের কথা বলছে, আর এগুলোই যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো।

এখন কেউ নারীর প্রতি সহমর্মিতা প্রাকাশ করলেও সেও খুব সহজে নারীবাদী হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে খুব ক্লাসিক দুইটা উদাহরণ শুনে আসছি, ওরা নাকি পুরুষের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে চায়, আর দ্বিতীয় উদাহরণটা হলো তারা পুরুষের মতো খালি গায়ে রাস্তায় হাঁটতে চায়।

নারীবাদীদের নিয়ে আশৈশব একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভংগী নিয়ে বেড়ে উঠেছি। দিন গড়িছে, বাংলাদেশ সাক্ষরতার হার বেড়েছে কিন্তু তাদের প্রতি ঘ্রিনা কমতে দেখিনি।

একটা খুব সাধারণ কারণ আমার কাছে মনে হয়, নারীবাদ বিদ্যমান সমাজ কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। এগুলো আমাদের প্রথাগত চিন্তার বিরোধী। প্রথা যখন স্বয়ং ঈশ্বরের, তাকে প্রশ্ন করবে কে? ঈশ্বরের চেয়ে ভালো প্রথা কি মনুষ্য দ্বারা নির্মাণ সম্ভব? এর উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে একটা সমাজের নির্মাণ।

পুরুষতন্ত্র, লিংগ রাজনীতি, অর্থনৈতিক অবস্থান, শ্রেণীকে খুব সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। তাই এগুলো নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নাই।

৬.
গতকাল বিবিসির খবরে দেখলাম বাল্যবিবাহে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রথম। কমেন্ট সেকশনে দেখলাম বাল্যবিবাহের পক্ষে ব্যাপক উৎসব চলছে। বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় ভিক্টিম তো সেই কিশোরী মেয়েটা। বুঝতে বাকি থাকে না বাল্যবিবাহ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে একটা পশ্চিমা এনজিওওয়ালা টার্ম ছাড়া কিছুই না।

ওদিকের নারীরা নোবেল মাল্য গলায় ঝুলিয়ে বাহবা কুড়াচ্ছে। আর আমরা আছি ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী এই তত্ত্বকে কীভাবে ছেদ করা যায়। আমরা ধর্ষণের বিচার চেয়ে রাস্তায় নামছি। হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডে তরুণী লিখেছে, “ধর্ষণের জন্য আমার পোশাক নয়, তোমার বিকৃত পৌরুষ দায়ী”।

রাহাত আহমাদ
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এন্ড টেকনোলজি

শেয়ার করুন:
  • 83
  •  
  •  
  •  
  •  
    83
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.