একদিনে কেউ ধর্ষক হয়ে যায় না

বনানী রায়:

চারিদিকে যেন নারীর প্রতি লাঞ্ছনা, অপমান, অত্যাচার, নিপীড়ন ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। নিজের ঘরের মানুষ, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, বখাটে, সন্ত্রাসী সবার দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। আইন কঠোর করার জন্যে আন্দোলন হচ্ছে, আইন কঠোর হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, অত্যাচারীদের কেউ কেউ ধরাও পড়ছে; তবু পাষণ্ডদের মনে বিন্দুমাত্র ভয় নেই। অত্যাচার কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। এ যেন নোংরামিতে জেতার লড়াই। কে কত কুৎসিত আর ঘৃণ্য ভাবে নারীর অপমান করতে পারে তার লড়াই। দেশের প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, স্পিকার সহ উচ্চপদে আসীন সকল নারীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর লড়াই। এ যেন অসুস্থ, বিকৃত রুচির পুরুষের নারীকে হেয় করে জেতার লড়াই। এর শেষ কোথায়, জানি না আমরা কেউ।

আমরা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব, রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে আন্দোলন করি। অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে, তা নিয়ে আমার কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক ভাবে, সামাজিক ভাবে আমাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই? এই অবস্থা কি একদিনে তৈরি হয়েছে? একটু ভাল করে ভেবে দেখুন তো, কখনো আপনার ছোট মেয়েটা বা বোনটা কোন আত্মীয় বা প্রতিবেশী কোন কুলাঙ্গার দ্বারা বিচ্ছিরি ছোঁয়া পেয়েছে বা আরো খারাপ কিছু তার সাথে হয়েছে শুনে আপনি বা আপনারা গিয়ে তাকে বেধড়ক পিটিয়েছেন? বা পারিবারিকভাবে কোন বিচারের ব্যবস্থা করেছেন?

করেন নি, আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি আপনি বা আপনারা কী করেছেন। মায়েরা মেয়েটাকে চোখে চোখে রেখেছেন, তাকে বকা দিয়েছেন, তার গায়ে বয়স হওয়ার আগেই জোর করে ওড়না জড়িয়েছেন, তা সে ওড়নার ভার বইতে পারুক বা না পারুক। আর বাবারা মনে করে দেখুন, প্রতিবাদ বা বিচার করার পরিবর্তে নিজের বউকে বকা দিয়েছেন মেয়েকে ঠিকমত দেখে রাখতে পারে না বলে, মেয়েকে ঠিকঠাক মত জামাকাপড় পরাতে পারে না বলে। আর সেই সুযোগে অপরাধীর সাহস বেড়ে গেছে কোন শাস্তি না হওয়ার কারণে। তার অপরাধ বাড়তে বাড়তে চরমে উঠেছে, সে একসময় ধর্ষক হয়ে উঠেছে।

একদিনে কেউ ধর্ষক হয় না। ছোট ছোট অপরাধ গুলোকে যখন গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা না হয় তখন অপরাধীর মনে অপরাধ প্রবণতা আরো বাড়তে থাকে। নিজের ঘর বা আত্মীয়ের বাড়ি বা আশেপাশের কোন বাড়ির ছোট ছোট শিশু, কিশোরীদের সাথে কুরুচিপূর্ণ কাজ করার মধ্য দিয়ে নরপশুগুলো হাত পাকায়। সেগুলো অনেক সময় বড়রা জানতেও পারে না। জানলেও তেমন কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বরং যেন না জানার একটা ভান করা হয়। ব্যাপারটা অনেকটা যেন এমন একজন ভাল বা ভদ্র মানুষের অপমান হবে, লোক জানাজানি হবে, তাতে মেয়েরও বদনাম হবে, তার চেয়ে চুপচাপ থেকে নিজের মেয়েকে চোখে চোখে রাখার উপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই কুরুচিপূর্ণ অমানুষগুলোর নোংরামি বাড়তেই থাকে। নোংরামি বাড়তে বাড়তে এরাই একদিন ধর্ষক হয়ে ওঠে। অথচ যেদিন ছোট্ট মেয়েটা এসে বলেছিল, অমুক তার গায়ে হাত দিয়েছে বা আরো অসভ্য আচরণ করেছে, সেদিন যদি দুই বাড়ির মুরব্বিরা একসাথে বসে তাকে কোন পক্ষ একটুও ছাড় না দিয়ে ঘরোয়া ভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা হত বা আইনের আশ্রয় নেওয়া হত; তাহলে হয়তো সে ধর্ষক হওয়ার সাহস বা সুযোগ পেত না।

আমাদের বাড়িতে, আত্মীয় স্বজনের মধ্যে, প্রতিবেশীদের মধ্যে, বন্ধু মহলে কার মধ্যে লাম্পট্য আছে তা যেমন মেয়েরা জানে ভদ্র ছেলেরাও বুঝতে পারে। কারণ লাম্পট্য কখনো লুকিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু আমরা জেনে বা বুঝে কী করি? কোনো পদক্ষেপ কি নিই? যদি ভদ্র ছেলেরা খারাপ ছেলেদের শোধরাতে চাপ দেয় এবং না শোধরালে তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করে বা খারাপ ছেলে আখ্যা দিয়ে কোন অনুষ্ঠান বা একত্রিত আয়োজনে সেই লম্পটদের বাদ দেওয়া হয়, তাহলে লম্পটগুলো খারাপ তালিকায় যাওয়ার ভয়ে হয়তো নিজেদের শোধরানোর চেষ্টা করতে পারে। কিছু না পারলে অল্প থেকেই তাকে ধরে পুলিশে তো দেওয়া যায় বা পুলিশের কাছে নালিশ জানানো যায়।

যুগ যুগ ধরে চলে আসছে যে অত্যাচারের ধারা, তা একদিনে বন্ধ হওয়ার কথা নয়, হবেও না। আমাদেরও তাই একদিন প্রতিবাদ করে চুপচাপ সব মেনে নিয়ে আগের জায়গায় ফিরে গেলে হবে না। আন্দোলন যখন শুরু হয়েছে, আওয়াজ যখন উঠেছে তখন তা চলতে থাকুক সবকিছু পুরোপুরি না হোক অন্তত কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত। তবে আন্দোলন মানে যে সবসময় মাঠে নেমেই জ্বালাও পোড়াও করতে হবে তা নাও হতে পারে। প্রতিবাদ শুরু করতে হবে ঘর থেকে। ঘরের মধ্যে যদি কোন নারী কারো দ্বারা অপমানিত বা লাঞ্ছিত হতে থাকে, তবে সেখান থেকেই প্রতিবাদ শুরু হোক। আমাদের মুখ বুজে মেনে নেওয়ার পরম্পরা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটা পরিবারে বা আত্মীয় স্বজন মিলে যদি বিশ ত্রিশ জন মানুষ থাকে, তার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা না হয় দশ পনের জনই ধরলাম। তার মধ্যে কতজন কুরুচিপূর্ণ?

সবাই তো হতে পারে না। যারা ভালো তারা কেন ঐ কুলাঙ্গারদের করা পাপের দায় নেবেন? আর কেনই বা তাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কথা ভেবে বা ভদ্রতা করে সবকিছু জেনে বুঝেও চুপচাপ থাকবেন? যখন আপনি জানতে বা বুঝতে পারবেন আপনার পরিবারে বা আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কেউ বা কেউ কেউ মেয়েদের দিকে কু দৃষ্টি দিচ্ছে বা খারাপ ইঙ্গিত করছে বা সরাসরি আপনার বাড়ির বা আত্মীয়দের মধ্যে কারো সাথে অসভ্য আচরণ করছে কেন আপনারা নিরবে সেটা মেনে নেবেন? পরবর্তীতে আপনাকেও তো সব পুরুষের সাথে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে নারীর চোখে। আর ভদ্রতার ধার ধারবেন না। টেনে খুলে দিন সবার সামনে আপনার মেয়ে, বোন, স্ত্রীকে অসম্মানকারির মুখোশ।

আমাদের সমাজে যখনই নারীকে অপমান, অসম্মান বা ধর্ষণ করা হয়; তখনই সামাজিক ভাবে হেয় হয়ে এসেছে নারী। এমনকি কন্যা শিশু বা কিশোরী যখন এসে মায়ের কাছে বলে কোনো অসভ্য, ইতর তার গায়ে হাত দিয়েছে; মা প্রথমেই ভাবে সবাই জানলে তার মেয়েকেই হয়তো খারাপ বলবে বা খারাপ চোখে দেখবে। তারপর সে কথাটি যখন বাবার কাছে পৌঁছায় বাবাও মেয়ের নামে কুৎসা রটার ভয়ে, সামাজিক ভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে নিরবে হজম করে। অথচ একবারও ভাবা হয় না এখানে মেয়েটার দোষ কোথায়? মেয়ের বাবা মা লজ্জায় সমাজের কাছে জানায় না, অথচ এ লজ্জা অপরাধকারি জানোয়ারটার। যে কুলাঙ্গার দুষ্কর্মটি করল তার কোনো বকা, মার বা শাস্তি কিছুই হলো না। মা বাবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে এই ভেবে যে, মেয়ে হয়ে জন্মেছে এসব তো সহ্য করতেই হবে। যেন মেয়ে হয়ে জন্মানোই আমাদের সমাজে পাপ। এই সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে কবে? কবে নারী তার যোগ্য সম্মান পাবে? আর কবে কু পুরুষরা তাদের কাজের উপযুক্ত শাস্তি পাবে?

আমাদের দেশে ইভ টিজিং, নারী নির্যাতন এসব বিভিন্ন বিষয়ে আইন আছে। কিন্তু তার প্রচার বা কার্যকারিতা কতটুকু? আমাদের দেশে নারীর সম্মান রক্ষায় যে আইন গুলো আছে তার ব্যাপক প্রচার দরকার, যাতে সেই আইনগুলো সম্মন্ধে সর্বস্তরের নারীরা জানে এবং প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারে। আইনগুলোর প্রচার এমনভাবে হতে হবে যাতে অপরাধীরাও ভয় পায়। তবে শুধুই প্রচার নয়, প্রয়োগটা আরো বেশি দরকার। নারী লাঞ্ছনা, নির্যাতন বা ধর্ষনের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে, তার প্রচার এবং প্রয়োগ সঠিক ভাবে হতে হবে। আইনকে শুধু বইয়ের পাতায় চোখ বন্ধ করে ঘুমোলে হবে না, জাগ্রত হতে হবে।

শুধু ‘ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ এই আইন পাশ হলে হবে না। আইন কঠোর করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে আরো অনেক আগে থেকে। অপরাধ অল্প থাকতেই আইনের মাধ্যমে তাকে শাস্তি দিতে হবে, যাতে সে ধর্ষনের মত অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজ করার সাহস না পায়। যখন অল্প অপরাধে তাকে সাজা ভোগ করতে হবে, তখন বড় অপরাধ করার আগে সে অন্তত দু বার ভাববে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অল্প বা ছোট অপরাধের শাস্তি না হওয়াটা একজন অপরাধীর বড় অপরাধ করার প্রবণতা বাড়ায়। তাই নারীর বিরুদ্ধে যে কোন অপরাধেই গর্জে উঠুক বাংলাদেশ।

(ফিচারের ছবিটা নেট থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.