ধর্ষণ, মনোবিকার ও অধঃপাত

ফারদিন ফেরদৌস:

চারজন শিশু মিলে একজন শিশুকে ধর্ষণ করেছে। গণমাধ্যমের খবর এমনটাই জানাচ্ছে। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের রূনসী গ্রামে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা আছে কিনা জানা নাই, তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না। বাপ যদি চোর, ছ্যাঁচড়, লুইচ্চা, ধর্ষক বা লুটেরা হয়, তার ছাওয়াল কি সাধু সন্তু হবে?

আমরা যা শেখাচ্ছি, আমাদের শিশুরা তাই শিখছে।

এই করোনাকালে বেটা বুড়ো ছাওয়াল সবাই মিলে কী দেখছে? ইউটিউব/ফেসবুক আর ফেসবুক/ইউটিউব।

শিশুরা কাশফুলের শুভ্রতা চেনে না, চেনে কেবল কার্টুন।কাঁচপোকা চেনে না, চেনে কেবল টিকটকের ভাঁড়ামো এবং নারীবিদ্বেষী নোংরামো।

গান নাই, সংস্কৃতি নাই, নাটক, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, কবিতা, খেলাধুলা কিচ্ছু নাই। সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে মানুষের মনোজগত যদি মানবীয় গুণাবলী দ্বারা পরিপূর্ণ না হয়, ফিল ইন দ্য গ্যাপ স্রেফ যৌনতায়। বড়দের পাশাপাশি এখন শিশুরাও যৌন অবসেশনে ভোগা শুরু করেছে।ফলাফল বরিশালে শিশু কর্তৃক শিশু ধর্ষণ।

আমাদের ভবিষ্যৎ কি আমরা বুঝতে পারছি?

দেশের যে রিলিজিয়াস টিচাররা নৈতিকতা শিক্ষা দিতে পারতো, সেই তাদেরই একশ্রেণী আকণ্ঠ ছেলে শিশু ধর্ষণে নিমজ্জিত। ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই ছেলেটি কি তার ওপর সংঘটিত অত্যাচারের কথা মগজ থেকে দূর করতে পারবে? পারবে না। আলটিমেটলি বড় হয়ে সেও একজন বিকৃত ধর্ষকামীই হবে। হচ্ছেও তাই। গুগলে ‘বলাৎকার’ লিখে সার্চ দিয়ে দেখেন, কী আসে? নূরানী হুজুরদের মুখ, যারা শিশু ধর্ষণ ও হত্যার সাথে জড়িত।

আমরা পারতাম ইন্টারনেট, ইউটিউব বা ফেসবুকের ভালোটুকু গ্রহণ করতে। কেমনে করবো? বাঙালি ইউটিউব ফেসবুক বিকৃত যৌনতা দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে। শিশুরা এক টিপেই নারীর অন্দরমহলে ঢুকে পড়বার চান্স পাচ্ছে।আমাদের নজরদারির অভাবে তারা এডাল্ট কন্টেন্টে নিজেদেরকে অভিযোজিত করছে। হুজুররা নারী বিদ্বেষের নামে এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে -যেসব আলোচনা রসময় গুপ্তের চটিকেও হার মানায়। হুজুররা সরাসরি বলছে, হে যুবক তুমি বেহেশতের চিরযৌবনা বাহাত্তর ও একজন এক্সট্রা নারীকে ভোগ করতে চাও, তবে হ্যান কর, ত্যান কর। অনেক হুজুর বেহেশতি হুরের নিতম্ব ও স্তন নিয়েও রগরগে আলোচনা উপস্থাপন করেন। পার্থিব জীবনে স্বামী-স্ত্রী ব্যক্তিগত বিষয়াবলী নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন।

ক’দিন আগে এক ডাক্তার হুজুরকে দেখলাম চার বিয়ে করবার ফজিলত বর্ণনা করতে। সে আলোচনায় ওই পেটি মৌলভী সরাসরি বলল প্রেগন্যান্সি অবস্থায় স্বামী কি সঙ্গম ছাড়া থাকবে? মেডিকেল সায়েন্স অনুযায়ী এক বউয়ের পিরিয়ড বা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নাকি স্বামীর সঙ্গম ছাড়া থাকা সম্ভব না। তাই পুরুষের চার বিয়ে ফরজ। এসব সেক্সুয়াল অবসেসড মৌলভীদের বলতে ইচ্ছে করে তার জন্মকালে তার পিতৃপুরুষ অন্যত্র গমন করেছিলেন, নাকি ধৈর্য ধরেছিলেন? তার বা তাদের মনে রাখা উচিত ছিল না যে, তার বর্ণিত এই এডাল্ট কনটেন্টটি একজন শিশু দেখে ফেলতে পারে? আসলে এরা প্রত্যেকেই একেকজন পোটেনশিয়াল ধর্ষক। যারা মোটিভেশনের নামে সমাজ ও সংসারে জনে জনে ধর্ষণের অনুপ্রেরণা বিলায়।

এইসব প্রাপ্তবয়স্কদের আলোচনা বক্তা নামের কুলাঙ্গাররা খোলাখুলি সোশ্যাল মিডিয়া আপলোড করে অন্ধ অনুসারীদের দিয়ে জনে জনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর ফলাফল চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। ইউটিউব/ফেসবুকের প্ররোচনায় বড়রা তো দলবেঁধে নারীর সর্বস্ব হরণ করছেই, এখন শিশুরাও ওই কুকর্ম থেকে বাদ যাচ্ছে না।

একশ্রেণীর পারভার্ট কাপুরুষের বক্তব্য হলো ধর্ষণের জন্য ৭০ ভাগ নারীরাই দায়ী। কতবড় কুযুক্তিপূর্ণ কথা! নারীরা কি পুরুষকে ধর্ষণের সক্ষমতা রাখে? অথবা কোথায় ঘটেছে এমন যে, কোনো নারী পুরুষের ওপর জোরজবরদস্তিতে সওয়ার হয়েছে।

আরেকশ্রেণী আছে, যারা গলা ফাটায়ে বলে ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক দায়ী। পর্দা করলেই ধর্ষণ ওঠে যাবে। ওরে পামর মাদ্রাসার শত শত ধর্ষিত ছেলে শিশুর পর্দার কি সমস্যা? তনু ও নুসরাত তো পর্দানশীন জীবনযাপন করেছে, তারা কাপুরুষদের কাছ থেকে জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে পেরেছে?

আর পর্দা না করলেই তাকে ধর্ষণ করা জায়েজ হয়ে যায় অসভ্য অযাচারী নামধারী মুসলিম? বরং তোমরা ন্যায়নিষ্ঠ ও নৈতিকমানে পোক্ত মানুষ হতে তখন যখন তোমার নোংরা ও পঁচে যাওয়া মগজে, বিভৎস চোখে, বর্বর মননে ও ভয়াল নিম্নাঙ্গে পর্দা করতে। নিজে বেপর্দা হয়ে অন্যের পর্দা নিয়ে আলাপচারিতা পুরাই অসভ্যতা ও অনধিকার চর্চা। হুজুরেরা রোজ যে পরিমাণ নারীবিদ্বেষী ওয়াজ করে তাতে বুঝা যায় নারীর জন্মই হয়েছে পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য। এর ব্যত্যয় হলেই পুরুষ এমনকি ধর্ষণও করতে পারে। বেদ্বীন ও বেপর্দা নারীকে ধর্ষণ করা যায় -এমন মানবতাবিরোধী কুকথা অহরহই এদের মুখে শোনা যায়।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার বালিদ্বীপে যারা প্রমোদ ভ্রমণে যান তার কতটা পর্দা করেন সবাই জানি। সেখানে একটি ধর্ষণ নয় কেবল, নারী পুরুষ একে অপরকে ন্যূনতম অসম্মান করেছে এমন ঘটনা কি কেউ দেখাতে পারবে?

কেউ বলে শরিয়া আইন চালু করতে হবে। শরিয়া আইনে চলা মুসলিমদের মাদারল্যাণ্ড সৌদিআরবে যে পরিমান নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটে সারাবিশ্বের যোগফলও তার বেশি হবে না। এর বড় সাক্ষী ওই দেশে জব করা আমাদের মা বোনেরা।

কার্যত অধিকাংশ বাঙালি এখন বোধবুদ্ধির ভয়াবহ পচনক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সবাই গোড়া কেটে আগায় জল ঢালবার প্রয়াস পাচ্ছে। ধর্ষকের শাস্তি হিসেবে আইন সংশোধন করে যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হচ্ছে। তাতে কি ফল দেবে? এইদেশে একজন ধর্ষকের বিচারও কেউ দেখেছে? প্রমাণিত ধর্ষককে বিচারক বছরব্যাপী জামিন দিয়ে দেন যেখানে সেখানে আইনের কমবেশি কিছুই ম্যাটার করে না।

ধর্ষণ বন্ধে আমাদের প্রস্তাবনা…

•| ইউটিউব/ফেসবুকের নোংরা কন্টেন্ট অবিলম্বে সরিয়ে নিন।| যারা অর্থ কামাইয়ের ধান্ধায় এসব বানায় তাদেরকে আইনের আওতায় আনুন।|

•| হুজুরদের নারীবিদ্বেষী ওয়াজ, বেহেশতি হুরের রগরগে বর্ণনা এবং স্বামী-স্ত্রীর যৌনতা বিষয়ে ব্যক্তিগত করণীয় নিয়ে আলোচনা বন্ধ রাখতে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। সব কথায় সবখানে ধর্ম টেনে আনবার নাম জীবন নয়। মানবীয় অনেক সুকুমার বৃত্তি আছে, তার প্রায়োরিটি অতি অবশ্যই ঐশীবিদ্যার আগে।|

•| শিশুরা তো বটেই বড়রাও যাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে আসক্ত না হয়ে পড়ে তার বিহিতব্যবস্থা নিতে হবে।|

•| শিশু ও যুবকদেরকে ফেসবুক ও ইউটিউব বিমুখ করতে গান, বাজনা, সাহিত্য, থিয়েটার, চলচ্চিত্র সহ শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার বাধ্যতামূলক সুযোগ দান করতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে ব্যতিব্যস্ত রাখতে এসব বিষয় পড়াশোনা ও পরীক্ষার অংশ করে দিতে হবে। যার সংস্কৃতি ও খেলাধুলা চর্চার মান ভালো তার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হবে এমন বন্দোবস্ত করতে হবে।|

•| যেকোনো মূল্যে বিজ্ঞাপন বা প্রমোশনালের নামে মিডিয়া, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, স্পোর্টস এবং গণমাধ্যমে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের মর্যাদা হানিকর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে বুদ্ধিজীবী, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব ও সমাজবিজ্ঞানীদের বাস্তবানুগ, মানবতাবাদী ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।|

•| একজন শিশু বৃক্ষপ্রেমি, মানবতাবাদী, উদার, সহনশীল, পরোপকারী ও সৎ হিসেবে যাতে গড়ে ওঠে এমন ব্যবস্থা পড়ালেখায় স্থান দিতে হবে। প্রতিদিন একটা ভালো কাজ করলে তার খাতায় বেশি নাম্বার ওঠবে এমন ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।|

•| সর্বোপরি লেখাপড়াটা তথাকথিত বইপুস্তক থেকে মুখস্থবিদ্যা হিসেবে পরীক্ষার খাতায় উগরানো বাদ দিয়ে সৃজনশীল ক্রিয়াকর্ম, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা ও কর্মকুশলতাকে পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক করতে হবে। ব্যাকডেটেড মৌলভীদের কথায় গান বাজনা সাহিত্য হারাম বলবার কোনো সুযোগ নাই। আমরা দেখতেই পাচ্ছি ইউটিউবের টাকার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মৌলভীদের কথায় দেশের মানুষ একফোঁটাও শুদ্ধ হয়নি। সভ্যতা ও নৈতিকতায় বিশ্বমানুষ হয়ে ওঠতে হলে বিশ্বপাঠ গ্রহণ করতে হবে। সবার মনে শুভবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।|

হয়ত এখনো সময় আছে দেশটাকে ট্র্যাকে ফেরাবার। সভ্যতার ট্রেন অলরেডি লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। ট্রেনটি নিমজ্জিত বা ধ্বংস হওয়ার আগে অন্তত একজন নেতৃস্থানীয় মানুষ এগিয়ে আসুন যিনি আমাদের প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর সম্মান সমুন্নত রাখবেন। নিরাপত্তা ও মর্যাদায় নারী ও পুরুষের সমানাধিকার বজায় রাখবেন। শিশুদেরকে নৈতিকমানে প্রকৃষ্ট মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠবার সুযোগ দেবেন।

আমরা আর একটিও ধর্ষণ, মনোবিকার বা মানবীয় অধঃপাতের ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে চাই না।সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীতে আমার দেশের মতো সেরা দেশ আর একটিও না থাকুক।

•| মানুষ ফিরুক মানবতায় |•

লেখক: সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন
email: [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 342
  •  
  •  
  •  
  •  
    342
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.