পিতৃতন্ত্র ও পুরুষের অসহায়ত্ব

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা:

যে লেখাটা আমি লিখতে যাচ্ছি এই লেখাটির চিন্তা আমার বহুকাল আগের, তখন আমি সদ্য মাস্টার্স পরীক্ষার ভাইভা বোর্ড শেষ করে, বাইরে আমার এক বন্ধুর সাথে বিভাগের করিডোরে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ এক স্যার এসে প্রশ্ন করলেন আমার ছেলে বন্ধুটিকে, আপনার চাকরি-বাকরির কী খবর? আমার ছেলেবন্ধুটি সেদিন উত্তর করেছিল, “চাকরি তো পেতেই হবে স্যার। বাসার অনেক চাপ, পরিবারের সবার দায়িত্ব তো আমাকে নিতেই হবে, পাঁচ ভাইবোনের সবাই পড়ছে, আমিই একমাত্র ছেলে, আমাকেই তো সবাইকে দেখতে হবে, ছেলে বলে কথা”। অন্যদিকে যখন আমাকেও একই প্রশ্ন করা হলো, আমি তখন উত্তর দিয়েছিলাম, “আমি নারী হবার কারণে আমার পরিবার থেকে চাকরির কোনো চাপ নেই, চাপ আছে, তবে তা কেবলই বিয়ের।” সেদিন সেই মুহূর্ত থেকেই এই বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিলেও কালের আবর্তে কোথায় যেন চিন্তাটা হারিয়ে গিয়েছিল।

কিছুদিন আগে উইমেন চ্যাপটারে প্রকাশিত একটি লেখা আমার নজরে পড়ে, লেখাটির টাইটেল ছিল সম্ভবত “মেল মুড সুইং বা ডিপ্রেশন এর কথা কেউ বলে না”। লেখাটি পড়ার অনেকদিন আগে থেকেই আমার মাথায় পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্র কীভাবে পুরুষকে অনেক বেশি নিমজ্জিত করে ফেলেছে বা কীভাবে পুরুষকে পিতৃতন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রেখেছে সেটি আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। অথবা যদি বলি পিতৃতন্ত্র কীভাবে খোদ পুরুষকে কেবল পৌরুষের নির্মাণে নিমগ্ন করে রেখেছে সেই গল্পটি আমাদের মাথায় আসে না। এই লেখাটি পড়ার পর যেন আরো বেশি করে আমি এই লেখাটা লেখার তাগিদ অনুভব করলাম।
যেহেতু আমি একজন নারী আমার জন্য পুরুষের বাস্তবতা বোঝা বা অনুধাবন করা কেবলই পর্যবেক্ষণের। লেখকের সাথে আমি একমত পুরুষের বিষন্নতা নিয়ে আমরা আসলেই ভাবি না। কিন্তু এই না ভাবার পেছনে আসলে দায়ী কে? খুব গভীরে ভাবলে সহজেই ধারণা করা যায় এধরনের ভাবনার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে পিতৃতন্ত্র।

ভেবে দেখুন তো কে আসলে আমাদের সমাজের পুরুষকে পৌরুষত্ব বা পুরুষ হতে শেখায়, জবাবটা খুব সহজ।

প্রথমত আমাদের পরিবারই আমাদের ছেলে সন্তানদের পুরুষালী হওয়ার বা পৌরুষের শিক্ষা দেয়। আর আমাদের পরিবার যে মতাদর্শ লালন করে সেই মতাদর্শটি হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক। বলা বাহুল্য আমাদের পরিবারের বেশীরভাগ মায়েরাই এই পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শকে ধারণ ও লালন করেন। তাইতো আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মায়েরা এখন পর্যন্ত ছেলে সন্তানের কাছ থেকে যে ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করেন, সেটি নারী সন্তানের কাছে আশা করেন না। ছেলে সন্তানের উপস্থিতি আমাদের পরিবারকে, আমাদের মায়েদেরকে এক ধরনের সামাজিক নিশ্চয়তা প্রদান করে, যার মূল উৎস হচ্ছে বংশ রক্ষার নিশ্চয়তা। এবং বংশ সুরক্ষা নিশ্চয়তা থেকেই শুরু হয় পুরুষতন্ত্রের বীজ বপন। তাইতো খুব অল্প বয়স হতেই ছেলে সন্তানটিকে শেখানো হয় তাকে তার নিজ পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যদিকে কালেভদ্রে খুব কম মেয়েকেই তার মায়েরা বলে থাকে যে, তোমাকে আমাদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। এই যে পরিবারের দায়িত্ব একজন ছেলে সন্তানকে নিতে হবে, এই শেখানোর মধ্য দিয়েই শুরু হয় পুরুষের অসহায়ত্ব।

পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ আমাদের এই শিক্ষাই দান করে একটি ছেলে সন্তানই কেবল একটি পরিবারের দায়িত্ব বহন করতে সক্ষম। আর এই সক্ষমতা নিশ্চিত করবে তার পুরুষতান্ত্রিক চর্চা। এরই সূত্রে একটি ছেলে সন্তানকে শিশুকাল থেকে শেখানো হয় তাকে হতে হবে শক্ত, যত কষ্টই হোক, তার কান্না করা বারণ। আর ভয় পাওয়া বারণ, ভয় পেয়ে মায়ের নিরাপদ আঁচলে মাথা গোঁজা বারণ। তার মন খারাপের অনুভূতি প্রকাশ করা বারণ, তার জন্য সকল প্রকার কোমলতা বারণ, চার দেয়ালের ছোট্ট ঘরের মাঝে তার স্বপ্নকে নিবদ্ধ করা বারণ। এতো এতো বারণের বেড়াজালে সেই শিশুকাল থেকেই একটি ছেলে সন্তানকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় জীবনের কঠোর বাস্তবতায়।

তার শৈশবের সূত্রপাত ঘটে এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে যে তাকে তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করতে হবে যেকোনো মূল্যে। হোক সেটি পাঁচ/চার অথবা তিন সদস্যের পরিবার। তাকে শেখানো হয় তার নিজের পরিবার, বাবা-মা-ভাই-বোন এর পরিবার, উভয় পরিবারের সকল প্রকার অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব কেবলই তার। সহজ বাংলায় বললে যেটি দাঁড়ায়, ছেলে সন্তানটিকে এই বাস্তবতায় ফেলে দেওয়া হয় যে সেই হবে তার পরিবারের এবং তার বাবা-মার পরিবারের একমাত্র অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি, যেন টাকা রোজগার করা ছাড়া একজন পুরুষের আর কোনো চাহিদা থাকতে নেই।

এ তো গেল বাবা-মায়ের প্রত্যাশা থেকে ছেলেকে নির্মাণের প্রক্রিয়া। এবার চলুন এই ছেলেটি যখন শৈশবের পায়ে বেরিয়ে তার যৌবনে অনুপ্রবেশ করে তখন তার সাথে কী কী ঘটে সেটি দেখি। তার প্রেমিকা অথবা তার জীবনসঙ্গিনী যাই বলুন না কেন, তাদের মনন ও চিন্তাশীলতায় পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ বিবর্জিত নয়। বেশিরভাগ নারী এমনভাবে পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শে বাঁধা যে তারা কোনভাবেই একজন পুরুষকে অসহায়, কল্পনাপ্রবণ, আবেগী অথবা ঘরকুনো হিসেবে দেখতে আগ্রহী নয়।
তাইতো প্রেমিকা অথবা সহধর্মিনী তারাও শয়নে-স্বপনে কেবল এমন একজন পুরুষকেই কামনা করেন যিনি হবেন তার অভিভাবক, যে পুরুষ তার জীবনের সকল অর্থনৈতিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দানে সক্ষম। কারণ নারীকেও তো পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের আলোকে এভাবেই শেখানো হয়েছে যে পরিবারের সকল অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব কেবলই পুরুষের। কারণ পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ একটি মেয়ে বাচ্চাকে এই শিক্ষায় শিক্ষিত হবার সুযোগ করে দেয় না যে একজন নারী তার নিজ ও পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিতে সক্ষম। তাকে শেখানো হয় না পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেয়ার জন্য তাকেও একটি ছেলের ন্যায়ে প্রস্তুত হতে হবে, তাকেও সমানভাবে সমানতালে তার জীবনসঙ্গিনীর সকল বিষয়ে সকল দায়িত্বকে ভাগ করে নিতে হবে। এ জাতীয় সুশিক্ষার সুযোগ আদৌ পিতৃতন্ত্র তাকে দেয় কি? নাকি সে কেবলই ভাবতে শিখে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শর গ্রাসে, পুরুষ হচ্ছে একমাত্র কামাইয়ের মেশিন, পুরুষের কঠোরতাই কেবল পুরুষের সৌন্দর্য, পুরুষকে কেবল শাসন করা মানায়। যে পুরুষ কান্না করে অথবা যে পুরুষ শাসন করার ক্ষমতা রাখে না অথবা যে পুরুষের মনটা নরম, সে আবার পুরুষ নাকি? তো খুব স্বাভাবিকভাবেই বেচারা পুরুষের সামনে আর কোন গতি থাকে না। না থাকে তার ঘর, না থাকে তার পর। তার বেদনা প্রকাশের কোনো জায়গা থাকে না অথবা তার বেদনা প্রকাশের কোনো সুযোগ তাকে পিতৃতন্ত্র করে দেয় না।

আবার ঘর থেকে বের হয়ে যে পুরুষ যখন তার বন্ধুদের কাছে তার জীবনের গল্প বা বাস্তবতা দুঃখ এসব কথা শেয়ার করতে যান, তখন আমার অনেক ছাত্রদের মুখেই শুনেছি, যে তাদের বন্ধুরা যে ধরনের সান্ত্বনা দেন তাদের বক্তব্য থাকে অনেকটা এরকম, “মামা তুমি এটা একটা কথা বললা, তুমি একটা পুরুষ মানুষ হয়ে এরকম ভেঙ্গে পড়লে তোমার চলে, আরে বাঁচবি ব্যাটা বীরের মতো, বাঘের মতো বাঁচ, নাইলে বউয়ের হাতে বিড়ালের মতো গলায় ঘন্টা পইরা বউয়ের আঁচলের তলায় থাকতে হইবো।” অথবা “শোন মামা, যদি টাকা থাকে পকেটে, পুরা দুনিয়া তোমার হাতে, টাকা ছাড়া ব্যাটাছেলে গো কোন পরিচয় নাই”, অথবা তুমি কেমন পুরুষ যে বউরে টাকা কামাই করতে পাঠাও, বউরে টাকা কামাই করতে পাঠাবা, আবার আশাও করবা যে বউ তোমার হাতের মুঠোয় থাকবে, তাইলে কেমনে হবে? বউ যদি ১০ টাকা কামাই করে তোমারে কামাই করতে হবে ১০০ টাকা, তাইলে দেখবা ঘরে শুধু শান্তি আর শান্তি।

অর্থাৎ পুরুষ পিতৃতন্ত্রের আদর্শ বা মতাদর্শকে এমনভাবে ধারণ করে যে তার আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো তার অনুভূতি তা প্রকাশের সকল রাস্তা বন্ধ করে দেয়। তাহলে কীভাবে পুরুষের বিষণ্নতা অথবা পুরুষের বেদনার গল্পগুলো আমাদের সামনে আসতে পারবে? তথাপি অনেক পুরুষকে এও বলতে শুনি পিতৃতন্ত্র একটি ভালবাসার নাম। দুঃখজনক হলেও ব্যাপারটা যেন অনেকটা এরকম, গাধার মতো পুরুষ কেবল সারাজীবন শুধু ঘানি টেনে বেড়াবে এবং মজা হচ্ছে পিতৃতন্ত্র যে পুরুষকে এরকম গাধা বানিয়ে রেখেছে দিনের পর দিন, সে বিষয়ে পুরুষের কোনো মাথাব্যথা নেই, বরঞ্চ এই গাধার মতো জীবন যাপন করেই সে মহা উল্লাসে উল্লসিত।

সবশেষে এতোটুকুই বলবো, পিতৃতন্ত্র যে কেবল নারীকেই থেকে বঞ্চিত করেছে তা নয়, পুরুষকেও তার মানুষ হবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, পুরুষকে তার মানবিক গুণাবলি আয়ত্ত করা থেকে বঞ্চিত করেছে, পুরুষকে তার মানবিক মূল্যবোধের বা অনুভূতি বহিঃপ্রকাশে বাধাগ্রস্ত করেছে।

কাজেই পিতৃতন্ত্রের এই বেড়াজাল থেকে যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরুষ এবং নারী উভয়ের মানুষজন বেরিয়ে আসতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কারো পক্ষেই মানুষ হিসেবে আমাদের মানবিক অনুভূতিগুলো প্রকাশের সুযোগ থাকবে না। আমাদের কারোরই আর মানুষ হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ থাকবে না। আমরা কেবলই বেঁচে থাকবো নারী অথবা পুরুষ হয়ে তথা একটি লিঙ্গ সর্বস্ব সত্তা হিসেবে।

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
পিএইচডি ফেলো, অকল্যান্ড ইউনিভারসিটি অফ টেকনোলজি,
নিউজিল্যান্ড।

শেয়ার করুন: