সেক্স, বিয়ে, সন্তান বর্জন করছে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা!

ইসাবেল রোজ:

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীরা জেগে উঠছে। তাদের প্রতি এতোদিন ধরে চলমান অনিয়ম, অবিচার, সহিংসতার প্রতিবাদ করে চলেছে। এক এক অঞ্চলের নারীদের সমস্যা একেক রকম। তাই সেইসব অঞ্চলের নারীদের প্রতিবাদের ধরন এবং ভাষাও ভিন্ন, আর এটাই স্বাভাবিক।

যেমন মেক্সিকান নারীরা লাল জুতো দিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ইরানের নারীরা হিজাব খুলে বাঁশের আগায় ঝুলিয়ে হিজাব মুক্ত হওয়ার প্রতিবাদ করেছে।
আরবের নারীরা একা চলাফেরা করার স্বাধীনতা চেয়েছে। সে দেশে পুরুষসঙ্গী বাধ্যতামূলক ছিল এতোদিন।
তেমনি দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা 4B movement দ্বারা বিয়ে, সন্তান, ডেটিং, সেক্স সবকিছু বর্জন করার আহবান জানিয়েছে।

কিছু সংখ্যক সাউথ কোরিয়ান নারী একত্রিত হয়ে পুরুষতান্ত্রিক নিয়মভঙ্গ করে বিয়ে সন্তান, প্রেম সবকিছু বর্জন করার আহবান জানিয়েছে।
বনি লী ৪০ বছর বয়স্ক একজন অবিবাহিতা স্ট্রেইট নারী, যার বয়ফ্রেন্ড বা হাজবেন্ড খোঁজার কোনো আগ্রহ তো নেই-ই, বরং তিনি প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ে, সন্তান ধারণ এসব কিছুরই বিপক্ষে। তিনি নারীর সাফল্যে এসব বিষয়গুলো বাধার সৃষ্টি করে বলে মনে করেন।

তিনি কিন্তু একা নন।
দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা বিয়ে এবং সন্তান ধারণের বিরুদ্ধে একটি মুভমেন্ট করছেন।
যাকে চরমপন্থী নারীবাদ বলে আখ্যায়িত করা যায়।
বনি লী মনে করেন, বিয়ের পর মেয়েদের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি হয়। তিনি তার এক পোষা কুকুরকে সাথে নিয়ে সিউলের পার্শ্ববর্তী শহরে বসবাস করেন।

বিয়ের পরিসংখ্যান হ্রাস পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। কারণ হিসাবে লী মনে করেন মেয়েদের কাছে তাদের সমাজের প্রত্যাশা অনেক বেশি, একটি মেয়েকে বিয়ের পর ঘরেবাইরে একযোগে কাজ করতে হয়, সন্তান লালন-পালন করতে হয়, ঘরে বয়স্ক বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি থাকলে তাদের দেখাশোনা করতে হয়। অথচ এতে তারা তাদের স্বামী বা পার্টনারের কোন সাহায্য পায় না। বয়স্ক মানুষদের জন্য সরকার খুব সামান্যই ভাতা দিয়ে থাকে।

ইসাবেলা রোজ

বনি লী দুই বিষয়ে মাস্টারস ডিগ্রী লাভ করেছেন।
তিনি বলেন, “বিয়ের বাজারে একটি মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা ক্যারিয়ারের কোন কদর নেই” শুধুমাত্র পুরুষের জন্য সবরকম সাপোর্ট বা ঘরোয়া কাজ করতে পারে কিনা সেটাই হয়ে ওঠে বিয়ের পাত্রীর একমাত্র যোগ্যতা।

তিনি আরও বলেন, “অনেক শিক্ষিত যোগ্যতাসম্পন্ন নারী মা হবার পর সবকিছু বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়, কারণ তারা সব একসাথে কুলিয়ে উঠতে পারে না। এক্ষেত্রে তাদের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

Kim Ji Young born 1982 নামে একটি সিনেমা নারীদের মধ্যে তূমুল জনপ্রিয়তা পায়। সিনেমাটি মূলত একটি বিতর্কিত নারীবাদী লেখিকার গল্প থেকে নির্মিত হয়। যার বিষয়বস্তু এরকম:
একটি মেয়ে তার বাচ্চাকে দেখাশোনা করার জন্য নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেয় এবং পরবর্তীতে তার বাচ্চাকে বড় করতে তার কতখানি সংগ্রামের মধ্যে জীবন পার করতে হয়, সেটাই সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা হয়।
এই সিনেমাটিকে নারী দর্শকরা ১০ এর মধ্যে ৯.৮ শতাংশ রেটিং দিয়েছে। যেখানে পুরুষ দর্শকরা রেটিং দিয়েছে মাত্র ২.৮।

সিউলে পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধে কিছুসংখ্যক নারী প্রতিবাদের উপকরণ হিসেবে 4B বা এস্কেপ দ্যা করসেট মুভমেন্ট শুরু করেছে।
এদেশে কর্মজীবী বিবাহিত মেয়েদের ঘরের কাজে পুরুষদের চেয়ে চার গুণ বেশি সময় ব্যয় করতে হয়।
এক দশক আগে দক্ষিণ কোরিয়ার ৪৭ শতাংশ নারীরা মনে করতো বিয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে। গত বছর সেই সংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৪ শতাংশ।
4B সদস্যদের রয়েছে চার হাজার ফলোয়ার।
(4B যারা ম্যারেজ, মাদারহুড, ডেটিং, সেক্সকে বর্জন করেছে)

ভিন্ন আরেকজন নারীবাদী আছেন যিনি বিয়ে বর্জনের বার্তাসহ ভিডিও পোস্ট করেন। তার সাবস্ক্রাইবার ১০০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

বনি লী বলেন, “আমাদের সমাজ এমন কিছু নিয়ম তৈরি করে রেখেছে যা আমি একজন নারী হিসেবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। তখনি আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি বিয়ে, ডেটিং আমার জন্য অনুপযোগী এবং অর্থহীন”।

ইউন ঝি হায় একজন ২৪ বছর বয়স্ক ইউটিউবার। যিনি বাস করেন মা-বাবার সাথে।
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েদের কাছে সকলের প্রত্যাশা তারা দেখতে বাবলি, বাচ্চাদের মতো হবে”। তার মতে, মেয়েদের সবসময় আকর্ষণীয়ভাবে সেজে থাকাই এই সমাজের প্রত্যাশা। ইউন ঝি প্রসাধনী ছাড়া চুল ছোট করে ঘুরে বেড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও তার এক্স বয় ফ্রেন্ড লম্বা চুল পছন্দ করতো। সে কখনই ইউনের ফেমিনিস্ট মুভমেন্টকে সমর্থন দেয়নি।

ইউন ঝি বর্তমানে 4B সদস্য। তিনি ডেটিং বা সেক্স কোন কিছুই আর মিস করেন না বলে জানান।
তার মতে, “নিজেকে সুখী স্বাচ্ছন্দ্যে রাখার অন্য আরও উপায় আছে”।

ইউন আরও মনে করেন কোরিয়ার পুরুষরা যাদের বয়স ২০-৩০ এর মধ্যে, তারা সবাই স্পাই ক্যামেরার লিকড ভিডিও দেখে থাকে শুধু তাই নয় তিনি মনে করেন এরাই তাদের এক্স গার্লফ্রেন্ডদের উপর প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে এসব ভিডিও প্রকাশ করে।
এই কারণে ইউন আর কোন পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারেন না।

4B এবং Escape the corset দক্ষিণ কোরিয়ার সবচাইতে চরমপন্থী নারীবাদী মুভমেন্ট। প্রচলিত সৌন্দর্যের মাপকাঠিকে এড়িয়ে এই প্রতিবাদী নারীরা মাথার চুল ছেঁটে ফেলে এবং সব ধরনের প্রসাধনী বর্জন করে চলে। যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় লাভজনক ব্যবসার মধ্যে প্রসাধনী অন্যতম।

Shin Gi স্টাম্ফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে 4B এর চারটি ক্যাটাগরি হলো –

১) ম্যারিজ
২) মাদারহুড
৩) ডেটিং
৪) সেক্স

এই চারটি বিষয় থেকে নারীরা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে চান, কেননা এই বিষয়গুলোর সাথে নারী যখনই জড়িয়ে পড়ে তখনই তারা পিছিয়ে পড়েন।
এস্কেপ দ্যা কোরসেট মুভমেন্টের মাধ্যমে মেয়েরা চুল কেটে প্রসাধনী ব্যবহার না করে পুরুষশাসিত সমাজের প্রত্যাশাকে প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ তারা মনে করে সমাজ যেহেতু তাদের প্রসাধনী ব্যবহার করে একটি সৌন্দর্যের মাপকাঠি দিয়ে মাপতে চায় তারা এই সৌন্দর্য বর্ধনে অংশ নিতে নিজেকে বাধ্য করতে চায় না।

দক্ষিণ কোরিয়ার মেয়েরা সন্তান ধারণে বিমুখ হচ্ছে। তাদের সন্তান ধারণের সূচক ০ দশমিক ৯৮ অথচ জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সূচক থাকা প্রয়োজন ২ দশমিক ১।
দেশটির সরকার এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিবাহিত দম্পতিদের সহজ কিস্তিতে বাড়ি কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে, যেন ভবিষ্যতে দেশটি জনশূন্য না হয়ে পড়ে।

বনি লী বলেন, “ভবিষ্যত নারীদের পক্ষে হবে”। তার স্বপ্ন যেই নারীরা চিরদিন অবিবাহিত থাকবে তাদের জন্য ভবিষ্যতে থাকার ব্যবস্থা করা।
তার স্বপ্ন পূরণ হোক।
বিশ্বের সব নারীরা নিরাপদ থাকুক।

তথ্য সূত্র: Japanese times

শেয়ার করুন: