একটি যৌন অত্যাচারের শেষ পরিণতি

সানজিতা শারমিন:

আজ আমার জন্মদিন। চার ভাইয়ের পর আমার জন্ম হইছে, তাই বাবা মা মেয়ে হওয়ার আনন্দে অভিভূত। আমার নাম রাখলেন ফুলী। আমার চার ভাইও আমি হওয়ার আনন্দে আমার আদর যত্নের কম রাখতো না।
ধীরে ধীরে আমি বড় হচ্ছি, এক সময় স্কুলে ভর্তি হলাম। বাসায় আমার ভাইরা আমাকে হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করতো।

আমাকে নিয়ে বাবা মায়ের কত স্বপ্ন, আমাকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করবে, ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিবে। মেয়ে জন্মের সাথে সাথে সব বাবা-মা-ই বুঝি এমন ভেবে রাখে।
দেখতে খুব মিষ্টি হয়েছি সবাই বলে। মা প্রতিদিন এখনো নিয়ম করে কপালের একপাশে কাজল টিপ দিয়ে রাখে নজর লাগবে বলে।

দেখতে দেখতে আমার বয়স ১০ বছর হয়ে গেল। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমি তখনো গোল ফ্রক আর হাফ প্যান্ট পরি।
এক বিকেলে জামার পিছনে রক্ত দেখে খুব ভয় পেয়ে যাই কী হলো এই ভেবে। তাড়াতাড়ি করে বাথরুমে গিয়ে দেখি পুরো পাজামা রক্তে ভেজা। কাঁদতে কাঁদতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে মাকে গিয়ে বলি।

মা শুনেই হেসে দিলেন। বোকা মেয়ে এভাবে কাঁদতে নেই, এটা স্বাভাবিক, মেয়েদের একটা নির্দিষ্ট বয়স পরে প্রতি মাসে নিয়ম করে এমন হয়। মা আমাকে এই সময় কী করতে হবে সব শিখিয়ে দিলেন। তবু আমি কাঁদছি, এটা কেমন স্বাভাবিক বিষয় বুঝতে পারলাম না। যাই হোক ধীরে ধীরে এ বিষয়ে আমার ভয় কেটে গেল, কিন্তু কেন এটা হয়, কী কারণে, তার কিছুই জানি না। আর জানার চেষ্টাও করিনি। আগের মতোই সবার সাথে খেলতে যাই স্কুলে যাই।

এই ঘটনার দুই-তিন মাস পর একদিন আমার খুব পেটে ব্যথা হয়, কিন্তু কাউকে কিছু বলি না। দেখতে দেখতে আমার পেট ফুলে যেতে লাগলো। হাত পাগুলো একদম শুকনা, আমাকে দেখলেই যে কেউ বলে দিতে পারবে আমি কতটা পুষ্টিহীনতায় ভুগছি। একদিন মা বাবাকে বললো, মেয়ের তো দেখি পেট ফুলে গেছে, কিছুতেই কমছে না, মনে হয় কৃমি হইছে, তুমি দুইটা ট্যাবলেট আইনো তো। বাবা দেরি না করে বাজারে গেলেন। সংসারের অন্যান্য বাজারের সাথেই আমার ঔষধ নিয়ে আসলেন। আমি তো ট্যাবলেট এর সাইজ দেখে ভয় পেলাম, এতো বড় ট্যাবলেট আমার গলা দিয়ে নিশ্চিত নামবে না। তাই জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম।

ততদিনে আমি ক্লাস ফাইভে উঠে গেলাম। একদিন আমার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো, কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। এ অবস্থা দেখে বাবা আর মা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে রেডি হলেন, আমি মাকে বললাম, মা, আমাকে আমার লাল ফ্রকটা দাও, আমি ওটা পরে যাবো ডাক্তারের কাছে। মা দিলেন বকা, এদিকে মরে যাচ্ছিস, কই যাবি ডাক্তার দেখাতে, আর ইনি ঢং করছেন। আমি আর কথা না বলে মা বাবা আর দাদিকে নিয়ে চললাম ডাক্তারের চেম্বারে।

চেম্বারে আসার পর ডাক্তার পরীক্ষা করে বিস্ফারিত চোখে জিগ্যেস করলেন, মেয়ের বয়স কতো? মায়ের আগে আমি হাতে গুনে বয়স হিসেব করে বললাম, আমার বয়স ১১ হবে সামনের মাসে। তখন উনি বাবাকে বললেন একে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। অবস্থা ভালো না। বাবা তাই করলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছুক্ষণ পর মা খেয়াল করলেন বিছানা ভিজে যাচ্ছে রক্ত আর পানিতে। মা তো ভয়ে জোরে চিৎকার দিলেন, ও আল্লাহ গো, আমার মেয়ের কী হলো! মায়ের চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি ডিউটিরত ডক্টর, সিস্টার ছুটে আসলেন আমার কাছে। আমি তখনও বুঝতে পারছি না আমার কী হচ্ছে। উনারা আমাকে নিয়ে গেলেন লেবার রুমে। মা পেছন থেকে চিৎকার করছে আর বলছে, আমার মেয়েরে আপনারা কই নিয়ে যান? মায়ের চিৎকারকে কেউ পাত্তা না দিয়ে আমাকে টেবিলে তুলে দিল। কিছুক্ষণ পর অসহ্য কিছু মুহুর্ত পার করার পর আমার একটা ছেলে বাবু হলো!
আমার মায়ের কোলে যখন বাবুকে দেয়া হলো, তখন মনে হচ্ছে উনি আর এই দুনিয়াতে আর নাই। বাবাও কেমন যেন রক্তশূন্য মনে হলো।

এদিকে আমি ভেবে পাই না মা বাবা খুশি না হয়ে এমন করে কাঁদছে কেন?? আমি তো ব্যাথা ভুলে গিয়ে খুব খুশি মনে মনে, একটা পিচ্চি বাবু পাইছি। কতদিন ধরে মাকে বলছি আমাদের আরেকটা বাবু হলে খুব ভালো হতো। আমাকে লেবার রুমে রেখে বাইরে বাবা আর মা ফিসফিস করে কী যেন বলছে, চল এটাকে গলা টিপে মেরে ফেলি। এ বাঁচলে আমরা খুব বিপদে পড়ে যাবো, আমাদেরকে গ্রাম ছাড়া করবে সবাই। আমি বুঝতে পারছি না, কাকে মেরে ফেলতে চাইছে। একটু পর শুনি আমার দাদী বলছে, বউ বাচ্চাটা আমার কোলে দাও তো, কী সুন্দর দেখতে! শোনো, ওকে মেরে ফেলার দরকার নাই, এর চেয়ে কাউকে দিয়ে দেই।

কিছুক্ষণ পর বাবা আমাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসলেন। বাড়ি ফেরার সারা রাস্তা বাবা মা আর দাদী কাঁদতে কাঁদতে ফিরলেন। আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না কী এমন হলো যে ওরা এমন করে কাঁদছে।
আমি ঘরে শুয়ে আছি, কিন্তু বাবুকে কেউ আমার কাছে দিচ্ছে না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না, কারণ কেউ আমার সাথে ভালো ব্যবহার করছে না তাই।

হঠাৎ করে দেখি বাবা প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে মাকে বলছে, ওকে জিগ্যেস করো, কে এমন ক্ষতি করলো আমার! যদি না বলে তাহলে আমি ওকে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দিব।
মা আর দাদী আমার বিছানার পাশে এসে বসলে আমি মাকে বলি, মা তোমরা সবাই এমন করছো কেন, আর বাবুকে কেন দিয়ে দিবে অন্যকে? ও তো আমাদের বাবু, কেন দিবে, বলো না মা, বলো না?
মা নিরুত্তর।

শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠে মা আমাকে জিগ্যেস করলেন, বলতো ফুলী, কে তোর এমন সর্বনাশ করছে?
আমি বলি, সর্বনাশ কই পাইলে মা, কই কিছুই তো হয়নি! তারপর আমারে অবাক করে দিয়ে দাদীও বলছে, বল না ফুলী, কে তোর সাথে এমন করলো? কার সাথে তুই এমন করেছিস?
আমি কিছুই মনে করতে পারলাম না।

কিছুক্ষণ পর হাসতে হাসতে মাকে বলছি, আমি কয়েকদিন আগে রুবির পেন্সিলের বক্স চুরি করেছি, আর খেলতে গিয়ে ঝগড়া করে রুবেলের মাথায় ঢিল মারছি। এর চেয়ে বেশি কিছু তো করিনি।
আমার কথা শুনে মা আমার দিকে অসহায়ের মতো তাকাচ্ছেন। এরপর বললেন, এগুলো না ফুলী। বলতো, তরে কেউ আদর করছে? কোন ছেলে মানুষ? আমাদের বাড়ির বাইরের কেউ?

আমার হঠাৎ মনে পড়লো, বেশ কয়েকমাস আগের এক দুপুরবেলার কথা।
সাথে সাথে মাকে বললাম, হ্যাঁ, মা, মনে পড়ছে। একদিন তোমরা কী যেন কিনতে হাটে গেছিলা, আর বাবা বাড়ি ছিল না, ভাইরাও সবাই স্কুলে ছিল। আমি সেদিন একা বাড়ি ছিলাম। হঠাৎ দেখি আমাদের পাশের বাড়ির কালাম ভাই আছে না, সে আমাদের ঘরে এসে বললো, ও ফুলী আমারে একগ্লাস পানি খাওয়া, আর আমার পা’টা একটু টিপ দে তো। আমি দিছিলাম। জানো মা, কালাম ভাই আমারে সেদিন অনেক আদর করছে, কিন্তু আমি প্রচণ্ড ব্যথাও পাইছিলাম।

আচ্ছা মা, তুমি বাবা, দাদী, ভাইরা যখন আমায় আদর করো, তখন তো আমি এমন কষ্ট পাই না, তাহলে তখন কেন পেলাম??
মাকে দেখি মুখে কাপড় গুঁজে অবিরাম কাঁদছে, দাদীও।

মা বাইরে গিয়ে বাবাকে কী যেন বললেন ফিসফিসিয়ে, আমি শুনতে পাইনি।
অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় আমি ঘুমিয়ে পড়ি, কিন্তু সকাল হতেই দেখি কালকের সেই ছেলে বাবুটা আর নাই। মাকে জিগ্যেস করতেই মা তেড়ে এলেন আমাকে মারতে। রাগ সামলে নিয়ে বললেন, কাপড়চোপড় গোছা, তরে তোর নানা বাড়ি রেখে আসমু, আর এখানে থাকা লাগবো না, স্কুলেও যাওয়া লাগবো না।
তারপর থেকে আজো আমি নানা বাড়ি থাকি।

আমার ছেলেবেলা হঠাৎ করেই কেমন করে কিছু বুঝে উঠার আগেই হারিয়ে গেল। কাটালাম এক বিভীষিকাময় শিশুকাল। আজ আমি ৩০ বছরের পূর্ণ নারী। সেইদিন অইসব না বুঝলেও আজ বুঝি আমার সাথে ঘটে যাওয়া দিনগুলোকে। আমি আজো খুঁজি আমার সেই সন্তানকে। যাকে নিজের জীবন ও শরীর চেনার আগেই মাত্র ১১ বছর বয়সে আমার দেহে ধারণ করেছিলাম।

(বিঃদ্রঃ এই ঘটনাটা একেবারে সদ্য জন্ম নেওয়া একটি সত্য ঘটনা। সঙ্গত কারণেই সেই ফুলীর আসল পরিচয় দেওয়া যায়নি। আমাদের সমাজে এমন অনেক ধর্ষক আছে, যারা ফুলীর মতো নিষ্পাপ শিশুর জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়, অনিশ্চিত করে দেয় জন্ম নেওয়া আরেকটা নবজাতকের জীবন, একঘরে করে দেয় ফুলীর বাবার সংসারকে।
যেই সমাজ ধর্ষকের জন্ম দেয় সে সমাজ ধর্ষকদের ইসোলেটেড রুম হিসেবেও কাজ করে, শুধু ফুলীদের পরিণতি হয় ডাস্টবিনে।)

সানজিতা ১৭/১০/১৬

শেয়ার করুন: