আজন্ম অভিশাপ!

জেসমিন আরা:

আঙ্গুরি বেগম দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল দশটা, তার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হয়। বাড়ির কলিং বেল বাজে, সে আতঙ্কিত বোধ করে। কিন্তু স্ট্রোকে অবশ হয়ে যাওয়া মুখে সে অভিবাক্তি ফুটে ওঠে না। বাড়ির কাজের মেয়ে খাদিজার সাথে তার রুমে ঢোকে ফিজিওথেরাপিস্ট বদরুদ্দিন। আঙ্গুরি বেগম প্রাণপণে তার অর্ধ আড়ষ্ট জিব নেড়ে খাদিজাকে তার কাছে থাকতে অনুরোধ করে, যা খাদিজার কাছে শুধু গোঙ্গানির মতই মনে হয়। বদরুদ্দিন ইশারায় খাদিজাকে বাইরে যেতে বলে, হতাশা আর অসহায়ত্বে আঙ্গুরি বেগমের দুচোখ জলে ভিজে উঠে।

এক দেড় মাস আগে রাতে বাথরুমে যাবার সময় মাথাঘুরে পড়ে যান, তারপর কী হয়েছিল সে তা জানে না। হাসপাতালের বিছানায় যখন চোখ খুলে বড় ছেলে মনুকে দেখে ডাকতে যায়, তখন বুঝতে পারে সে ভালো করে জিভ নাড়াতে পারছে না। এরপর ডাক্তার আর ছেলেদের আলাপ আলোচনা থেকে বুঝতে পারে তার শরীরের ডানপাশটা ও পা দুটা স্ট্রোকে অবশ মানে প্যারালাইজড হয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর শুরু হয়েছে ফিজিওথেরাপি। দিন দিন এই ফিজিওথেরাপিই তাকে মানসিকভাবে পীড়িত করে তুলছে। নিজের অবস্থা বোঝাবার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু তার আড়ষ্ট জিভ থেকে উচ্চারিত অনুরোধ, অনুযোগ, অনুনয়, কোনকিছুই আজ পর্যন্ত কারো কানে পৌঁছাতে পারেনি সে ।

সেই প্রথম দিন যেদিন তার ছেলের বউ স্নিগ্ধা বদরুদ্দিনকে তার ঘরে রেখে রান্নাঘরে ফিরে গিয়েছিল সেদিন থেকেই আশি বছর বয়সের আঙ্গুরি বেগমের জীবনে শুরু হয়েছে এই নতুন লাঞ্ছনা। বদরুদ্দিন তার পায়ের পাতার কাছে ম্যাক্সির প্রান্তটায় হাত রাখতেই তিনি মনে মনে কুঁকড়ে ওঠেন, ইচ্ছে হয় পাটা তুলে দুম করে একটা লাথি মারে। পক্ষাঘাতে আড়ষ্ট পা একবিন্দুও নাড়াতে পারে না, কিন্তু মনের ভেতরে জ্বলেপুড়ে খাক হতে থাকে সে।

বদরুদ্দিনের মেয়েলি কণ্ঠ কানে আসে,

“খালাম্মা, আইজকা আবার পায়জামা পিনছেন ক্যান? কাপড়ের উপার দিয়া কেমনে মাসাজ দিমু আপনেরে?” কথা বলতে বলতে বদরুদ্দিন তার পায়ের তলায় তেল মাখিয়ে শক্ত হাতে চাপ দিতে থাকে, তিনি একটু ব্যথা অনুভব করেন। আঙ্গুরি বেগম বুঝতে পারেন, একটু একটু করে তার অনুভূতিগুলো ফিরে আসছে। তার মনের কোণে একটু আশার আলো জ্বলে ওঠে, হয়তো অচিরেই তার এই গ্লানির অবসান হবে।

প্রথম যেদিন মালিশের ছলে বদরুদ্দিন তার যৌবন উত্তীর্ণ শরীরের গোপন স্থানে হাত দিয়েছিল সেদিন আঙ্গুরি বেগমের মন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, মনে পড়েছিল সেই ছেলেবেলা থেকে মেয়ে হয়ে জন্ম নেবার যাতনার কথা। মনের গোপন কুঠুরিতে জমিয়ে রাখা সব কষ্টের স্মৃতিরা একে একে নতুন করে বুকের ভেতরে সুনামির ঢল বইয়ে দিয়েছিল। সে কবেকার, যেন অন্য কোন জনমের কষ্টগুলো বুকের ভেতরে তুফান তুলেছিল।

সেই প্রথম মাকে ছেড়ে দাদীর সাথে থাকতে হয়েছিল, তার মা গিয়েছিল নানা বাড়ির কাছের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। দুদিন পর মা ফিরেছিল তার ভাই কামালকে কোলে করে। কত বয়স তার, তিন, কিবা চার। কিন্তু ঐ দুদিনে তার বয়স যেন বেড়ে গিয়েছিল কয়েকশগুণ। তার আশপাশের কেউ, এমন কি তার মাও জানতে পারেনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল তার নিষ্পাপ, ভাবনাহীন শৈশব। মাকে নিয়ে চলে যাবার সময় বাবা তাকে দাদীর কাছে রেখে যায়,

“মা, ওরে তোমার কাছে রাইখ্যা গেলাম, একটু দেইখা রাইখ”।

দাদী জোর গলায় বলেছিল,

“হেইডা আর আমারে কইতে হইবে না, আমি আমার নাতনিরে বুক দিয়া আগলাইয়া রাখমু।“ প্রথম রাতটা দাদীর কাছে কিসসা শুনে স্বপ্নের মতো কেটে যায়, ছোট্ট আঙ্গুরির মার কথা একবারও মনে পড়ে না। সকালে দাদী মুড়ির মোয়া, নারকেলের নাড়ু খেতে দেয়। দুপুরে পুকুর থেকে গোছল করিয়ে এনে দাদী তাকে সিম-আলু দিয়ে রান্না করা মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেতে দেয়। খাবার পর তার ভীষণ ঘুম পায়, দাদীর ঘরের চৌকিতে শুয়ে পড়ে। দাদী বলে,

“দাদু, আমি পুকুর থন থাল বাসুনগুলা মাইজ্জা, গোছল কইরা আসি, তুমি ঘরের বাইরে যাইও না। দাদী চলে যাবার পর মার কথা মনে পড়ে, একটু কান্নাও পায় তার। কতটুকু, বা কতক্ষণ ঘুমিয়েছে তা এখন আর সে মনে করতে পারে না। কিন্তু আজও তার স্পষ্ট মনে আছে সেই বীভৎস দৃশ্য। ঘুমের ঘোরে ছোট্ট আঙ্গুরি হঠাৎ অনুভব করে কেউ যেন তার জাঙ্গিয়ার ইলাস্টিক ধরে টানছে, চোখ মেলতেই দেখে ছোট কাকা তার পাশে বসা। কাকা হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে, আর অন্য হাতে তার পেশাবের রাস্তায় হাত বুলাতে থাকে। লজ্জায়, শরমে, শিশু আঙ্গুরির মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল তখন। একটু পরে কাকা তাকে ছেড়ে দেয়, আর বলে,

“এই কথা কাউরে কইও না কিন্তু, মাইনশে তোমারে মন্দ কইবে।“ দাদী ফিরে এসে আঙ্গুরিকে কাঁদতে দেখে জানতে চায়,

“কী হয়েছে দাদু, কান্দো ক্যান? মায়ের কথা মনে হইছে, চিন্তা কইরো না মা আইয়্যা পরবে।“ সে দাদীকে কিচ্ছু বলতে পারে না, শুধুই ফুঁপিয়ে কাঁদে। রাতে দাদু তাকে অনেক জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারে না। সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারে না সে, শুধুই ভয় হয় তার। মা ফিরে এসে আঙ্গুরির পরিবর্তন দেখে একটু অবাক হলেও, কিছু জানতে চায় না তার কাছে। ভয় আর শঙ্কা নিয়ে দিন কাটলেও কিছুদিন পর আঙ্গুরি ভুলে যায় সেদিনের কথা।

দশ বছরের আঙ্গুরি সকালবেলা ছোট ভাইয়ের হাত ধরে মসজিদের মক্তবে যায় আরবি শিখতে। সেদিন সকালে ভাইয়ের জ্বর, মা পাশের বাড়ির মাইমুনার সাথে মক্তবে যেতে বলে। মাইমুনাকে পাওয়া যায় না, মামা বাড়ি গেছে। শেষমেশ সে একাই সাহস করে মক্তবের দিকে ছোটে। ভেতরে ঢুকে দেখে মুয়াজ্জিন তফাজ্জল ঝুঁকে ঝুঁকে কোরান তেলাওয়াত করছে, তখনও আর কেউ সেখানে আসেনি। আঙ্গুরি ফিরে যাবার জন্য দরজার দিকে মুখ ফেরালে তফাজ্জল ডাক দেয়,

“আঙ্গুরি আরবি না পইড়া বাড়িত যাইতেছ ক্যান?” ভীত আঙ্গুরি উত্তর দেয়,

“হুজুর, এহনো সবাই আসে নাই, আমি একটু পরে আসি?“

“ওরা এহনই আইসা পরবে, তোমার বাড়ি যাওনের দরকার নাই। এইডা তো ভালো সময়, তোমারে ভালো কইরা পড়া বুজাইতে পারমু।“ সংকোচ ও দ্বিধা নিয়ে সে তফাজ্জলের সামনে বসে, রেহালের ওপর আম সিপারা মেলে ধরে। তফাজ্জল তার তুলার গদিওয়ালা আসন থেকে নেমে আঙ্গুরির এক্কেবারে সামনে এসে বসে। হাতের বেতটা দিয়ে ওর মাথা থেকে ওড়নাটা সরাতে চেষ্টা করে,

“এই গরমের মইদ্ধে মাথায় ঘুমটা দিছ ক্যান?” আঙ্গুরির সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যায়, সে যেন পাথর হয়ে যায়। তফাজ্জল পান খাওয়া ফাটা লাল ঠোঁটে ওর কপালে চুমু খায়। তার মুখের বিশ্রী আর উৎকট গন্ধে আঙ্গুরির বমি এসে যায়, সে ছুটে পালাতে চায়। তফাজ্জল খপ করে ওকে জড়িয়ে ধরে বুক, পিঠে হাত বুলাতে থাকে। এর মাঝে মসজিদের বারান্দায় ছেলেদের আওয়াজ শোনা যায়, তফাজ্জল আঙ্গুরিকে ছেড়ে দেয়,

“এই মাইয়্যা, মন দিয়া শোন, কাউরেই কিন্তক কিচ্ছু কইবা না। আর তোমার কথা কেউ বিশ্বাসও করবে না। কাউরে কইলে তোমার মাবাপ আর তোমার উপর আল্লার গজব পড়বে ।“

সেদিন সে আর আরবি পড়ায় মন দিতে পারেনি, তফাজ্জলই তাকে ধমকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে সে তার নিজের শরীরকেই ঘৃণা করতে থাকে, তার বাড়ন্ত শরীরের দিকে পুরুষের লালসার দৃষ্টিকে সে তার নিজের পাপ বলেই মনে করতে থাকে। চারপাশের কোন কিছুই তার আর ভালো লাগে না, নিজেকে এ পৃথিবীতে অবাঞ্ছিত ভাবতে শুরু করে সে। মা তার পরিবর্তন লক্ষ্য করলেও কোন সংশয় প্রকাশ করেনি, ভেবেছে মেয়ে তার বালিকা থেকে নারীতে রূপান্তরিত হচ্ছে।

তারপর কোথায় না মেয়ে হয়ে জন্মাবার পাপের শাস্তি পোহাতে হয়নি তাকে? প্রাইমারি ইশকুলের এসেম্বলি শেষে ক্লাসে ঢোকার সময় সহপাঠীর আনাকাঙ্খিত ছোঁয়া, বাড়ির লজিং মাস্টার, আত্মীয় সম্পর্কের কাকা, মামা, বাবার বান্ধু, জ্ঞাতি সম্পর্কের ভাইয়েরা, বাসের কনডাকটার, মার্কেটের ভিড়ের মাঝে, কত মানুষই যে তার এই শরীর নামক মন্দিরকে কলুষিত করতে চেয়েছে। কারো কারো চোখের ভয়ঙ্কর লোলুপ দৃষ্টি তাকে সাড়া জীবন তাড়িয়ে ফিরেছে। আঙ্গুরি বেগম তাই কখনও কন্যা সন্তানের মা হতে চায়নি, দুটি ছেলের মা হয়েছে সে।

জোয়ানকালে সে ভাবতো বুড়ো হলে আর কিছু না হোক পুরুষের লালসার দৃষ্টি থেকে মুক্তি মিলবে, তার সে ভাবনা মিথ্যে হয়ে গেছে। থেরাপি দিতে এসে প্রথম যেদিন বদরুদ্দিন থেরাপির নামে তার শরীরের গোপন আর অনাবশ্যক অংশ স্পর্শ করেছে, সেদিন মেয়ে হয়ে জন্মানকে মহা এক পাপ ছাড়া কিছুই মনে হয়নি তার। বিধাতার প্রতি প্রচণ্ড আভিমান হয়েছিল, মনের ভেতরে গুমরে উঠছিল হাজারো প্রশ্ন। স্রষ্টার কাছে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, “আমারে মাইয়্যা বানাইয়্যা জন্ম দিয়া ক্যান তুমি আমারে জনম জনম পাপী বানাইয়্যা রাখলা, মালিক! মাইয়্যা হওনের অভিশাপ কুনদিনই কি আমারে ছাড়বো না!”

****
লেখক পরিচিতি: জেসমিন আরা, ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করছেন। এযাবৎ চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে, এবং আরও দুটি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। আমার দ্বিতীয় কবিতা সঙ্কলন “মা তোমাকে” এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে।

শেয়ার করুন: