নির্ভয়ার মতো তনু, রূপারাও ন্যায়বিচার পাক

শামীম আরা নীপা:

২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রাতে দিল্লিতে চলন্ত বাসে ২৩ বছরের তরুণী নির্ভয়াকে ছয়জন মিলে গণধর্ষণ করেছিল। গণধর্ষণের পর শরীরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে নগ্ন অবস্থায় চলন্ত বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল নির্ভয়াকে। শুধু নির্ভয়াই নয়, তার সঙ্গী পুরুষ বন্ধুটির উপরও নৃশংস অত্যাচার চলেছিলো।

দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ছায়া শর্মা নিজের বাছাই করা পুলিশ সদস্যদের নিয়ে তৎক্ষণাৎ একটি তদন্ত দল গঠন করেন। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত সেই তদন্ত দল সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। সমস্ত ভারত এই ঘটনার প্রতিবাদে ও ধর্ষকদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো তখন।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে চারজনের ফাঁসির আদেশ দেয় দিল্লির ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। ঐ ঘটনায় অভিযুক্ত ছয়জনের মধ্যে একজন নাবালক বলে সংশোধনাগার থেকে তিন বছর পরে ছাড়া পেয়ে যায়। আরেক অভিযুক্ত রাম সিং জেলের মধ্যেই আত্মহত্যা করে। ২০১৪ সালে দিল্লি হাইকোর্ট চারজনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে। ২০১৭ সালে সেই রায় পুনর্বিবেচনা করে দেখতে আদালতে আর্জি জানিয়েছিল অন্যতম অভিযুক্ত অক্ষয় ঠাকুর সিং, যা ডিসেম্বর ২০১৯ এ খারিজ হয়ে যায়। ৭ জানুয়ারি ২০২০ মামলাটির রায় হয় এবং ২২ জানুয়ারি ২০২০ আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করার নির্দেশ দেয়।

অবশেষে গত ২০ মার্চ ২০২০ ভোরে চারজনকে একসাথে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। এটা গেল নির্ভয়ার ঘটনা। এবার ফিরে আসি অন্য ঘটনায়।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকার পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোঁপ থেকে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। ছাত্র পড়াতে গিয়ে আর ঘরে ফিরে আসতে পারেনি সে। তনু হত্যার ঘটনায় ২০১৬ সালের ২১ মার্চ তাঁর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহকারী ইয়ার হোসেন কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এ পর্যন্ত এই হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তিনবার বদল করা হয়।

২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর সকালে সিআইডির সদর দপ্তরের নতুন ভবনে তনুর বাবা, মা, ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল, চাচাতো বোন লাইজু জাহান ও চাচাতো ভাই মিনহাজ হোসেন গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে সার্জেন্ট জাহিদের নাম বলেন। তনুর মা আরও বলেন, সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকারী কে তা বেরিয়ে আসবে। কারণ সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে যাওয়ার পর জঙ্গলে তনুর মরদেহ পাওয়া যায়।

সর্বশেষ সন্দেহভাজন হিসেবে তিন জনকে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা তনুর মায়ের সন্দেহ করা আসামি বলেও জানায় সিআইডি। তবে তাদের নাম জানানো হয়নি।

২০১৯ এর আগস্ট মাসের পর তনু হত্যা মামলার আর কোন অগ্রগতির সংবাদ পাওয়া যায়নি। আজ চার বছর পরও তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তদন্তও শেষ হয়নি, ডিএনএ রিপোর্ট সম্পর্কেও কেউ কিছু জানে না এবং সংশ্লিষ্ট কেউ এই বিষয়ে খোলাসা করেও কিছু বলছে না, সেই হিসাবে চার বছর ধরে তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আদতে কোন অগ্রগতিই নাই।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজের আইন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে ছোঁয়া পরিবহনের একটি চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে পরিবহন শ্রমিকরা। পরে তাকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে যায় তারা। পুলিশ ওই রাতেই তার লাশ উদ্ধার করে।

রূপা হত্যাকাণ্ডের ১৭৩ দিন ও মামলার ১৭১ দিন পর মাত্র ১৪ কার্যদিবসের শুনানিতেই রায় হয়েছিল নিম্ন আদালতে। দেশের ইতিহাসে এতো দ্রুত কোনো চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হয়নি। রূপা হত‌্যা মামলায় ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চার আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেন নিম্ন আদালত। হত‌্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে এ রায় হলেও আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করায় তা থমকে আছে। এখনও আপিল শুনানি শুরু হয়নি। ফলে মৃত‌্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

উপরোক্ত তিনটি ঘটনার একটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে দিল্লীতে, অথচ বাংলাদেশের দুটো মর্মান্তিক ঘটনার একটির কোন অগ্রগতিই হয়নি এবং অপরটি নিম্ন আদালতের রায় সত্ত্বেও ঝুলে আছে, কারণ আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার অনিয়ম অনীহা।

তনু এবং রূপা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে আমাদের দেশের মানুষও বিক্ষোভে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল, কিন্তু তাতেও তদন্ত কিংবা বিচার এগুচ্ছে না। কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন হচ্ছে না। দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের মাধ্যমে আমাদের দেশ ধর্ষকদের প্রতি কোন সতর্কবাণী পৌঁছে দিতে পারছে না, কারণ এসব ঘটনায় এই দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের কোন মাথাব্যথা নাই।

প্রতিদিন ধর্ষণ হচ্ছে এবং অপরাধীরা বেশিরভাগই বিনা বিচারে পার পেয়ে যাচ্ছে এবং ধর্ষণের ব্যাপারে আরো সাহসী ও উৎসাহী হয়ে উঠছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ এই চার বছরে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৩০টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে, কিন্তু রায় কার্যকর হয়নি তখনো। ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় (ঢাকা, ঝিনাইদহ, জামালপুর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ ও নোয়াখালী) ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় দেখা যায়, ঐ সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের- এই যদি হয় অবস্থা তবে ধর্ষক ভয় কেন পাবে আর কেনই বা সমাজ ধর্ষণমুক্ত হবে, কীভাবে হবে?

ধর্ষণ ও তৎপরবর্তী হত্যার শিকার পরিবারগুলোর কথা কি ভেবে দেখেছেন কেউ? প্রায় সাত বছর পর নির্ভয়া হত্যা মামলার সুরাহা হয়েছে যেখানে তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার খুব দ্রুতই নিষ্পন্ন হয়েছিলো – এই সময়কালে পরিবারটি কি নারকীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছে, তা আমাদের বেশিরভাগ মানুষের ধারণার বাইরে। তনু’র পরিবারের অবস্থাটি ভেবে দেখুন একবার – উনারা অন্ধকার এক কূপের ভেতর বাস করছেন, আর রূপার পরিবারও জানে না তাদের জীবদ্দশায় এই মামলার রায় ও শাস্তি কার্যকর হতে দেখতে পাবে কিনা!

ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার সামান্য অংশই আইন-আদালতের সামনে আসে। ধর্ষণের মামলায় চূড়ান্ত সাজা হবার উদাহরণ খুব বেশি নেই বলেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আপোষ করে নেয় অনেকে। অথচ তনু ও রূপার পরিবার আপোস করেনি, তারা মামলা চালিয়ে যাচ্ছে, আর বিচারের ও শাস্তি কার্যকরের অপেক্ষায় আছে।

আদালতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্ষণের মামলায় বেশিরভাগ অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাবার মূল কারণ সাক্ষীর অভাব যা তনুর হত্যাকাণ্ডে দৃশ্যমান। অনেক সময় মামলার বাদীও শেষ পর্যন্ত মামলা লড়তে চান না নিরাপত্তা ও বিবিধ অসুবিধার কথা চিন্তা করে। তবে ভিকটিমের পরিবারের নিরাপত্তা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি পুলিশকেই নিশ্চিত করতে হয়, যদিও বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তনু ও রূপার পরিবারের মনোবল ও বিচারের দাবিকে কোনকিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি।

ধর্ষণের মামলা প্রমাণ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পক্ষের সদিচ্ছা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাক্ষী রেখে কেউ ধর্ষণ করে না। সেখানে মূল সাক্ষী হচ্ছে ভিকটিম এবং তার মেডিক্যাল রিপোর্ট। এক্ষেত্রে আর কিছুর প্রয়োজন নাই। ধর্ষণ মামলা দ্রুত শেষ করার কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। কিন্তু যখন ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় তখন ভিকটিম উপস্থিত থাকতে পারা সম্ভব না হলেও আলামত থাকে এবং তদন্ত ঠিকমতো এগুলো অপরাধীকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন কোন কাজ নয় যদি রাষ্ট্রযন্ত্র এই বিষয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের যথাযথ প্রশাসন ও সরকার এইসব ব্যাপারে কোন আগ্রহ প্রকাশ করে না।

ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে অপরাধীদের জামিন না দিয়ে বরং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের দেশে সেই পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাই না। বিভিন্ন সময় ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা থামছে না। ধর্ষণের কোনো ঘটনা নিয়ে তোলপাড় না হলে সেটির তদন্ত থেকে শুরু করে সবকিছুই ধীরে চলে। নুসরাতকে হত্যার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলে প্রধানমন্ত্রী যখন নির্দেশনা দেন, তখন এর বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। যদিও সেই রায় কার্যকর কতোটা হবে, তা নিয়ে যথেষ্টই সন্দেহের অবকাশ আছে। কিন্তু সকলেই রাষ্ট্রের নাগরিক, সকলের জন্যই একইভাবে আইনী প্রক্রিয়া এগুনো উচিত। শুধু একটা মামলা কোনো উদাহরণ হতে পারে না।

বিচার না হওয়া ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ। সাম্প্রতিক নানা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ধর্ষণ বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, বরং দেশে ধর্ষণ দিন দিন বাড়ছেই। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আসকের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ নারী। একইসঙ্গে নারীদের উত্ত্যক্ত করা ও যৌন হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯ সালে উত্ত্যক্ত হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১৮ নারী। আরও উদ্বেগজনক ঘটনা হলো- শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯-এ শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও নিখোঁজের পর মোট ৪৮৭ শিশু নিহত হয়েছে। আগের বছর নিহত হয় ৪১৯ শিশু।

ধর্ষণ প্রতিরোধে এবং রাষ্ট্রকে ধর্ষণ ও হত্যার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগে সোচ্চার থাকা ছাড়া আমাদের আর কোন ভিন্ন পথ সামনে খোলা নাই। আমাদের ঘর থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটা স্তরে শিশুদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন যেন তারা ধর্ষক হয়ে গড়ে না উঠে। সেইক্ষেত্রে তাদেরকে জেন্ডার বুঝাতে হবে, মানবাধিকার বুঝাতে হবে। রাষ্ট্রকে চাপ দিতে হবে যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মানবিকভাবে বড় হতে পারে, বিকশিত হতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই – তনু এবং রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত অগ্রগতি দেখতে চাই। নির্ভয়ার ধর্ষণ ও হত্যার বিচার ও শাস্তি কার্যকর হয়েছে যেভাবে, ঠিক সেইভাবেই তনু ও রূপা ধর্ষণ- হত্যা মামলার বিচার ও শাস্তি কার্যকর হওয়া দেখতে চাই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.