করোনা আতঙ্কেও পুরুষতন্ত্র ও ধর্মীয় উগ্রবাদ

রোকাইয়া জেরিন:

বর্তমান বিশ্বে সব থেকে বড়ো আতঙ্ক করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশেও করোনার প্রভাব শুরু হয়ে গেছে। মানুষ আতঙ্কিত এবং ভীত এই ভাইরাসের ভয়ে। কিন্তু উল্টো চিত্রও দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষই মানছে না কোন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সরকারে বিভিন্ন পদক্ষেপও ব্যর্থ হচ্ছে জনগণকে সচেতন করতে। এর মূল কারণ জনগণের অজ্ঞতা বলে আমি মনে করি না।

চায়ের দোকান, রাস্তায়, বাজারে অকারণে বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরুষেরা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেশিরভাগ পুরুষেরই তাদের নিরাপত্তার একটা মিথ্যা ধারণা থাকে। সমাজে পুরুষ মানেই ক্ষমতা, শক্তির প্রতিচ্ছবি। তাই পুরুষ তাদের সেই মিথ্যা অহংকারের বলি হচ্ছে প্রত্যেকটা মহামারীতেই।

জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আকিকোর মতে, Men may have a “false sense of security” when it comes to the corona virus. এবং এর জন্যই পুরুষের থেকে নারীরা ভাইরাসের কারণে কম প্রভাবিত হয়। যদিও ভাইরাসের শুরুতেই বারবার হাত ধোয়া এবং পরিষ্কার থাকার ব্যাপারে বলা হয়েছে, কিন্তু তুলনামূলকভাবে পুরুষের থেকে নারীরা বেশি মানছে এই পরিচ্ছন্নতার নিয়ম।

এদিকে বাংলাদেশের করোনা আক্রান্ত নারীদের বেশিরভাগই ঘরের পুরুষের কাছ থেকে এই রোগের জীবাণুটিতে আক্রান্ত। আশঙ্কা করা যায় দেশে করোনা আরো মহামারী আকারে দেখা দিলে আক্রান্ত নারীদের বেশিরভাগেরই আক্রান্ত হওয়ার কারণ হবে পরিবারের পুরুষটি। বেশিরভাগ নারীই আপ্রাণ চেষ্টা করছে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার, কিন্তু দেশীয় চিরায়ত সমাজব্যবস্থায় বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে এটি।

চাইনিজ সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশনের তথ্যমতে, যদিও নারী-পুরুষ সমানভাবেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু ভাইরাসে পুরুষের মৃত্যুহার ২.৮% এবং নারীর ১.৭% । অন্যদিকে ২০০৩ সালে হংকং এর SARS ভাইরাসের সময় ও পুরুষের মৃত্যুহার ৫০% বেশি ছিল নারীর তুলনায়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে পুরুষরা দুর্বল লিঙ্গ। বিজ্ঞানীদের মতে, শ্বাসকষ্টের অনেক ভাইরাল সংক্রমণের ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় পুরুষদের পরিণতি বেশ খারাপ হতে পারে। শুধু, শ্বাসকষ্টের ভাইরাল সংক্রমণ ই নয় অন্যান্য ভাইরাসের সাথেও নারীরা বেশি ভাল লড়াই করতে পারে । এ বিষয়ে রিসার্স অন ওমেন’স হেলথ অফিসের ডিরেক্টর ড. জানিন ক্লেইটন বলেন, মেয়েদের ইমিউন সিস্টেম পুরুষের তুলনায় শক্তিশালী। নারীরা যেকোন টিকা দেওয়ার পরে পুরুষের তুলনায় আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। বিজ্ঞান যতই প্রমাণ করুক নারীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তারপর ও পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজের পুরুষেরা নিজেদের পুরুষত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। আর তাদের এর মনোভাব করোনা ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে লক্ষগুণ।

এদেশের বেশিরভাগ বিবাহিত নারীই গৃহশ্রমের সঙ্গে জড়িত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত। নারীর শক্তভাবে না বলার ক্ষমতা এখনো দেয়নি সমাজ তাকে। এদিকে বিদেশফেরত পুরুষটি খুব সহজেই তার ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে স্ত্রী সন্তানকে। নারী সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞাতে আক্রান্ত হচ্ছে করোনায়। আবার গ্রামের প্রান্তিক নারী অথবা শহরের মধ্যবিত্ত গৃহবধূ নারীটি কতটুকু নিজে সচেতন এবং কি করতে পারছেন নিজেকে ভাইরাস মুক্ত রাখতে?? ধর্মীর গোঁড়ামি খুব সহজে পুরুষরাই ছড়াচ্ছে নারীর মধ্যে। অনেক সচেতন নারীও তার পরিবার প্রধান পুরুষটিকে শতচেষ্টা করেও সুরক্ষিত রাখতে পারছেন না।

বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থার আরেকটি অন্যতম কারণ ধর্মীয় গোঁড়ামি। করোনার হাত থেকে হয়তো আমরা মুক্তি পেতেও পারি, কিন্তু এদেশের উগ্রবাদী তথাকথিত ধার্মিকদের হাত থেকে আমাদের মুক্তি কি আদৌ সম্ভব? সরকার দেশে করোনা পরিস্থিতির জন্য সব ধরণের গণজমায়েত নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু এদেশের মানুষের ধর্মান্ধতার সুযোগ নিচ্ছে ধর্মীয় নেতারা। তারা মসজিদে ইসলামের ভুলভাল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, করোনা মুক্তির দোয়ার নামে হাজার হাজার মানুষের গণজমায়েত করছে, মসজিদে মুসল্লিদের ভীড় বাড়ছে, ইমামরা মুসল্লিদের বিভ্রান্ত করছে আরো বেশি। হুজুরদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে করা বিভিন্ন আজগুবি কথা বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ মানছে না সরকারি বিধিনিষেধও।

যখন চীনে প্রথম করোনা তাণ্ডবলীলা শুরু হয় তখন এদেশের ধর্মগুরুরা ফতোয়া দেয়, চীন মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলো তাই তারা আজ আল্লাহর প্রতিশোধে করোনায় আক্রান্ত। হুজুরদের ওয়াজ, মসজিদে ইমামদের খুতবায় এ কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গত ২০ মার্চ শুক্রবার ফার্মগেট সরকারি বিজ্ঞান কলেজ মসজিদের ইমাম খুতবায় জুমার নামাজে মসজিদে মাস্ক পরে আসা মুসল্লিদের নিয়ে উপহাস করেন। তিনি বলেন, হাঁচি হলো আল্লাহর নিয়ামত। এর মাধ্যমে শরীরের জীবাণু বাইরে বের হয়ে যায়। এছাড়াও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর করোনা মোকাবেলায় নেওয়া পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। যদিও একজন সচেতন মুসল্লির প্রতিবাদে লোকজন তাকে মারতে উদ্যত হলে তিনি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হোন।

এর চিত্র দেশের প্রত্যেকটি এলাকার। আর এই ধর্মীয় কুসংস্কার আর গোঁড়ামির জন্যই আজও দেশের মানুষ করোনা নিয়ে সতর্ক না। এছাড়াও করোনা নিয়ে তৈরি গুজবেরও কিন্তু শেষ নেই। অনেকে স্বপ্নে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক বা ঔষধ পাওয়ার কথা বলছে। মানুষ মধ্যরাতে ছুটছে থানকুনি পাতার পেছনে। কেউ বলছে, রসুন দিবে করোনা থেকে মুক্তি, আবার কেউ ছুটছে হুজুর বা ওঝার থেকে তাবিজের আশায়। করোনা মুক্তির জন্য হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে মাহফিল তো আছেই।

অথচ দীর্ঘদিন হাতে সময় থাকার পরও তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়নি সরকার এবং ব্যক্তিগত পর্যায়েও সবাই ছিল উদাসীন। স্কুল-কলেজ বন্ধ হওয়ার পর মানুষ ঘুরতে গেছে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়, কেউ গেছে গ্রামে। আর যারা ঢাকা আছে তারাও দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়।
আর যারা করোনাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে তারা কি আদৌ কোরআনের বা হাদিসের সাথে যোগাযোগ রাখছেন?

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 780
  •  
  •  
  •  
  •  
    780
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.