ভারতের নির্ভয়া বিচার পেলো, তনু, রূপা পাবে কবে?

সুপ্রীতি ধর:

২০ মার্চ ২০২০, ভারতের মহারাষ্ট্রের তিহার জেলে কার্যকর হলো ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত, আলোচিত ধর্ষণ মামলার চারজন আসামীর মৃত্যুদণ্ড। যেটি কিনা নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা নামেই সুপরিচিত। তিহার জেলের ইতিহাসেও এই প্রথম ঘটনা একসাথে চারজনের ফাঁসি কার্যকর। স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৫ টায় দণ্ডাদেশ কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে আসা লোকজনের মধ্যে একধরনের স্বস্তি নেমে আসে। স্বস্তি পায় নির্ভয়ার মায়ের মনও। তিনি সাক্ষাতকারে তার সন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, দেরিতে হলেও তিনি তার মেয়ের সাথে সংঘটিত নির্মম ঘটনার বিচার পেয়েছেন।

ভারতের সর্বস্তরের লোকজন এককথায় তাদের স্বস্তির কথা জানিয়েছেন। ইউনিয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এই ঘটনা শুধু ভারতই নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই একটা বার্তা দেবে। তিনি আরও বলেন, এতোগুলো বছর ধরে তিনি এক মায়ের লড়াইটা নিজ চোখে দেখেছেন, আজ খানিকটা হলেও সেই মায়ের কষ্ট প্রশমিত হবে।

সুপ্রীতি ধর

২০১২ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে বন্ধুর সাথে সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার পথে বাসের মধ্যে অত্যন্ত নৃশংস ও পাশবিক উপায়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল এক মেডিকেল স্টুডেন্ট। ধর্ষণ করেই সেদিন ক্ষান্ত হয়নি ওরা। যোনির ভিতরে শিক ঢুকিয়ে দিয়ে ভিতর থেকে ইনটেস্টাইন বের করে নিয়ে এসেছিল। কয়েকদিন হাসপাতালে লড়াইয়ের পর মারা যায় নির্ভয়া। তখন এই ঘটনা ব্যাপক নাড়া দিয়েছিল পুরো ভারত ছাড়াও সমগ্র বিশ্বে। ফুঁসে উঠেছিল সেদিন সবাই এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে। যার জের ধরে ভারতীয় আইনের সংশোধন পর্যন্ত আনতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী।

নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে তখন ফুঁসে উঠেছিল ভারত

 

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলো, অক্ষয় কুমার সিং, পবন গুপ্তা, বিনয় শর্মা এবং মুকেশ সিং। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর দুজনের একজন বিচার শুরুর পরপরই আত্মহত্যা করেছিল জেলে বসেই। আর ষষ্ঠজনের বয়স ১৭ বছর হওয়ায় তিন বছর সংশোধনাগারে থেকে বেরিয়ে আসে সে। মূলত এই কিশোরই সেদিন নির্ভয়াকে ধর্ষণের পর চলন্ত বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল রাস্তায়। আর নির্ভয়ার সাথে থাকা তার বন্ধুকেও নির্মমভাবে পিটিয়ে তাকেও ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল।

এর আগে তিন তিনবার তাদের ফাঁসির দণ্ডাদেশ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এবারও কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত জনমনে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। জানা গেছে একেবারে শেষ মুহূর্তে দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয়ে যায়।

গত কয়েকদিন ধরেই এমন একটি খবর শোনার জন্য মন উদগ্রিব হয়ে ছিল। নির্ভয়ার ঘটনাটি তখন এমন নাড়া দিয়েছিল, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সব কয়টা দেশে যে কেউই মন থেকে সরাতে পারেনি ওকে। একটা ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় ভারতীয় আইনের প্রতি আস্থা রাখা ছাড়া উপায়ও ছিল না। বিশ্বাসও ছিল, যেহেতু ব্যাপক জনমত ছিল নির্ভয়ার সাথে, ওর মায়ের আকুতির সাথে, বলতে গেলে প্রতিটি কন্যাশিশু, মেয়ে, নারী সবার ‘আপনজন’ হয়ে উঠেছিল নির্ভয়া। আর সেকারণেই তাকে ‘ভারতকন্যা’ উপাধিতেও ভূষিত করা হয়। আজ অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ সাজার মধ্য দিয়ে একটা ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে নারীদের পক্ষে।

ঘটনাটি ভারতে হলেও আমরা যারা দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা, আমাদেরও কম অর্জন নয়। আমার মনে আছে, ভারত যখন ফুঁসছে, তখন আমরাও এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে জড়ো হয়েছিলাম। দাবি জানিয়েছিলাম নির্ভয়াসহ বাংলাদেশেও যতোগুলো ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। দিল্লির ঘটনার পরপরই বাংলাদেশেও কতোগুলো চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল।

ধর্ষণ তো আমাদের দেশের জন্য নতুন কিছু না। এই মহামারী রোধে রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন কোনো মহল থেকেই কোনদিন কোনো ধরনের তৎপরতা, নির্দেশ কিছুই আমাদের চোখে পড়েনি, পড়েও না। ধর্ষণের প্রতিবাদে নারী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের প্রতিবাদও সেই অর্থে আমলে নেয়া হয়নি। তা না হলে এটি এমন মহামারী আকার নিতে পারতো না কখনও। তবে এখানে আমি বলবো, নারী সংগঠনগুলোর মধ্যেও ঐক্যের অভাব রয়েছে। ফলে কোনো একটি ঘটনায় কখনই যূথবদ্ধ কোনো আন্দোলন গড়ে উঠেনি।

সোহাগী জাহান তনু

এই তো সেদিনের কথা। কুমিল্লা সেনানিবাসেই ঘটেছিল ঘটনাটি। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল সেনানিবাসের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে। সেই হত্যাকাণ্ডের চার বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল ২০ মার্চ। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়েও এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ তনু হত্যার পর দেশব্যাপী ব্যাপক একটা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, কিন্তু সেনানিবাসে সংঘটিত ঘটনা বলে যেকোনো উপায়েই হোক না কেন সেই আন্দোলনকে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে খোদ তনুর বাবা-মা-ভাই। তারা স্বজন হারানোর শোক করার বিনিময়ে প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরছে।

এই রঙ্গ ভরা বঙ্গদেশে যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুখ খোলা যায় না এক তনু হত্যাকাণ্ডই তার যথেষ্ট প্রমাণ। হতাশ হয়ে, বিপর্যস্ত হয়ে আমরা বলতে বাধ্য হই যে, তনুকে আসলে কেউ হত্যা করেনি, ওকে ভালুকে খেয়ে ফেলেছে। যদিও আমরা জানি এই ভালুকটা আসলে কারা! কাদের বিরুদ্ধে আমাদের সকল মিডিয়ারও মুখে কুলুপ আঁটা! বাংলার দামাল ছেলেদের কীর্তি কাহিনী নিয়ে বলার মতোন শক্তি সামর্থ্য আসলেই নেই কারও, বলা চলে সেইরকম মেরুদণ্ডি প্রাণীও আজ নেই।

রূপা খাতুন

তারপর আসি টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে রূপা খাতুন নামের যে মেয়েটিকে ধর্ষণের পর ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তনুর মতোন ভাগ্য রূপার ছিল না, তাই সেরকম কোনো আন্দোলন গড়ে উঠেনি। কিন্তু লেখালেখি দিয়ে, বা অল্পবিস্তর প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হলেও রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার শাস্তি আমরা চেয়েছিলাম। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হোক ধর্ষক প্রতিরোধে, এটাই ছিল আমাদের চাওয়া। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র যখন পুরুষতান্ত্রিক হয়, নারী জীবন যেখানে তুচ্ছ হয়, সেখানে নারীকে ধর্ষণ তো রীতিমতোন পুরুষালী শক্তি প্রদর্শনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তার আবার বিচার কী!

তবে সুখের বিষয় যে, মাত্র ১৪টি কর্মদিবসের পর টাঙ্গাইলের চাঞ্চল্যকর রূপা খাতুন ধর্ষণ ও হত্যার মামলার রায়ে চারজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল আদালত। এ মামলায় একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শেষপর্যন্ত সেই বিচার কোন পর্যায়ে আছে, তা আমরা আর জানি না।

বরাবরই বলে আসছি, আবারও বলি, সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে কোনো সরকারই নারীর প্রতি সদয় হবে না, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, সর্বোপরি নারী যে একজন ‘মানুষ’, সেই বোধটাই তাদের মধ্যে কাজ করবে না। তার মানে আমাদের দেশে এমন একটি যুগান্তকারী বিচার দেখতে হলে আরও কত শত বছর অপেক্ষা করতে হবে, কে জানে! হয়তো আমরা যেদিন সত্যিকার অর্থেই ‘সভ্য’ হবো ‘অসভ্য’ থেকে, সেদিন হয়তো স্বপ্ন দেখলেও দেখতে পারি।

লেখক: সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার

শেয়ার করুন:
  • 639
  •  
  •  
  •  
  •  
    639
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.