উইকএন্ড আড্ডার জেন্ডার দৃষ্টিকোণ

তানবীরা তালুকদার:

প্রবাসে উইকএন্ড আড্ডা একটা খুব কমন প্র্যাক্টিস। সারা সপ্তাহের ব্যস্ততার পর একটু আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা প্রায় সবারই আরাধ্য থাকে। প্রবাসীরা সাধারণতঃ নিজেদের কমিউনিটির সাথে আর অ-প্রবাসীরা নিজেদের পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে। প্রবাসী আড্ডার বিষয়বস্তু লিঙ্গভেদে ছেলেদের আর মেয়েদের ভিন্ন হয়, এই নিয়ে বন্ধু-ভাই লেখক বিভিন্ন মনোবিদের উদাহরণসহ খুবই সুখপাঠ্য একটি লেখা পড়লাম।

আমি আমার স্বভাবনুযায়ী বলেছি, এ প্রসঙ্গ নিয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ আছে, আর তাতে অনুরোধ এসেছে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে লিখতে, যাতে দুটো লেখা যোগ করে খানিকটা পরিপূর্ণ চিত্র উঠে আসে। প্রথমেই বলে রাখছি, এই লেখাটি সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা থেকে যেহেতু লেখা হবে, এটা ইউনিক কিছু হবে না আর নেট ঘেঁটে বিভিন্ন তত্ত্ব তুলে আনতে গেলে, আলসেমিতে লেখাই হবে না, এটা নিতান্তই “অনুরোধের ঢেঁকি গেলা” টাইপ লেখা যেহেতু দ্বিমত পোষণ করেই ফেলেছি।

শুরুতেই খুব ছোটবেলার একটি ঘটনা শেয়ার করছি, আমরা সবে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে পা রেখেছি, স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলার আনন্দে, প্রজাপতি পাখায় উড়ে বেড়াচ্ছি। ক্লাশ হোক আর না হোক আমরা মোস্ট অবিডিয়েন্ট স্টুডেন্টদের মতো রোজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, ফাঁকা ক্লাশরুমে বসে থাকি, ইলেক্ট্রিসিটি নেই, ফ্যান ঘোরে না আর ঘুরলেও বাতাস কই যায় আমরা তা জানি না। গরমে সেদ্ধ হতে হতে ক্লাশে আড্ডা, সেটা শেষ করে সামনের এক ফালি মাঠে আড্ডা, তারপর টিএসসির মাঠে আড্ডা, সোজা কথায়, দুপুর না গড়ালে বাসায় ফেরাফেরি নেই। কিন্তু মেয়েরা এক দল আর ছেলেরা আলাদা দল। ঝগড়া নেই আমাদের, সবাই সবার নাম-টাম জানি, হাই-হ্যালো হয়, কিন্তু আড্ডা দেই আলাদা। তার হয়তো কারণ ছিলো, সদ্য তারুণ্যে পা রাখা আমরা সবাই যারা অভিভাবকদের মুঠো থেকে বেরিয়ে সবেমাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি, অনেক কিছুতেই আমরা তখন খানিক দিশেহারা। আমাদের গল্পসল্পও হয়তো খানিক বেপরোয়া। যেহেতু কো-এড থেকে আমরা আসিনি, স্বাভাবিক সংকোচ কাটেনি আমাদের।

তো একদিন আমাদের এক আহ্লাদী বান্ধবী বললো, আচ্ছা ছেলেরা কী নিয়ে গল্প করে?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে অন্য বান্ধবী বললো, আমরা যা নিয়ে গল্প করি ওরাও হয়তো তাই নিয়েই গল্প করে।
আহ্লাদী বান্ধবী মুখ লাল করে বলে উঠলো, ছিঃ ছেলেরা কী অসভ্য!

আমরা সবাই হো হো হেসেই ক্ষান্ত হইনি, অনেকদিন আমাদের মধ্যে এই বাক্যটি সাংকেতিক প্রবাদ-প্রবচন হিসেবে কাজ করেছে।

উইকএন্ড আড্ডায় সাধারণতঃ মেয়েরা রান্না-বান্না, জামা-কাপড়, বাচ্চাদের নিয়ে আলোচনা করে, যেটা হয়তো অনেকের দৃষ্টিতেই তেমন প্রডাক্টিভ কিছু না। কিন্তু কেন?

রান্না-বান্না শুধু মেয়েরা করে বলেই কি এই অবজ্ঞার চিন্তা? শুধু বাঙালি কিংবা বাংলাদেশ সমাজ দিয়েই কি সব বিচার করা যায়? আর সেটাও যদি মেনে নেই, মানুষের মৌলিক যে প্রেষণা তার মধ্যে খাদ্য গ্রহণ প্রথম আর প্রধান। বাঙালি বাবুরা নিজেরা রান্না না করলেও, রান্না ঘরে সাহায্য না করলেও, ভালো-মন্দ খেতে তারা পেছান না এবং রান্না ভালো না হলে অসন্তুষ্টি জানান দিতেও ছাড়েন না। তাহলে এই নিয়ে আলোচনা কী করে অগুরুত্বপূর্ণ হতে পারে!

বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন মানুষ একসাথে হয়, অনেকেই অনেক কিছু আলাদা রকমভাবে রেঁধে খায়, আবার অনেক কিছু যেমন এক পরিবারে খুব সাধারণ খাবার অন্য পরিবার সেটা জানেই না, নতুন কত কী জানা, শেখা হয়! অনেকেই আমরা দেশে থাকার সময় সেভাবে রান্নাবান্না করিনি, প্রবাসে এসেই শিখেছি, তাদের জন্যে বড়দের কাছ থেকে কিংবা অন্যদের কাছ থেকে, নানা টেকনিক জানা তো আমার দৃষ্টিতে দারুণ সাহসের কাজ। খাবার ছাড়া যেকোনো অনুষ্ঠান যেখানে অচল, সেখানে এই নিয়ে আলোচনা উপহাসের বিষয় হতে পারে কি!

মেয়েরা শাড়ি-কাপড়, সাজগোজ নিয়ে মেতে থাকে। হ্যাল্লোওওও – কথায় আছে, প্রথমে দর্শনচারী তারপরে গুণবিচারী, লুক মানুষের খুবই একটা জরুরি ব্যাপার। এই সমাজের প্রত্যেক জায়গায় মানুষের সাজ-পোষাক দিয়ে তার সামাজিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধার্মিক অবস্থান সম্পর্কেও একটা ধারণা করা হয়ে থাকে। এবং ধারণা খুব কমই ভুল প্রতীয়মান হয়।
ইউরোপের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ড্রেস কোড দেয়া থাকে। অফিসের মিটিং, পার্টি, বিজনেস ট্যুরের মেইলে, ড্রেস কোড উল্লেখ থাকে। বলতে পারেন, ঘরোয়া আড্ডায় এটা নিয়ে আলোচনা করার কী আছে? অবশ্যই আছে, আলোচনা না হলে, একজন আর একজন থেকে শিখবে কীভাবে? বিশাল একটা ইন্ডাস্ট্রি দুনিয়া জোড়া কাজ করছে, ব্যাপারটি কি এতোই হেলাফেলার? কত ডিজাইনার, কত ইনভেসমেন্ট! আর এটা নিয়ে সমালোচনা না করে বরং এভাবে দেখা যেতে পারে, পুরুষরা নিজেরাও এ নিয়ে একটু সচেতন হোন, সুন্দর – সুবেশী মানুষ দেখতে সবারই ভালো লাগে, হোক সে নারী কিংবা পুরুষ।

লেখক রিচার্ড ওয়াটার্স বলেছেন, “It Takes a Village to Raise a Child”. একটা বাচ্চার বিভিন্ন বয়সের সাথে তার মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন চাহিদা ও সমস্যা মোকাবেলা করে তাকে স্কুল, বাড়ি, বন্ধু বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সামলে বড় করে তোলা কি খুব সহজ ব্যাপার? বাচ্চাদের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস এগুলো নিয়ে পরিচিতদের মধ্যে আলোচনা, পরামর্শ নেয়া, আইডিয়ার আদান-প্রদান খুব স্বাভাবিক নয় কি? এখানে তো মা-শাশুড়ি কেউ পাশে নেই বুদ্ধি পরামর্শ দেয়ার জন্যে। ছোট বাচ্চারা অনেক সময় অনেক কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না, ডাক্তারের কাছে সব এক্সপ্লেইন করা কঠিন, সেসব ক্ষেত্রে স্বজনদের ছোট পরামর্শ তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

“বাচ্চা বড় করা” হেলাফেলার ব্যাপার কি এটা? এটা নিয়ে উন্নাসিকতা কিংবা তাচ্ছিল্য কী করে আসতে পারে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মায়েরাই যেহেতু দায়িত্ব নেয়, সিনসিয়ারলি ব্যাপারগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, সন্তানের মঙ্গল কামনায় তারা অস্থির হতে পারেন বইকি।

জীবনের এই মৌলিক-পারিবারিক ব্যাপারগুলোই তো বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। ঘর-পরিবার হলো প্রতিটি মানুষের ভিত্তি। ভিত্তি নড়বড় করলে বাকি কাজ চলবে কী করে? সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বরং বলতে হয়, পেট পুরে খাওয়ার পর আড্ডায় বসে, বিশ্বরাজনীতির এই আলোচনা ট্রাম্প আর পুতিন, হাসিনা-খালেদা, শফি হুজুর কিংবা ক্রিকেট খানিকটা মুখে মুখে রাজা-উজির মারা অথবা গুলতানি করার মতোই নয় কি? (নো অফেন্স মেন্ট টু এনিওয়ান) পৃথিবীর কোন প্রান্তের লিভিং রুমে বসে ভরপেট খেয়ে পিয়ে কারা কী নিয়ে আলোচনা করছে, তাতে কোন দেশের রাজনীতি কবে বদলেছে নাকি বদলায়? কিংবা ফেসবুকে লিখলামই খুব জ্বালাময়ী কিছু আর তাতে? আনপ্রোডাক্টিভ ইস্যু কোনগুলো সেগুলো এখন বিশ্লেষণ করা সময়ের দাবি নয় কি? রকবাজি আর কদিন!

আমার দৃষ্টিতে আড্ডা ব্যাপারটার “বিষয়বস্তু” নির্ভর করে অনেকটাই জীবনের কোন পর্যায়ে আছি আর কোন পরিস্থিতিতে আছি তার ওপর। যারা নতুন আসে, সেটেলিং ডাউন পজিশনে থাকে তাদের আড্ডার বিষয় থাকে বেশির ভাগ, বাড়ি কেনা, কোন কোম্পানিতে সেকেন্ডারি বেনেফিট কী কী আছে তার খোঁজ আর হিসেব-নিকেশ করা, নেদারল্যান্ডসে যেহেতু বেশিরভাগ এক্সপার্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষকেই বেতনের বায়ান্ন শতাংশ কর দিতে হয়, তার থেকে কী কী সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির আলোচনা, বাংলাদেশি মাছ কোথায় পাওয়া যাবে, হালাল মাংসের দোকান, মসজিদ, কোথায় রোজকার দিনযাপনের জিনিসগুলো একটু সস্তায় পাওয়া যাবে (বাংলাদেশ থেকে নেদারল্যান্ডসে আসা মাত্র এক ইউরো=প্রায় নব্বই থেকে একশো টাকার পার্থক্য) ভাষা শিক্ষা কিংবা ভাষা সমস্যা ইত্যাদি। একসময় কাগজপত্র ছাড়া ইউরোপে এসে কাগজ বানানোর একটা স্ট্রাগল ছিলো, সে ব্যাপারটা এখন অনেকটাই কমে গেছে, তাই সে প্রসঙ্গ বাদ।

বয়স আর একটু বাড়লে এরপরের ধাপে থাকে, কেনা বাড়িতে কী কী ধরনের কাজ করানো হবে, সেই কাজের জন্যে কোথায় কাকে পাওয়া যাবে সেসব নিয়ে আলোচনা, এর মধ্যে ট্যাক্স দিতে দিতে যেহেতু অভ্যস্ত হয়ে যায়, সেই ব্যথা কিছু তখন কমে আসে, জিনিসপত্রের দামের সাথেও এডজাস্ট করে ফেলে নিজেকে সেই প্রসঙ্গ ও আর আর্কষণীয় নয়, বরং দেশীয় খাবার দাবার মিস করাটা বেড়ে যায়। বাচ্চাদের প্রি-স্কুল, স্কুল ইত্যাদি নিয়ে কিছু তত্ত্ব ও তথ্যের আদান প্রদান। আগে সস্তায় দেশে ফোন করা, বাবা-মাকে বেড়াতে নিয়ে আসার ভিসা প্রসিডিউর, বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর সহজ ও সস্তা উপায়, সুপারমার্কেটে কোন জিনিসটা কী নামে পাওয়া যাবে এসবও আলোচনায় আসতো। এখন ওয়েবসাইট আর গুগল ট্রান্সলেশনের কারণে এই আলোচনাটা কমে এসেছে।

অনেক বড় অনুষ্ঠান হলে আলাদা কথা। কিন্তু ছোট ঘরোয়া আড্ডায় ছেলেরা- মেয়েরা সবাই একসাথেই বসি। আজকাল অনেক ছেলেই নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করতে ভালবাসে, আড্ডায় তাদের নিজেদের তৈরি করা ডিশ আসে, রান্নার রেসিপি ও ট্রিক এন্ড টিপস নিয়ে আলোচনা হয়, যারা ড্রিঙ্কস ভালবাসে সে নিয়েও আলোচনা হয়, মুভি লাভাররা একসাথে বসে সিনেমা দেখা হয় কিংবা নাটক, অনেক সময় বিভিন্ন রকম গেম খেলি, অনেকেরই হবি ফটোগ্রাফি, সেই নিয়ে গল্প হয়, অবশ্যই প্রফেশনাল লাইফের নানা ঝঞ্ঝাট, প্রমোশন, সুবিধা-অসুবিধা সব নিয়ে আলাপ চলে, অনেকেই বাড়ি বড় করার নানা প্ল্যানিং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে, আইডিয়া দেয়-আইডিয়া নেয়, ইউরোপের একটা সুবিধা, তিন বা চারদিনের ছুটিতেও টুক করে গাড়ি নিয়ে পাশের দেশে বেড়াতে যাওয়া যায়, সেসব নিয়ে গল্প আর এর ফাঁকে ফাঁকে গান এবং ডিস্কো তো আছেই। আর বাংলাদেশে যেহেতু কিছু না কিছু ঘটতেই থাকে তাই ধর্ম, রাজনীতি এসব কমন ফ্যাক্টর তো আলোচনাতে থাকেই। নেট ও ফেসবুকের কারণে আজকাল এগুলো মেয়েদের খুবই হাতের নাগালের ব্যাপার, তাই আলোচনা কিংবা তর্কে তাদের পিছিয়ে থাকার কোন কারণ তো নেই!

আড্ডা আলোচনা ব্যাপারটা যেহেতু খুবই পারিপ্বার্শিক আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে পড়ে, সুতরাং মেয়েরা কী নিয়ে আলোচনা করে কিংবা করে না’র ছকে ফেলে দেয়াটা আজকের প্রেক্ষাপটে হয়তো আর বাস্তবসম্মত নয়। আজকাল বেশিরভাগ মেয়েরই নিজের ক্যারিয়ার আছে এই প্রবাসেও। এই আধুনিক সমাজ কাঠামোতে বেশির ভাগ বাঙালি মেয়েই যেহেতু সারাদিন, “জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ” পেরিয়ে আসে, তাদের লাজুকলতা হয়ে আড্ডায় পিছিয়ে থাকার কোন কারণ তো নেই। বরং মেয়েরা সাহসী, বাস্তববাদী, যেসব ক্লান্তিকর, ক্লিশে, একঘেঁয়ে ব্যাপার থেকে ছেলেরা সারাবেলা পালাতে চায়, মেয়েরা বিনোদনের মুহূর্তেও তার থেকে পিছপা হয় না, সেটাকে প্যারালাল রেখেই আড্ডা, আনন্দ চালিয়ে যায় কিংবা তার মধ্যে থেকেই আনন্দ খুঁজে নেয়।

শেয়ার করুন:
  • 181
  •  
  •  
  •  
  •  
    181
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.