ভালবাসা হৃদয়ের, ভালবাসা শরীরের!

শেখ তাসলিমা মুন:

জানি ভালবাসা শরীরের শুনলে অনেকেই নাক কুঁচকে ফেলবেন। কিন্তু ভালবাসা হৃদয়ের এবং তার বহিঃপ্রকাশ শরীরেরও এবং বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভালবাসার প্রকাশ না থাকলে সেটি ধীরে ধীরে প্যাসিভ এক ফিলিং হয়ে একে অপরের ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি করে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ভালবাসা দুজন প্রাপ্তবয়স্কের সিদ্ধান্ত, তারা কিভাবে সেটি চর্চা করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত দুজন সে বিষয়ে একই প্লাটফর্মে এবং একে-অপরের সাথে কম্যুনিকেট করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি তাদের ভালবাসা। সমস্যাটা জট পাকায় যখন ভালবাসার ক্ষেত্রে দুজনের ভেতর কম্যুনিকেশনে ব্যাপক ভিন্ন ধারণা থাকে, এবং সেটি নিয়ে তারা একে অপরকে আঘাত করে। সে আঘাত ভালবাসাকে হত্যা করে।

আমি আমার এ ছোট্ট লেখনীতে বাংলাদেশের মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। কেন বলছি। ভালবাসার ক্ষেত্রে আমাদের নারীদের একটি ধারণা কাজ করে যে তারা ভালবাসার ক্ষেত্রে প্যাসিভ ভূমিকা পালন করবে এবং সবটাই পুরুষের দায়িত্ব। পুরুষের দায়িত্ব নারীর ব্রীড়া ভাঙানো। বিষয়টি একটি পর্যায় পর্যন্ত কাজ করে, কিন্তু পরে নাও করতে পারে। আমি শারীরিক ভালবাসার কথা বলছি। শারীরিক ভালবাসা বলে সেটি হৃদয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়, সেটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

অনেক নারীপুরুষ নিজেদের অসম্ভব ভালবাসা সত্ত্বেও তাদের ভেতর যৌন সম্পর্ক কমতে কমতে এমন একটি পর্যায়ে আসে যে, একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে তিক্ত অনুভব নিয়ে বাস করে যায়। নারী বলছে, সমস্যাটা তোমার। পুরুষ বলছে, তোমার এ ধরনের মন্তব্য আমার সেক্স ডিজায়ারকে হত্যা করেছে। অন্য নারীর ক্ষেত্রে আমি এমন অনুভব করি না। বলা বাহুল্য, এমন বক্তব্য আগুনে কেরোসিন হয়ে জ্বলে ওঠে।

মনের ভালবাসার জন্য দুজন দুজনের প্রতি যত্নশীল হতে হয় এবং তার বহিঃপ্রকাশ দরকারি। এ বহিঃপ্রকাশ ‘তুমি ওষুধ খেয়েছো?’ “ওয়ালেট সাথে নিয়েছো তো? “দুপুরের খাবারটি খেয়েছিলে?” শব্দাবলীই একে অপরের জন্য যথেষ্ট নয়, তবে দরকারি। আরও দরকার একে অপরের কপালে হাত রাখা। হাত ধরা এবং চুমু খাওয়া। কথাটি আঁতকে ওঠার মতো। কুড়ি বছর বিয়ে হয়ে গেলে কোনো স্বামী স্ত্রী একে অপরকে চুমু খায়?

কিন্তু বিষয়টি দরকারি। এবং এ ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষই চুমু বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে এসে ‘বুড়ো বয়সে ঝামেলা করো না’ বলে ধমক খায়। নারী বরং তার সংসারের, শরীরের একটু খোঁজ নিলেই খুশি হয়ে পড়ে বেশি। কিন্তু বিষয়টি উল্টো হওয়া উচিত। নারীকেই চুমু খাওয়ার বিষয়ে এগিয়ে আসা দরকার। ইনিশিয়েটিভ নেওয়া দরকার। এখানে একটি মনের আড় কাজ করে। নারীর ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকে প্যাসিভ ভূমিকা হিসেবে সমাজ নির্ধারণ করেছে। ভূমিকাটি সামাজিক। এটি একটি রোল। নারী সে রোল প্লে করে যাচ্ছে। নারী এগিয়ে আসলে বা এক্টিভ হয়ে উঠলে সেটি ‘নির্লজ্জতা’ বলে অভিহিত হবে বিধায় অনেক মেয়ে ডিলেমায় ভুগে থাকে। সেক্সের পুরোটাই পুরুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে।

মূলত এভাবে দীর্ঘদিন কাজ করেনা। শরীর পরিবর্তিত হয়। এক্ষেত্রে পুরুষের শরীরের ফাংশন এবং নারীর শরীরের ফাংশন এক নয়। এটি বায়োলজিক্যাল। একজন নারীকে জাগিয়ে তুললে সেটির সময়কাল দীর্ঘ হতে পারে। শুধু তাই নয়, নারীর যৌন উপভোগের দিকও মাল্টিপল। কিন্তু পুরুষের শরীর সেভাবে গঠিত নয়। তার দরকার হয় স্টিমুলেন্স। এ স্টিমুলেন্স যেমন মনের, তেমন শরীরের। তারুণ্যে যেমন সে জেগে উঠতে পারে মুহূর্তে, সামান্য বয়সের ছায়া পড়লে সেটি নাও হতে পারে। আর সেজন্য সে ইমপোটেন্ট, সেটি কিছুতেই নয়। যৌন সম্পর্ক স্থাপনে এখানে দুজনের সমান সক্রিয়তা ভীষণ জরুরি। নারী যদি মনে করেন যে বিষয়টির দায়িত্ব পুরুষের, তাহলে দাঁড়াবে, পুরুষ বার বার ব্যর্থ হচ্ছে, সে অভিযুক্ত এবং ব্যর্থ অনুভব করছে। যা তাকে মানসিকভাবে হীনমন্য করছে। বিষয়টি একটি দৈনন্দিন কলহ হিসেবে পরিণত হয়ে সেক্স লাইফ শেষ করে দিচ্ছে।

মনে রাখতে হবে ভালবাসা দুটি মন এবং শরীরের মিশ্রণ। দুজনের পারটিসিপেশনের ভিত্তিতে একটি সফল ভালবাসা গড়ে তোলার। সেখানে যার যখন হেল্প দরকার, তাদেরকে সে হেল্প করা জরুরি। যেহেতু পুরুষের যৌন উত্তেজনা এবং নারীর যৌন উত্তেজনার দৃশ্যমানতা এক নয়, সেহেতু এ ক্ষেত্রে পুরুষকে তৈরি করতে নারীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এভাবে দুজন দুজনের ভেতর আলো ও বিদ্যুতের কারুকাজে ভালবাসা গড়ে ওঠে। তারা অনেক বয়স পর্যন্ত সফল ভালবাসা উপভোগ করতে পারে। কেবল সেই সচেতনতার অভাবে অনেক কাপল দুর্ভোগ পোহায়।

শরীরের অক্ষমতা মনে প্রবেশ করে। নারী এবং পুরুষ উভয়কে নিজেদের শরীর বিষয়ে জানতে হবে যেমন জানতে হবে বিপরীত জনের শরীরও। কীভাবে এ শরীর ওয়ার্ক করে এবং করে না, সেটি জানাও দরকারি। যখন সে এনাটমি জানা হয় তখন ‘তোমার হৃদয় আমার হোক আমার হৃদয় তোমার’ যেভাবে ওয়ার্ক করে বা করবে বলে আমরা ভেবে নেই, শরীরের ক্ষেত্রেও সেটি কাজ করে। উভয়ের শরীর আপন না হলেও মন আপন হয় না, শুনতে আলাদা মনে হলেও বিষয়টি সত্য। হৃদয় ছাড়া অন্যের শরীর নিজের হয় না। শরীর ছাড়া হৃদয়ের অংশ হয়ে ওঠা হয় না। দুটি বিষয় এক না হলে ভালবাসা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। পূর্ণ হয়ে ওঠে না।

ব্রীড়া ত্যাগ করে ভালবাসার অভিব্যক্তি বিষয়ে মূর্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। শরীর ছাড়া ভালবাসা ব্যর্থ সেটি বলবো না, তবে স্পর্শ মনেরই অভিব্যক্তি। যে স্পর্শে মনের কথা লেখা থাকে। প্রতিটি স্পর্শের ভাষা আলাদা। প্রতিটি স্পর্শ একটি ভাষা। একটি শব্দ। মনের মতো শরীরের ভালবাসায় সফলতা দরকারি। ভালবাসা মনে এবং শরীরে পুষে রাখার বিষয় না। তাকে মুক্ত করার বিষয়।

শেয়ার করুন:
  • 591
  •  
  •  
  •  
  •  
    591
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.