মালতীর ছেলে ও ছেলের বউ

সাবরিনা স. সেঁজুতি:
পর্ব ১-

অবশেষে ছেলে-ছেলের বউ অন্যত্র বাসা নিয়েছে। এবার মালতী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। অনেকদিন ধরেই আকারে ইঙ্গিতে ছেলেকে বোঝাচ্ছেন, কিন্তু ছেলে বোঝে না।

একটাই ছেলে অবশ্য মালতীর, তাতে কী? আজকাল বিয়ের পর কি কেউ এক সাথে থাকে? তাছাড়া ছেলে বিয়ে করেছে নিজের পছন্দে। আজ মালতীর বড়লোক বান্ধবীর মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে হতো, তাহলে একটা কথা ছিল।

মালতীর বান্ধবী বলেছিল, মেয়ের বিয়েতে মেয়েকে সে ঘর ভর্তি করে জিনিস দেবে। কতই না স্বপ্ন দেখেছিল মালতী! কিচ্ছু হলো না। ছেলে গোঁ ধরলো যে এই মেয়ে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। শেষ পর্যন্ত মেনে নিতেই হলো।
তবু যাক বিয়ে তো ঠিক হলো, দেনা পাওনা ঠিক হবার আগেই ছেলে সোজাসাপ্টা মেয়ের পক্ষকে জানিয়ে দিল, মেয়ের বাড়ি থেকে উপহারের নাম করে কোনো ফার্নিচার-টার্নিচার আসলে সোজা ফিরিয়ে দেবে।

একথা শুনে মালতীর মাথায় সেদিন বাজ পড়েছিল। মালতী তার বোনকে দুঃখ করে বলেছিল, “আরে বাবা উপহার তো উপহারই, সব উপহারই কি যৌতুক নাকি?” কিন্তু মালতীর ছেলের এক কথা, মেয়ের বাড়ি থেকে কিছু নেয়া মানে সেটা যৌতুক-ই। ছেলের বাবাও কত করে ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করলো। ঘাড় ত্যাড়া ছেলে, সে কি আর বোঝে? কোন যৌতুক মানে কোন উপহার-টুপহার ছাড়াই শেষে ঘরে বউ আসলো।

তবু মালতী ভেবেছিল সব ভুলে বউকে আপন করে নিবে। ওরেব্বা ! তাই কি সম্ভব? মেয়ে কি আলাভোলা নাকি! বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দেওয়া মেয়ে। বিয়ের পরেই চাকরিতে ঢুকে গেল। সকাল আটটায় অফিসে যায়, রাত আটটায় আসে। বউয়ের চেহারা দেখাই দায়। তাহলে আর ছেলে আর ছেলের বউকে ঘরে রেখে লাভ কী? অন্তত ছেলে যদি আলাদা বাসা নেয়, বেড়াবার অছিলা করে হলেও তো বউয়ের সেবা পাবার আশা করা যাবে ।

এখন এক বাড়িতেই থাকে। সেবা করলে করলো, না করলে নাই। তাছাড়া সেবা করার মূলমন্ত্র তো রান্না ঘরে, সেটা তো আর এখানে সম্ভব না। কারণ এ বাড়ির রান্না ঘর মালতীর নিজের হাতে গোছানো। সেটা সে বউয়ের হাতে ছেড়ে দেবে না। রান্না ঘরেও যদি বউ ঢুকে পড়ে, তবে তো ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই বউয়ের রাজত্ব মেনে নিতে হবে।
চার মাসে আগে ছেলে জানালো, বউ পোয়াতী। সেদিন সে কথা শুনে মালতীর মাথা ভন ভন করে ঘুরে উঠেছিল। এই ভেবে যে এতো দিন তো চাকরি করা বউ মেনে নিয়েছে, এখন তার সন্তানও এসে ঘাড়ে চাপবে।

মালতীর বড় বোন এই কথা শুনে বলেছিল, “উড়েব্বাস! তা হবে না। একদিকে বাড়ির বড় ছেলে। তার উপর তার প্রথম সন্তান। তাই বাচ্চা হবার আগেই যদি ছেলে-ছেলের বউকে অন্যত্র পাঠাতে না পারিস মালতী, তবে এই আমি বলে দিচ্ছি- তোর সুখের দিন আর জীবনেও আসবে না।“

কিন্তু ছেলের বাবাকে সরাসরি বোঝানো কি যায়? কীভাবেই বা বলবে মালতী যে, সে তার একমাত্র ছেলের-ছেলের বউয়ের সাথে থাকতে চায় না। ছেলেকেও নানাভাবে বুঝিয়ে লাভ হয়নি। পোয়াতী বউকে ডেকে তো আর এসব কথা বলা যায় না।

তো একদিন খাবার টেবিলের ঘটনা। বাবা আর ছেলের একটু কথা কাটাকাটি হলো, ব্যস সেই সুযোগে এক রাতেই মালতী তার স্বামীকে বুঝিয়ে ফেলছেন যে, “ছেলে আলাদা বাসা নিলে সুবিধা বৈ অসুবিধা কিছু নাই। তুমি রাজী হয়ে যাও। ছেলে তো তোমার একটাই। যেখানেই যাক, বাবা-মাকে তো আর ভুলে যাবে না। তাছাড়া একই ছাদের নিচে থাকলে তো কয়েক বছর, কী এমন লাভ হয়েছে বলো? ছেলে-ছেলের বউ তো আছে তাদের মতো নিজেদের অফিস আর ক্যারিয়ার নিয়ে। আলাদা থাকলে তুমি-আমি যাবো মাঝে মাঝে তাদের বাসায় বেড়াতে। ছেলের বউ সেবা সুশ্রুষা করবে। একমাত্র ছেলে আমাদের, ফেলে তো দেবে না। আর লোকে কী বলবে সে চিন্তা তুমি করো না। আত্মীয় স্বজনকে আমি বোঝাবো।“

মালতীর যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সেই রাতের পর মাত্র দু সপ্তাহ লেগেছে ছেলেকে বুঝিয়ে দিতে যে তারা চাচ্ছে ছেলে আলাদা বাসা নিক। পাশাপাশি আত্মীয় স্বজনকে কম বেশি জানিয়ে দিলো, ছেলে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, কারণ ছেলের বউ চায় না যে ছেলে তাদের সাথে থাকুক। এই যুগে এসব কথা লোকজনকে বোঝাতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। ছেলের বউয়ের নামে ‘ক’ বললেই লোকজন ধরে নেয় সে কলকাতা বেড়াতে গেছে, তাও আবার একা। তাই মালতীকে শুধু গল্পটা শুরু করতে হয়েছিল। বাকিটা তারা নিজেরাই রচনা করে মুখে মুখে ছড়িয়ে দিলো।

এদিকে ছেলের বউ যেহেতু পোয়াতী, তার উপর অফিস করে। তাই এতো সব পারিবারিক পলিটিক্স সে বুঝলেও যে জড়াবে না, তা মালতী বুঝতো। শিক্ষিত বউ ঘরে আনার এটাই তো বড় সুবিধা। এসব শিক্ষিত আত্মসচেতন মেয়েগুলো পট করে নিজেকে অতোটা নিচে নামাতে পারে না। এমনকি মালতী যে চালাকি করে তাকে খাবার দাবারের কষ্ট দিতো, এসব কথাও হজম করে ফেলেছে বউ নিঃশব্দে। আজ যদি বউ তার মতো মফস্বলের মেয়ে হতো, তবে শাশুড়ির নাজেহাল অবস্থা করে ছাড়তো। তাছারা বউ নিজে কামাই করে, দরকার হলে বাইরে যেয়ে খাবে। মালতীর হিসাব পাক্কা।

তবে যতো যাই ঘটুক শেষমেষ মালতীর বুদ্ধির জয় হলো বলে সে আজ বেজায় খুশি। সব কিছুই তার প্ল্যান মতো হলো। ছেলের বউ গতকাল রাতেই চলে গেছে মা-র বাসায়, আর ছেলে সব ফার্নিচার নিয়ে যাচ্ছে আজ। তারা নতুন বাসা নিয়েছে।

মালতী বুঝতে পারছে, ছেলে নিশ্চিত কিছুদিন গাল ফুলিয়ে থাকবে। তবে, কত দিন? বাঙ্গালী সমাজে বেশি দিন তো আর ছেলে বাবা-মায়ের সাথে গাল ফুলিয়ে থাকতে পারবে না। তাছাড়া দুদিন পর ছেলের বাচ্চা-কাচ্চা হবে। সামাজিকতা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে।

মালতী মনে মনে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুললো, কী দারুণভাবেই না সে সবকিছু সামলে নিয়েছে। বড় আপার বুদ্ধি না পেলে সম্ভব হতো না। কী উত্তম সময়-ই না সে বেছে নিয়েছে আলাদা হবার। ছেলে- ছেলের বউ দু’জনেই ব্যস্ত অফিস আর পেটের বাচ্চা নিয়ে। তাই ছেলে মায়ের কথা এক বাক্যে মেনে নিয়েছে কোনো ঝামেলা ছাড়াই।

পর্ব -২
প্রায় বছর ঘুরতে চলল মালতীর সুখের দিন এসেছে।
মালতী ছেলেকে ফোন দিচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরছে না। ফোন রিং হয়ে কেটে গেল। একটা এসএমএস আসলো, আই অ্যাম বিজি।

মালতী যেমনটা ভেবেছিল তেমনটা হয়নি। ছেলে সামাজিকতা রক্ষার্থে মোটেও বাবা-মায়ের সাথে বাধ্যতামূলক সম্পর্কটা ধরে রাখেনি। নতুন বাসায় যাবার পর থেকে ছেলে ছাড়া ছাড়া। এর মাঝে ছেলের সন্তান হলো। মালতী স্বামীর সাথে ছেলের প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে হাসপাতালে গেলেও ঝামেলা এড়াবার জন্য পরের দিন-ই গ্রামে চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে ছেলের হাব-ভাব দেখে মনে হলো, যেন মালতী বিরাট কোনো অন্যায় করে ফেলেছে। সে ছেলে যাই ভাবুক, মালতী জানে সে কী করছে।

তবে মুশকিল হলো, এর পর থেকে ছেলের সাথে মালতীর যোগাযোগ শুধু কমেই চলেছে। আজকাল বলতে গেলে বন্ধ-ই। মনে মনে ছেলের বউকে গালি দেয় ঠিকই মালতী, কিন্তু মালতী নিজেও জানে আসলে রশি বেশি টাইট দিতে যেয়ে ছিড়ে গেছে।

ছেলের বউ তো ঠিকই তার বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখে। ফেইসবুকে তাদের ছবি দেখে মালতী। দেখলেই মালতীর পিত্তি জ্বলে ওঠে। মনে মনে অভিশাপ দেয় ছেলেকে, ছেলের বউকে আর বউয়ের আত্মীয় স্বজনকে।

শুধু একটা বিষয়ে ছেলের কাছে মালতী মনে মনে কৃতজ্ঞ না হয়ে পারে না। সেটা হলো মালতী ছেলে-ছেলের বউকে নিয়ে নিজের আত্মীয় স্বজনের কাছে যতোই খারাপ কথা বলুক না কেন, ছেলে সে বিষয়ে জনসম্মুখে রা’টি করেনি কখনও। ছেলে লোকজনকে বলেছে, বাবার সাথে বনছে না। মালতী মানে-মানে বেঁচে গেছে।

আজকাল জায়নামাজে দাঁড়িয়ে শুধু এই এক দোয়াই করে মালতী, যাতে শেষ বয়সে সমাজ-আত্মীয়-স্বজনের কাছে তার মান না যায়। তা না হলে যে মিথ্যা জাল সে বিছিয়েছে চারপাশে, ছেলে যদি মুখ খোলে, তবে তার জাতও যাবে, সবই যাবে।

শেয়ার করুন: