আমি তো আমার গল্প বলছি (পর্ব-৩)

0

দেবী গাফফার:

১২

ঘুনদুম, বাইশারীতে আমরা আছি, হেডম্যানের বাসায় যাচ্ছি তো যাচ্ছি, রাস্তা আর শেষ হয় না। সমতল রাস্তা শেষ, পাহাড় পার হতে হবে। মুষলধারে বৃষ্টি।
ভুট্টা ক্ষেতের মাঝখানে পিচ্ছিল রাস্তা। একটু বেখেয়াল হলেই শেষ। আবার ক্ষিদা, কাঁচা ভুট্টা খেলাম। রাতে কয়টায় পৌঁছাতে পেরেছিলাম আজ আর মনে নাই। আমার সারা শরীর জুড়ে জোঁক। শাক আর ভাত খেলাম, এতো মজাও হতে পারে? সকাল হলো, আবার হাঁটা শুরু।
বাসায় যখন পৌঁছালাম, সবার ছোট ভাইটা ১০৬ এর ওপরে জ্বর। মাথায় পানি দিতে হবে, পানি তো পাহাড়ের ওপর নাই। ওকে নিয়ে নিচে নেমে পাহাড়ি ছড়াতে নিয়ে যাই। আমি বাবা, মা পানি দিতে থাকি। ঐ যাত্রায় ও বেঁচে গেলো।

বিপদ যখন শুরু হয়, আর যাওয়ার নাম নেয় না। শুরু হলো আমার আর মায়ের জ্বর। কোরবানি ঈদ, আমরা মাংস খাইনি, ঐ পাহাড়ে কে মাংস দিবে! জ্বর হলে কতকিছু খেতে ইচ্ছা করে। আমার মনে হলো মাংস না খেলে আমি বাঁচবো না। ‘মা, আমি মাংস দিয়ে ভাত খাবো’। এই প্রথম বোধহয় আমি অবুঝ হলাম।

বাইশারীর সাথেই বার্মা বর্ডার। ঈদের দুইদিন পর। ঐ পাশে মায়ের এক দূর সম্পর্কের চাচা থাকে, সহজে যাওয়া যেতো, আমি আর মা গেলাম। মায়ের উদ্দেশ্য ছিলো, ঈদের পর পর যদি মাংস দিয়ে ভাত দেয়? ভাত আর দেয় না। চা বিস্কুট দিলো। আমরা চলে আসলাম, ভাইটার জ্বর ছাড়ে না।
বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন কক্সবাজার যাওয়ার। অভাব গেলো না, যাবে কী করে? কাজ তো করতে হবে, কে করবে? বাবার আর কাজ করতে হলো না।
এরেস্ট হয়ে গেলেন। এইসব ৭৪ থেকে ৭৮ এর মাঝখানে। আমি হুবহু সন তারিখ বলতে পারবো না। পেটে ক্ষিদা নিয়ে কে মনে রাখবে এসব? বিদ্যাই বা কতোটুকু?
বাবা জেলে।

দেবী গাফফার

আমরা দেখা করলাম।
আমি ছেলে ছেলে ভাব থেকে মেয়ে হচ্ছি। আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে মাকে বললেন, দেবীকে বার্মায় নানীর কাছে রেখে আসো। তখন ৭৮ সাল, এটা মনে আছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসা শুরু। পাসপোর্ট ভিসা লাগে না, ওই পার থেকে দলে দলে লোক আসছে। আমি, মা আর আমার দ্বিতীয় ভাইটা বার্মা গেলাম। আমরা বার্মিজ ড্রেস পরাতে মংডুতে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।

মা আমাদের দুই ভাইবোনকে রেখে আসলেন নানা বাড়ি। শুরু হলো নতুন কাহিনী। মায়েরা পাঁচ বোন। ছোট খালা বিয়ে করে নানীর কাছেই থাকে। খালা তো মহা খুশি, নতুন কাজের মেয়ে আসছে, আমি নানা বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে গেলাম। নতুন করে দেবীর পরীক্ষা শুরু হলো।
ভোর আজানের সময় উঠেই পানি আনা, অনেক দূরে পানির কূপ। খালার বাচ্চা হবে, দুই তিনবার গোসল করার সেই পানি। একটা বাসায় যত রকমের পানি লাগে। মরিচ বাটা, রান্নার কাজ করা। খালা বলতো, এগুলো তোমাকে কাজ শিখাচ্ছি। আহারে খালা আমার, আমি তো দেবী, কাজ শিখে গেলাম। ছয়-সাত মাস পর আমি আর ভাইটা চলে আসলাম।

তখন আমি একটু বড়। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি না। মানুষের ডাব সুপারি পেড়ে দিই না, বিলে মাছ ধরি না। কী হবে! আমি আর মা মিলে বুদ্ধি করলাম, ভোরবেলা আজানের আগে উঠে মিষ্টি আলু সিদ্ধ করে ভাইটাকে দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে পাঠাবো। কোনমতে চলতো, ছোট মানুষ আলুর হাঁড়ি মাথায় নেওয়ার বয়স ওর হয়নি। কষ্ট আমাদের ক্ষমা করেনি। দয়া মায়া ছাড়া আমাদের সাথে রয়েই গেলো।
ছোট ভাইটা আলু বিক্রি করতে গেলে মানুষ এমনি এমনি কেড়ে নিয়ে নিতো, মারতো। আমারও করার কিছু নাই। আবার সিদ্ধান্ত নিতে হলো,
এবার গলায় বাক্স ঝুলিয়ে পান বিক্রি কর, ভাইটা তাই করতো, কোনদিন না করেনি, বাক্সটা ছিল ওর চেয়ে বড়, এর ভারে কুঁজা হয়ে যেতো।
মনে পড়লে এখনও বড্ড কষ্ট পাই। ওর ওই খিলিপান বিক্রির টাকাতেই কোনো রকম ভাত আসতো। তিন বেলা সবাই খেতে পারতো। বাবা জেলে। বাবাকে মনে হয় কেউ তেমন একটা মনে করতো না। কেমন করে করবে, আমরা পেট যুদ্ধে তখন মরি মরি।
ভাইটার জন্য বড্ড মায়া লাগে, রাতে যখন ফিরতো, ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত, যেন পরাজিত শিশু সৈনিক। গলা থেকে পানের বাক্সটা নামিয়েই মাটিতে ঘুম।
কৃতজ্ঞতা ভাই, সোজা সরল বোকা ভাইটা আমার। এমন দুধের বাচ্চার কাঁধে আর যেন কোন বোঝা না ওঠে! আমার মায়ের মতো অসহায় যেন কোন মা না হয়! আর কোন অবুঝ বাবার ঘরে যেন কোন দেবীর জন্ম না হয়!
ভাইরা বড় হতে থাকলো, ওদের ভিতরে বাবার প্রতি রাগ জমতে থাকে।
কিছুদিন পর শুরু হলো নতুন উপদ্রব।

আমরা থাকতাম চাল বাজারের পিছনে, মান্নান সওদাগরের বাড়ির সামনে। তখন একটা টিম করা হয়েছিলো, সিকিউরিটি টিম (মনে হয় ৭৮ কী ৭৯)। ওরা যা খুশি করতো, মানুষকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে মারতে মারতে মেরে ফেলতো, কোন প্রতিবাদ চলবে না। কক্সবাজারের আতংক। ওদেরই এক নরপিশাচের চোখে পড়ে গেলাম আমি। ভাগ্য ভালো, এক আত্মীয়ের বাসায় আমরা যৌথভাবে থাকতাম।
সোজা ঘরে ঢুকেই বলতো দেবী কই, বারান্দায় বসে বার বার ডাকতেন। অসহায়ত্বের দুনিয়া। আমার চাচাতো বোন মরিয়ম বুবু ছিলো, ওকে বলতাম বুবু আমার ভয় লাগে, চলো আমার সাথে। রাগে শরীর কাঁপতো, আর মনে হতো ওই পিশাচটাকে কেটে টুকরো টুকরো করি।
প্রতিদিন বলতো, আমি অনেক রাতে আসবো, দরজা খুলে দিও। এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পর একদিন বললাম, আপনি আমাকে ভালোবাসেন? সে তো খুশিতে খই ফোটাচ্ছে। কী বলো, ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি। কী বলেন, আমি বিশ্বাস করি না। তাহলে একটা চিঠি দেন? আমি আগে চিঠি পড়ে পড়ে আপনার প্রেমে পড়বো, তারপর রাতে দরজা খোলে দিব। সেদিনের মতো অফিসার লেজ নাড়াতে নাড়াতে চলে গেলো। পরের দিন গাধার বাচ্চা ওর অফিসের পেড এ নিজ হাতে লিখে দীর্ঘ প্রেম প্যাঁচাল নিয়ে আসলো।
বাসার সামনেই মান্নান সওদাগরের বাড়ি। ওনারা সম্ভবত তিন বোন। এক বোনের জামাই সেই সিকিউরিটি কোম্পানিতেই চাকরি করেন। ওই আপার কাছে সব খুলে বললাম। আপা জানতে চাইলেন কোন প্রমাণ আছে কি না! চিঠির একটা পৃষ্ঠা দিলাম, বাকিটা আমার কাছে।
আমি একাই আমাকে বাঁচানোর যুদ্ধ করছি। বাসার অন্যরা জানলে এতোবড় সিদ্ধান্ত নিতে দিবে না। যে কোনো অপরাধ দেখিয়ে বাসার লোক ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে।

পরের দিন বিকালে দেবীইই দেবীইইই (হাহা) তুমি তো আমার আপন বোন, মায়ের পেটের বোন। আমাকে ক্ষমা করো। তখন ও মাইনকা চিপায়। এতোগুলো লোকের ঘুম হারাম করা কুকুরটা যেন একদিনেই ঘেউ ঘেউ করা ভুলে, মাথা নিচু করে কাঁইইইই কাঁইইই করা শুরু করলো।

সেদিন দেবী জেগেছিলো। ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, এখন এই মুহূর্তে চলে যান, না গেলে জায়গা মতো কিক্ মারবো। (বার্মায় বড় মামার কাছে কারাতে শিখেছি) কুঁই কুঁই করতে করতে চলে গেলো। ওর চাকরিও গেলো। সে তার কর্মফলের গাট্টি বোঁচকা বেঁধে কক্সবাজার ছাড়লো। মান্নান সওদাগরের মেয়ে, আপুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা নাই।
আমি শিখে যাচ্ছি আগামীর পথ চলা, আমাকে আমার রক্ষা করা।

১৩

দিন তো আর থেমে থাকে না। আমাদের দিনও কেটে যাচ্ছিল। আরও কত না বলা কথা রয়ে গেলো। আমি ভাগ্যবতী, আমার কষ্টের কথা সবাই শুনছে। আমি বলছি আর বুকে বয়ে বেড়ানো ভারি পাথর খানা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে।
সবার ছোট ভাইটা বোধ হয় বাঁচবে না। সারা শরীর ফুলে উঠলো, হাত পা পেটে পানি চলে আসলো। কোথায় ডাক্তার, কোথায় টাকা, আমার মা আমার দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে।
দুঃখকে স্বীকার করো না, সর্বনাশ হয়ে যাবে।
দুঃখ করো না, বাঁচো, প্রাণ ভরে বাঁচো।
বাঁচার আনন্দে বাঁচো। বাঁচো, বাঁচো এবং বাঁচো

কী করবো আমি? সবার ছোট হওয়াতে ও আমার বেশি আদরের। ওই বয়সেই যেন মায়ের ভূমিকা আমি নিয়েছিলাম। সবাইকে জিজ্ঞেস করি আমার ভাইটার এই অবস্থা, কী খাওয়াবো? এক খালা বললো, সোনা সিঁদুর মার্বেল দিয়ে গুঁড়ো করে খাওয়াও। ভোরে হাঁটাও। আমি তাই করতে থাকলাম। বেঁচে গেলো।
৮০ সালের দিকে বাবা নির্দোষ প্রমাণ হয়ে বের হলেন।
বের হয়ে দেখলেন, আমাকে সাথে রাখা ঠিক হবে না।

মাঝির ঘাটে আমার জ্যেঠার বাড়ি। আমি চলে গেলাম জ্যেঠার বাড়ি, আমার নিরাপত্তার জন্য। বাবা বললেন, ওখানেই থাকো, ভালো পরিবেশ, ভালো থাকবে। যৌথ পরিবার, কামলা সব মিলে বিশ-পঁচিশ জন। ভাই বোন তের জন। বাজার আসছে, রান্না হচ্ছে।

ভোরে আজানের সাথে সাথে সবাই নামাজে দাঁড়াচ্ছে। স্বর্গীয় পরিবেশ। আমিও রান্না ঘরের দায়িত্ব অনেকখানি নিলাম। সন্ধ্যা হলেই সবাই পড়তে বসতো। আমার ভিতরে পড়াশোনা করার আকাংখা, আহা আমিও যদি পড়তে পারতাম! অনেকগুলো ভাইবোন বিভিন্ন ক্লাসে। যে যা পড়তো, মনোযোগ দিয়ে ওদের পড়াশোনা শুনতাম। সবাই আদর করতো।

জীবনে ভালো যা শিখেছি কিছু বাবার কাছে, বাকিটা এই জ্যেঠার বাসায়। ঐ বাসার সবার প্রতি, প্রতিটি মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার সাথে ভালোবাসাও ওদের প্রতি।
কিছু মাস পর বাবা বাংলাদেশে থাকবেন না। সৌদি যাবেন, বাবার বড় ভাই সৌদি থাকেন। বাবার ইচ্ছা, মরলে ওখানেই মরবেন। চলে গেলেন।

মাসে মাসে টাকা পাঠাতেন। আমাদের পৃথিবী অন্য রকম হলো, ভাইবোন মিটিংয়ে বসলাম কে কোন স্কুল এ ভর্তি হবো! আমি বেসরকারি গার্লস স্কুলে ভর্তি হলাম ক্লাস সিক্স এ। এখন? থ্রি ফেল করা আমি সিক্স এ হাবুডুবু খাই। চ্যালেঞ্জ হয়ে গেলো রীতিমতোন। রাত দিন পড়া আর পড়া।
ফাইনাল পরীক্ষা, রেজাল্ট আসলো আমি ক্লাস এ ফাস্ট , স্কুল ফাস্ট। স্কুলের রেকর্ড থাকলে হয়তো আমার নাম এখনও আছে। আমার কনফিডেন্স বেড়ে গেল।
আমার বন্ধুরা সবার কথা মনে পড়ে। বেবী, বিজু, বিনু, হাছিনা, পুতুল, পাপিয়া আরও অনেক। বিশেষ করে সেরাজু আল্লাহর কাছে চলে গেছে। সেরাজু ভালো থাকিস বন্ধু।
অত:পর আমার জীবনেও প্রেম আসলো…।

১৪

বাবা টাকা পাঠালেন একটি জমি কিনে বাড়ি করার জন্য। কালুর দোকান পাহাড়তলিতে জায়গা কেনা হলো। কিন্তু রেজিষ্ট্রেশন হলো না। কারণ নাবালকের সম্পত্তি।
কালুর দোকানের পাশেই হাসান মাস্টার এর বাসায় ভাড়া থাকি। এক রুম এক বারান্দা। পাশের রুমে থাকেন আঁখির মা। মাঝখানে কাঠের পার্টিশান। ওই রুমে কী কথা হয় আমরা শুনি, আমাদের কথাও উনারা শুনতে পান।

মাঝে মাঝে এক ছেলের গলার আওয়াজ শোনা যেতো। বিভিন্ন হাসির গল্প, কথাবার্তা শুনি। একদিন আঁখির আম্মা আমার হাতে একটা চিঠি দেন। পড়ে দেখি দীর্ঘ প্রেমপত্র।
আমার তো ঘুম হারাম হয়ে গেল, কে সে, দেখতে কেমন! ভিতরে অস্থিরতায় সারাদিন গেলো, রাত আটটার দিকে সেই গলার আওয়াজ। কাঠের ফাঁক দিয়ে প্রথম দেখি। পরে উনার পরিচয় শুনে আমি চিনতে পারি। ছোটবেলায় বাবার সাথে উনাদের বাসায় যেতাম, উনাকে দাদা ডাকতাম। চেহারা মনে নাই। কক্সবাজারের বনেদি পরিবার। অনেক ভাইদের মধ্যে উনি সবার ছোট। উনি বি এ পড়েন, আর আমি সেভেন থেকে এইট এ।

অনেক চিন্তা ভাবনা করে আমি উত্তর দিই। আঁখির মা চিঠি দেওয়া নেওয়া করে। স্কুল ছুটির পর গার্জিয়ানদের সাথে উনি দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই দাঁড়িয়ে থাকাটাই আমার কেমন যেন ভালো লাগতো। জীবনযুদ্ধের মাঝখানে যেন এক মুঠো সুখের বাতাস বয়ে যাওয়া।
ততদিনে আমাদের জায়গায় দুই রুমের টিনশেড বাসা হলো। আমরা বাসায় উঠে যাই। গার্জিয়ানদের মাঝখানে আমার দু-চোখ উনাকে খুঁজে বেড়াতো। হয়তো ওটাই ভালোবাসা।
প্রেম কাহিনী উনার ভাইদের কানে পৌঁছাতে সময় লাগেনি। শুরু হ’য়ে গেলো “কাভি নেহি কাভি নেহি ” পর্ব।
আল্লাহ তো মুচকি হাসেন, আর চাবিকাঠি নাড়ান। যা টাকা ছিলো বাড়ি বানাতে শেষ। পরের মাসে বাবা আর টাকা দেন না। চার ভাইবোনের পড়াশোনা খাওয়া। বাবাকে পর পর চিঠি দিলাম।
একদিন উত্তর আসলো, তোমরা এখন বড় হয়েছো, তোমাদের ব্যবস্থা তোমরা কর। আমাদের পৃথিবী আবার ওলট-পালট হ’য়ে গেলো।
পাশে একজন মহিলা ছিলো, আংগুরের মা। তাকে দেখতাম সিমেন্ট এর খালি বস্তা দিয়ে ঠোংগা বানাতো। না খেয়ে তো আর থাকা যায় না।
মাকে বললাম, ভাইকে পাঠিয়ে সিমেন্ট এর বস্তা কিনে আনেন। তাই হলো। একটা বস্তা তিন টাকা। এখন বানাবো কীভাবে? কোনদিন তো বানাইনি। আংগুরের মায়ের কাছে গিয়ে বলি, দেন, আমি আপনাকে হেল্প করি। এভাবে শিখে নিলাম।

রাতের বেলা মা আর আমি শুরু করলাম, মাপমতো করতে হয়। কাপড় কাটার মতো। ভুল হলে ঠোংগা কোনো সাইজের হবে না। মাকে শিখিয়ে দিলাম। হারিকেন এর আলোয় সারা রাত ধরে বানিয়ে ভোরে ভাইকে বাজারে পাঠাতাম বিক্রির জন্য। যার কারণে এখনও কোন পেশাই আমার কাছে ছোট মনে হয় না।

বিক্রি করে যা আসতো চাল, আলু, তা দিয়েই চলতাম। আবার শুরু হলো আরও ভয়ংকর দিনরাত। তখন আমরা বড়ো হচ্ছি। দিনের বেলা বস্তা লুকিয়ে রাখতাম, রাতে শুরু করতাম।
সকাল দশটায় স্কুল। এতো কষ্ট করে পড়ালেখা ভালো লাগতো না।
এক রিকশাওয়ালা প্রতিদিন বিকালে উনার একটা চিঠি নিয়ে আসতো, আমার চিঠি নিয়ে যেতো। উনি লিখতেন আমার জন্য কী পাঠাবেন, কাপড়, লিপস্টিক! আমি লিখতাম, এক কেজি মাছ, এক কেজি তরকারি।
আমার ছোট ভাইদের দিকে তাকালে বুকে মোচড় দিতো। আমি কাকে জিজ্ঞেস করবো, কার কী অপরাধ?
উনাদের বাসার পরিবেশ দিনকে দিন আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। দেবী কোনদিন ঐ বাসার বৌ হতে পারে না। উনার মা ভাইদের কথার যুক্তি আছে। কেন নিবে আমাকে? বউ আনবে নিজেদের সমমানের। কক্সবাজারের দশটা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে উনারা একটা।
আমি তো কান্নাকাটি করে একাকার। আমার প্রথম প্রেম, উনি বুঝে নিলেন, আমাকে উনাদের বাসা থেকে কেউ মেনে নিবেন না। কী আর করা, সৌদি যাবেন, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমাকে নিয়ে যাবেন।
আমাদের দুর্দিনের সীমা রইলো না।

অভাবের কথা আর বলতে চাই না, হাজারও বছরের ব্যথা। আর বর্ণনা দেবার মতো ভাষা আমার জানা নেই। ইয়া আল্লাহ কতো আর কতো? কতদিন, কতদূরে আমাদের তিনবেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা, সামান্য পনেরো টাকা স্কুল এর বেতন। সেটা দেওয়াও মুশকিল হয়ে গেলো। সবাই জানে আমরা ভালো আছি, বাবা টাকা পাঠান।
প্রতিযোগিতা হলো প্রেম আর ক্ষিদা, কে জিতে? এক একটা দিন যেন পার হয় না, কার অপরাধের শাস্তি কে ভোগে! ভাইরা বাবার ওপর মনক্ষুন্ন হতে থাকলো। আমি রাতদিন ঠোংগা বানাতে বানাতে সিমেন্ট এ শরীর চুল আঠা হয়ে যেতো।

আমি চেষ্টা করতাম সততার সাথে তিন বেলা খাবার যোগাড় করতে। নুন আনতে পান্তা ফুরায়।
দেড়শ টাকা দামের একটা রেডিও ছিলো আমার, বড্ড প্রিয়, ওটাই আমার সুখের ঠিকানা। তখন গাজী ভাই সিনেমার পাবলিসিটি করতেন, ‘হ্যাঁ ভাই’। অনেকের
হয়তো মনে আছে। সারাক্ষণ শুনতাম। দুর্বার। খোকন সোনা ছবির এড হতো, ভালো লাগতো।
ওই সময়েই আমার দুই চাচাতো ভাইকে নিয়ে চাচী ঢাকা থাকতেন। উনি কক্সবাজার গিয়ে দেখেন আমাদের করুণ অবস্থা। আমাকে বেড়াতে
নিয়ে আসলেন। চাচীর সংসার ভাই চালান। তখন ভাই এর মধ্যবিত্ত অবস্থা। উনাকে সবাই ওস্তাদ ডাকে।
একদিন ভাই এর বাসায় এক ভদ্রলোক আসলেন, আমি গেইট খুলি।
ওস্তাদ আছেন?
নাই।
আসলে বলবেন রাজীব আসছিলো, খোকন সোনার রাজীব।
আমি বলি, দাঁড়ান, দাঁড়ান, রেডিওতে কি আপনার ভয়েস শুনতাম?
জ্বী।
আপনি সেই রাজীব? একটু বসেন, এক কাপ চা খেয়ে যান। উনি বসলেন, খোকন সোনা ছবি নিয়ে অনেক গল্প হলো।
পরের দিন থেকে উনি প্রতিদিন আসেন। এসেই বলতেন, এক কাপ লাল চা।আমি বুঝতে পারি উনার প্রতিদিন আসার কারণ।
আমি কক্সবাজারের উনার প্রেমে, মনে মনে পূজা করছি। তাই রাজীব সাহেব এর প্রতিদিন আসা আমার বিরক্ত লাগতো। একদিন অনেক তিতা করে চা বানিয়ে দিয়েছিলাম। একমাসের মতো ছিলাম, তিতা চা দিলেও রাজীব সাহেব রুটিন করে আসতন। একমাস পর আমি আমার মতো আমার যুদ্ধ ক্ষেত্রে ফিরে যাই কক্সবাজার।
দিন যায়, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ক্লাস এইট থেকে মেট্রিক দিব। ক্লাস এইটে মাত্র একমাস ক্লাস করি। ৫৮ দিন পড়ে পটিয়া থেকে পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট কী ছিলো কে জানে! হ্যাঁ, আমি বলবো, কে জানে! আমি ভাবতে থাকি আমার মা, ভাই কী খাবে? আমাদের কী হবে?

একদিন বর্ষাকাল বৃষ্টি থামার নাম নাই, রাস্তায় হাঁটুসমান কাঁদা, দুজন লোক মোটর সাইকেল কাঁধে নিয়ে খুঁজে খুঁজে আমাদের বাসায় আসলেন। রাজীব সাহেব আর উনার এক পুলিশ বন্ধু।
আমার ভাইতো রাজীব সাহেবকে দেখে বেহুঁশ। আমি ভিতরের রুমে। দৌড়ে গিয়ে বলে, রাজীব সাহেব আপনার সাথে দেখা করতে আসছেন, চলেন। গিয়ে বল আমি বাসায় না-ই। টিভি দেখতে গেছে। রাজীব সাহেব মন খারাপ করে চলে গেলেন।
কক্সবাজার এর উনাদের বাসা থেকে নানান রকম হুমকি আসতে থাকে। আম্মা কান্নাকাটি করেন, যদি আমার ভাইদের কিছু করে?
৮৫ সালে মি. কক্স সৌদি চলে গেলেন।

শেয়ার করুন:
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares

লেখাটি ৫২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.