স্বপ্নহীন চরাচরে স্বপ্নময় মানবী

রায়হানা রহমান (নীলা): যখন আমি জন্মেছিলাম, আমার মা-বাবা দুজনেই ভেসে গিয়েছিল আনন্দের বন্যায়। কিন্তু পাশাপাশি আমার মা-বাবাকে Meye 9অবজ্ঞার আগুনে পুড়তে হয়েছিল পরিবারের পুত্র সন্তানধারীদের অহমিকায়।

বাবা অনেক ভালবেসে নাম রেখেছিল এক দামী পাথরের নামে। কিন্তু জানতো না সে, পাথর দামি হলেও সবার সহ্য হয় না। আমার বেলায়ও ভিন্ন হয়নি। একটু একটু করে যখন বেড়ে উঠছি তখন বুঝলাম আমাকে অনেকেরই সহ্য হয় না। তাই অনেক জায়গায়ই নিজেকে মেলে না ধরে গুটিয়েই রাখতাম।

আমার পরে আমার বাবা মায়ের আরো একটি কন্যা সন্তান হয়। পরপর দুটি কন্যার জন্য আমার বাবাকে অনেকেই দুর্বল ভাবা শুরু করে। আর এ কারণেই আমার বাবার চারিত্রিক গুণাবলি ধীরে ধীরে দুর্বলতাতেই রূপ নেয়।

সেজন্য প্রায় সময়ই আমাদের দুই বোনকে বলতো, ‘আমি তোমাদের শিক্ষা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ দিতে পারবো না’।

আমি হাসতাম, আর মনে মনে বলতাম তাইতো আমাদেরকে দেয়ার মতো তোমার কিছু নেই, কিন্তু চাচা যে তার পুত্র সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য জায়গা কিনেছে? কিন্তু বলতে পারতাম না সে কথা, পাছে আমাকে লোভী ভাবে! আসলে আমাদের সমাজই আমার বাবা-মাকে দুর্বল করেছিল। তাদের ভাবতে শিখিয়েছিল কন্যা সন্তানের জন্য সুপাত্র সন্ধান করা ছাড়া আর কোন দায়িত্ব আপাতত তাদের নেই।

কৈশোরের বাতাসে আমি যখন মাখামাখি, আত্মীয়-পরিজন আমাকে টেনে হিঁচড়ে ঘরে ঢোকায়, বলে, এ বাতাস ভালো না। আমি বুঝতে পারি না তাদের কথা। ঘরের একটি মাত্র জানালা দিয়ে আমি দেখি কৃষ্ণচূড়া সেই বাতাসে দোল খেয়ে খেয়ে আমাকে ডেকে চলে। আমি সাড়া দিতে পারি না।

যখন আমি সবে তারুণ্যের নৌকায় পা দিয়েছি, তখন আমার মা-বাবা মিলে ঠিক করলো আর মেয়েকে ঘরে রাখা যাবে না। এরপর বয়স বাড়লে মেয়ের আর ভালো পাত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাকে বিয়ে দিয়ে তারা তাদের উপর দেয়া সৃষ্টিকর্তার দায়িত্ব পালন করতে চাইল। আমার বোবা কান্না তারা কোনদিনও শুনতে পেল না। আমি দেখতে পেলাম আমার হাতে পায়ে শিকল পড়া ছায়াকে। কিন্তু নাম যে আমার এমন এক পাথরের নামে তাতো আর আমার শ্বশুরালয় জানতো না, তাই তাদেরও সহ্য হলো না আমাকে। এক সময় ফেলে গেল এক অজানা চরাচরে।

আমি শূন্য মষ্তিস্কে হেঁটে বেড়াই সেই চরে। কানে আসে হাজারো গুঞ্জন আমার দোষেই নাকি সংসারে ঠাঁই হলো না আমার। আমি খুশি হই, ভালোই হলো। আমি স্বাধীন হলাম। ভাবি এবার আমি ইচ্ছেমত মনের আকাশে ঘুড়ি ওড়াবো, চষে বেড়াবো বনাঞ্চল। কিন্তু আবার কোন এক শক্ত দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসি ইট পাথরের জীবনে। আমার মা-বাবা আমাকে শিক্ষা ছাড়া আর কোন সম্পদ দিতে পারেনি। তাই আপাতত ঘুড়ি ওড়ানো শিকেয় তুলে প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছি বেঁচে থাকার দৌড়ের মাঠে। অথচ আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা পৃথিবীর নানা আকাশে রঙিন ঘুড়ি উড়িয়ে চলেছে।

তারপরও কোন কোন রাতে আমি হরিণীর মতো ছুটে চলি সেই চরে আকাশ দেখবো বলে। আকাশের গায়ে দোল খাওয়া কৃষ্ণচূড়ার ডালে আমার ঘুড়ির সুতো আটকে গেলে আমি হেরে যাবো কৃষ্ণচূড়ার কাছে। তখন তার লালে লাল হব আমি।

স্বপ্নহীন চরের স্বপ্নে বিভোর আমি পিছনে তাকিয়ে হাজারো ছায়া দেখতে পাই।

08.05.2015

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.