বিয়ে, সেক্স এবং বোঝাপড়া

শিল্পী জলি: বিয়ের পর অনেক পরিবারই মাথা ঘামায়, বিয়ে করে ছেলে তাদের বউয়ের ভেড়া হয়ে গেল কিনা? অথবা বউ ছেলেকে নষ্ট করে দিল কিনা? এক কথায় উদ্দেশ্য, হীন। বিয়ে একটি জটিল বিষয়। আমাদের সমাজের জন্যে সেটি আরও বেশী।
কিছু না জেনেই আমরা বিয়ের পিঁড়িতে বসে যাই। অথচ স্বভাবে একজন পশ্চিমের হলে অন্যজন হয়তো পূবে চলি। অতঃপর ভিন পথের দুই যাত্রীকে এক পথে চলতে হয়।
ওদিকে বিয়ে হতে না হতেই পরিবারের অন্যদের মন জয়ের প্রশ্নটি এসে সামনে দাঁড়ায়, যেন তাদেরই বিয়ে। অন্যদের মন জোগাতে গিয়ে বিয়ের আসল বিষয়টিই সবচেয়ে কম গুরুত্ব পায়, যেটা পরিবারটির সারা জীবনের জন্যে ভীত তৈরি করে– দাম্পত্য জীবন, দু’জন দু’জনকে বুঝতে পারা।

Cosmopolitan Womenজাবিতে আমাদের ইয়ারে দু’টি মেয়ে পড়তো। দেখতে এবং চলনে বলনে পুরো ননীর পুতুল। অতি উত্তম পরওয়ারিশ। সাধু। কোনদিন কারও সাথে টুঁ শব্দ করেছে বলে মনে হয় না। ওদের দেখলে মনে প্রশ্ন উদয় হতো, ওরা হয়তো জানেই না বিয়ে কী, কেন, কিভাবে? একেবারে ব-কলম — ওদের কী হবে?

ওরা এতো নরম, এতো সভ্য, এবং এতো ভদ্র ছিল যে ওদের সাথে বিয়েকে ঠিক ভাবাই যেত না। আমরা যে খুব পাকা বুড়ি ছিলাম তা নয়। তবে একটু-আধটু প্রেমপ্রীতি বুঝতাম, আবার অন্যদের প্রেমের গল্প শুনতেও ভালো লাগতো। অথচ ওদের দেখে মনে হতো ওরা ‘আই লাভ ইউ’ও বোঝে না ! সেখানে বিয়ে তো আরও অনেক বেশী কিছু।
সেদিন ফেসবুকে এক বান্ধবী বললো, বিয়েতে দাম্পত্য সম্প্রীতি মোটেই জরুরি নয়।
বিপদের কথা ! শুনেই মনে প্রশ্ন এলো, তাহলে কী জরুরি? ভেন্না ভাজি? তবে বিপদ বুঝে কোন তর্কে গেলাম না। দেশে যেখানে বিয়ে করা হয় বাবা-মাকে খুশী করতে, সেখানে বিয়েতে নিজের খুশী এবং প্রয়োজনের কথা বললে ‘লুচ্চা’ বলতে কতক্ষণ ?
অনেকেই হুটহাট বিয়েতে বসে যায়, অথচ জানে না বিয়ে কেন? বাবা-মা এবং সমাজও চায় না তারা জানুক কেন বিয়ে করবে। যতোটা সম্ভব তারা বিষয়টি থেকে ছেলেমেয়েদেরকে যোজন যোজন দূরে রাখে। অতঃপর একদিন ছেড়ে দেয় বিয়ের মহাসমুদ্রে–তখন আবার বিয়েতে টিকে থাকাই সার্থকতা।
হায়রে কপাল–ব-কলমের টার্গেট এতো হাই ?
বিয়েতে যে বিষয়টি অপরিহার্য, সেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলা যেন মৌচাকে ঢিল ছোঁড়ার মতোই ভয়াবহ। রক্ষা পেতে হলে ধোঁয়া তৈরি করে করে সাবধানে এগোতে হয় যেন মৌমাছি নাগালে না পায়। আমিও তেমন করেই ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় লিখবো।
বিয়ে কোন সেবাধর্ম, জনসেবা, বা ফ্রি সার্ভিস নয়। এখানে দুপক্ষেরই স্বার্থ থাকে, প্রয়োজন থাকে, আদান-প্রদান থাকে। এই আদান-প্রদানের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সহবাস। ধর্মের নামে কবুল পড়লাম, অতঃপর বললাম, সহবাস চাই না, ওটি অন্যায়, হবার নয়– ওটি বিয়ে করে আরেক পক্ষকে বিপদগ্রস্ত করা।

কেননা বিয়ের প্রধান বিষয় সহবাস, বাকি সবকিছু বাড়ি-গাড়ি, রান্নাবান্না, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি, টাকা-পয়সা-গয়নাগাটি, সব ঐচ্ছ্বিক। তাই সহবাসের বিষয়টি লক্কর-ঝক্কর হয়ে গেলে বিয়ে টেকানো মুশকিল।
জরিপে দেখা যায়, প্রতি তিন দম্পতিতে একটি দম্পতিদের মাঝে সেক্সচ্যুয়াল ডিজায়ার গ্যাপ থাকে আকাশসম। একজন হাত ধরা, পাশে বসা, চোখে চোখ রাখা, জড়িয়ে ধরা, মিষ্টি কথা বলা, একান্ত হওয়া পছন্দ করলেও অন্যজন বলে, ভাগো। তার মতে, বিয়ে তো হয়েছেই–আবার ধরাধরি কিসের? চাই না ।
এই লো ডিজায়ারের মানুষটিই বিয়েতে তার পার্টনারকে বানর নাচ নাচায়। কখনও বলে, মাসের শেষ শুক্রবার সকাল ন’টায় নক করো, যদি মুড আসে, নইলে না….। তার কাছে দাম্পত্য জীবনকে মনে হয় আঁচড়, বাঁচড়, অথবা খামচি। অকারণ সময় নষ্ট। জীবনের আনন্দ বা খুনসুটি নয়।

ওটি এড়াতে সে দিনরাত তেতিয়ে থাকে যেন পার্টনারটি আশেপাশে ভিড়তে না পারে। সে কাজ দেখিয়ে রাতের পর রাত পার করে দেয় যেন একসাথে ঘুমুতে যেতে না হয়। তার মনে হয় একসাথে খেলে, হাঁটলে, মিষ্টি কথা বললে, বা শুতে গেলে আর রক্ষা নেই–বাধ্যতামূলক সহবাসে লিপ্ত হতে হবে। তাই দিনভর ব্যবহার খারাপ করে করে পাঁয়তারা করে পার্টনারকে দূরে রাখার। অধিকন্তু শোনায় আরও কোন কোন মেয়ে বা ছেলে তার লাইনে আছে, প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। তারা নিজের পার্টনারকে সঙ্গ দিতে পারে না, ওদিকে অন্যদেরকে লাইনে রাখে।

Shilpi Jolley 2
শিল্পী জলি

ওমন বিয়েতে হাই ডিজায়ারের মানুষটি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তার রাত কাটে ছাদের দিকে তাকিয়ে। দোকা হলেও একাকিত্ব তাকে খেয়ে ফেলে। প্রথমদিকে সে হয়তো চেষ্টা করে পার্টনারকে বোঝাবার। কিন্তু বোঝাতে বোঝাতে এক সময় তার কষ্টগুলো রাগে পরিণত হয়, ধীরে ধীরে সে দূরে সরে যেতে থাকে। অতঃপর সময় না দিয়েই একদিন হয়তো ঘোষণা দেয়–আর নয়। ভেঙ্গে যায় বিয়েটি।

বেশীর ভাগ ছেলেই মনে করে, আমি ছাড়া জগতের সব ছেলেই সহবাসে মাষ্টার। তাই বিষয়টি নিয়ে অনেকেই পরিবারের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করতে বিব্রতবোধ করে। হীনমন্যতায় ভোগে। তাই আসল সমস্যার সমাধান না হয়ে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে। অথচ অনেকেই মোটামুটি একই গোয়ালের বাসিন্দা। কেননা কারও জীবনই পারফেক্ট নয়– এদিক আছে তো, সেদিক নেই। অথচ যে পার্টনারটি মোর ক্লোজনেস লাইক করে, মোর টাচ লাইক করে, পাশাপাশি থাকতে লাইক করে সে হয়তো ভাবে, সে আর আমায় ভালোবাসে না, আপন ভাবে না। হয়তো তার অন্য কোথাও সম্পর্ক হয়েছে তাই এমন করছে।

বিবাহিত থাকলেও সে একাই থাকে। নিঃসঙ্গ, একাকী, অনাকাঙ্ক্ষিত অনুভূতিগুলো তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে। অতঃপর অবহেলিত জীবনে এক সময় বিয়ের দায়টি সে আর বইতে পারে না। চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।
দেশে যেসব ছেলেকে বউয়ের ভেড়া বলা হয় তাঁদের মূলত সেক্সচ্যুয়াল ডিজায়ার হাই, তাই তারা বউয়ের কথা শোনে, পাশে পাশে থাকে।

কেননা বিয়েকে কন্ট্রোল করে কম ডিজায়ারের পার্টনারটি– এটি নারী বা পুরুষ যে কেউই হতে পারে।
সার্থক বিয়ের উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে সেক্সচ্যুয়াল ডিজায়ারের গ্যাপটি কমিয়ে আনা।
কম ডিজায়ারের পার্টনারটি যদি মনে করে বছরেও একবার মিলিত হবে না এবং সেটি কোন বিগ ডিল নয়, তাহলে চলবে না। বরং তাকে সহমর্মী হতে হবে, আরেক পার্টনারের নিডটি বুঝতে হবে। ইচ্ছে না হলেও সহবাসে রাজী হতে হবে। স্বাস্হ্যগত বা চাকরি সংক্রান্ত কোন অসুবিধা হলে তার সমাধান করতে হবে।

অনেক সময় হাই-ব্লাড প্রেশার, ডায়াবেটিস, হরমোনাল সমস্যা, ডিপ্রেশন ইত্যাদি কারণে মানুষের সেক্সচ্যুয়াল ডিজায়ার নাও থাকতে পারে। নিয়মিত এক্সারসাইজ, যথাযথ ওষুধ সেবন, বা হরমোনাল চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যাগুলো অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাছাড়া নিয়মিত চর্চা করলে অনেক সমস্যাই দূর হয়ে যায়।
হাই ডিজায়ারের যারা তারা প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমে তার পার্টনারকে বোঝাতে হবে তার কতোটা নিঃসঙ্গ লাগে, তার জন্যে কতোটা কঠিন বিয়েটিকে এভাবে টেনে নেয়া। তাছাড়া পার্টনার যে বিষয়গুলোতে সত্যিকারের খুশি হয় সেগুলো করা যেতে পারে।

যেমন মেয়ে হলে বলা, তোমাকে ক্লান্ত লাগছে, আজ একটু রেস্ট করো, আমিই না হয় চা বানিয়ে পান করবো। অথবা তোমার মা-বাবাকে ফোন করো। অথবা যারা জিনিসপত্রে খুশি হয়, তাদেরকে টুকটাক এটা ওটা দেয়া।
রাগ দেখানো, কটাক্ষ করা, সমালোচনা করা, বা চলে যাবার হুমকি দেয়া সম্পর্কটিকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। তাই সত্যিকারের সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনাই উত্তম।

অনেকেই বিয়ে যত পুরোনো হয় তত বেশী এসব নিয়ে আলোচনা করে না, অথচ সময়ের সাথে সাথে সহবাসের বিষয়টিতেই বেশী টানাপোড়েন শুরু হয়, যখন খোলাখুলিভাবে আলোচনা করা অতি জরুরি।
মেয়েরা যত সহজে নিজের অপারগতা প্রকাশ করতে পারে, ছেলেরা তত সহজে সেটি পারে না। কেননা তাদের ইগো প্রবলেম ভয়াবহ। পার্টনার কিন্তু ঠিকই বোঝে সমস্যা কোথায়? কেন?
সেখানে পুরোনো ডার্লিংয়ের পেচাল, অকারণ এড়িয়ে চলা, ফালতু রাগ দেখানো, বা হম্বিতম্বি করলে কোন ভালো ফল আসে না।
বিয়েতে হাতে হাত রাখা, পাশাপাশি বসা, মিষ্টি দুটো কথা বলা মানেই সহবাস অনিবার্য নয়। তবে এর সুফল অসীম।
ক্ষণে ক্ষণে টার্বো এসে আমাকে দেখে যায়, গা ঘেঁষে পাশে শুয়ে পড়ে। আতিক এলেই বাফী তার বুকে উঠে বসে। মাত্র কয়েক মিনিট, অথচ প্রাপ্তি আকাশ ছোঁয়া। বোবা প্রাণী যদি এভাবে ভালোবাসা, নির্ভরতাকে প্রকাশ করতে পারে, সম্পর্ককে রিনিউ করতে পারে–তাহলে মানুষ কেন পারবে না ?
সময়ের সাথে জীবন বদল হয়, জীবনের চাহিদা বদলায়, সহবাসেও পরিবর্তন দেখা দেয়, অপারগতা আসতে পারে–এটিই স্বাভাবিক।
তবে সহবাসে অক্ষমতা এলেও মিষ্টি ব্যবহার, ভালোবাসা, এবং মানবিকতা বজায় রাখা অতি জরুরি– এটি পাথরেও ফুল ফোটাতে পারে।

শেয়ার করুন:

“–কেননা বিয়ের প্রধান বিষয় সহবাস, বাকি সবকিছু বাড়ি-গাড়ি, রান্নাবান্না, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি, টাকা-পয়সা-গয়নাগাটি, সব ঐচ্ছ্বিক!!! ” মনে হচ্ছে সহবাসের জন্যই বিয়ে, বা সহবাসের কাছে অন্য সব তুচ্ছ! এটা ঠিক নয়। এটা গুরুত্বতপূর্ণ তবে ভালবাসা, সম্মান, সহযোগিতা – এসবের তুলনায় খুব বেশী না। “মিষ্টি ব্যবহার, ভালোবাসা, এবং মানবিকতা বজায় রাখা অতি জরুরি– এটি পাথরেও ফুল ফোটাতে পারে।” – সহবাসের গুরুত্তকে অস্বীকার না করেও বলতে হবে “মিষ্টি ব্যবহার, ভালোবাসা, এবং মানবিকতা” খুব জরুরি।

আপনি কি পারিবারিক জীবনে সুখী? যদি হোন তাহলে আপনার কথাগুলো অবশ্যই অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। আর যদি নিজেই সংসার জীবনে ব্যর্থ হয়ে থাকেন তাহলে এসব থিউরিটিক্যাল কথাবার্তার কোন মানে নাই। আগে নিজের জীবনে এ্যাপ্লাই করুন, উদাহরন তৈরী করুন। তারপর অন্যদের জ্ঞান দিতে আসুন।

বিষয় গুলি আলোচনা হচ্ছে, এটা ভালো খুবই ভালো…
কিন্তু আলোচনা গুলি করবার সময় ‘ইউরোপই মহান’ থেকে সরে আসতে পারলেই মঙ্গল হয়। নারী যৌনতা রাগমোচন প্রজনন ইত্যাদী নিয়ে আফ্রিকা ও ভারতের অর্জনগুলি আলোচনাকে আরো সমৃদ্ধ করবে। পঞ্চাশ বছর আগে ইউরোপ জেনেছে ভারত-আফ্রিকায় তার অনেক কিছুই হাজার বছর থেকেই আছে…
তার উপর জমেছে আরব ও ইউরোপের ধুলি…

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.