নারী হয়ে জন্মেছি, আমি গর্বিত

0
রেহেনা মাহমুদ:
নারী হয়ে জন্মেছো – এতো বড় ভাগ্যের কথা। নারী হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর সৃষ্টি। সবচাইতে আকর্ষণীয়, সবচাইতে বৈচিত্র্যপূর্ণ। নারী হয় মাতা, নারী হয় কন্যা, নারী হয় স্ত্রী, আবার হয় কারো ভগ্নী, কারো বা প্রেমিকা। নারীর সৌন্দর্য্য পুঁজিত হয়ে এসেছে সর্বকাল।
যুগে যুগে মহাকাব্য রচিত হয়েছে কেবল নারী সৌন্দর্যের বর্ণনায়। কত শত প্রেমিক পুরুষের আত্মাহুতি শুনি নারীর রুপে, রাজার রাজ্য ত্যাগের কাহিনীও কম নেই, আরো আছে রাজ্যে- রাজ্যে লড়াই এক নারীকে ঘিরেই। নারীর বুদ্ধিমত্তা নিয়েও কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ঘর-সংসারের হিসেব তো সে-ই সুচারুভাবে সম্পন্ন করে। সন্তানের কখন কী লাগবে, স্বামী কোন পোশাক পরে অফিস যাবে, কী রান্না হবে, খাবার যেন গতদিনের চাইতে কটু ভিন্ন হয় …… এসব কিছু সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে সেই ঘরের নারী। শুধু গৃহিণী বলেই যে ঘর সামলাচ্ছে তা নয়, যারা চাকরি করেন তারাও ঠিক গুছিয়েই সব সম্পন্ন করেন। কজন পুরুষ ঘর-বাহির দু’জায়গাই সামলাতে পারবেন? কিন্তু সব নারীই এ জায়গায় কৃতিত্ব দেখাবেন, সন্দেহ নেই।

রেহেনা মাহমুদ

‘আমি নারী’ -এ নিয়ে যেখানে আমার গর্বিত হবার কথা, সেখানে আমরা সমাজে নিজেদের বোঝা মনে করি, সংসারে কুঁকড়ে থাকি। কেন? একজন নারীর গর্ভবতী হবার অনুভব স্বর্গীয়। মানব জাতির অস্তিত্ব থাকতো না, যদি না নারী ‘মা’ হতো।পুরুষের পক্ষে কী সম্ভব সন্তান জন্ম দেয়া? এ ক্ষমতা একান্তই নারীর।

অথচ আমরা মায়েরা এখনো পুত্র সন্তানের কামনায়-প্রার্থনায় চোখ ভেজাই। গর্ভের সন্তান যেন ছেলে সন্তান হয় তার জন্য মানত করি। এমনকি প্রযুক্তির কল্যাণে যদি জেনে যাই যে আগত সন্তানটি কন্যাশিশু; তাকে অনেকেই পৃথিবীর আলো দেখতে দেই না। কী নিষ্ঠুর! কেন এই নির্মম সিদ্ধান্ত? এতে করে আমরা কি নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্ব বিলীনে সহায়তা করছি না?
এমন পাষণ্ড সিদ্ধান্ত নিতে যদি কেউ বাধ্যও করতে চায়, তবে আমরা তা মেনে নেবো কেন? কেন সংসারে সবার যত্ন নেয়া বউটি,মা টি অযত্নে থাকে? চব্বিশ ঘন্টা কাজ করে যাওয়া নারীটি কেন তার যোগ্য সম্মানটুকু পায় না?এ থেকে মুক্তির উপায় কী? এ সব কেন’র একটাই উত্তর আমার কাছে।
আর তা হলো, নারী যতোদিন না অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হবে, ততোদিন নারীর এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অসম্ভব। নারীকে উপার্জন করতে হবে; থাকুক তার উত্তরাধিকার সূত্রে অঢেল টাকা; থাকুক স্বামীর বিশাল অংকের ব্যাংক-ব্যালেন্স। একজন উপার্জনকারী নারী ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহসী হয়ে উঠে, আত্মসম্মানবোধ জেগে উঠে তার ভিতর। তখন চাইলেই কেউ তাকে অন্যায়ভাবে কোনকিছুতে বাধ্য কর‍তে পারে না। তাকে ঠকাতে পারে না।
আমাদের সমাজের একজন অশিক্ষিত পুরুষও জানে সে উপার্জনক্ষম, পুরো পরিবারটি তাকেই চালাতে হবে। সে চালায়ও। সে বোকা, ক্ষীণ কায়ার, দুর্বল,মেধাহীন হতে পারে। কিন্তু কোন না কোনভাবে সে তার আয়ের পথ খুঁজে নেয়। আমরা নারীরা কেন তেমন করে ভাবতে পারি না? আমরা নিজেদের দুর্বল ভাবি, অসহায় ভাবি। অথচ পুরুষদের মতো আমরা সব কিছুই করতে সক্ষম। 
তাই, নারীর শিক্ষিত হওয়া জরুরি বটে ,তবে তার চাইতেও জরুরী সাহসী হওয়া। আমেরিকায় নির্বাচনের সময়ে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিন্টন বলেছিলেন, -“sky is the limit”.আপনার স্বপ্নকে বিস্তৃত করুন। ঘরের বাসন-কোসন নিয়ে সঙ্গী পুরুষের সাথে যুদ্ধ করার সময় এখন আর নেই। এখন নারীর সময় এসেছে বিশ্ব জয় করার। লক্ষ্য এমন হলে যে ছোটখাটো বাধা আসে তা তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দেয়া যাবে। নিজের সক্ষমতাকে আবিস্কার করা আজ নারীদের জন্য ভীষণ জরুরি। তা না হলে কেবল শিক্ষিত হয়ে লাভ কী?
কিছুদিন আগে নারী দিবস উপলক্ষে এক সেমিনারে গিয়েছিলাম। সফল ও সাহসী নারীদের কথা শুনছিলাম মনোযোগ দিয়ে। বেশ কয়েকজন সুশিক্ষিত নারীই বললেন যে, তারা তাদের সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করেছেন। তাদের সন্তানেরা আজ প্রতিষ্ঠিত বা ভাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছে। এ নিয়ে তাদের গর্বের সীমা নেই। মা হিসেবে তারা সফল আজ।
এখন প্রশ্ন হলো, নারীরা চাকরি করলে কি সংসার চলবে না? সন্তানেরা ভালভাবে বেড়ে উঠবে না? সুশিক্ষিত হবে না?একজন শিক্ষিত নারীর এহেন ভাবনা আর নিজের মাথায় কুড়াল মারার সমান। খেয়াল করে দেখলাম, শিক্ষিত এক শ্রেণীর নারীর ভিতর এই এক ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। তারা বাচ্চা-কাচ্চা লালন-পালনের অজুহাত দেখিয়ে কোন পেশায় ঢুকছেন না। তার সংসারে অভাব নেই, তার চাকরির প্রয়োজনও নেই বুঝলাম। কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূল হতে কতোক্ষণ? পারবেন কি তখন? না, নারীর সেই চেনা চরিত্রই বেরিয়ে আসবে– জলে ভাসা পদ্ম আমি ,শুধুই পেলাম ছলনা, আমার নাইতো কোথাও কোন ঠাঁই … আহা!
গানটা যে অবলা নারীদের নিয়েই। বৃদ্ধ বয়সে যে সন্তানের জন্য স্যাক্রিফাইস করে গর্ববোধ করছেন-সেই আবার ওল্ড হোম এ রেখে আসবে না তো? নারীদের স্যাক্রিফাইস এর এমন অসার ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। উপার্জন করতে হবে। স্বাবলম্বী হতেই হবে। ঘরের পুরুষটি যতোটুক পারছেন, আপনিও তা পারবেন; সাহসটুকু রাখুন। আপনি জগতের সবচাইতে সুন্দর সৃষ্টি, আপনি স্পেশাল, গর্বিত হউন যে আপনি নারী।

লেখাটি ৭৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.