বীরাঙ্গনাকাব্য

0

শবনম সুরিতা ডানা:

ঘরে ঢুকতেই ছোট ছোট হাতের দল এগিয়ে এসে আমায় ছুঁতে চায়। আমি তাদের স্পর্শ গ্রহণ করি। আমার রোজকার স্পন্দনহীনতা দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি যুদ্ধ পেরিয়ে আসা ছ’বছরের আয়েশার দৃষ্টিকে। আমি বুঝিনা, পদে পদে ভুল করি। উল্টোদিকে থাকা শিশুদের অনেক ধৈর্য্য। তারা সযত্নে আমায় বোঝায়।

গবেষণার সাথে সাথে সময় কাটাতে, ভাষাকে আরো খানিকটা বশে আনতে আমি পার্ট-টাইম কাজ করি।  প্রতি সপ্তাহের দু’দিন আমি কিছু বাচ্চাদের সাথে কাটাই। বিভিন্ন বয়েসের মেয়েরা আসে সেখানে। চার বছরের আয়েশা থেকে ২১ বছরের বারনা- সবারই কমবেশি সাহায্য প্রয়োজন। আমি তাদের ইস্কুলের হোমটাস্কে জার্মান, ইংরেজি, অঙ্ক ইত্যাদি বিষয়ে সাহায্য করি। অবশ্য সেটা শুধু প্রথমের এক-দেড় ঘন্টা। বাকি ৪-৫ ঘন্টা আমার কাজ তাদের ব্যস্ত রাখা। কখনো গান, কখনো নাচ, সিনেমা, খেলাধুলো, দলবেঁধে সবাই একসাথে কিছু রান্না করা বা কখনো স্রেফ অকারণ লম্ফঝম্প। সপ্তাহের এই দুদিন আমি ভুলে যাই প্রাপ্তবয়স্কতা, অন্তত ভুলতে চেষ্টাটুকু করি। তবে এই হোমটাস্ক, লাফঝাঁপের চেয়েও আমার বড় দায়িত্ব এই মেয়েদের ভুলে যাওয়া বা ভুলতে পারার সাহস শেখানো।

মান্ডলি’র কথাই ধরা যাক নাহয়। কুর্দিশ মেয়ে মান্ডলি ইরাক থেকে তুরস্ক হয়ে জলপথে গ্রীস আসে ২০১৩’র শেষের দিকে। মা-বাবা, ছোট তিন ভাই-বোন, দাদু-দিদা সহ ১২জনের পরিবার পায়ে হেঁটে জার্মানি এসে পৌঁছয় ২০১৪’র মার্চ মাসে। যুদ্ধে নিজের দাদাকে হারানো মান্ডলি যখন এদেশে আসে তখন তার বয়স মাত্র ছয়। আমার সাথে ওর যখন পরিচয় হয় সেদিন ওর জন্মদিন। নয় পেরিয়ে দশে পা রাখা মেয়েটি কোন কেক কাটেনি সেদিন। আমাদের সংস্থা কেক, আলো, বেলুন সব ব্যবস্থাই করেছিল, তবুও মান্ডলি কেক কাটতে নারাজ। বলিউড নাচের লোভ দেখিয়ে মান ভাঙানোর পর জানতে পারলাম পরিবারের সবাই বেমালুম ভুলে গেছে ছোট্টটির জন্মদিনের কথা। উলটে দেরী করে ঘুম থেকে ওঠায় মায়ের বকাও খেয়েছে বেচারি। প্রাণপ্রিয় বাবা ভোররাতে বেরিয়ে গেছে পাশের শহরে কাঠের কারখানায় কাজ করতে, যে দাদা আগে সবার আগে ঘুম ভাঙিয়ে শুভেচ্ছা জানাতো, আজ সে মান্ডলিদের ৯০ স্কয়ার মিটার ফ্ল্যাটের দেওয়ালে শুধু ছবি।

আর মা? তার সারা শরীর বেয়ে জরা, ক্লান্তি নেমে আসে, আর টলটলে চোখদুটি ক্ষোভ উগরে দেয় ধর্ম, রাষ্টড়-নামক কারাগারগুলির দিকে। আমার সহকর্মী কুর্দিশ ভাষায় অনেক বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন মান্ডলিকে। কিন্ত সে অনড়, বারান্দায় চুপটি করে বসে থাকে। বেশ খানিকক্ষণ ঠায় তাকিয়ে থাকার পর মান্ডলি একটা আশ্চর্য কথা বলে আমাদের-

“আগে এমন হত না জানো, কিন্ত যুদ্ধ আমাদের সবকিছু বদলে দিয়েছে”

গতকাল সন্ধ্যেয় তেমন কাজ ছিল না। সবচেয়ে ছোট বাচ্চাগুলিকে স্পাইডারম্যানের গায়ে রঙ ভরতে দিয়ে গল্প করছিলাম আমি আর বছর একুশের মেয়ে বারনা। ইংল্যান্ডে চাকরি পেয়েছে সে, তার ইংরেজি ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও। এখানে আসে আমার সাথে এক ঘন্টা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে, যাতে ভিসা অফিসারের সাথে কথা বলার সাহস জোগাতে পায়। গতকালই প্রথম জানলাম বারনা’র মা নেই। যে কুর্দিশ মহিলাদের ছবি দেখি খবরের কাগজে, বন্দুক কাঁধে আইসিসের বিরুদ্ধে জান কবুল করে লড়ছে, বারনা’র মা সেরকমই এক মহিলা ছিলেন। আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে প্রাণ হারান তিনি। এই মায়ের জোর করাতেই পাড়ার দুই বান্ধবী আর এক পরিচিত বৃদ্ধের সাথে ২০১২ সালে জার্মানির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় বারনা। অবশেষে ২০১৬ সালে মায়ের মৃত্যু এবং তার বাবা আর বড়ভাইয়ের এখানে আসা। বারনা এখনও মুক্ত নয়, সে এখান থেকে পালাতে চায়। নিজের মত করে, নিজের জন্য একটা শান্তির জীবন চায় সে, যেখানে তার কলেজ যাওয়ার জন্য ভাইয়ের হাতের মার খেতে হবে না, রিপড জিন্স থেকে উঁকি মারা হাঁটুর জন্য একবেলা না খেয়ে থাকতে হবে না আর। বারনা’র মতে সে স্বেচ্ছায় হিজাব পরে, অথচ প্রচণ্ড রাগের মূহুর্তে যখন নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে তার, তখন আর পারে না। হ্যাঁচকা টানে খুলে দেয় মাথার কাপড়। ক্লিপের ফাঁকে আটকে থাকা চুলও উপরে যায় হয়ত তার। আমি তাকে প্রশ্ন করতে যাই, ‘তোমার ব্যথা লাগে না?’  আমার প্রশ্ন বারনার সত্যের সামনে লজ্জায় হিজাবী হয়ে ওঠে। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না আমার।

মাঝেমাঝে আমারও খুব অসহায় লাগে। যখন আয়েশা বা মান্ডলি সহজ কোন শব্দের অর্থ জানতে চায়, আর আমার নব্য জার্মান শেখা মাথা কিছুতেই তার উত্তর দিতে পারেনা, আমি খুব ভয় পাই। অবশ্য মান্ডলির ছোট বোন সাবরিনা আজকাল আমাদের সংস্থায় আসা শুরু করেছে। বেড়েপাকা বাচ্চারা যেমন হয়, ঠিক তেমনই ইনি। মেজাজ সাংঘাতিক। এক একদিন এক একজন শিক্ষিকার কোলে বসে পড়াশোনা করবে সে, মোটেও নামবে না কোল ছেড়ে। গত সপ্তাহে একদিন তাড়াহুড়োয় টেবিলকে চেয়ার বলে ফেলেছি জার্মান ভাষায়। সবে সাড়ে চার বছরের সাবরিনা, কানে কানে আমার ভুল শুধরে দিয়ে, বিজ্ঞের মতন মুখ টিপে হাসে। আমায় বলে, “তুমি তো এদেশে নতুন, আমি তোমায় জার্মান শিখিয়ে দেব, ভয় পেয়ো না!”

সাবরিনা আমায় জার্মান শেখাবে কথা দিয়েছে। মান্ডলি আমায় বোঝাবে কেন কুর্দিশরা করিনা কপূর আর শাহরুখ খানের এত ভক্ত। আয়েশা নিত্যনতুন মেহেন্দির নকশা শিখে এসে আমার হাতে তা ঝালিয়ে নেবে। আর আমি তাদের কথা দিয়েছি সাহস শেখাব। অতীতের দুর্বলতাকে বর্তমানের, ভবিষ্যতের শক্তিতে পরিণত করবার সাহস শেখাব। তারা এখনও অনেক ছোট। ওরা জানেনা ওরা একা নয়। ঘুমোতে যাবার আগে যা কিছু ওদের চোখে জল আনে, পৃথিবীর সম্পূর্ণ অন্য কোন প্রান্তে সেই সময় অন্য কেউ একই কারণে ভেঙে পড়ে। আয়েশা, বারনা, মান্ডলি বা আমি- আমরা তো উদাহরণমাত্র। লড়াইটা সবার। আর তাই লড়াইয়ে জেতার দায়ও সবার সমান। একইভাবে, এই মেয়েগুলির মুক্ত হবার ভার ওদের একার নয়।

সাতটা বাজলে সব মেয়েরা বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লে আমিও বের হই। সেখান থেকে স্টেশন মিনিট আটেকের হাঁটা পথ। সম্পূর্ণ অন্য সময়ের একটা গান মাথায় বিদ্যুতের মত খেলে যায় আমার। জেদী জোঁকের মত লেগে থাকে গোটা পথ জুড়ে-

আমি যে তোর আলোর ছেলে,

আমার সামনে দিলি আঁধার মেলে,

মুখ লুকালি- মরি আমি সেই খেদে।।

বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে।।

আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে

বলে শুধু, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে।।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 166
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    167
    Shares

লেখাটি ৮১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.