‘দে বিলাই, কামড় দে’

শান্তা মারিয়া:

নারী দিবসের জন্য মাত্র একটি লেখা শুরু করেছি, এর মধ্যে একজন সহকর্মী নারী সাংবাদিক বিশেষ একটি কাজে এলেন তার চার বছরের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটি বেশ রোগা পাতলা। বয়সের তুলনায় আরও একটু ছোটখাটো।

আমার বাড়িতে কেউ এলেই পোষা বিড়াল জেনাসের ধারণা হয় তাদের পরিচয় গ্রহণ করা তার অবশ্য কর্তব্য। সেই প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জেনাস গিয়েছিল অতিথিদের গা শুঁকে দেখতে। মা একটু সাবধানে তার মেয়েকে সরিয়ে নিলেন বিড়ালের কাছ থেকে। আমি আশ্বস্ত করলাম, জেনাস কাউকে কামড়ায় না। সহকর্মী বললেন, তার মেয়েকে কিছুদিন আগে একটি বিড়াল কামড়েছিল। মেয়েটিও দেখালো ওর হাতে কামড়ের দাগ। ইঞ্জেকশনও দিতে হয়েছে সেজন্য বেশ ক’টি।

শান্তা মারিয়া, লেখক ও সাংবাদিক

সাংবাদিক মায়ের সন্তান। মাকে ব্যস্ত থাকতে হয় বাইরে। তাই কেয়ার গিভারের ভাষাটা রপ্ত করেছে মেয়ে। এবার ওর ভাষাতেই বলি। বিড়াল দেখে মা ভয়ে মেয়েকে সাবধানে সরিয়ে নিলেও মেয়েটি কিন্তু একটুও ভয় পায়নি। বরং আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো, ‘আমি বিলাই ভয় পাই না। শয়তান বিলাই কামড় দেয়। কিন্তু আমি ভয় পাই না। দে বিলাই, কামড় দে’।

আমি ছোট্ট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমরাই পারবে। কে বলে, ও রোগা? কে বলে, ও ছোট? ওর চেয়ে সাহসী, ওর চেয়ে শক্তিমান মেয়ে তো আমি দেখিনি। ‘দে বিলাই কামড় দে’। কতো দিবি কামড় দে। তবু ভয় পাবো না আমরা।

হ্যাঁ, এটাই আমাদের এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য। পরিবর্তনের জন্য সাহসী হতে হবে, সাহসের সঙ্গে পরিবর্তন গ্রহণ করতে হবে। নিজেকেও পরিবর্তিত করতে হবে সাহসের সঙ্গেই। সাহসী না হলে সমাজের বৈষম্য দূর করা যাবে না। লড়া যাবে না বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

আমাদের চারপাশেই বৈরিতা। দোলনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৈরিতা। ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’ বললে চলবে না। সাহস করে খাঁচাটা ভাঙতে হবে। সেটাই আনবে পরিবর্তন। সোনার খাঁচায় বসে দানা খাওয়া আর শিখানো বুলিতে গান গেয়ে খাঁচার মালিককে তৃপ্ত করাও অনেক সময় আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। আমরা ভাবি, ভয় পাই। মনে করি খাঁচা থেকে বের হলেই কাক,চিলে ছোঁ মারবে।

খাঁচাতেও অনেক সময় মার খেতে হয়, কখনো ছেঁটে দেওয়া হয় ডানা, আবার কখনও মালিকের খুশিমতো পায়ে জোটে সোনার নূপুর। খুশি হই, দেখি নিজেকে, ভাবি কতো সুখী আমি। খাঁচার মালিক ‘ভালো’ হলে ‘ভালোবাসলে’ আমরা খাঁচার জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে যাই, সুখেও থাকি। তবু খাঁচা তো খাঁচাই। মুক্ত আকাশ তো সেখানে নেই। আর যদি নির্যাতিত হই, তখনও ভাবি আর ভাবি, শক্তি সাহস কোনটাই কুলায় না যে খাঁচা ভেঙে বের হবো। আবার অনেক সময় ভয় জাগে, গরম কড়াই থেকে আগুনে গিয়ে পড়ার ভয়। কাক,চিল, বাজপাখির ভয়।

কেউ কেউ আবার আমাদের ‘সবক’ দেয়, শিক্ষা দেয়। বলে কতো ভাগ্যবলে তোমরা খাঁচার ভিতরে আরামে থাকতে পারছো। মালিককে মেনে চলা বড়ই পুণ্যের কাজ। তোমরা পুণ্যবতী। নিজের মালিকের কাছে যত্নে আছো। ভুলেও ওই মুক্ত পাখিদের দিকে তাকিও না। ওরা খারাপ পাখি।

ছবিটা সংগৃহীত

কিন্তু যদি আমি স্বাধীন মানুষ হিসেবে বাঁচতে চাই, তাহলে খাঁচা ভাঙার ঝুঁকিটা নিতেই হবে। কাকাচিলের সাথে লড়াই করার জোরও অর্জন করে নিতে হবে। সংগ্রাম করেই বাঁচতে হবে। চেষ্টা করতে হবে জয়ী হওয়ার। মারবে? মরে যাবো? এখনি বা এমন কি বেঁচে আছি? ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে’, হ্যাঁ মুক্তির পরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বলিদানে প্রস্তত থাকতে হবে।

আর ‘বিলাই’ এর কামড় খেয়ে ভয় পেলে চলবে না। ‘দে বিলাই কামড় দে’ কত কামড় দিবি দে। তবুও ভয় পাবো না, তবুও পিছিয়ে যাবো না।

বিশ্ব নারী দিবস। শুধু একদিনের নয়। সারাজীবনের সাহস্ সঞ্চয়ের, সংগ্রামের প্রেরণা জোগানোর দিন। অমুক তমুক কোম্পানির নারী দিবস নয়। এটা আমাদের সকলের নারী দিবস। সব শ্রেণি পেশার মানুষের আত্মসাহসে বলীয়ান হ্ওয়ার দিবস। এগিয়ে যাবার দিন। সাহসী হও। বি বোল্ড। Be Bold For Change!
Be Bold! Be the Change।

সাহসী হও। পরিবর্তন আসবে।  নিজেকে পরিবর্তন করবো, সমাজে পরিবর্তন আনবো। এটাই হোক আমাদের নারী দিবসের অঙ্গীকার।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.