বোরখার ছায়াতলে

মোশফেক আরা শিমুল:

বোরখা, হিজাব কি নারীরা শুধুই ধর্মিয় কারণে পরে? কিংবা হিজাব বা বোরখা পরা নারীরা কি পশ্চাৎপদ চিন্তা করে? তারা সবাই কি রক্ষণশীল হয়?

একদিন এক বোরখা পরিহিত নারীর সাথে কথা বলছিলাম। তিনি গৃহিনী। তার সাথে কথা বলার এক পর্যায় সে বললো, “আমার বোরখা পরতে ভালো লাগে না। কিন্তু বোরখা না পরলে শ্বশুর- শাশুড়ি রাগ করে। বোরখা পরি বলেই বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাই।” এই নারীর জন্য ধর্মীয় অনুভূতি বা তার সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার জন্য বাইরে যাওয়া, বাজারে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বোরখা পরার মতো শর্ত মেনে নিয়েছে।

আজ থেকে ১৫ বছর আগে আমিও হিজাব /বোরখা পরা নারীদের দেখলে তাদের রক্ষণশীল মনে করতাম। ভাবতাম খাঁচার মধ্যে থেকে একটা মানুষের চিন্তা কীভাবে খাঁচার বাইরে যাবে? কিন্তু ব্যক্তিবিশেষে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়। কারও কারও জন্য খাঁচাটাই হয়ে দাঁড়ায় ন্যুনতম স্বাধীনতার পথ। ওইটুকু স্বাধীনতা পাওয়াই তার জন্য অনেককিছু! তাই পোশাক দেখে মানুষের চিন্তাকে বিচার করার চিন্তাটাই আসলে একটা মৌলবাদী চিন্তা। আমি কাজের বা অকাজের নানা অভিজ্ঞতায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রও দেখেছি। হিজাব/বোরখা পরার পেছনে ধর্মীয় অনুভূতি ছাড়াও নানা বাস্তবতা থাকে। নানা কারণে না চাইলেও অনেক নারীকে এই পোশাকটা পরতে হয়। তার মানে আমি এটা বলছি না যে ধর্মীয় কারণে যারা বোরখা পরেন তারা রক্ষণশীল।

আমি বলছি চয়েজের কথা। সকল নারী পছন্দ করে নিজ ইচ্ছাতেই বোরখা/হিজাব পরেন এমনটা নয়। পছন্দ না করেও অনেক নারীরা বোরখা পরেন এবং তার বাস্তবতার কারণেই তাকে সেটা পরতে হয়। আমরা বলতেই পারি যে সে কেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই পোষাকটা পরছে, এটাই তো সমঝোতা। বুঝতে হবে সবার যুদ্ধ করার মতো অবস্থা ও অবস্থান থাকে না।

একবার কক্সবাজারে রাখাইন পল্লীতে একটা কাজে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম রাখাইন মেয়েরা বোরখা পরছে। তা আবার যেই সেই বোরখা না, একেবারে হাত মোজা পরা, মুখ ঢাকা বোরখা। জিজ্ঞেস করতে তারা বললো, এই পোশাক পরেও এমনকি তারা নিরাপদবোধ করেন না। স্থানীয় পুরুষদের মাঝে একটা চিন্তাই আছে যে রাখাইন নারীরা যৌনকর্মি হয় বা যৌনতার ক্ষেত্রে সহজলভ্য। সেক্ষেত্রে তাদের পরিচয় বুঝতে পারলে আরও বেশি যৌন হেনস্তার শিকার হতে হয়। রাস্তাঘাটে রাখাইন মেয়েদের দেখে বাঙালী পুরুষদের অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা একটা নরমাল ব্যাপার। বিশেষ করে অবিবাহিত রাখাইন নারীরা বেশি বোরখা পরেন স্কুল, কলেজ ও কাজে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের জাতিগত পরিচয় গোপন করার জন্য। এটা আমরা বলতেই পারি যে বোরখা দিয়ে নিরাপদ থাকা যায় না। কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে ওখানের নারীরা এই পোশাকটিকেই নিরাপত্তার অবলম্বন মনে করছেন।

আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে বোরখা পরছেন যৌনকর্মীরা। যখন আমি যৌন কর্মিদের সাথে কথা বলেছি তখন দেখেছি, বাচ্চাদের যখন স্কুলে নিয়ে যান বা অন্য কাজে বাইরে যান তখন তারা বোরখা পরা নিরাপদ মনে করেন। কারণ তাদের কোনো খদ্দের তাদের দেখে চিনে ফেলতে পারেন। কাজের বাইরে তাদের কেউ চিনে ফেলুক এটা তারা চান না। এখানে তারা মুখ ঢাকা বোরখা পরেন পরিচয় গোপন করার জন্য। আমাদের সমাজে যৌন কর্মকে একটি খারাপ পেশা হিসেবে দেখা হয়। খদ্দেরের মান সম্মান না গেলেও যৌনকর্মীর পরিচয় প্রকাশ পেলে তারা সমাজে নিন্দিত হন। আর এই নিন্দার ভার তার পরিবারের সদস্যদের গায়ে লাগুক তা কোনো যৌনকর্মী চান না। তাই পরিচয় লুকানোর জন্য মুখ ঢাকা বোরখা পরেন তারা।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবার বোরখার ব্যবহার হয় ভিন্ন কারণে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলেছিলাম। তারা বলছেন তারা বোরখা পরেন আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে নারী পুরুষ উভয়ই ফ্যাশন সচেতন। তাছাড়া নিত্য নতুন বাহারি পোশাক প্রদর্শনের মাধ্যমে স্ট্যাটাস প্রকাশের বিষয়ও রয়েছে। যাদের অনেক পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই তারা বন্ধুদের নিত্যনতুন পোশাকের কারণে কিছুটা হীনমন্যতায় ভোগেন। বোরখা পরলে তাদের এই চাপটা কম হয়। আবার স্কুলে যাওয়া আসা করেন এমন অনেক নারী অভিভাবকরা বোরখা পরেন দ্রুত বের হওয়ার প্রয়োজনে। সকাল থেকে বাড়ির সকল কাজ সেরে স্কুলে বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হয়, এরই মাঝে পরিপাটি হয়ে বের হওয়া তাদের জন্য বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এরা অনেকেই আবার অন্যসময় অন্য কোথাও বোরখা পরেন না।

এর বাইরে একটা বড় অংশ নারীরা বোরখা/ হিজাব করেন পরিবারের প্রেশারে। কারও বাইরে যাওয়ার, কারও পড়াশোনা করার, এমনকি কারও নিজের পছন্দমতো সাজগোজ করার শর্ত থাকে বোরখা বা হিজাব। যেমন শ্রিয়া (ছদ্ম নাম) হিজাব করে, কারণ তার মা হিজাব করার শর্তে তাকে চুল ছোট (বয় কাট) করতে দিয়েছে। শ্রিয়ার কাছে চুল ছোট করা ও শার্ট পরতে পারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাই সে মায়ের শর্ত মেনে হিজাব করে। কিন্তু হিজাব পরাটা তার নিজের আগ্রহে নয়। সমঝোতা।

আবার অনেকে বোরখা পরেন সামাজিক প্রেসারে। আশপাশের সবাই হিজাব করেন, তিনি হিজাব না করলে এলাকার লোকজন খারাপ বলবে। একজন চাকুরিজীবী হিজাব পরা নারী যিনি কিনা অফিসের বাইরে ওয়েস্টার্ন পোশাক পরেন, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি কেন হিজাব করেন? তিনি বলেছিলেন, অফিসে পোশাক নিয়ে যুদ্ধ করতে ভালো লাগে না, সবাই এভাবে দেখতে চায় নারীদের আর অধিকাংশ নারী কলিগরা হিজাব করেন বলে তিনিও হিজাব করেন।
নরসিংদীতে একটি স্কুলে গিয়েছিলাম প্রশিক্ষক দিতে। লক্ষ্য করলাম হিন্দু শিক্ষিকারাও বোরখা পরা। দুপুরের খাবারের বিরতিতে জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলাম ওই স্কুলের নারী শিক্ষকদের বোরখা পরা বাধ্যতামূলক।

আমি অনেক হিজাব/বোরখা পরা নারীদের দেখেছি যারা প্যান্ট শার্ট পড়া নারীদের থেকেও বেশি প্রগ্রেসিভ ও আধুনিক। তারা অন্যের পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করেন না বা অন্যকে বিচার করেন না। সকলের পছন্দ, স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। যে মেয়েটি বড়ই হয়েছে বোরখার মাঝে, সে বোরখাকে সাথে নিয়েই তার স্বাধীনতা খোঁজে।

আপাদমস্তক বোরখা পরা এক কিশোরী, যে কিনা ধর্মীয় কারণে নিজের পছন্দে (সে হয়তো পছন্দ বোঝার সুযোগই পায়নি) বোরখা পরেন, আমাকে তার ইচ্ছের কথা বলেছিলো। সে বলেছিলো, সে বোরখা পরেই “পুরুষদের” বাইক চালিয়ে পাহাড়ে উঠতে চায় এবং পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সে হেলমেট খুলে দাঁড়াতে চায়। এটাই তার স্বাধীনতা।

লেখক পরিচিতি: উন্নয়নকর্মী ও এক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন: