এক আদনান লোকান্তরে , লক্ষ আদনান ঘরে ঘরে

কামরুন নাহার রুমা: কানে দুল, হাতে ব্রেসলেট, মাথায় কালো রিবন,  চোখে কালো সানগ্লাস পরা ঈগল গ্যাঙ্গের ম্যাক্সের কথা মনে আছে কারো? মনে নেই? মনে করিয়ে দিচ্ছি ।

ম্যাক্স হলো ২০০০ সালে ভারতে মুক্তি পাওয়া জোশ ছবির নায়ক শাহ্রুখ খান যে ঈগল গ্যাং নামে একটা গ্যাং এর লিডার। আর তার প্রতিপক্ষ স্করপিওন বা বিচ্ছু গ্যাং যার প্রধান প্রকাশ অর্থাৎ নায়ক শরদ কাপুর। রাস্তা বা সীমানা দখলে এই দুই দল সবসময় একে অন্যের সাথে মারপিটে ব্যস্ত। সোজা কথায় নিজদের আধিপত্য বিস্তারি এদের মূল কাজ। আর তাদের এই আধিপত্য বিস্তারের নিত্য নাজেহাল এলাকার মানুষ সেইসাথে পুলিশ বাহিনী। আর তাদের আধিপত্য বিস্তারের  কর্মযজ্ঞে সিনেমার শেষে প্রাণ দেয় বিচ্ছু  গ্যাং এর প্রধান প্রকাশ।

ওটা সিনেমা ছিল তাই এই আধিপত্য বিস্তারের খেলা বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু  উত্তরার নাইন স্টার আর ডিসকো বয়েজের এই খেলা কি আদৌ বন্ধ হবে! এই খেলাটা শুরুই বা হোল কিভাবে? হ্যাঁ বলছি উত্তরার আদনান হত্যার কথা।  ঘটনাটি পুরোটা পড়ার সাথে সাথে আমার ঈগল আর বিচ্ছু গ্যাঙের কথা মাথায় এসেছিল। আদনানের পরিবারের জন্য আমার কোন সান্ত্বনা নেই; একফোঁটা কষ্ট হয়নি আমার আদনানের মায়ের জন্য। আমার ভীষণ খারাপ লেগেছে আদনানের জন্য কারন তার এই পরিণতির জন্য যতোটা না সে নিজে তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী ওর মা-বাবা, ওর পুরো পরিবার।

কামরুন নাহার রুমা

আমি আমার পুরনো একটা লেখায় বলেছিলাম সন্তানকে টাকা পয়সা দিয়েই মাবাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়না; সেই টাকা পয়সা সে কিভাবে খরচ করে সেটার খোঁজ খবর রাখতে হবে এবং মাবাবার থেকে দূরে থেকে যেসব সন্তান বিশেষ করে ছেলে সন্তানরা লেখাপড়া করে তাদের উপর আসলে নজরদারি দরকার কারন আমার নিজের চোখেই দেখা ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় দ্রুত বিপথে চলে যায়। কিন্তু উত্তরার এই ছেলেগুলোতো অধিকাংশই মাবাবার সাথেই থাকে তাহলে গ্যাপটা কোথায়? এই ছেলেগুলো মোটরসাইকেল রেস করে, দল বেঁধে মোটরসাইকেল চালিয়ে ভয় দেখায়, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, দাপট দেখায় ইত্যাদি। এই কাজগুলো করার জন্য একই সাথে বিত্তবান হওয়া এবং প্রভাবশালী হওয়া জরুরী অর্থাৎ পারিবারিক অর্থনৈতিক কাঠামো শক্ত হওা জরুরী এবং হয়েছেও তাই। এদের মাবার অনেক টাকা যে টাকার ওরা ব্যবহার নয় অপব্যাবহার করছে এই গ্যাং গঠনের মাধ্যমে।

আমি আমার শৈশবে পাড়ার এবং আমার নিজের বড়ভাইবোনদের দেখেছি একটু একটু করে পয়সা জমিয়ে বই কিনছেন, পাড়ায় একটি ক্লাব করার চেষ্টা করছেন এবং করেছেনও। ক্লাবগুলোর কাজ ছিল পাঠচক্র থেকে শুরু করে নানান ধরনের প্রতিযোগিতার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের  আয়োজন করা; বিশেষ দিবসে শোভাযাত্রা বের করা এবং নিজেদের সাধ্যমতো দরিদ্রদের সাহায্য করা ইত্যাদি।

এরপরে একটা সময় আসলো দেখলাম টাকা তুলে সবাই ভিডিও ক্লাব করছে আর এখন একটা সময় টাকা তুলে সবাই বিশেষ করে ছেলেরা গ্যাং গঠন করছে যার গঠনমূলক কোন কাজ নেই আছে শুধু ধ্বংস । আমি যে তিনটা ফেজ এর কথা বললাম এই তিনটা ফেজে আমাদের জীবনে শুরুতে ছিল টিভি (খুবই সল্প পরিসরে) তারপর এলো ভিডিও এবং ডিশ কালচার এবং লাস্ট ফেজে এলো ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন।

আমি কমিউনিকেশনের শিক্ষক ঘুরেফিরে সব থিওরিতে চলে যায়। এই গ্যাংদুটোর যারা সদস্য এরা সবাই উঠতি বয়সের তরুন, কেউ কিশোর । স্বচ্ছল পরিবারের হওয়াতে তারা কোন কিছু চাওয়ার আগেই পায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এদের সবার রুমে নিজেদের আলাদা আলাদা টিভি সেট আছে । ওয়াইফাই কানেকশন তো মুড়িভাত । আর স্মার্ট ফোন সেটা ওদের কাছে কমদামী খেলনার মত যেটার যথেচ্ছা ব্যবহার তারা করে; যার মধ্যে আছে পর্ণ দেখা থেকে শুরু করে গেমস খেলা এবং সহিংসতায় ভরা মুভি দেখা। আজকাল ওরা টিভি দেখে সময় নষ্ট কম করে কারন যেখানে খুশি সেখানে বসেই টিভির অনুষ্ঠান স্মার্টফোনে দেখা যায় । কার রেস এবং যুদ্ধ-মারামারি সম্পর্কিত গেমস ওরা বেশি খেলে আর সেসাথে দেখে সহিংসতায় ভরা বিদেশী মুভি। এটা আমি বেশ অনেকটা সময় ধরে এই বয়সের ছেলেদের অবসারভ করার মাধ্যমে পেয়েছি। উত্তরার এই ঘতনায় গারবনারের কালটিভেশন তত্ত্বটি বেশ প্রযোজ্য।

টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিশেষ করে সহিংস অনুষ্ঠান দর্শকদের ভাবনার জগতে কোন পরিবর্তন আনে কিনা, তাদের নৈমিত্তিক জীবনে সেসব অনুষ্ঠানের কোন প্রভাব আছে কিনা, থাকলেও সেটা কিভাবে এবং কতোটুকু তা ১৯৬০ এর মাঝামাঝি সময়ে টিভি দর্শকদের উপর গবেষণা করে  তার ফলাফল পরবর্তীতে গারবনার এবং গ্রস প্রকাশ করেন ১৯৭৬ সালে এক গবেষণা প্রবন্ধে ।

গবেষণার ফলাফলে তারা দেখিয়েছেন হেভি ভিউয়াররা (যারা বেশি বেশি টিভি দেখে) সহিংসতায় ভরা অনুষ্ঠান দেখে বিশ্বাস করে যে টিভিতে তারা যা দেখছে বাস্তব দুনিয়া এরচেয়ে অনেক বেশি খারাপ অনেক বেশি সহিংসতা এখানে হয়; যা দেখানো হচ্ছে তার পুরোটাই সত্যি ধরে নিয়ে তারা নিজেরা সেইসব আচরণে উদ্বুদ্ধ হয় – যার একেবারে চাক্ষুষ প্রমাণ উত্তরার এই দুটি গ্যাং। এরা ক্লাস ফোর ফাইভ থেকে সব ধরনের লাক্সারী পেয়ে বড় হয়েছে । টিভিতে, স্মার্টফোনে নিজেদের মত অনুষ্ঠান দেখছে বোঝার বয়সের আগে থেকেই । আর দেখছে সব সহিংস অনুষ্ঠান। সেই না বোঝার বয়স থেকে এসব দেখতে দেখতে তারা তাদের নিজেদের মধ্যে এটা কালটিভেট  করে ফেলেছে এবং ধরেই নিয়েছে বাস্তব পৃথিবীটা এমনই তাই তারাও যদি এই আচরণ করে তাহলে কি আর এমন অন্যায়।  

ঠিক তাই। অন্যায়টা ওদের নয় একেবারেই । অন্যায়টা মা-বাবার । সন্তানের হাতে সবকিছু তুলে দেবার আগে একটু ভাববেননা আপনারা যা দিচ্ছেন তার ব্যবহারটা কেমন হওয়া উচিত কতোটুকু হওয়া উচিত! তাকে বোঝাতে হবে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সেই জিনিসের ব্যবহার! চাইলেই সন্তানকে দামী ফোন কিনে দেয়া , এলইডি টিভি কিনে দেয়া, মোটর সাইকেল কিনে দেয়া, দামী গাড়ি কিনে দেয়ার মধ্যে যতটানা আপনার বাহাদুরি প্রকাশ পায় তার চেয়ে বেশি প্রকাশ পায় আপনার মূর্খতা । আপনার মূর্খতা আপনার সন্তানের জীবনের জন্য হুমকি । তাই আসুন একাকীত্ব দূরীকরণ এবং বিনোদনের জন্য আদনানদের হাতে সব বিলাসিতা তুলে দেবার পাশাপাশি তাদেরকে সেসবের পরিমিত ব্যাবহারটা শিখাই।

মায়েরা আপনারা কিটি পার্টিতে ব্যস্ত না থেকে, বাবারা আপনারা ক্লাবে বসে ড্রিঙ্ক করা থেকে বিরত থেকে সন্তানকে একটু সময় দিন;  আপনি , আপনারাই তার বন্ধু হোন, কোন যন্ত্র নয়। 

রেফারেন্সঃ

(Gerbner & Gross (1976 – Living with television: The violence profile. Journal of Communication, 26, 76.)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.