মামুন ,মার্গারিতা ও মৃত্যুচিন্তা

শাহাব উদ্দিন: সমষ্টিতে সাধারণ মানুষ হলো পিঁপড়ের দঙ্গলের মতো। বিশেষ করে প্রাচীন যুগের সৈন্যবাহিনীর একজন সৈন্য যার দেহ বর্মে ঢাকা, মাথা ও মুখ হেলমেটে, চোখ বরাবর দুটি ছিদ্র আর তার হাতে বর্শা।
এই ব্যক্তিটির পরিচয় কি? কোনো পরিচয় নেই।

সে ক্ষুধার্ত হয়, ব্যথায় কাতরায়, ভালোবাসে, যৌনতার তীব্রতায় অন্য মাত্রায় পৌঁছায়। পৃথিবীর কতো কিছু তাকে সুখী ও ব্যথিত করে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে চিন্তামগ্ন হয়; আর যখন গাছের ডালপালা শব্দ করে হাওয়ায় দুলে উঠে এবং সেই শব্দ অতিক্রম করে কোন পাখির ডাক ভেসে আসে সে বিমুগ্ধ চেয়ে থাকে। তারপরে তাকে যখন শত্রুকে আক্রমণ করার আদেশ দেয়া হয়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে অবিকল তারই প্রতিচ্ছবি আর একজনের ওপর, প্রাণপনে যুদ্ধ করে ,তারপরে মরে যায়, নয় অন্য মানুষটিকে হত্যা করে বেঁচে থাকে।

Margarita
বাবা মামুনের কোলে অলিম্পিক জয়ী মার্গারিতা মামুন

যদি মরে যায় দুই পায়ে ধরে তাকে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় লাশের স্তুপের দিকে, তার অনুভূতিহীন হাত পৃথিবীর মাটি আঁকড়ে ধরতে চায়, কিন্তু ততক্ষণে তার বর্তমান অতীতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। আজও অবিকল তাই, যখন আমরা সভ্যতার অভূতপূর্ব শীর্ষে বসবাসরত।
একজন ব্যক্তিকে সংখ্যায় পরিণত করা হচ্ছে মানব সভ্যতার হলমার্ক।
আসলে এটাই সভ্যতা।
পিঁপড়েরা কি আমাদের মতো?

খবরটি যখন এলো আমি রোগী দেখছিলাম, মানে আমার এক মেন্টালি ডিজেবল আট বছরের রোগী আমার পিঠে, হাতে ধপাধপ ঘুষি মারছিল, আর আমি ওকে কন্ট্রোল করায় ব্যস্ত ছিলাম। ওর ঘুষিতে ব্যথার বিষ ছিল এবং আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম।
একটি মৃত্যু সংবাদ!

ডাক্তারকে মৃত্যু সংবাদ দিয়ে বিচলিত করতে নেই। ডাক্তার জীবন-মৃত্যুর মাঝখানের সেতুটি, সেই সেতুকে নাড়াতে নেই। তাতে ডাক্তারের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, তার গলার কাছে যদি কোনো কান্না দলা বেঁধে থাকে, সে ভুল ডায়াগনোসিস করতে পারে, ভুল ঔষধ দিতে পারে, সে প্রয়োজনীয় কাজটি করতে ভুলে যেতে পারে। সে তখন জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি সেতু থাকে না, হয়ে যায় মৃত্যুর সহচর।
ডাক্তারের মানুষ থাকা একটি সংগ্রাম , পাথর হওয়া সহজ।

কিন্তু দিন শেষে সবাই পিঁপড়ে, মৃত্যুর এক দুদিনের মধ্য সারা দুনিয়া তাকে ভুলে যায়, অন্য সব খবর এসে মৃত্যু সংবাদের উপরে স্তুপীকৃত হয়; যাদের জন্য জীবনের আই-ঢাঁই, কান্নাও সংগ্রাম , তারা দু’চারদিন বেশি মনে রাখে, কিন্তু তারপর তাদেরও কাজে যেতে হয়, স্কুল-কলেজ থাকে, প্রেম-ভালোবাসা-অনুভূতি-চাঁদ-পাখি-প্রজাপতি-নদী নিজস্ব স্থান দখল করে রাখে।
হ্যাঁ, মার্গারিতা বুলগাকভের গল্পের যে মাস্টার তার ভালোবাসার নারী। জীবনের কালো,কঠিন ও প্রেত নৃত্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন মানবী যে তার ভালোবাসাকে বিজয়ী করে এনেছে।

মার্গারিতা অলিম্পিকে বিজয়ী হয়ে এসেছে , নিজ যোগ্যতায় অর্জন করেছে সোনার মেডেল , আসলে সোনা বা মেডেল এখানে গৌণ। বিজয় হচ্ছে সবচেয়ে রৌদ্রময়।

মামুন আমাদের বন্ধু, আমাদের সমসাময়িক, কিন্তু আমার তাকে মনে নেই, হয়তো আমি তাকে দেখিইনি, আর মানব দঙ্গলে যদি দেখেই থাকি, কী দিয়ে আমি চিনবো? দুই চোখ, দুই হাত, দুই পা দিয়ে একজন মানুষকে আর একজন মানুষের থেকে আলাদা করা যায় না। আলাদা করে কাজ, কিন্তু কাজ চেহারায় লেখা থাকে না।

কিভাবে তুমি আমাকে আলাদা করবে? এই যে আমি ভালোবাসি, অনুভব করি, তোমার জন্য কিছু করে যেতে চাই?
আজ আমি মামুনকে চিনি তার আত্মজার কারণে। এখন ব্যাপারটি রিভার্স হয়েছে ,আমরা মামুনের কারণে তার আত্মজা মার্গারিতাকে অংশত আমাদের ভাবতে পারি এবং মার্গারিতা আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে ।

মামুন শয্যাশায়ী, ঠিক বুলগাকভের মাস্টারের মতো রুগ্ন, হাসপাতাল বেডে, সে জানে মার্গারিতার সাথে তার দেখা হবেই । মামুন এয়ারপোর্টেও যেতে পারেনি এতো বড় বিজয়ের পরে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে, ”মা, তুই এখন পৃথিবীর সন্তান, সারা পৃথিবী তোর দিকে চেয়ে আছে এবং তুই যাই ভালো কিছু করিস বাংলাদেশ তোকে নিয়ে গর্ব করবে।”

আশ্চর্য! ও তো গত সপ্তায় বা অলিম্পিকের আগের দিনও চলে যেতে পারতো। কিন্তু যায়নি, কারণ তাহলে মার্গারিতা বিজয়ী হতে পারতো না। মার্গারিতা তার সন্তান, পারতো না এত বড় শোকের বোঝা কাঁধে নিয়ে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পারফরমেন্স দেখাতে।
যখন স্বপ্ন সাফল্য হয়ে হাতের মুঠোয় এসে গেল, মামুনের মনে হলো এবার চলে যাওয়া যায়।
ক্যান্সারের ব্যথার নিরসন হয় চলে যাওয়ায়, মৃত্যুই এই ব্যথার মহৌষধ।

কিন্তু এই সবের মানে কি?
মৃত্যুর সুইচটি কি তার হাতে ছিল?
এই সুইচ কি অন অফ করা যায় ?
মানুষ তা পারে?
মরণশীল মানুষ?

নাহ্ আমার এই গল্প ভালো লাগে না। এ কোন গল্পই নয়, এ হলো বাস্তব জীবন !

অথচ জীবনের অন্য দিকটিও কেমন ধুসর। গণক ঠাকুর প্রাচীন রাশিয়ার ওলেগকে বলে ছিল তোমার প্রিয় ঘোড়ার কারণে তোমার মৃত্যু হবে, অথচ ঘোড়াই মরে গেল ওর আগে। ওলেগ বললো, এই গণকেরা মিথ্যুক। সে দীর্ঘদিন আগে মৃত ঘোড়ার খুলি পা দিয়ে নাড়া দিতেই সেখান থেকে বিষধর সাপ বের হয়ে মৃত্যু-ছোবলটি মেরে দিল।
এটা কি? ভাগ্য ?
আমরা তো বস্তুবাদী, আমরা তো ভাগ্য মানি না।
আমরা কি এখন শুধু অশ্রুই ফেলব যতদিন আমাদের ঝর্ণাটি শুকিয়ে না যায়?

আগস্ট ২৭,২০১৬

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.