সময়ের এফোঁড়-ওফোঁড় ও মেয়েদের সাহস

রওশন আরা বেগম: ১৯৯১ সালে আমি যখন ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হই, সেই সময় থেকে ৪/৫ জন বান্ধবী মিলে এক সংগে বের হতে শুরু করলাম। আমাদের সঙ্গে সাহসী একটি মেয়ে ছিল। সে সঙ্গে থাকলে আমাদের সাহস অনেক বেড়ে যেত।

সম্ভবত ১৯৯৩ সালে, ঈদের কেনাকাটা করার জন্য বন্ধুবান্ধব মিলে প্ল্যান করে একসঙ্গে বের হই। সঙ্গে সেই সাহসী বান্ধবী রিপাও ছিল। চাঁদনী চক মার্কেটের মধ্যে হাঁটছি। হঠাৎ করে রিপা আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বললো, ‘তোরা তৈরি থাকিস। ঠিক জায়গা মতো ঘা দিতে আসছে’। বড় একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে তা আমরা বুঝতে পারলাম।

girls safetyবুকে ধাক্কা দিতেই রিপা লোকটিকে ধরে ফেললো। সেইদিন আমরা সেই লোকটাকে সবাই মিলে রাস্তায় ফেলে আচ্ছামতো জুতো পেটা করেছিলাম। সেইদিনের পর থেকেই আমরা সবাই সাহসী হয়ে গেলাম। যে কাজটি একা একটি মেয়ের পক্ষে করা সম্ভব ছিল না, সবাই মিলে সেই অসম্ভব কাজটি সম্ভব করে ফেললাম। যদিও এতে সমস্যার সমাধান হলো না, তবু মনের মাঝে কেমন যেন এক ধরনের তৃপ্তি পেয়েছিলাম।

২০০৬ সালের দিকে বিশেষ একটা কাজে আমাকে একাই বাংলাদেশে যেতে হয়। টরেন্টো থেকে আমিরাতস এয়ারলাইন্সে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আমার এই যাত্রাটি ছিল বেশ ভয়াবহ। বিশেষ করে দুবাই থেকে ঢাকা পর্যন্ত। পরিবার নিয়ে এর আগে অনেকবার যাওয়া হলেও এই প্রথম বাধ্য হয়ে একা যাওয়া।

একটা মেয়ের পক্ষে দেশের বাইরে যতটা নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব, নিজের দেশের মানুষের মধ্যে আসা ঠিক ততটাই বিপদজনক। হিথরো এয়ারপোর্টে এসে আরো দুই বাঙ্গালী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারাও একাই দেশে যাচ্ছে। একটি মেয়ে, কানাডায় পড়াশুনা করে। সে আমাকে জানালো, দুবাই এরপর থেকে যাত্রা কিন্তু নিরাপদ নয়। কারণ আমাদের সঙ্গে কোন পুরুষ মানুষ নেই। তাই প্ল্যান করলাম দুবাই থেকে আমরা তিনজনে একসঙ্গে সিট নিবো।

দুবাইতে বাংলাদেশি অনেক শ্রমিক কাজ করে। তারাও একই প্লেনে উঠবে। মেয়েদের একা দেখলেই পিছু নিতে পারে। দুবাইতে বাংলাদেশি যে শ্রমিকগুলো কাজ করতে আসে, তারা প্রায় সবাই গ্রাম থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী মানুষ। তাদেরকে যে ভয় পাওয়ার ব্যাপার আছে তা আমার জানা ছিল না।

অল্পবয়সী মেয়েটি আমাকে জানালো, দুবাই এর এই শ্রমিকগুলো একেবারেই অন্যরকম। আমরা যখন দুবাইতে যাত্রা বিরতি নিলাম তখন একজন লোক এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আপা আপনি কোথায় যাবেন? আমি কোনো উত্তর দিলাম না। প্লেনে উঠার সময় আমার সমস্যা বেঁধে গেল। তিনজনে একসঙ্গে সিট পেলাম না। বাধ্য হয়ে আমাকে বুকিং সিটে বসতে হলো। আর আমার সিটটি ছিল দুবাই ফেরত কয়েকজন শ্রমিকের ঠিক মাঝখানে, যেখানে আর কোনো মেয়ে ছিল না।

Chitkarআমাকে একা পেয়ে তাদের মধ্যে উল্লাস দেখতে পেলাম। আমার পাশের সিটটি খালি ছিল। সেই সিটে কে বসবে তা নিয়ে এক প্রকার প্রতিযোগিতা শুরু হলো শ্রমিকদের মধ্যে। আমি ইমারজেন্সিতে কল দিলাম। ইন্ডিয়ান এয়ার ক্রু এসে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলেন। আমি তাকে জানালাম –”I don’t feel safe here” . তিনি তখন জানালেন যে তিনিই আমার পাশের সিটে বসবেন। এই বলে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন কিছু একটা কাজ শেষ করার জন্য। সেই সুযোগে ২০/২৫ বছরের একটি ছেলে নিজের সিট রেখে দ্রুত আমার পাশের সিটে এসে বসে পড়লো। তাদের সঙ্গীরা হাতে তালি আর শিস্ দিতে শুরু করলো।

প্লেনের মধ্যে এরকম, ঘটনা ঘটতে পারে তা ছিল সত্যি অবিশ্বাস্য। এদের মধ্যে একজন মধ্যবয়স্ক লোক আমাকে লক্ষ্য করে বললো, ”ম্যাইয়া হইছেন, চাপাচাপি খাইবেন না, তা কী কইরা হয়?” এর মধ্যে কেউ কেউ স্মোকিং শুরু করছে, মাইকিং করেও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমি আবারো ইমারজেন্সিতে কল দিলাম।

ইন্ডিয়ান ফ্লাইট ক্রুটি এসে এবার এক প্রকার জোর করেই সেই ছেলেটাকে আমার পাশের সিট থেকে তুলে দিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞ্যেস করলেন- আপনার দেশের লোকগুলো এরকম কেন ? ” They behaved like animal.” এই কথা শুনে লজ্জায় আমার মুখ লুকানোর মতো অবস্থা।

মনে মনে ভাবি, এই মানুষগুলো শিক্ষার আলো থেকে অনেক দূরে। এরা শিক্ষার সুযোগ ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাই হয়তো তারা সভ্য হতে পারেনি। এই দায়িত্বটা কাদের ছিল? স্বাধীনতার এতো বছর পরেও মেয়েরা স্বাধীন দেশে চলাফেরা করতে পারছে না। কেন শফী হুজুরদের মুখ থেকে লালা ঝরে? মেয়ে মানুষ দেখলেই যে পুরুষের মুখে লালা আসে, সেইসব পশুতে দেশ আজ ছেয়ে গেছে। মেয়েরা নিরাপত্তার জন্য বোরখাকে অবলম্বন হিসাবে বেছে নিয়েছে। ধর্মীয় বোরখার থেকে দেহকে রক্ষা করার বোরখার সংখ্যাই আজ বেশি। (পুরাতন লেখা)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.