শান্তা মারিয়া: বিশ শতকের সাহসী নারী অরিয়ানা ফ্যালাসি তার গর্ভস্থ অনাগত সন্তানের উদ্দেশ্যে সমাজ ও জীবন সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। তার সন্তানটি ছিল বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের ফসল। বিষয়টি যদি কারও অজানা হয়ে থাকে সেজন্য সংক্ষেপে বলছি।
ইতালিয় সাংবাদিক ও লেখক অরিয়ানা ফ্যালাসি তার প্রেমিকের সঙ্গে থাকতেন। তিনি গর্ভধারণ করলে প্রেমিক গর্ভপাতের জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি সন্তানের মা হতে চেয়েছিলেন এবং তাই গর্ভপাতে রাজি হননি। তখন প্রেমিক তাকে ছেড়ে চলে যায়। ফ্যালাসি তারপরও সন্তানকে পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এই ফ্যালাসির মতো সাহসের পরিচয় আরও অনেক নারী দিয়েছেন।
আশির দশকে বলিউড অভিনেত্রী নীনা গুপ্তা অবিবাহিত অবস্থাতেই ভিভিয়ান রিচার্ডের সন্তানের মা হয়েছিলেন এবং সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে সেই সন্তানকে প্রতিপালন করেছেন প্রকাশ্যে। আরেক বলিউড অভিনেত্রী কঙ্কনা সেনশর্মা অবিবাহিত অবস্থাতেই গর্ভধারণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে তিনি তার প্রেমিক ও গর্ভস্থ সন্তানের বাবাকে বিয়ে করেন।
বর্তমানে পাশ্চাত্যে অবিবাহিত মায়ের প্রতি সমাজ আর অনুদার নয়। অবিবাহিত নারী সেখানে সন্তানের জন্ম দিতে পারেন এবং সেই সন্তানকে শুধু নিজের পরিচয়ে প্রতিপালনও করতে পারেন। সেখানে অবিবাহিত পিতাও বিরল কোনো বিষয় নয়। কোনো মানুষ যদি মনে করে সে বিয়ে করবে না বা বিবাহিত জীবন যাপন করবে না, অথচ সন্তান নিতে চায় তাহলে দত্তক গ্রহণ, সারোগেসি অথবা সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে সে সন্তানের মা বা বাবা হতে পারে এবং সেই সন্তানকে প্রতিপালনও করতে পারে|
এমন বহু সিংগেল প্যারেন্ট পাশ্চাত্যে রয়েছে। অবিবাহিত মায়ের সন্তানকে বিভিন্ন হীনতাসূচক বিশেষণে অভিহিত করা, তার উদ্দেশ্যে কটূক্তি করার রীতি পাল্টে গেছে বহু আগেই।

মানবসমাজের উষালগ্নে বিয়ে নামের সামাজিক প্রথাটি ছিল না। জীবন তখন যূথবদ্ধতার। সেই আদিম সাম্যবাদী সমাজে সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত কোনো দ্ব্ন্দ্ব সংঘাত ছিল না। সে সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সে সমাজে মা ছিল সকল ক্ষমতার কেন্দ্র এবং মায়ের ক্ষমতা ছিল নিরঙ্কুশ। প্রকৃতিদত্ত যে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী নারী অর্থাৎ নারী সন্তান জন্মদানে সক্ষম-সেই বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল নারীর ক্ষমতার উৎস। সন্তানের পরিচয় নির্ধারিত হতো মায়ের নামে এবং গোষ্ঠির নামে। তখন গোষ্ঠির সকল পুরুষই সকল শিশুর পিতা বলে পরিচিত হতো। পরবর্তিকালে সমাজকাঠামো ও সম্পত্তির ধারণার পরিবর্তনের সাথে সাথে দলগত বিয়ে, এক নারীর একাধিক স্বামী, এক পুরুষের একাধিক স্ত্রী এবং এক পুরুষ-এক স্ত্রী ইত্যাদি অনেক রকম বিয়ের প্রথার জন্ম হয়েছে।
অবিবাহিত নারীর সন্তান ধারণের বিষয়টি অনেক প্রাচীন সমাজেই প্রচলিত ও স্বীকৃত ছিল। মহাভারতে অবিবাহিত নারীর সন্তানকে বলা হতো ‘কানীন’। কর্ণ ও ব্যাসদেব যথাক্রমে কুন্তি ও সত্যবতীর ‘কানীন পুত্র’।
আবার বিবাহিত নারী স্বামী ভিন্ন অন্য পুরুষ দ্বারাও সন্তানধারণ করতে পারতো। সেই সন্তানকে বলা হতো ক্ষেত্রজ। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন তিন পাণ্ডব প্রকৃতপক্ষে কুন্তির গর্ভে ক্ষেত্রজ পুত্র। নকুল ও সহদেব মাদ্রীর গর্ভে ক্ষেত্রজ পুত্র। এরা পাণ্ডুর পুত্র বলে পরিচিত হলেও এদের বায়োলজিকাল ফাদারদের সঙ্গে কুন্তি ও মাদ্রির বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না। একইভাবে পাণ্ডু এবং ধৃতরাষ্ট্র ছিল অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে স্বামী ভিন্ন অন্য পুরুষ দ্বারা উৎপাদিত পুত্র। এইসব পুত্ররা সকলেই খ্যাতিমান হয়েছিলেন এবং তারা শুধুমাত্র জননী দ্বারা প্রতিপালিত ছিলেন। তাদের জীবনে পিতার তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না। পিতৃপরিচয়হীন পুত্র বা কন্যাও সেসময় সমাজে পরিত্যাক্ত ঘোষিত হয়নি। অবিবাহিত এবং অনেক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে নিরত জবালার পুত্র সত্যকাম বিখ্যাত ঋষি ছিলেন এবং তিনি ঋষি গৌতমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিষ্য ছিলেন।
গ্রিক মিথোলজি অনুযায়ী পার্সিউস, থিসিউস, হারকিউলিসসহ অনেক বীর ও বিখ্যাত চরিত্র বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের ফসল।যীশুখ্রিস্টও কুমারী মেরির সন্তান ছিলেন। ইসলাম ধর্মে রয়েছে, পরকালে এবং বিচার দিবসে সন্তান পরিচিত হবে গর্ভধারিণী মায়ের পরিচয়ে।
মধ্যযুগে বিবাহ সম্পর্ক বহির্ভুত সন্তান সম্পর্কে ইউরোপের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অতি কঠোর। ‘বেজন্মা’, ‘জারজ’ ইত্যাদি গালাগাল বর্ষিত হতো তার উদ্দেশ্যে। সে ছিল সমাজ বহির্ভূত জীব। প্রায়শই তাকে ও তার মাকে ঠেলে দেওয়া হতো মৃত্যুর মুখে।
বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ কাঠামোতে অবিবাহিত মায়ের সন্তান জন্মদানের ঘটনা পরিবারে বিশাল বিপর্যয় নিয়ে আসে। অবিবাহিত মায়ের সন্তানরূপে জন্ম নেওয়া শিশুটির কোনো ঠাঁই হয় না পরিবারে ও সমাজে। ছোটবেলা থেকেই তার উদ্দেশ্যে বর্ষণ করা হয় গালাগাল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুটি জন্ম মুহূর্তে মা কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়।
কিছুদিন আগে ঢাকার বেইলি রোডে একটি পাঁচতলা বাড়ির সানশেডে ফেলে দেওয়া একটি নবজাতকের উদ্ধার এবং তার করুণ মৃত্যু সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। কয়েক মাস আগে ঢাকার পুরানো বিমান বন্দরে পরিত্যক্ত এক নবজাতককে কুকুরে কামড়ানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এদেশে ডাস্টবিনে, রাস্তার পাশে, নদীতে, পুকুরে, আবর্জনার স্তূপে কত শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে যায় তার কি কোনো হিসাব আছে?
বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে গর্ভে আসা নতুন জীবনকে গলা টিপে মারার জন্য ক্লিনিক আর হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছে ধর্না দেন কত অসহায় নারী এবং পাঁচ মাসের পর অ্যাবোরশন করাতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হন কতজন সে হিসেবই বা কে রাখছে। অবিবাহিত মায়ের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যদি এতো কঠোর না হতো তাহলে হয়তো এই শিশুদের এত নির্মম পরিণতি হতো না।
নতুন শিশুর জন্ম মানব সমাজে সর্বদাই হওয়া উচিত আনন্দের সংবাদ। শিশুকে স্বাগত জানানো উচিত। মা-বাবার আইনগত বন্ধন না থাকুক, তার জন্ম কেন অভিহিত হবে ‘অবৈধ’ অভিধায়? কেন ‘নাজায়েজ’, ‘লাওয়ারিস’ ইত্যাদি গালি বর্ষিত হবে তার প্রতি? কেন তাকে সমাজ থেকে পরিত্যাগ করা হবে? মানুষের জন্ম কখনও ‘অবৈধ’ হতে পারে না। তার মানব সত্ত্বার দাবি উপেক্ষা করা যায় না কখনও।
জানি, অনেকে বলবেন, এই লেখার মাধ্যমে বিয়ে বহির্ভুত সম্পর্ককে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বা সমাজকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অনাচারের দিকে। বিষয়টি কিন্তু তা নয়। যতই ঘৃণিত হোক বিয়ে বহির্ভুত সম্পর্ক, আমাদের সমাজে গোপনে যা চলছে সেটা কি অস্বীকার করতে পারবেন কেউ?
অসংখ্য নারী যে অবিবাহিত অবস্থায় সন্তান ধারণ করছে নানা কারণে, নানা পরিস্থিতিতে সেকথা কি অস্বীকার করার উপায় আছে কারও? এই সব সম্পর্কের কারণে যে শিশুর জন্ম হচ্ছে, কী ঘটছে সে শিশুর জীবনে আমি শুধু সে প্রশ্নটি করতে চাচ্ছি।
জন্মদাতা বাবা ও মায়ের আইনগতভাবে বিযে হয়নি সেই অপরাধে একটি শিশুকে কেন বঞ্চিত হতে হবে মায়ের স্নেহ থেকে, কেন হারাতে হবে বেঁচে থাকার অধিকার, কেন তাকে শৈশবে শুনতে হবে গালাগাল, কেন সারাজীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হবে ভয়াবহ গ্লানি, কেন তার জীবন শেষ হবে নর্দমায়, ডাস্টবিনে, মাটি চাপা পড়ে বা ফুটপাথে? সমাজ যদি তার প্রতি এত তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ না করতো তাহলে সেও অন্য দশটি শিশুর মতো পেতে পারতো সম্মান, বেড়ে উঠতে পারতো মায়ের কোলে। হয়তো সে বাবার স্নেহ পেত না, কিন্তু তবু তো মায়ের দিক থেকে হলেও একটি পরিবার সে পেত। পেত মায়ের পরিচিতি। ডিভোর্সড ও বিধবা মায়ের সন্তানরা যেভাবে বড় হয় সেভাবেই সে বেড়ে উঠতে পারতো, সমাজে অবস্থান গড়ে নিতে পারতো অন্য দশটি শিশুর মতো।
মহাভারতে পিতৃপরিচয়হীন বালক সত্যকামকে ঋষি গৌতম বলেছিলেন, তুমি সত্যকুলজাত। সত্যকাম নিজের কর্মগুণে সমাজে সম্মান অর্জন করেছিলেন| তার মা জবালা ছিলেন স্বামীহীন যৌনকর্মী। কিন্তু তিনি সন্তানকে পরিত্যাগ করেননি।
আমাদের সমাজের অবিবাহিত মায়েদের মাথায় যদি নিন্দা, শাসন, লোকলজ্জা ও সমাজপতিদের দণ্ডের ফলে রীতিমতো আকাশ ভেঙে না পড়তো, তাহলে তারাও হয়তো শিশুদের পরিত্যাগ করতেন না, হয়তো তাদের ফেলে দিতেন না রাতের অন্ধকারে মৃত্যুর মুখে। তাহলে সমাজটা হয়তো আরও বেশি শিশু-বান্ধব হতো।
লেখক ও সাংবাদিক
যীশুর জন্মের অপব্যাখ্যা দিলেন। তিনি ঐশী জন্ম গ্রহণ করেছেন। একজন ছেলে আর এক মেয়ের অবৈধ জঙ্গল চর্চা থেকে নয়। আপনার বিচানা সবার জন্য খোলা থাকতেই পারে তবে তার রাষ্ঠ্রীয়, সামাজিক, প্রথাগত বৈধতার দরকার শতভাগ জরুরী।।