জঙ্গি উত্থান: পরিবার বনাম রাষ্ট্রের দায়ভার

রাহিমা আক্তার: গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরায় জঙ্গি আক্রমণ গোটা জাতিকে যেমন স্তম্ভিত করেছে, তেমনি আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে আমাদের যুব সমাজের দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পর্কে।

এতোদিন কেবল মাদ্রাসার ভেতরেই জঙ্গি তত্ত্ব আটকে থাকলেও তা যেন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে তার বিস্তার এখন ইংরেজী মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে। আর যেখানে ‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়’ এর নাম জড়িত, যা কিনা দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। যেটাকে আমরা ধরেই নেই যে অতি আধুনিকতায় আর বিত্ত-বৈভবে বেড়ে উঠাদের শিক্ষাকেন্দ্র, সেখানকার দুজন ছাত্রকে এই জঙ্গিদের মধ্যে দেখে নড়ে চড়েই বসতে হয়, যা কিনা নতুন ভাবনা জন্ম দেয় যে আসলে সমস্যার মূল কোথায়?  

Rahima Akter
রাহিমা আক্তার

এখানে একটা জিনিস লক্ষণীয় যে দেশের সাম্প্রতিক দুটো হামলায় জঙ্গিরা কোনও বিশেষ দাবি দাওয়া প্রকাশ করেনি বা দেয়নি বিশেষ বার্তা । কি কারণে বা কি উদ্দেশ্য নিয়ে এই নির্মম হত্যা তা তারা উহ্য রেখেছে যা কিনা পরোক্ষভাবে আইএস বা ওই হিজবুত তাহিরি বা অন্যান্য মৌলবাদী সংগঠনের উদ্দেশ্যকেই সমর্থন করেছে । কেবল জিম্মিদের মুখে শোনা কিছু বক্তব্যই প্রমাণ করে যে এই যুবকরা কতটাই ভ্রান্ত ধর্মীয় চিন্তাবোধের দিকে ঝুঁকে পরছে । এক জঙ্গির বক্তব্য ছিল ‘তোমাদের সাথে আমাদের বেহেস্তে দেখা হবে’!  কতটাই বিপথগামী আর ধর্মান্ধ হলে একজন মানুষ মানুষ হত্যার মাধ্যমে বেহেস্ত খোঁজার নেশায় ছোটে! তার চেয়ে বড় হল কোন সেই অপশক্তি যে কিনা এত আধুনিক শিক্ষায় আর বিত্ত-বৈভব-বিলাসিতায় বেড়ে উঠা যুবকদের মস্তিষ্ক পুরোই বদলে অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে, বানিয়ে দিতে পারে জঘন্য খুনিতে। আমাদের যুদ্ধ আসলে সেই অপশক্তির বিরুদ্ধেই।

আমাদের সামনে এখন ১৯৭১ এর চেয়েও বড় যুদ্ধ। কারণ ১৯৭১ এ যুদ্ধ ছিল এক পক্ষের সাথ – রাজাকার আলবদর আর তার দোসর পাকিস্তানের সাথে । এখনকার যুদ্ধ আমাদের চতুর্পাশের সাথে – ঘরে আর বাইরে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, শিক্ষাক্ষেত্রে – সর্বত্রই। আর্টিজান রেস্তরায় হামলার জঙ্গি যুবকরা যদি সত্যি কোন ধর্মকে ভালবাসত তাহলে তারা কখনই এমন কোন কাজ করত না যা সব ধর্মের বিপরীতে যায়। তার চেয়ে বড় হলো কোনও মানুষ যদি নিজেকে ভালবাসে তাহলে সে তার পরিবারকে ভালবাসবে আর পরিবারকে ভালবাসলে সে তার দেশকেও ভালবাসবে। যে নিজেকেই ভালবাসতে ভুলে গেছে সে কি করে দেশ আর দেশের জনগণকে ভালবাসবে? এখানে কথা হলো সেই ভালবাসা কেমন করে তৈরি হবে? নিজের প্রতি আর দেশের প্রতি ভালবাসাটা তৈরি করার দায়িত্ব পরিবার আর শিক্ষাঙ্গনের নয় কি? এখন কটা স্কুলে সকালে জাতীয় সঙ্গীত হয় তাও প্রশ্নবিদ্ধ, কটা স্কুলে লাইব্রেরি ক্লাসে ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা হয় তা আমার জানা নেই।

আমাদের সময় স্কুলে আমরা সপ্তাহে একটা ক্লাস পেতাম কেবল লাইব্রেরিতে যেয়ে এ বিষয়ে পড়ার জন্য আর আলোচনার জন্য। আমাদের সময় শিক্ষক, আমাদের পিতামহ আর অন্যান্য গুরুজনেরা ছিলেন পরম শ্রদ্ধার, কিন্তু এখন সে শিক্ষা হারিয়েই যাচ্ছে। বন্ধুর আর কাছের মানুষ হয়েও রাজনৈতিক দলাদলিতে যখন কোন শিক্ষক ছাত্রের কাছে অসম্মানিত হয় তখন তার দায় কি সরকারের ওপরও পড়েনা যে কিনা ছাত্রদের দলবাজির রাজনীতিতে ব্যবহার করে? আর এর জন্য দায়ি কি কম বেশী ঐ শিক্ষকও নন যিনি সঠিক শিক্ষা সেই ছাত্রছাত্রীদের দিতে পারেননি কারণ তিনিও যে আদর্শ আর নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষক?

Gulshan 9ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে যে দেশের পাঠ্য বইয়ে ইতিহাস বদলে যায় সেখানে ছাত্ররা দ্বিধা শঙ্কায় ইতিহাস পড়ে তারা কিভাবে তার শিক্ষক, সমাজ আর মানুষকে শ্রদ্ধা করবে সেটাও একটা বড় বিষয়। যে ছাত্রছাত্রীরা দেখে আসে তার সমাজে রুমি, তৃষা, সিমিরা বখাটেদের উৎপাতে মৃত্যুর পথ বেছে নেয় আর তার সঠিক বিচার হয়না কিংবা সাগর, রুনি, তনুরা হটাৎ করেই খুন হয়ে যায় অথচ খুনিরা মাথা উঁচু করেই সমাজে চরে বেড়ায় আর মিথ্যে পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট দিয়ে বেড়ায় কোনও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বড় ডাক্তার তখন তা কি সমাজে এই তরুণদের অন্যায় কর্ম কান্ডকে আরও প্রশ্রয় দেয়না? আর এর জন্য কি রাষ্ট্রও দায়ি না? কেবলই পরিবারই দায়ী?

চোখের সামনে মানুষ খুন হয়ে যাবে, খুনিরা আল্লাহু আকবর বলে খুন করে যাবে আর আপনি তা দেখেও বলবেন আমাদের সমাজে উগ্র মৌলবাদী নেই, অথচ জঙ্গি কর্মকাণ্ডের পর কেবল পরিবারকেই দায়ভার দিবেন তা কেমন করে হয়? রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা বলবেন ধর্মকে কটাক্ষ করে কথা বলা যাবে না অথচ সাথে সাথে ধর্মান্ধ খুনিকে শাস্তির আওতায় আনবেন না তাহলে সেই ধর্মান্ধ খুনিরা কি প্রশ্রয় পাবেনা?  রাজনীতির খেলায় কখন আপনারা সেই উগ্র ধর্মান্ধদের সাথে জোট বাধবেন আর বলবেন আমরা তাদের সমর্থন করিনা তা কি হয়? এটাও কি প্রশ্রয় নয়?

অনেকে দেখছি দুজন জঙ্গির পরিবারের দেশ ও জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে বেশ আক্রমণাত্মক লেখা লিখছেন, যেন সব দায়ভার পিতামাতার ছিল আর এখানে সমাজ রাষ্ট্রের কোন দায়ই ছিল না। কেউ মন্তব্য করেছেন সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেনি বলেই সন্তান সেই পথে গেছে।

না আমি এ মতের সাথে একদম দ্বিমত পোষণ করছি না, আবার একবাক্যেই সহমতও পোষণ করছি তাও না। পরিবার শিশুর প্রথম শিক্ষাঙ্গন একথা যেমন সত্য, তেমনি একটি শিশুর বেড়ে উঠায় তার চেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বিদ্যালয়। আর এ দুইয়ের মাঝে রাষ্ট্রের রয়েছে অবাধ বিচরণ।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক; প্রথমত সত্য মিথ্যার প্রভেদ এবং সঠিক পথ টাকে বেছে নেওয়ার শিক্ষা যেমনি শিক্ষাঙ্গন দেবে তেমনি এর চর্চায় মূল দায়িত্ব পালন করবে পরিবার। আপনার শিশুটি আপনাকেই অনুকরণ করবে আর নমস্য ভাববে তার শিক্ষককে। যেখানে ঘরের মধ্য থেকেই ভাল ফলাফলের জন্য আপনি চাপ দিচ্ছেন আপনার সন্তানকে, তেমনি চাপ দিচ্ছে তার স্কুল। অথচ কী কারণে সে পিছিয়ে পড়ছে তার দায়ভার কেবল ওই শিশুর নিজের! এরই মাঝে সে বুঝে যায় স্কুল এবং পরিবার এই দুই এর মাঝে টিকে থাকতে হলে তাকে অন্য কোনও পন্থা বেছে নিতে হবে, সে বেছে ন্যায় অসদুপায়।

আর ক্রমশ এভাবেই ভাল ফলাফল করার চাপ একটি শিশুকে ঠেলে দেয় জীবনে প্রথম অন্যায় এর পথে। প্রথম করা অন্যায় একটি শিশুকে দ্বিতীয় অন্যায়ের দিকে সহজেই পরিচালিত করতে পারে। আর এখন তো সেই অন্যায়ে সরাসরি শিক্ষক, পিতামাতা, প্রশাসন জড়িত – হ্যাঁ প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথাই বলছি।

একবার কি ভেবে দেখেছেন আপনারা কিভাবে আপনাদের সন্তানকে অন্যায় আর দুর্নীতির পথে উৎসাহিত করছেন? আরেকটি বিষয়, একজন শিশু যদি ছোটবেলায় সঠিক শিক্ষা পেয়ে থাকে তাহলে তার বদলাবার সম্ভাবনা কম হলেও একেবারেই নেই তা নয় কিন্তু। এ ক্ষেত্রে পরিবার তাকে যতোটাই দেখভাল করুক সে যদি সমাজ এবং রাষ্ট্রে ক্রমাগত অন্যায়ের প্রশ্রয় দেখে আর দেখে কোথাও আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া, তাহলে যুব সমাজের একাংশ যদি সেই ভ্রষ্ট পথে পা বাড়ায় তাহলে তার দায়ভার কার, অনেকটাই রাষ্ট্রের নয় কি?

পশ্চিমা কিছু সমাজের কথাই ধরা যাক, কেন ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছেলেমেয়েরা তাদের বয়স ১৮ এর পর পিতামাতার নিবিড় পারিবারিক বন্ধন থেকে দূরে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করেও অন্যায়ের পথে পা দিচ্ছে না? কেন এখানে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন কম? শুধু পরিবার থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে? নাকি এখানে রাষ্ট্র অনেক বেশী দায়বদ্ধ বলে? এখানে তো কেউ কাউকে চড় মেরে বসে না কারণে-অকারণে, আর খুন করা তো দূরেই থাক। কারণ কাউকে চড় মারলে তাকে এখানকার আইন রেহাই দেবে না।

হ্যাঁ একথা সত্য যে সহিংস কোনও আচরণ বেছে না নেওয়ার চর্চা পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে। এখানে পরিবার যেমন বড় ভূমিকা রাখে, তার চেয়ে অনেক বড় ভূমিকা রাখে রাষ্ট্র, যা কিনা আমাদের দেশের দলবাজির রাজনীতিতে হারিয়েই গেছে।

আমি বলছিনা যে পশ্চিমাদের সব ভাল বা সেখান থেকে কেউ জঙ্গি, অনাচার, অন্যায় কার্যক্রমে যুক্ত হয় না, আমি বলছি সেখানে এই হার অনেক কম। আমরা পশ্চিমাদের অনেক খারাপ গুন রপ্ত করেছি, কিন্তু ভালটা কখনও আমলেই নেইনি। অন্তত পশ্চিমাদের এই আইনের সঠিক বাস্তবায়ন আমরা রপ্ত করে নিতেই পারতাম কিন্তু নেইনি।  

জানি অনেকেই বলবেন এখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষ করে আমারিকা-ইসরায়েল আর ঘরের পাশের ভারতের কুট রাজনীতিও দায়ী, কিন্তু সেক্ষেত্রেও কি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নেই? নিজের দেশের স্বার্থ রেখে ক্ষমতার পালাবদলে পালে হাওয়া দিতে যদি ঘরের শত্রু বিভীষণকেই ডেকে আনেন তাহলে সে দায় কার?

রাষ্ট্রের আর জাতির স্বার্থে যদি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে একসাথে কাজ না করতে পারেন তাহলে পরিবার এখানে কিছুই করতে পারবে না।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দুর্নীতি রোধ করুন, আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করুন, দেখবেন অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। কেমন করে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হয়েও জঙ্গিরা ছাড়া পায় তা খতিয়ে দেখুন, সেখানে পিতামাতা না অন্য কেউ জড়িত তা বের করুন এবং যথাযথ ব্যাবস্থা নিন। কেবল পরিবারকে দোষ দিয়েই রাষ্ট্র আর সমাজ তার দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে তা ভাবার কোনও কারণ নেই।  

কোনও বাবা-মা’ই চায় না তার সন্তান তার নিজের পরিবার আর রাষ্ট্রের প্রতি অভিশাপ বয়ে আনুক, তাকে লজ্জিত করুক যদিও কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা সমাজে ঘটেই থাকে আর সেই ব্যতিক্রম রোধে পরিবার আর রাষ্ট্রকে একসাথেই কাজ করতে হবে।

খুঁজে বের করুন সেই অপশক্তিকে যারা কিনা আপনার চারপাশের টগবগে মেধাবীদের বদলে দিচ্ছে বিধ্বংসী কাজে, কারণ এ লড়াই সেই অপশক্তির বিরুদ্ধেই। আর এ অপশক্তি এখন আপনার চারপাশেই- ঘরে বাইরে, পূর্ব পশ্চিমেও। এখনই পরিবার আর রাষ্ট্র দুই এ মিলে এর অঙ্কুরিত বীজ সমূলে উৎপাটন না করলে পরে মহিরুহ বৃক্ষের শেকড় উপড়ান কেবল কঠিনই না, বরং একেবারেই অসম্ভব হবে ।

শেয়ার করুন: