কিশোরীর পোস্টমর্টেম

নাসরিন বিনতে ইসলাম: আমার কলেজ জীবনের এক বান্ধবির কথা খুব মনে পড়ছে। ঝুমা (ছদ্মনাম) খুব শান্ত মেয়ে। ওর বাড়ি দূর্গাপুর। পিসির বাসায় থাকতো পড়াশোনার জন্য। রোজ দেরী করে কলেজে আসতো। খুব একটা আড্ডা দিতো না ।ওর সাথে যেদিন শেষ দেখা ও খুব অস্হির ছিল।

God Womenআমায় বললো কিছু কিছু ভুলের মাশুল জীবন দিয়ে দিতে হয়। আমি বললাম, এটা কেন বললি? ও কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিল। আমি তার হাতটা ধরে বললাম প্রেমে পড়েছিস? ও বিষন্ন মুখে বললো, আরো বেশি কিছু করেছি, ভাল থাকিস। ও চলে গেল।

পরের দিন কলেজে গিয়ে শুনি ঝুমা গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করেছে। আমার মনে হতে লাগলো ওর শেষ কথাটা। কী যে কষ্ট পেলাম, অনেকদিন লাগলো কষ্ট ভুলতে। পরে জেনেছিলাম ও প্রেগনেন্ট ছিল। তার পিসতুতো ভাইয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক ছিল। হিন্দুদের মধ্যে নিকট আত্মীয়ের সাথে বিয়ে হয় না, তাই মরণকেই বেছে নিল ঝুমা।

ঝুমার ঐ ভাই মানতে পারেনি মৃত্যুটা, তাই সেও আত্মহত্যা করে কদিন পর। এ ঘটনাটা ঘটে ২০ বছর আগে। ইদানীং প্রায়ই দেখছি একই রশিতে প্রেমিক-প্রেমিকার ঝুলন্ত লাশ। আমায় প্রেমজনিত মৃত্যু খুব কষ্ট দেয় কেন জানি না। আমি ঝুমাদের কথা মন থেকে সরাতে পারি না। ঝুমার শতভাগ পুড়ে যাওয়া দেহের পোস্টমর্টেম কিভাবে হয়েছিল জানি না, তবে আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছ থেকে অন্য এক ঝুমার পোস্টমর্টেম এর কথা জানি।

আর তাহলো-

কিশোরীর মৃত শরীরটাকে টেবিলের উপরে শুয়ে দেওয়া হয়েছে। টান টান করে। মাথার নিচে আধা গজ চৌকাঠ। চৌকাঠটাকে বালিশ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। আমি জানি না কতজন মৃত মানুষের বালিশ হবার ভয়ংকর অতীত আছে এই কাষ্ঠদণ্ডের।
কিশোরীর সারা শরীর ফিনফিনে পাতলা সাদা ওড়নায় ঢাকা। বেঁচে থাকার সময় সম্ভবত এই সাদা ওড়নাটিই এর পরনে ছিল।  
স্যার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-মৃত্যুর কারণ কী হতে পারে?
আমরা সারা শরীরে তাকালাম। কোন আঘাতের চিহ্ন নাই। ত্বক মসৃণ, উজ্জ্বল। লাবণ্য বলতে কী বোঝানো হয় জানি না। তবুও মনে হচ্ছিল, কিশোরীর ত্বক লাবণ্যময়। লাবণ্যময়ী মৃত কিশোরীর মৃত্যুর কারণ কী হতে পারে?
আমরা চল্লিশ জন মিলে টিউটরিয়াল গ্রুপ। চল্লিশজন একসাথে বলে উঠলাম,
-স্যার, ব্রেইন ইনজুরি!
-কিভাবে?
-সম্ভবত রোড ট্র্যাফিক এক্সিডেন্ট। ব্রেইন দেখলেই বোঝা যাবে।
ডোমদের কাছে মরা গরুও যা, মরা মানুষও তা। একজন ডোম মোটামুটি হাসিমুখে ঝনঝন শব্দে অস্ত্র হাতে তুলে নিল। হাতুড়ি, বাটালি এবং ছুরি। ছুরি ধারালো। টাংস্টেন লাইটে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
প্রথমে কপালের উপর দিয়ে, এক কান থেকে আরেক কান বরাবর লম্বালম্বি ছুরি দিয়ে চামড়াটা কেটে ফেলল। কাটতে গিয়ে দেখা গেল ছুরিতে ধার নাই। দুইটা হিন্দি গালি দিয়ে কিশোরীর মাথার নিচের তক্তাটা টেনে বের করে ঘষঘষ করে ছুরিটা ধার দিল।
কপালের চামড়া কেটে চুলসহ মাথার স্কিনটা (স্কাল্প)) সামনে থেকে টেনে পেছনে আনলো। নারকেলের ছোবড়া ছেলার মতো, টুপি খোলার মতো, গরুর চামড়া ছিলে ফেলার মত।
হাতুড়ি আর বাটালি দিয়ে কপালের কাছে ‘ঠকঠক’ করে খুলিটা ফাটিয়ে ফেলল। বয়ামের ঢাকনী খোলার মতো কপালের হাড্ডি দুইটা খুলে মাথার মগজ বের করল। ধারালো ব্লেড দিয়ে কেক কাটার মত করে মগজটা কয়েক খণ্ডে কেটে দেখা হলো। কোথাও জমে থাকা রক্তের চিহ্ন নাই। এর অর্থ- মাথায় আঘাত পেয়ে মেয়েটি মারা যায়নি। অন্য কোন কারণ আছে!
স্যার আবার জিজ্ঞাসা করলেন,
-মৃত্যুর কারণ কী হতে পারে?
এবার দশজন চুপ করে থাকলো, ত্রিশজন বললো,
-স্যার, হ্যাংগিং। গলায় দড়ি!
ডোম গলা দেখাল…গলায় কালো দাগ…গলা কাটলো। বুকের মাংস-স্কিন লম্বা টান দিয়ে দিয়ে চিরে ফেলল। মোটামুটি বোঝা গেল- হ্যাংগিং।
স্যার বললেন- গলায় রশি দিয়ে মরা। সুইসাইড। এবার বলো, সুইসাইডের প্রবেবল কজ (সম্ভাব্য কারণ) কি?
post mortemআমরা চুপ করে থাকলাম। কিছু বলতে পারলাম না। স্যার হাসলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-হিন্টস দিচ্ছি… ডেড বডি একটি মেয়ের… বয়স কম… সুইসাইড… কি কারণে হতে পারে?
আমরা সবাই বললাম,
-জানি না স্যার।
-ব্রেইন খাটাও!
-ব্রেইন খাটছে না স্যার।
স্যার হাসলেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘মেয়ের বাবা-মা বলেছে, তাদের সাথে ঝগড়া হয়নি। মেয়ে বাবা-মায়ের উপর মন খারাপ করে সুইসাইড করেনি। বয়স দেখে তোমরা আন্দাজ করো…আর কি কারণে হতে পারে?’
ভিড়ের ভেতর হতে একজন ছাত্রী বলল,
-প্রেমঘটিত স্যার?
স্যার উচ্চস্বরে বললেন,
-একজ্যাক্টলি… উত্তর কাছাকাছি গেছে…আরো একজ্যাক্ট উত্তর দাও! একটু ভাবো…
আমরা ভেবে কিছুই পেলাম না।
আমাদের ব্যাচের প্রথম পোস্টমর্টেম। আমাদের এরকম বডি দেখার কোন অভিজ্ঞতা পর্যন্ত নেই। স্যার আমাদের লিড দিচ্ছেন প্রশ্নে। তিনি জানেন বলেই লিড দিতে পারছেন। তাকে নিশ্চয় এরকম অনেকগুলো কেইসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এরকম অনেকগুলো কিশোরীর ডেডবডি কাটাছেঁড়া করে দেখতে হয়েছে।
স্যার আমাদের বললেন,
-মেয়েটার বডির দিকে তাকাও। স্কিনটা কেমন গ্লেজ দিচ্ছেনা? দেখতে বেশ সুন্দরী…ঠিক?
-জ্বি স্যার…ঠিক।
-এবার বডির তলপেটের দিকে তাকাও। কিছু বোঝা যাচ্ছে?
অন্ধকে হাতি চেনানোর মত অবস্থা। আমরা বডির তলপেটে কিছুই দেখতে পেলাম না।
স্যার ডোমকে নির্দেশ দিলেন।
ডোমসাহেব ছুরির ফলাটা গলায় ঢুকিয়ে দিয়ে নাভি পর্যন্ত টান দিল।মনে হল…একটানে একটা বড় ট্র্যাভেল ব্যাগের চেইন খোলা হল। স্যার আমাদের বুকের-পেটের সব ভিসেরা দেখালেন। কিশোরীর স্টমাক (পাকস্থলি) কেটে ফেলা হলো। লিভার(কলিজা), ফুসফুস সব কাটাকাটি করা হলো। কোন কিছু পাওয়া গেল না। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন,
-কী কারণে সুইসাইড করতে পারে…এখনো বুঝতে পারছ না?
এবার দুই-একজন ছেলে আরেক জনের পিছনে মাথা লুকিয়ে, দুই-একজন মেয়ে লজ্জায় ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,
-সেক্সুয়াল এসল্ট?
স্যার যথেষ্ট পর্দা এবং গোপনীয়তার সাথে যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করলেন। সেক্সুয়াল এসল্টের সাইন-সিম্পটম নাই।
চল্লিশজন নিশ্চুপ। স্যার আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন,
-আমি তলপেট দেখতে বলেছি… এবার দেখ!
এবার তলপেট কাটা হল। জরায়ু(ইউটেরাস) কেটে একটা মাংসপিণ্ড বের করা হল।
আমি নিশ্চিত আমার মতো অনেকেই সেদিন কেঁপে উঠেছিল। মেয়ের জরায়ু কেটে একটা নবজাতক বের হল। এতো চমৎকার লাল টকটকে ছোট্ট শিশু আমরা কোনদিন দেখিনি। এতো সুন্দর খাড়া নাক, গোলাপী ঠোঁট, লাল লাল গাল, আঙ্গুরের দানার মত সুন্দর সুন্দর হাত পায়ের আঙ্গুল…কিশোরীর লাবণ্যময়তার কারণ বোঝা গেল। গর্ভবতী সকল নারীদের মতো এই কিশোরীর শরীরেও লাবণ্যতা চলে এসেছে। স্নিগ্ধতা এসেছে।

 

শেয়ার করুন: