নার্গিসের বঞ্চনার প্রায়শ্চিত্ত করছি আমি

0

Woman-depressed-500x368তসলিমা নাসরিন: বত্রিশ বছর আগে আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে কাজ করতে এসেছিলো নার্গিস। এত সরল মেয়ে আমি আমার জীবনে, সত্যি বলতে কী, দেখিনি। ওকে দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানো হতো। কোনও প্রতিবাদ না করে ও কাজ করতো। ওর নাওয়া খাওয়ার ঠিক ছিল না। কাকভোরে উঠতো, কিন্তু সকালের নাস্তা পেতে দুপুর হতো, দুপুরের খাবার পেতে বিকেল হতো।

আর খেতই বা কী! নিশ্চয়ই বাসি কিছু, পোড়া কিছু, অল্প কিছু। আমার কখনও মনে হয়নি, ওকে ওর যা প্রাপ্য, তা দেওয়া হচ্ছে। নার্গিসের জন্য কষ্ট হতো আমার। আশ্চর্য, কখনও অভিযোগ করতো না। ওর মুখ ভর্তি থাকতো মশার কামড়ের দাগে। ওর মশারি ছিল না। সারা রাত ওকে মশা কামড়াতো। অনেক অনেকদিন আমি চোখের জল ফেলেছি নার্গিসের জন্য। আগলে আগলে রাখতে চেষ্টা করতাম নার্গিসকে। আড়ালে ডেকে নিয়ে মাঝে মাঝে বিস্কুট, কেক, মিস্টি খেতে দিতাম ওকে। কী যে লজ্জা পেতো খেতে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে রাতে রাতে ওকে বই পড়তে শেখাতাম। আমার ভাইয়ের বাড়িতেও ও কাজ করতো। ওখানে মুখ বুঁজে অত্যাচার সইতো।

ভাইয়ের বাড়িতে ভাইয়ের এক শালা থাকতো, বাড়ি খালি পেয়ে ও নাকি নার্গিসকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল, এ খবর শুনে নার্গিসের মা’কে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাওয়া আসার ট্রেনভাড়া দিয়ে পাঠিয়েছিলাম ভাইয়ের বাড়ি থেকে নার্গিসকে যেন কোনও তক্ষুণি নিয়ে আসে। যখন চাকরি করতে শুরু করেছি, ওদের বাড়িতে গিয়ে কিছু টাকা, কিছু কাপড়চোপড়, কিছু খাবার দিয়ে আসতাম। ওকে যেন কারো বাড়িতে কাজ করতে না হয়। যেন নিরাপদে বাবা মা ভাই বোনের সঙ্গে নিজের বাড়িতে থাকতে পারে। যেন ও লেখাপড়া শেখে। যেন ভালো কোনও চাকরি বাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ পায়।

একসময় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় বদলি হই। নার্গিসের আর খোঁজ নেওয়া হয় না। শুনেছি ওর বিয়ে হয়ে গেছে। মা’র অসুখের সময়, ষোলো বছর আগে যখন গিয়েছি দেশে, নার্গিসের খোঁজ করেছি। নার্গিস এসেছিল দেখা করতে, ওর তিন বাচ্চা নিয়ে। ওর বিয়ে হয়েছে এক ডাকাতের সঙ্গে। নার্গিসকে বিষম মারধর করে। স্বামীর আত্মীয় স্বজনের সব কাজকর্ম একা নার্গিসকেই করতে হয়। ওদেরও লাথিগুঁতো খায় ও। ডাকাতি করে স্বামী প্রায়ই ধরা পড়ে। জেল খাটে। নার্গিসকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। সেদিন কয়েক হাজার টাকা নার্গিসের হাতে দিয়েছি। দেখলাম সেই কিশোরী নার্গিসই যেন। তেমনই সরল। তেমনই লাজুক। অসহ্য অভাবের সংসার। তারপরও টাকা হাতে নিতে লজ্জা পায়। ছোটবেলায় ঠিক যেমন একটা বিস্কুট হাতে নিতে লজ্জা পেতো। নার্গিসকে বলেছিলাম ডাকাতের কাছে আর না যেতে, অথবা ডাকাতকে তালাক দিয়ে ভালো কোনও ছেলে দেখে যেন বিয়ে করে নেয়। নার্গিস হেসে বললো, ‘আফা কী যে কইন, বিয়া তো জীবনে একবারই অয়’। বিদেশ থেকে দু’তিন বার কারও কারও হাতে নার্গিসের জন্য টাকা পাঠিয়েছি। ও টাকা ওর হাতে আর পৌঁছয়নি। যার হাতে টাকা দিয়েছি, সে নিজেই সাবাড় করেছে টাকা।

নার্গিস পরশু ফোন করেছিল। কয়েক বছর চেষ্টা করে আমার ফোন নম্বর যোগাড় করেছে। ষোলো বছর পর নার্গিসের কণ্ঠস্বর শুনছি। সেই আগের মতোই। সততা আর সরলতা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। ‘আফা, কিরম আছুইন? শইলডা বালা? রাইতের খাওয়া খাইছুইন?’ শুনে চোখ জ্বালা করে। ঠিক এভাবেই আমার সঙ্গে আদর করে কথা বলতো ও। আমার চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু আমাকে দেখে রাখার দায়িত্ব যেন ও-ই নিয়েছিল।

নার্গিসের ডাকাত স্বামী আরেকটা বিয়ে করেছে। পাঁচ বাচ্চাসহ নার্গিসকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। নার্গিসের বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আরেক মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। নার্গিস বললো, ‘আমার মেয়ের সাথে কতা কইন আফা’। ফোনটা সে দিল তার নাইনে পড়া মেয়েকে। কত গর্ব করে বললো তার মেয়ে নাইনে পড়ে। আমার কী যে ভালো লাগলো জেনে যে নার্গিসের মেয়ে কারও বাড়িতে ক্রীতদাসীর মতো কাজ করে না। সে ইস্কুলে যায়। সে পড়ে।

নার্গিস কোনও টাকা চায়নি। কোনওদিন ও কারো কাছে কিছু চায়নি। আমি নিজেই ভেবেছি, এ বছর বের হওয়া আমার নতুন বইয়ের রয়্যালটির টাকা আমি নেবো না, নার্গিসকে পাঠিয়ে দেবো। এবার এমনভাবে পাঠাবো যেন নার্গিসের হাতে পৌঁছোয় টাকাটা। আমি নিজে তো ধনী কেউ নই। পঞ্চাশ হাজার টাকা আমার জন্যও অনেক টাকা। আমার না হয় কিছুটা কমই হলো এবার। নার্গিসের তো সারা জীবন কম হয়েছে। আমি কি প্রায়শ্চিত্ত  করছি? আমার মনে হয়, আমি প্রায়শ্চিত্ত করছি। এই সমাজ একটা অসহায় দরিদ্র মেয়েকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত। যে মেয়ের ইস্কুলে পড়ার কথা ছিল, সে মেয়ে লোকের বাড়িতে কাজ করতো, বাসন মাজতো, কাপড় কাঁচতো, ঘর মুছতো, উঠোন ঝাড়ু দিত, রান্না করতো। প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে লোকের বাড়িতে থাকতো, মশা কামড়াতো, মানুষ মারতো, ধর্ষণ করতে চাইতো, তার প্রায়শ্চিত্ত। ডাকাত স্বামী আর তার আত্মীয় স্বজনের অত্যাচারের প্রায়শ্চিত্ত। নার্গিসকে তার জীবনটাই কাটাতে হয়েছে এক জীবন যন্ত্রণার মধ্যে, তার প্রায়শ্চিত্ত।

এই সমাজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত  আমি করছি। লক্ষ লক্ষ মেয়ে নার্গিসের মতো ভোগে। কিন্তু সবার দুঃখ তো আমি একা ঘোচাতে পারবো না। একজনের দুঃখ অন্তত কিছুটা হলেও ঘোচাবার চেষ্টা না হয় করি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.