নারীর ‘আত্মসম্মানবোধ’ এবং আলোচনায় গেটস দম্পতি

নাহিদা নিশি:

সকালে উঠে জানলাম, খুব সুন্দর একটি টুইটের মাধ্যমে বিশ্বের তৃতীয় ধনী ব্যক্তি বিল গেটস এবং বিশ্বের পঞ্চম ক্ষমতাধর নারী মেলিন্ডা গেটস তাদের দীর্ঘ ২৭ বছরের দাম্পত্যজীবনের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন, যা নিয়ে এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা চলছে। সাত বছরের প্রেমের সম্পর্ক শেষে ১৯৯৪ সালে তারা বিয়ে করেছিলেন। মোট ৩৪ বছরের সম্পর্ক তাঁদের। তিনটা ছেলে-মেয়ে। দুজনই লিখলেন, বাদবাকি জীবনটা আর একসাথে বেড়ে উঠবেন না তারা। খবরটা শুনে প্র্রথমে একটা কথাই মাথায় আসলো, ‘কেন!’
কারণ হিসেবে যদিও কেউ বড়সড় কোনো যুক্তি দেখাতে পারেনি। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেননি। নেট ঘেঁটে শিওর হলাম, বিল গেটসের বিরুদ্ধে কোনোরকম ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের কিংবা প্রতারণা অভিযোগ আনেননি মেলিন্ডা। অন্যদিকে মেলিন্ডার বিরুদ্ধেও ‘পোশাকের মতো প্রেমিক বদলানো’র অভিযোগ আনা যাচ্ছে না। মেলিন্ডা কারো টাকার লোভে পড়ে পরকিয়ায়ও জড়াননি। কোন ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটাননি কেউ।

তাহলে?
শুধুমাত্র প্রেম কমে গেছে বলে?
ভালোবাসা নষ্ট হয়ে গেছে বলে?
বিশ্বাস ভেঙে গেছে বলে?
নাকি কোনো কারণে আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছে বলে?

নাহিদা নিশি

কয়েকজন অবশ্য লিখেছে, “মেলিন্ডা গেটস টাকার লোভেই বিল গেটস’কে ডিভোর্স দিচ্ছেন! কারণ ডিভোর্স দিলেই আমেরিকান আইন অনুযায়ী তিনি হবেন ৩৫-৪০ বিলিয়ন ডলারের মালিক!” ২০১৯ সালে বিশ্বসেরা আরেক ধনী জেফ বেজোসের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বিশ্বের তৃতীয় ধনী নারী হয়েছেন ম্যাকেঞ্জি বেজস। যদিও জেফ বেজোসের পরকিয়াই ছিলো তাদের বিবাহবিচ্ছেদেরর প্রধান কারণ, কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক মিডিয়া শুধুমাত্র ম্যাকেঞ্জির অর্থপ্রাপ্তির ঘটনাটিকেই হাইলাইট করে গিয়েছে।
ভেবে খুব হাসি পেলো যে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আলোচিত মুনিয়া থেকে শুরু করে মেলিন্ডা পর্যন্ত সব নারীরই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে একটাই পরিচয়, ‘লোভী’! অথচ মেলিন্ডার নিজের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। আবার কেউ বলে বসবেন না যেন স্বামীর পকেট মেরে মেরে সে ৭০ বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছে! একটু কষ্ট করে গুগলে সার্চ দিলেই বুঝতে পারবেন আশা করি।
সারাজীবন আমার বাবা’কে দেখছি, কথায় কথায় বিভিন্নভাবে আমার মা’কে অসম্মানিত করতে। ছোটবেলায় বুঝতাম না বলে মা’কেই চুপ থাকতে বলতাম। এখনো যখন ঝগড়াঝাঁটি হয়, অকারণে অসম্মানিত হতে দেখি মানুষটাকে। আমি বারবার মা’কে জিজ্ঞেস করি, কেন তিনি এই মানুষটার সাথে এখনও সংসার করছেন! কেন ছেড়ে যাননি এখনও?
প্রতিবার একটাই উত্তর পেয়েছি, “তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে যেতে পারি না। আর ২৭ বছর সংসার করার পর এখন ছেড়ে গেলে লোকে কী বলবে? যাবোই বা কোথায়?”

বিল গেটস এবং মেলিন্ডা গেটসের নাম বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই জানে। তারপরও তারা মান-সম্মানের কথা ভেবে ভালোবাসাহীন সম্পর্ক’কে টানতে চায় না। সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে তিক্ততা নিয়েও হাসি হাসি মুখ নিয়ে সংসার করতে চায় না। কারণ তারা জানে, ডিভোর্সের সাথে মান-সন্মানের কোনো সম্পর্ক নেই আসলে। তারা জানে, সকলের ভালো থাকাটাই ইম্পর্ট্যান্ট!
এখানে আরো দুটো বড় কারণ অবশ্য আছে- আত্মসম্মানবোধ আর আর্থিক সক্ষমতা। আর্থিক সক্ষমতা আছে বলেই মেলিন্ডা’কে আমাদের মায়েদের মতো ভাবতে হয়নি, ‘যাবো কোথায়? খাবো কী?’
আর আত্মসন্মানবোধ? সেটা নিজে থেকে তৈরি না হলে কেউ কাউকে দিতে পারে না।

মেলিন্ডার কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেলো মামুনুল হকের স্ত্রী আমিনা তইয়্যেবার কথা। বন্ধুর এক্স ওয়াইফের সাথে রিসোর্টে থাকতে গিয়ে পাবলিকের হাতে ধরা পড়লো। তারপর স্ত্রী’কে ফোন দিয়ে বললো, ‘কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলো যে, তুমি সব জানো।‘
ভাবা যায়! কতোটা মেরুদণ্ডহীন হলে লাইভে স্বামীর কুকীর্তি দেখার পরও কোনো স্ত্রী ফোন রিসিভ করে লম্বা সালাম দিয়ে শান্ত গলায় কথা শুরু করতে পারে! খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। তারপর অনেকগুলো দিন চলে গেলো, আমিনা তইয়্যেবা তার প্রতারক, মিথ্যাবাদী স্বামীর বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ নিলেন না, বা নিতে পারলেন না, বা নেয়ার মতোন ক্ষমতাই তার নেই। তবে এর একটা কারণ হতে পারে আত্মসম্মানবোধের অভাব। টাকা-পয়সা না থাকলেও একটা উপায় হয়ে যায়, কিন্তু আত্মসম্মান না থাকলে কোনো উপায় হয় না।

বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর’কে নিয়ে তুমুল আলোচনা হলো বেশ কিছুদিন। আলোচনা হলো মুনিয়া’কে নিয়ে। কিন্তু আনভীরের স্ত্রী’র কথা একবারও ভেবেছেন আপনারা? তার স্বামীর বিরুদ্ধে পরকিয়ার অভিযোগ। একটা মেয়ে’কে খুন করার অভিযোগ, আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগ! অথচ তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো দুবাই’তে, ঘুরতে। সেও চুপচাপ লক্ষ্মী বউয়ের মতো চলে গেলো। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে আবার হয়তো ফিরে আসবে। সব আগের মতো হয়ে যাবে। কতোটা আত্মমর্যাদাহীন হলে এইরকম লম্পট, খুনি একটা স্বামীর সাথে সারাজীবন সংসার করা সম্ভব! এক ছাদের নিচে ঘুমানো সম্ভব!

মেলিন্ডার আরেকটি পরিচয় অবশ্যই জানা উচিত আমাদের। তিনি তাঁর জীবনী ‘দ্য মোমেন্ট অফ লিফ্ট’ এ প্রথমবারের মতো নিজেকে নারীবাদী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি প্রচুর কাজও করছেন।

বাংলাদেশে নারীবাদীদের সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘নারীবাদীরা বেশিরভাগই ডিভোর্সড হয়’। কথাটা যদিও নারীবাদীদের চরিত্রের ওপর দোষ দেয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে কথাটা আংশিক সত্যি এবং সুন্দর। নারীবাদীরা বেশিরভাগই ডিভোর্সড হয়, কারণ তারা স্বামীর হাতে মা’র খাওয়াটাকে স্বাভাবিক মনে করেন না। অপমান, অসম্মান মাথা পেতে নিয়ে দুইবেলা খাওয়া-পরার বিনিময়ে দাসবৃত্তি করেন না। তারা অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল হন না। তারা না খেয়ে থাকলেও কোনো নির্যাতক, প্রতারকের সাথে আপোষ করেন না।
একারণে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ স্ত্রী’দের যথেষ্ট আয়-রোজগারের বিরোধিতা করে। পুরুষ চায় না, তাদের স্ত্রীদের আত্মসম্মানবোধ থাকুক, আলাদা বাড়ি থাকুক, আলাদা ক্ষমতা থাকুক, আলাদা পরিচয় গড়ে উঠুক। তারা চায় না, তাদের স্ত্রী’রা জ্ঞানে, শিক্ষায়, ক্ষমতায়, সম্পদে, সন্মানে তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকুক। তারা চায় না, নারীবাদী মেয়েদের সংখ্যা বাড়তে থাকুক।

গত বছরের শেষ দিকে দৈনিক প্রথম আলোর একটা রিপোর্টে দেখেছিলাম, ঢাকায় দিনে ৩৯টি ডিভোর্সের ঘটনা ঘটছে, যা পূর্বের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়ার পেছনে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর চরিত্র, পরকিয়া, নারীবাদ এসবের ওপর দোষ চাপায়। কিন্তু সত্যিটা হলো, নারী যতবেশি ক্ষমতাধর হবে, নারী যতবেশি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হবে, ডিভোর্সের পরিমাণ ততো বেশি বাড়তে থাকবে। আর এটা নারীর পক্ষে মোটেও অশুভ ইঙ্গিত নয়।

সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ খুব কষ্টের, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে যুগ যুগ ধরে নারীই কেবল চুপচাপ সংসারের বোঝা টেনে যাবে, এমনটা তো হয় না। শেষ সময়ে এসে হলেও তাদের মুক্তির স্বাদ পাওয়ার ইচ্ছে হতেই পারে! ইচ্ছে হতে পারে, নিজের পরিচয়ে বাঁচার।
আমেরিকান নারীর সঙ্গে বাঙালী নারীর তুলনা করাটা হয়তো একটু হাস্যকর। কারণ তাদের শিক্ষা, অবস্থান, বাস্তবতা সমস্ত কিছুই ভিন্ন। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি হতে হলে আমেরিকায় জন্ম নেয়াটা জরুরি না। সেটা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে সম্ভব।

এই বোধ কেউ কাউকে দিতে পারে না।

শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.