যৌন হয়রানিকারকের মুক্তি: অপরাধের স্বাভাবিকীকরণ ও রেইপ কালচারের বৈধতা

সুমিত রায়:

যৌন হয়রানির মত অপরাধে গ্রেফতার হবার পরও একটি মব জেনারেটিং ফার-রাইট পপুলিস্ট ফ্যাকশন পুলিশ নামক ইনস্টিটিউশনকে চাপ দিয়ে বাদীর নাম-ঠিকানা নিয়ে, সেই বাদীকে বিভিন্ন রকমের থ্রেট দেয়ার মাধ্যমে মামলাটা উইথড্র করায় (বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টরকেও চাপ দেয়া হয়)। তার আগে অপরাধীর জামিনের সময় তাকে পাগড়ি, ফুলের মালা, ধর্মগ্রন্থ দিয়ে বীর হিসেবে অভ্যর্থিত করে মব জেনারেটিং ফ্যাকশনটি। পুরো প্রক্রিয়াটির দ্বারা পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ইনস্টিটিউশনের দুর্বলতা সামনে আসে, যা এরকম মব জেনারেটরদেরকে আরও উৎসাহিত করবে, মবোক্রেসিকে করবে আরও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এটা ছাড়াও আরও একটা যে গুরুতর ব্যাপার এখানে ঘটেছে তা হচ্ছে যৌন অপরাধের মত অপরাধের নরমালাইজেশন বা স্বাভাবিকীকরণ, এবং রেইপ কালচারের প্রমোশন। ঠিক এই ব্যাপারটা নিয়েই এই লেখাটা।

অপরাধের নরমালাইজেশন বা স্বাভাবিকীকরণের একটি সোশিও-সাইকোলজিকাল ফেনোমেনা। অর্থাৎ এটি কেবল সামাজিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। আলবার্ট বান্দুরা এর ব্যাখ্যা দেন তার মোরাল ডিসেংগেজমেন্ট কনসেপ্টটার মাধ্যমে। বান্দুরা এই মোরাল ডিসেংগেজমেন্ট বা নৈতিক বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কিভাবে মানুষ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্যায় কাজ করেও অপরাধবোধ এড়িয়ে যায় এবং নিজেদের কাজকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে। এই মব জেনারেটিং পপুলিস্ট গ্রুপটি এখানে বান্দুরা বর্ণিত ৮টি মেকানিজমই ব্যবহার করে এভাবে অপরাধকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য –

১। মোরাল জাস্টিফিকেশন (নৈতিক বৈধতা দেওয়া): মানুষ তখনই অপরাধ করে, যখন তারা বিশ্বাস করে যে তাদের কাজ কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। আমরা দেখি এখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি মনে করেছে, সে “নারীর শালীনতা রক্ষা করছে”। ধর্মীয় গোষ্ঠী তাকে “ধর্মের রক্ষক” হিসেবে চিত্রিত করেছে। তাই সে নিজের কাজকে কোনো অন্যায় মনে করেনি।

২। ইউফেমিস্টিক লেবেলিং (নেতিবাচক কাজকে ইতিবাচক ভাষায় প্রকাশ করা): অপরাধের মাত্রা কমিয়ে দেখানোর জন্য ভাষাকে পরিবর্তন করা হয়, যাতে তা সহনীয় মনে হয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রে ওদেরকে আমরা বলতে শুনি, “নারীকে হয়রানি” করা হয়নি, বরং তাকে “পর্দার পরামর্শ” বলা হয়েছে। ফলে সমাজের অনেকে মনে করেছে, “সে আসলে খারাপ কিছু করেনি, বরং ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছে।”

৩। অ্যাডভান্টেজাস কম্প্যারিজন (অন্য অপরাধের সঙ্গে তুলনা করে অপরাধ হালকা করা): মানুষ যখন নিজেদের অপরাধকে আরও বড় অপরাধের সঙ্গে তুলনা করে, তখন সেটিকে কম ক্ষতিকর বলে মনে হয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকেই বলেছে, “সে যৌন হয়রানি করেনি, শুধু পর্দার কথা বলেছে।” ফলে এটি সাধারণ মানুষকে ভাবিয়েছে, “এটি বড় অপরাধ নয়, তাই এটি ক্ষমার যোগ্য।”

৪। ডিসপ্লেসমেন্ট অফ রেসপন্সিবিলিটি (দায়িত্ব অন্যের উপর চাপানো): একজন ব্যক্তি তার অন্যায়ের জন্য ব্যক্তিগত দায় স্বীকার না করে দায় অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখি, অভিযুক্ত বলেছে, “আমি তো শুধু ধর্মীয় নিয়মের কথা বলেছি।” ধর্মীয় গোষ্ঠী বলেছে, “সে একা দায়ী নয়, পুরো সমাজই এই মূল্যবোধ ধরে রাখতে চায়।” ফলে অভিযুক্ত মনে করেছে, “আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু করিনি, আমি সমাজের পক্ষ থেকে কাজ করেছি।” ফলে তার অপরাধবোধও কমেছে, অনেকে মনে করছে এরকম হ্যারাসমেন্ট আসলে অপরাধ কিছু না, বরং উচিৎকার্য!

৫। ডিফিউশন অফ রেসপন্সিবিলিটি (দায়িত্বের বিভাজন করা): ব্যক্তি তার কাজের দায় এড়িয়ে যায়, যখন মনে করে “আমি একা এই কাজ করিনি, আমাদের অনেকেই এটি বিশ্বাস করে।” আর আলোচ্য ঘটনাটির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি মনে করেছে, “আমার মতো আরও অনেকেই এটা চায়, তাই এটি অন্যায় হতে পারে না।” তার সমর্থকরা বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন, “সমগ্র সমাজই নারীদের শালীনতা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে।” ফলে অভিযুক্ত (এবং অন্যেরা) মনে করেছে, “এটি আমার একার কাজ নয়, বরং সামাজিক আন্দোলনের অংশ।”

৬। ডিস্টরশন অফ কন্সিকুয়েন্সেস (পরিণামের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া): অপরাধের নেতিবাচক পরিণামকে তুচ্ছ বা গুরুত্বহীন হিসেবে দেখানো হয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ও তার সমর্থকরা বলছে, “সে তো শুধু কথা বলেছে, শারীরিক কিছু করেনি।” ফলে এটি অনেকের কাছে “ক্ষতিকর নয়” বলে মনে হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে অনেকে মনে করবে, “এমন আচরণ ঠিক আছে, কারণ এতে কারও ক্ষতি হয় না।”

৭। ডিহিউম্যানাইজেশন (ভিক্টিমের মানবিকতা খর্ব করা): অপরাধী তার শিকারকে “কম গুরুত্বপূর্ণ” বা “অযোগ্য” হিসেবে চিত্রিত করে, যাতে তার প্রতি সহানুভূতি না থাকে। এই ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা দেখি বাদীকে “অশালীন,” “অশিক্ষিত,” “ধর্মবিদ্বেষী” বলা হয়েছে। ফলে অনেকের কাছে মনে হয়েছে, “তার প্রতি এমন আচরণ করা বৈধ ছিল।” ফলে সমাজে নারী নিপীড়নকে আরও বেশি স্বাভাবিক করে তোলা হলো।

৮। অ্যাট্রিবিউশন অফ ব্লেইম (ভিক্টিমকেই দায়ী করা): অপরাধী নিজের অপরাধের জন্য ভিক্টিমকেই দায়ী করে। এই বিশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ও তার সমর্থকরা বলছে, “সে ঠিকমতো পোশাক পরেনি, তাই তার সঙ্গে এমন হয়েছে।” পুলিশ, প্রশাসন এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী এই যুক্তিকে নীরবে মেনে নিয়েছে। ফলে নারীদের মধ্যে এই ভয়ও ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তাদের পোশাক ঠিক না হলে তারা হয়রানির শিকার হবে এবং প্রশাসন তাদের রক্ষা করবে না।

এখন যে অপরাধটা নিয়ে এই মোরাল ডিসেংগেজমেন্টটা কাজ করছে সেটা যদি নারীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি হয়, যেটা এবারে হলো, সেটা আল্টিমেটলি রেইপ কালচারকেই প্রমোট করে। রেইপ কালচার নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে ইনফ্লুয়েনশিয়াল কাজটা হচ্ছে এমিলি বাকওয়াল্ড, পামেলা ফ্লেচার এবং মার্থা রথ-এর ট্রান্সফর্মিং আ রেইপ কালচার গ্রন্থটি। সেখানে তারা দেখান ধর্ষণ সংস্কৃতি বা রেইপ কালচার এমন একটি সামাজিক কাঠামো, যেখানে যৌন সহিংসতাকে স্বাভাবিক, যৌক্তিক, বা তুচ্ছ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই রেইপ কালচারের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে যৌন সহিংসতাকে অস্বীকার বা হালকা করে দেখা, ভিক্টিম ব্লেইমিং (ভিক্টিমকে দায়ী করা), পারপেট্রেটর জাস্টিফিকেশন (অপরাধীকে ন্যায়সঙ্গত দেখানো), ইনস্টিটিউশনাল সাইলেন্স (রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা বা নীরবতা), পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মাধ্যমে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার মত বিষয়গুলো। প্রত্যেকটাই বান্দুরার মোরাল ডিসেঙ্গেজমেন্টের সাথে সম্পর্কিত। আর প্রত্যেকটাই অপরাধীকে যেভাবে মব জেনারেটিং পপুলিস্টরা বীর হিসেবে মঞ্চায়িত করলো, বাদীকে বুলিং করে, ভয় দেখিয়ে, চাপ দিয়ে মামলা তুলে নেয়ালো তার সাথেও সম্পর্কিত। এটা রেইপ কালচারকেই প্রমোট করে। নারীদেরকে সমাজে আরও ভালনারেবল করে তোলে, আর শক্তিশালী করে সেই মব জেনারেটিং পপুলিস্ট ফ্যাকশনটিকে যা মবের মাধ্যমে এখন রেইপ কালচারকেই ইনস্টিটিউশনালাইজড করার পাঁয়তারা করছে!

তথ্যসূত্র

Bandura, A. (1999). Moral Disengagement: How People Do Harm and Live with Themselves. New York: Worth Publishers.

Buchwald, E., Fletcher, P., & Roth, M. (1993). Transforming a Rape Culture. Minneapolis: Milkweed Editions.

শেয়ার করুন: