রাষ্ট্র ভেঙে যাচ্ছে, হেরে যাচ্ছি আমরা

সুপ্রীতি ধর:

বর্তমান বাংলাদেশে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটছে তার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিবাদ করা বা লেখালেখি করা দুরূহ হয়ে উঠেছে। তারপরও গত কয়েকদিনে যা ঘটেছে তাতে একটা ভয়ংকর বার্তা এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে যে দেশটা কোনদিকে চলে যাচ্ছে বা গেছে এরই মধ্যে। সবচেয়ে ভয়াবহ যা ঘটেছে তা হলো গতরাতে ঢাকার শাহবাগ থানা থেকে তৌহিদী জনতার একজন নারী নিপীড়ককে জোরজবরদস্তি করে ছাড়িয়ে আনা। শুধু তাই নয়, এই নিপীড়নের ঘটনাকে ধর্মীয় খোলসে ঢুকিয়ে ফেলা এবং নিপীড়কের হাতে পবিত্র গ্রন্থ কোরআন শরীফ তুলে দিয়ে লোকদেখানো। এর মধ্য দিয়ে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে গেছে যে এখন থেকে নারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের নিপীড়ন চলতেই থাকবে, আর কেউ কোন টুঁ শব্দটিও করতে পারবে না বা করবেও না। কারণ দেশের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এটাকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিবে তাদের স্বার্থসিদ্ধির কাজে।

ফেসবুকের কল্যাণে আমরা সবাই দেশে-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখলাম তৌহিদী জনতার এই জয়োল্লাস। একদিকে ৫ বছরের ছোট্ট পূজার ধর্ষক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হয়েও জেল হাজত থেকে মুক্তি পাচ্ছে, আরেকদিকে আত্মস্বীকৃত নারী নিপীড়ককে ছাড়িয়ে আনার এই যে প্রচেষ্টা এবং শেষপর্যন্ত সফল হওয়া, তা একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছে এরই মধ্যে। যাকেই ফোন করি তারাই জানায় যে তাদের সাথেও ঘটছে নানাবিধ ঘটনা। একেকটা গা শিউড়ে উঠার মতোন।

গুলশানে প্রকাশ্যে বাড়িতে ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে সবার উপস্থিতিতেই, কেউ দেখার নেই। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে একজন রাখালকে কুপিয়ে হত্যা করে সাতটা গরু নিয়ে গেছে, কেউ কিছু বলার নেই। ঢাকার মোহাম্মদপুরে দুই তরুণীর সিগারেট খাওয়া নিয়ে যা হলো তা তো সবারই জানা এরই মধ্যে। পরবর্তিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে অনলাইনে ভয়াবহ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে আমাদের মেয়েরা। এই বুলিয়িংয়ে পলাতক সরকারের লোকজন যে ভাষা নিয়ে অংশ নিয়েছে, যেভাবে মেয়েগুলোকে উদোম করে গালিগালাজ করলো, তাও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো। দেখলাম আমাদের চারপাশে থাকা অসংখ্য লোকজনকে যারা সেদিনের সেই মবকে জাস্টিফাই করছে মেয়েদের বদনাম করে।

গতরাতে শাহবাগের ঘটনায় আমরা জেনেছি, মেয়েটা সালোয়ার কামিজ পরে ছিল, ওড়নাও পরে ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই কর্মচারি যে জীবনেও বোরকা ছাড়া নারী দেখেনি তা কিন্তু না। অনলাইনেই দেখেছি তার পাশে একটি মেয়েকে যে বোরকাহীন এবং তার ওড়নাটাও একপাশে ফেলে রাখা। তার মানে এটা যে পরিকল্পিত একটা ঘটনা তা বুঝতে রকেট সায়েন্স জানতে হয় না।
সেই লোক স্বপ্রণোদিত হয়ে কথিত হেদায়াত করতে যায় নাই তা স্পষ্ট। বিশেষ করে রাতভর তৌহিদী জনতার শাহবাগ থানায় যা করেছে, যা আমরা দেখেছি ফেসবুকের কল্যাণে, তাতে তাই মনে হলো। আরও ভয়ংকর হলো পরাজিত লীগারদের এসব ঘটনায় জয়োল্লাস। তাদের আনন্দ থামছেই না। তাহলে কী বার্তা দেয় এসব ঘটনায়? পরিকল্পিত নয়?

আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো যে শাহবাগ থানার পুলিশ নাকি মেয়েটির নাম-ঠিকানা সব যাবতীয় তথ্য তৌহিদী জনতার হাতে দিয়ে দিয়েছে। এখন এই মেয়েটার কী হবে? তার নিরাপত্তার কী হবে এখন?

অথচ জুলাইয়ের আন্দোলনে পথে নেমে এসেছিল লাখ লাখ নারী। তাদের কারও পরনে ছিল টিশার্ট-জিনস, কারওবা বোরকা, কারও শাড়ি। এ নিয়ে তখন কারও মাথাব্যথা দেখিনি বা নজরে আসেনি। বোরকা পরা আর টিশার্ট পরা নারীর লাঠি হাতে সেই আইকনিক ছবি গতকালও অনেকে পোস্ট দিয়েছে।

শাহবাগ থানায় উপস্থিত মব এই নিপীড়কের নিপীড়নকে ধর্মের সাথে মিলিয়ে গুলিয়ে খাইয়ে দিয়েছে সবাইকে। মিডিয়ার সামনে এই নিপীড়কের কাজকে ধর্মপ্রচার বলে মহীয়ান করেছে। এতে করে এর আগের দুদিন ধরে চলতে থাকা মেয়েদের সিগারেট খাওয়া নিয়ে বিতর্কে সম্পৃক্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ধর্মের মোড়কে নারী-হয়রানি করার চমৎকার এক অস্ত্র পেয়ে গেছে। একটা থানায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেয়া মোটেও উচিত হয়নি। আবার এতে এটাও প্রমাণ হয় যে দেশের বিশাল একটা অংশ এগুলো হতে দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সহায়তাতেই।

তৌহিদী জনতা নামধারী গোষ্ঠীটি এখন থেকে বিনা বাধায় নানান অপরাধমূলক কাজ করে পার পেয়ে যাবে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। ওরা এখন যা ইচ্ছে তাই করবে। সামনের দিনগুলিতে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে দেখা যাবে। মোরাল পুলিসিং আগেও ছিল, সবসময়ই আমরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম, কিন্তু দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছি আগের সরকারের নিস্পৃহতার কারণে, আর এখন এই সরকারের অন্ধত্ব আর অক্ষমতার সুযোগে বা বলা ভালো, তাদেরই ইন্ধনে এটা এখন সকল রেডলাইন অতিক্রম করে ফেলেছে।

এদেরকে এখানেই না থামালে রাষ্ট্র ভাঙবে, ভাঙতে বাধ্য। আমরা পতিত হবো রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুপরবর্তি সময়ে ভয়ংকর মাৎস্যন্যায় সময়ে, যখন অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলায় ছেয়ে গেছিল সমাজ। এখন তো অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে। সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে আমাদের হয়তো কয়েকশ বছর লেগে যাবে, হয়তো হবেও না কোনদিন।

 

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার।

শেয়ার করুন: