হিজাব, দাসত্ব এবং যৌন হয়রানি

নাদিয়া ইসলাম: কয়েকদিন আগে ফেইসবুকে একটা ভিডিও দেখলাম। হিজাব করা একজন মেয়ে সি-এন-জি অটোরিক্সায় উঠছিলেন এবং ড্রাইভার একপর্যায়ে তার ভদ্রস্থ কাপড় সত্ত্বেও তারে দেইখা উত্তেজিত হইয়া মাস্টারবেট শুরু করছিলেন এমন একটা ভিডিও।

খাড়ান, আপনারে সমবেদনা জানানোর আগে জিগাই, আপনি কি ভাবছিলেন ভদ্রস্থ কাপড় পরলেই সেক্সুয়াল এ্যাবিউজ ঠেকানো যায়?

Burka 1যদি আপনার উত্তর হ্যাঁ হয়, যদি ভাবেন, বোরখা পরলেই বা মাথায় কাপড় দিলেই লোকে আপনারে সম্মান কইরা ধর্ষণ না কইরা আপনারে সালাম দিয়া ‘তুমি আমার ধর্মের বোন’ বইলা ছাইড়া দিবেন, তাইলে আপনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সমবেদনাও নাই। গাধাদের প্রতি আমার সমবেদনা কাজ করে না। আর আপনে তো শুধু গাধাই না, আপনি সমাজের জন্য ক্ষতিকারক পদার্থ বিশেষ। আপনিও আপনার মত গাধা-শ্রেণীর বাদবাকি ক্ষতিকর মেয়ে-সদস্যের জন্য যখন অন্য একজন বোরখা না পরা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হোন, তখন তারে তার ‘উত্তেজনা-তৈরি-করা’ পোশাক নিয়া কথা শুনতে হয়। ধর্ষিত হওয়ার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হইতে হয়। নয় মাসের শিশুর দিকে তাকাইয়া দেখতে হয় তার কোন্‌ যৌনাঙ্গ, তার শরীরের কোন্‌ কোন্‌ অংশ পুরুষরে ‘এমন’ কাজে ‘উসকায়ে’ দিছিলো।

আমি ভাবতে চাই, জিন্স-টিশার্ট, শাড়ির মতই বোরখা পরা আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। কিন্তু আসলেই কি তাই? খেয়াল কইরা দেখবেন, কত মেয়ে শুধু বিয়ার পরে বা রিলেশানশিপের পরে স্বামী বা প্রেমিকের ইচ্ছায় বোরখা পরা শুরু করছেন। খেয়াল কইরা দেখবেন, আফগানিস্তান বা ইরান বা সৌদি আরবে বোরখা না পরার জন্য কত কত মেয়েরে মরতে হইছে। মানুষ যা কিছুই বলুক না ক্যানো, প্রতিটা কাপড়ই তার অন্যের ইচ্ছায় সামাজিক নিয়মে পরতে হয়। কিন্তু যেই পোশাকের সাথে অত্যাচারের ইতিহাস লেখা আছে, মেয়েরা সেই পোশাক নিজ ইচ্ছায় কীভাবে পরেন, তা আমার জানতে মন চায়। কেউ নিজ ইচ্ছায় নিজের ঠ্যাঙ্গে কী কারণে শিকল লাগাইতে চান তা নিয়াও প্রশ্ন করতে মন চায়।

আপনি কইতে পারেন, ‘আমারে কেউ জোর করেন নাই, আমি নিজ ইচ্ছায় বোরখা পরছি!’- আমি তবুও আপনারে বিশ্বাস করতে অপারগ। নিজ ইচ্ছা বইলা এই দুনিয়ায় কোনো ইচ্ছা নাই বইলা আমি বিশ্বাস করি। মানুষের সমস্ত ইচ্ছাই অতীত এবং অতীতের শিক্ষা অর্থাৎ জেনেটিক কোডিং এবং কালেক্টিভ আনকনসাশনেস দিয়া নির্ধারিত।

ঠিক তেমনভাবেই আপনে বোরখা পরতেছেন অন্যের (পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ এবং নারীর) ইচ্ছায়, কারণ তারা গত কয়েকশ’ বছর যাবত আপনারে পবিত্রতার সংজ্ঞা শিখাইছেন, শিখাইছেন, নারীর সম্মান তার ঠ্যাঙ্গের মাঝখানে ও মাথার চুলে।

শিখাইছেন, পুরুষের শরীরে একশ’ সাতাত্তর জন নারী (এবং পুরুষ) আইসা চাটলেও পুরুষের শরীরের কোনো সম্মানহানী হয় না, কিন্তু স্বামী ব্যতিত অন্য একজন পুরুষ (এবং নারী) এমনকি আপনার শরীরের একাংশ দেখলেও আপনার সম্মান নীলা আসমানে ধাই-ধাই উইড়া চইলা যায়।

অনেকেই কন, ‘কুরানে লেখা, তাই পরি।’ কিন্তু আপা, ইসলামে অর্থাৎ কুরানে তো বোরখা পরার নির্দেশ দেওয়া হয় নাই। বোরখা একটা আরবীয় পোশাক, এবং আরব অঞ্চলে গরম এবং ধূলার কারণে সমস্ত ধর্মের (জ্বি) মেয়েরাই বোরখা পরেন। আপনে কি আপনার গাধাত্বের কারণে সৌদি আরব এবং আপনার ধর্মরে এক বইলা গুলায়ে ফেলছেন?

আমি শালীন পোশাকের পক্ষে। যদিও শালীন আর অশালীন কী জিনিস সেইটা নিয়া তর্ক হইতে পারে। আমি বিশ্বাস করি সমাজ টিকাইয়া রাখার জন্য নারী ও পুরুষের জন্য আবহাওয়া ও পরিবেশভেদে আলাদা আলাদা পোশাক আছে, এবং থাকা উচিৎ। কিন্তু সেইটা দাসপ্রথা রিপ্রেসেন্ট করে এমন কোনো পোশাক হইতে পারে না। আনলেস সেইটা প্রতিবাদের নিমিত্তেই পরা হইতেছে।

আপনে যখন বোরখা পরেন, আপনে পুরুষরে জানায়ে দেন, আপনে দাস শ্রেণীয় প্রাণী, আপনারে অত্যাচার করা যায়, আপনারে নিয়া খেলা যায়, আপনারে পিটায়ে মারা যায়, আপনারে সম্পত্তি থিকা বঞ্চিত করা যায়, আপনারে বেশ্যা টাইটেল দেওয়া যায়, আপনার মুখে এ্যাসিড মারা যায়, আপনে জানায়ে দেন, আপনে নিচু শ্রেণী, আপনে জানায়ে দেন, আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আরেকজনের, আপনার সম্মানের দায়িত্ব আরেকজনের।

আপনে জানান, আপনার বোরখা পরা শরীর কেউ ধর্ষণ কইরা গেলে নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য আত্মহত্যা ছাড়া আপনার উপায় থাকে না! আপনে জানায়ে দেন, আপনে দুর্বল, আপনে জানান, আপনে যতই হিজাব করেন না ক্যানো, আপনে যতপ্রস্থ বস্তা দিয়া শরীর ঢাকেন না ক্যানো, আপনারে অটোরিক্সাতে বসাইয়া আপনার সামনে মাস্টারবেট কইরা আপনারে শুধু কান্দানোই যায়! আপনে জানান, আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন না, আপনি জ্বইলা উঠতে পারেন না, আপনি ঐ শুয়োরের বাচ্চারে ধইরা বিচির তলায় লাত্থি দিয়া মাস্টারবেট করার খায়েশ ছুটায়ে দিতে পারেন না!

তনু হিজাব কইরা ধর্ষণ ঠেকাইতে পারেন নাই। আপনেও হিজাব কইরা কিছু করতে পারবেন না। হিজাব করা বা না করার সাথে সেক্সুয়াল এ্যাবিউজের সম্পর্ক নাই। সুতরাং আপনার মত একজন ‘পবিত্র’ মানুষের সাথে এমন ক্যানো হইলো তা না ভাইবা আপনার পবিত্রতার সংজ্ঞা পাল্টান। বোরখার মত দাসপ্রথা থিকা বাইর হইয়া আসেন।

নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজে নেন। নিজেরে ফুল-পাখি এবং যা কিছু কোমল, যা কিছু নরম- তার সাথে তুলনা দেওয়া বন্ধ করেন, কারণ, আপনে যতদিন ফুল পাখি লতাপাতা থাকবেন, ততদিনই আপনে অত্যাচারিত হবেন। ততদিনই আমি আপনারে সমবেদনা না জানাইয়া এমন ফালতু এবং অদরকারী পোস্ট লিখবো। (ফেসবুক থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.