আমার যদি একটি কন্যা থাকতো!

অপূর্ব চৌধুরী:

আমার একটা স্বপ্ন ছিল আমার একটি মেয়ে হবে। সন্তান হিসাবে ছেলেদের কেন জানি পছন্দ করতাম না। মনে হতো ছেলে মানে তো গুন্ডা গুন্ডা। ছেলে মানেই আমার জুনিয়র বাঁদর।

মেয়ে বড় হয়ে উঠলে সবার আগে বলবো – মা, এক কাপ চা বানানো শুধু শেখো। আপাতত আর কিছু লাগবে না। বাবা কাজ শেষ দখিন দুয়ার ঘেঁষে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে যখন বিশ্রাম নেবেন, মেয়ে এক কাপ চা নিয়ে এসে বসবে। বাবা-মেয়ে এক কাপ চা খাবো। বাবা প্লেটে খাবে, মেয়ে কাপে শব্দ করে খাবে। খুব টিপিক্যাল স্বপ্ন। আহামরি কোন স্বপ্ন নয়।

মেয়েকে প্রথম শেখাবো, তুমি প্রথম মানুষ, তারপরে মেয়ে। তুমি প্রথম একটি প্রাণ, তারপর জেন্ডার। তোমার মাথা এবং একটি পুরুষের মাথা একই। পুরুষ চিন্তা শক্তি দিয়ে যা পারে, মা তুমি তাই পারবে।

মেয়েকে শেখাবো কারো ভালবাসা পাওয়ার জন্যে মুখাপেক্ষী থাকবে না, বরং তোমার ভালোবাসাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে।
কন্যাকে শেখাবো, পুরুষ আর নারীর পার্থক্য শরীরের কিছু গঠনে কেবল, যোগ্যতা, চিন্তা, ক্ষমতায় নারী পুরুষ দুজনেই সমান।

মেয়েকে শেখাবো অধিকার কেউ দেয় না, সব মানুষ অধিকার নিয়ে জন্মায়। যে পুরুষ তোমার জন্মগত সে অধিকারকে শ্রদ্ধা করতে পারবে না, ভালোবাসতে পারবে না, তাকে কেবল পুরুষ ভাববে, মানুষ ভাববে না।
খুব স্বপ্ন ছিল তাকে ছোটবেলা শেখাবো আয় এবং সঞ্চয়। তাকে শেখাবো কী করে নিজের আনন্দগুলো নিজের উপার্জনে করতে হয়। হাত পাতায় অলসতা, সে হাতে কিছু করায় বিলাসিতা।

মেয়েকে নিয়ে প্রচুর ঘোরার স্বপ্ন আমার। আমি ঘোরাঘুরির মানুষ। সেও তার মতো ঘুরে ঘুরে পৃথিবী দেখবে, মানুষ দেখবে, জীবনের গভীরতার খোঁজে জীবনকে ছেঁকে ছেঁকে দেখবে। যেখানে মানুষের শব্দ শোনা যায়নি, সেখানেও ছুটে যাবে সে।

আমি স্পোর্টস পছন্দ করি, তার ভালো লাগার স্বাধীনতায় তাকেও বলবো যে স্পোর্টস তোমার ভালো লাগে সেটি তুমি উপভোগ করবে।
বাবা মেয়ে একসাথে গান শুনবো। মেয়েকে বলবো গান গাইতে ভালো লাগলে গাইবে, চর্চা করতে ইচ্ছে করলে করবে, কিন্তু একটি মিউজিক যন্ত্র বাজানো শিখবে। তোমার চারপাশে যখন কেউ থাকবে না, যন্ত্রটি তোমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠবে।

আমি নাচতে পারি না, কিন্তু নৃত্য পছন্দ করি দেখতে। শরীরের ইউনিভার্সাল ল্যাঙ্গুয়েজ নৃত্য। আনন্দ প্রকাশের ভাষাহীন বিমূর্ত প্রকাশ নৃত্য। মেয়েকে বলবো যে নাচ শিখতে এবং করতে তোমার ভালো লাগে, যে নাচ তোমার ভেতর শরীরের কথা ফুটিয়ে তোলে, তুমি তাই করবে।

তার ভেতর স্বপ্ন বুনে দেবো কী করে জীবনকে ভালোবাসতে হয়, কী করে বড় মানুষ হওয়ার চেয়ে চিন্তা এবং কাজে নিজেকে বড় করে তুলতে হয়। অন্যের কাছে বড় হওয়ার চেয়ে নিজের কাছে বড় হয়ে নীরবে কীভাবে সেটি উপভোগ করতে হয়! প্রচার সর্বস্ব আধুনিক মিডিয়া মানুষের ভেতরটাকে খেয়ে দৈত্য বানিয়ে ফেলে।
মেয়েকে শেখাবো কী করে বাবার কোনো কিছুই সে বিনাবাক্যে মেনে নেবে না, যুক্তিতে বুঝবে। দরকার হলে বাপির সাথে তর্ক করবে। বাপিকে তর্কে হারাবে। ক্যারিয়ারে কী পড়তে চাইবে সেটি তার ভালো লাগায় ছেড়ে দেবো। আমি কেবল গাইড দেবো, সেটা যেনো সে ভালোভাবে পেতে পারে। ভালো লাগা চাপিয়ে দিয়ে হয় না, ভালো লাগায় সঙ্গী হতে হয়।

তাকে শেখাতাম – যার বই আর কলম আছে, সে কখনো বন্ধুহীন হয় না। একদিন বাবা থাকবে না, একদিন তোমার চারপাশে পরিচিতদের অনেকেই থাকবে না। কলম তোমার বন্ধু হয়ে সেদিন বাবার সাথে কথা বলবে ইথারে ইথারে। বাবা নেই, কিন্তু বাবা সবখানে আছে তোমার। চিন্তার কোষে কোষে বাবা নীরবে হাঁটবে।

স্বপ্ন স্বপ্নই থাকুক আপাতত। পৃথিবীর সকল নারী তো কন্যাই। কারো না কারো কন্যাই। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল কন্যারা।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.