লাভ বোম্বিং – যেটা আজকে আদর, কালকে নিপীড়ন (পর্ব ২)

প্রমা ইসরাত:

লাভ বোম্বিং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, দ্রুততম সময়ে, পার্টনারকে একটা ইন্টিমেট সম্পর্কে আটকে ফেলা। যেন ব্যক্তিটি পাগলের মতো প্রেমে পড়ে যায় এবং চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে থাকে।
লাভ বোম্বিং এর এই প্যাটার্ন কোনমতেই একটা সম্পর্কের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। যিনি লাভ বোম্বার তিনি খুবই প্রেমময় আচরণ করার পরে দেখা যায় হুট করে গায়েব হয়ে গেলেন। এক দিন, দুই দিন, কোন খবর নাই। ফোনে, ম্যাসেজে কোন যোগাযোগ নাই, তার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এই গায়েব হয়ে যাওয়াটাকে Ghosting বলে। মানে ভূত হয়ে উধাও হয়ে যাওয়া।
যিনি দিনে এতো এতোবার করে যোগাযোগ করছেন, তিনি পরের দিন আর কল করছেন না, কল করলেও কল রিসিভ করছেন না, বা কল কেটে দিচ্ছেন বা ফোনই বন্ধ। সিচুয়েশনটা একটু ভেবে দেখুন। একদিন দুই দিন বা এর চাইতেও বেশিদিন পর আবার তিনি উদয় হলেন, এবং এসেই ভালোবাসা দিয়ে আবার ভরিয়ে তুললেন। এই যে এই প্যাটার্নটা, এটা একটা সাইকেল।
লাভ বোম্বিং পাওয়ার পর, শরীরের যে হ্যাপি হরমোনগুলো রিলিজ হয়, সেগুলো পেতে পেতে ব্রেইন অভ্যস্ত হয়ে যায়, এরপর না পেলে ওটার জন্য ব্রেইন অস্থির হয়ে ওঠে। ড্রাগ এডিকশান এর মতো।

যখন ইন্টিমেট পার্টনার লাভ বোম্বিং করে তখন শরীরে ডোপামিন রিলিজ হয়, অক্সিটোসিন রিলিজ হয় সেক্সুয়াল এক্টিভিটিজের ক্ষেত্রে, এরপর ধরুন পার্টনার এমন আচরণ করলো যেটা কষ্ট দিলো, তখন নিঃসৃত হবে সেরোটনিন, লাভ বোম্ব করার পরে পার্টনার হুট করে উধাও বা সম্পর্কে ঝামেলা চলছে, আপনাকে এভয়েড করছে, কিছু জিজ্ঞেস করলে রিঅ্যাক্ট করছে, মুড অফ করে কথা বলছে, মানে লাগাতার চার্মিং পার্সোনালিটি থেকে হুট করে মুড অফ, একদম অচেনা, দূরের কেউ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে বলছে, এই সম্পর্ক আর রাখা যাবে না, বা এমন কিছু যা আপনি কখনো ভাবেনইনি। টেনশন, অস্থিরতায় তখন নিঃসৃত হচ্ছে কোরটিসল হরমোন।
তারপর পার্টনার ব্রেক আপ করতে চাইছে, বা আপনি খবর পেলেন তার অন্য জায়গায় সম্পর্ক আছে, বা এমন কোন তথ্য যা আপনার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব না, আপনি একা হয়ে যাওয়ার ভয় করলেন, পার্টনারকে হারিয়ে ফেলার ভয় করতে থাকলেন, তখন আপনার শরীর থেকে নিঃসৃত হচ্ছে এড্রেনালাইন হরমোন।
তারপর আবার পার্টনার বলছে, সব ঠিক, সে আপনাকে ছেড়ে যাবে না, কোন টেনশন নাই, যা যা তথ্য আপনাকে ডিস্টার্ব করছিলো, সব ভুয়া, মিথ্যা, আপনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এবং এরপর পার্টনার আবারও লাভ বোম্বিং করা শুরু করলো। মানে হরমোনের একটা টোটাল রোলার কোস্টার রাইড আপনি পেলেন।
এই রকম প্যাটার্ন একাধিকবার হতে থাকলো, তখন এই হরমোনের নিঃসরণের ফলে যে কেমিক্যাল তৈরি হবে শরীরে, সেটা টক্সিক। এবং এই টক্সিক কেমিক্যালের কারণেই আপনি আটকা পড়ে যাবেন ট্রমা বন্ডিং এ।
[Trauma Bond: A deep emotional attachment that develops in a relationship characterized by abuse that’s emotional, physical, or both.
Trauma bonding is a psychological response to abuse.]

এখন এই লাভ বোম্বিং থেকে বের হবেন কী করে?
আমাদের সমাজে, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, প্রেম নিয়ে এত্ত বিপুল পরিমাণ আবেগ দেখানো হয় যে, সত্যিই পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে যে কোনটা সত্যি এবং কোনটা মিথ্যে।
ওই শুভ কাজে দেরি করতে নেই এইসব থিওরি আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়।

লাভ বোম্বিং হতে থাকলে, সেই সম্পর্কের লাগাম টেনে ধরতে হবে। মুখে বলা প্রশংসা, উপহার, কেয়ারিং টাইপ খোঁজ খবর নেয়া, সুন্দর সুন্দর টেক্সট/ম্যাসেজ পাঠানো এগুলো করলেই, একজন মানুষ যে সম্পর্কের নানান প্রশ্ন থেকে দায় এড়াতে পারে, এই ধারণা থেকে বের হতে হবে। খারাপ ব্যবহারের বিপরীতে ক্ষমা না চেয়ে যদি কেউ লাভ বোম্বিং করে তাহলে তা বন্ধ করতে হবে।

যিনি লাভ বোম্বার, তিনি আপনার এই বাউন্ডারিগুলোকে মানতে পারবে না, কারণ বাউন্ডারি মানলে দ্রুত সময়ে সম্পর্কে সম্পৃক্ত হওয়া যাবে না। ফলে হয় তিনি রিঅ্যাক্ট করবেন।
লাভ বোম্বিং হচ্ছে বলে মনে হলে সহজ উপায় হচ্ছে, আপনার রেসপন্সকে নিয়ন্ত্রণ করা। লাভ বোম্বিংকে পাত্তা না দিয়ে, নিজের নিজস্ব জীবনকে যাপন করা। বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো, নিজের সাথে নিজের জন্য সময় কাটানো।
মানে তোমারেই করিয়াছি জীবনেরও ধ্রুবতারা, এই রাবীন্দ্রিকতা চর্চা করতে গিয়ে, নিজের অস্থিত্ব, নিজের জগতকে অবহেলা করার কোন মানে নেই।

আমরা সব সময় বলি, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। আমাদের ভেতর লোভ কাজ করে, কেউ আমাদের প্রশংসা করছে, আরও প্রশংসা পাওয়ার জন্য আমরা মুখিয়ে থাকি, কেউ দেবী বানিয়ে আমাদের পূজা করছে, এতে আমরা বিমোহিত হয়ে পড়ি, আমাদের ইগো স্যাটিসফাই হয়। নিজের ইগো আরেকজনের বাণীতে স্যাটিসফাই করতে চাওয়ার এই যে লোভ, এই লোভ থেকে মুক্ত হতে পারলে এই লাভ বোম্বিংগুলো চিনতে পারা এবং এগুলো এভয়েড করা সম্ভব।
লাভ বোম্বিং থেকে বাঁচতে, লাভ বোম্বার এর সাথে যোগাযোগ সীমিত করে ফেলুন। বাউন্ডারি সেট করুন। ভালো বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। ব্যাপার যদি এমন হয় যে, সম্পর্ক গোপন রাখতে বলছে, এটা এলার্মিং। কাছের বন্ধুবান্ধবদের বলা যায় না, এমন সম্পর্ক নিয়ে আসলেই ভাববার আছে। সরাসরি সুন্দরভাবে বলে দিন যে আপনি আর আগ্রহী নন, কিংবা কম্ফোর্টেবল ফিল করছেন না। তার এই লাভ বোম্বিং দেখে আপনি ক্রিঞ্জ খাচ্ছেন।
আপনি যোগাযোগ কমিয়ে দিলে, তিনি যদি আপনাকে স্টক করে, কোথায় যান, কী করেন এগুলোর খোঁজ নিতে থাকেন, পিছনে পিছনে গিয়ে উপস্থিত হোন, মনে রাখবেন এটা স্টকিং। স্টকিং এক ধরনের ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স।

নিপীড়কদের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এরা যত সহজে দেবী বানিয়ে ফেলে তত সহজেই তুচ্ছতাছিল্য করে। বেশ কয়েকদিন দেবী মোডে থাকবেন, এরপর হঠাত আবিষ্কার করবেন নিজেকে কুকুরের মতো তার পায়ের কাছে আপনি বসে আছেন, তার কাছে দেবী ডাক শোনার জন্য।

(যদিও আমি নারীদের ক্ষেত্র চিন্তা করে লিখেছি, কিন্তু সত্যি হচ্ছে এই ধরনের প্যাটার্ন এর মাধ্যমে এবিউজ একজন নারীও পুরুষের সাথে করতে পারে। অর্থাৎ নন বাইনারি সেন্সে, যেকোনো জেন্ডারের মানুষই তার পার্টনারের ক্ষেত্রে এরকম করতে পারে।)

আগের পর্ব:

https://womenchapter.com/views/38610

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.