যৌনতা প্রশ্নে ভগাঙ্কুর যখন অবহেলিত

আজও বিশ্ব জুড়ে নারীর প্রজননতন্ত্রের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গের উপর আমাদের জ্ঞান আশ্চর্যজনকভাবে কম। এমনকি বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরাও এ বিষয়টি পারতপক্ষে এড়িয়ে যান। সম্ভবত তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। প্রত্যঙ্গটির নাম ভগাঙ্কুর, যাকে ইংরেজিতে বলে ক্লিটোরিস।

লেখাটি অনুবাদ করেছেন, সাবরিনা স. সেঁজুতি

ভগাঙ্কুরের এনাটমির উপরে প্রথম বিশদ গবেষণাপত্র বের হয়েছিল ১৯৯৮ সালে, আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে। গবেষণাটি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ও’কনেল। যদিও ২০ বছর আগে অর্কিডের মতো দেখতে ক্লিটোরিসের উপরে অবিস্মরণীয় এই গবেষণাটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, পরবর্তীতে খুব সচেতনভাবেই এ বিষয়ক জ্ঞানচর্চা থেকে বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকরা নিজেদের বিরত রেখেছেন। এর কারণ সম্ভবত নারীর যৌনতৃপ্তিতে ভগাঙ্কুরের ভূমিকা।
ভগাঙ্কুর নারী-শরীরের একমাত্র প্রতঙ্গ যা নারীকে যৌন তৃপ্তি বা অর্গাজমে সহায়তা করে। এর অবস্থান যোনীপথের বাইরে। অনেকগুলো নার্ভের মিলনস্থল এই ভগাঙ্কুর, তাই অসম্ভব অনুভূতিকাতর।

পুরুষতান্ত্রিক এ বিশ্বে সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের মতো চিকিৎসা-বিজ্ঞানেও নারী বিষয়ক, বিশেষ করে নারীর যৌনতা বা কামনা বিষয়ক, তৎসংক্রান্ত আলোচনা এবং অভিব্যক্তি তীব্র সামাজিক ট্যাবুর অন্তরালে চাপা পড়ে থাকে বিধায় এ বিষয়ক গবেষণা, আলোচনা ও প্রকাশনার সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু পুরুষের শিশ্ন নিয়ে কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই বিস্তারিত আলোচনা যুক্ত করা হয় গবেষণাপত্র এবং চিকিৎসা-বিজ্ঞানের পুস্তকে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় পাঁচশ বছর আগেও ভগাঙ্কুরকে শয়তানের উপহার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইংল্যান্ডের এক গ্রামে মহামারির কারণ হিসেবে ভগাঙ্কুরকে চিহ্নিত করা হয়েছিল- তারা বিশ্বাস করেছিল নারী শরীরে এর উপস্থিতি মানে সে নারী জাদুকরি, ডাইনি, বিধ্বংসী। অর্থাৎ যে নারী যৌনসুখ উপভোগ করতে সক্ষম, সে নারী অভিশপ্ত। বিশ শতকের শুরুতে বিখ্যাত মনোবিশেষজ্ঞ সিগমুন্ড ফ্রয়েড নারী শরীরে ভগাঙ্কুরের গুরুত্ব উপেক্ষা করে বলেছিলেন, নারীর অর্গাজম বা যৌনতৃপ্তি নির্ভর করছে তার মস্তিষ্কের পরিপক্কতার উপর। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকেরা সচেতনভাবে ভগাঙ্কুর সম্পর্কিত যেকোনো জ্ঞান, এমনকি ব্যাধিও গোপন করে যান।

সামাজিক ট্যাবুর পাশাপাশি এতোসব গোপনীয়তার আরেকটি প্রধান কারণ হলো ভগাঙ্কুর সম্পর্কিত জ্ঞানের স্বল্পতা। এই জ্ঞান স্বল্পতা এবং অবহেলার একমাত্র ভুক্তভোগী হলো নারী। বহু নারী, যারা ভগাঙ্কু্রের নানা রোগে ভুগছেন, প্রত্যঙ্গটি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে এবং সামাজিক ট্যাবুর কারণে বিনা চিকিৎসায় জীবন পার করে দিচ্ছেন।
দুঃখজনক হলেও যুগ যুগ ধরে নারীর পায়ে শেকল পরানোর জন্য যত ধরনের সামাজিক নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়েছে, সকল ক্ষেত্রেই নারীর যৌন-আকাংক্ষা এবং তৃপ্তিকে অবহেলা করা হয়েছে। সেকারণেই নারী শরীরের যে প্রত্যঙ্গটি যৌনসুখ নিশ্চিত করে, তাকেও সামাজিক ট্যাবুর আওতায় ফেলা হয়েছে। সামাজিক ট্যাবু আর জ্ঞানস্বল্পতা একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত। সামাজিক ট্যাবু আছে বলেই ভগাঙ্কুরের উপরে জ্ঞানচর্চা হচ্ছে না। তবু যেসকল সাহসী গবেষকরা এর উপর কাজ করছেন তারা কিন্তু নতুন নতুন তথ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রত্যঙ্গটির কাজ কি শুধুই যৌনতৃপ্তি দেয়া? নাকি প্রজননতন্ত্রে এর আরও কোন ভূমিকা আছে যা আমাদের অজানা?

লেখাটির শুরুতেই ক্লিটোরাস বা ভগাঙ্কুর সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে যারা গুগুল সার্চ করার কথা ভেবেছেন বা করেছেন, তারা হয়তো ইতিমধ্যে জেনে গেছেন, গুগল এই বিষয়ে অনেকের মতোই এক কথায় জানিয়ে দিয়েছে যে নারীর‍ প্রজননতন্ত্রে এর ভূমিকা শুধুই যৌনানুভূতি বা অর্গাজমে সহায়তা করা । একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভগাঙ্কুরের প্রধান কাজ সেটাই। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো জানাচ্ছে যে ভগাঙ্কুরের ভূমিকা শুধুই অর্গাজমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকরা নারীর প্রজননতন্ত্র এবং প্রজনন-প্রক্রিয়ায় এর বিশেষ ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন।

তাদের মতে ভগাঙ্কুরের মাধ্যমে নারী মস্তিষ্কে এক ধরনের আলোড়ন ঘটানো সম্ভব যা যোনিপথের রক্ত চলাচল, অক্সিজেন সাপ্লাই, লুব্রিকেশন, তাপমাত্রা এবং জরায়ু মুখের অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। ফলশ্রুতিতে মিলনকালে স্পার্মের গতি নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ডিম নিষিক্ত হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। স্পার্মের আয়ুষ্কাল অতি স্বল্প এবং ডিম নিষিক্ত করার সময়সীমা আরও সীমিত। অধিকাংশ সময়ই লাখ লাখ স্পার্ম চেষ্টা করেও সঠিক পরিবেশের অভাবে একটি ডিম নিষিক্ত করতে সক্ষম হয় না। সেক্ষেত্রে ভগাঙ্কুর একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে যদি মিলনকালে নারীর যৌনসুখ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
নতুন এই তথ্য আবিষ্কারের পর আমাদের হয়তো মেনে নেওয়া উচিত জাইগোট গঠনে ভগাঙ্কুরেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাই সামাজিক ট্যাবু ঝেড়ে ফেলে চিকিৎসক এবং গবেষকদের উচিৎ নারীর দেহের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গটি নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা চালিয়া যাওয়া।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

লেখক পরিচিতি:

Sabrina Syed
PhD Candidate
University of Newcastle
Newcastle, NSW
Australia

শেয়ার করুন:
  • 556
  •  
  •  
  •  
  •  
    556
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.