ধর্ষক নির্মাণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ (শেষ পর্ব)

শামীম আরা নীপা:

এবার আমাদের করণীয় নিয়ে কিছু আলোচনা করি:

১. পরিবারের প্রতিটা মানুষকে সচেতন হতে হবে। খুব গুরুত্বের সাথে মাথায় রাখতে হবে যে সন্তানের ভেতর লিঙ্গ বৈষম্য করা যাবে না এবং শিশুদেরকে পারস্পরিক সম্মানবোধ ও পরমতসহিষ্ণুতার সাথে লালন পালন করতে হবে।
বাচ্চাদের বুঝিয়ে বলতে হবে শরীরের কোন অংশগুলো একান্ত ব্যাক্তিগত এবং স্পর্শকাতর। সাথে তাদের ভালো স্পর্শ ও মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে বোঝাতে হবে। তাদেরকে নিজেদের যৌনাঙ্গকে চিনতে সাহায্য করতে হবে। বাচ্চাদের বোঝাতে হবে তাদের শরীর কেবলই তাদের এবং শরীর স্পর্শ করার অধিকার অন্য কারো নাই এবং বাচ্চাদেরকে সবসময় সতর্ক করতে হবে যেন কেউ তাদের একান্ত ব্যাক্তিগত অঙ্গে স্পর্শ না করে।

তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে, কোন আত্মীয় কিংবা পরিচিত কারো কিংবা অপরিচিত কারো আচরণে অস্বস্তি হলে অবশ্যই মা বাবাকে জানাতে হবে এবং চিৎকার করে না বলে সেখান থেকে দৌড়ে চলে আসতে হবে বাবা মা’র কাছে, কেউ যদি কোন ঘরে নিয়ে যায় কিংবা খেলার ছলে চুমু খায় কিংবা শরীরের কোথাও স্পর্শ করে সেইটা বাবা মা কে নিঃসঙ্কোচে জানাতে হবে। মা বাবাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে, সন্তানের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হবে, যেন নির্দ্বিধায় বাচ্চারা যেকোনো ঘটনা শেয়ার করতে পারে। বাচ্চার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। বাচ্চা যদি হঠাৎ কাওকে এড়িয়ে চলে তবে বাচ্চার সাথে খোলামেলা কথা বলতে হবে, বাচ্চার পক্ষ নিতে হবে এবং যৌন নিপীড়ককে সারাজীবনের জন্য তিরস্কার করে ত্যাগ করতে হবে এবং তার শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বাচ্চারা দিনের একটা বড় সময় স্কুলে থাকে- বাচ্চাদের সাথে স্কুলের গল্প করার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেছে কিনা। স্কুলেরও দায়িত্ব আছে বাচ্চার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সেই বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে বাবা মাকে। বাচ্চা যদি স্কুলে যেতে না চায় কিংবা স্কুল থেকে ফিরে চুপচাপ থাকে কিংবা পড়তে না চায় কিংবা সবাইকে এড়িয়ে চলে তাহলে অবশ্যই বাচ্চার সাথে কথা বলতে হবে এবং বাচ্চাকে নিজের কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। স্কুল কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানাতে হবে।

একটি শিশু এমন প্রসঙ্গ বোঝার ক্ষমতা রাখে না কিন্তু তবুও তাকে জানাতে হবে। আর তার জন্য কি করা যেতে পারে সে ব্যাপারে ভাবতেও হবে, সাহায্য নিতে হবে বিশেষজ্ঞদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে- একটি শিশুকে তার শরীরের তিনটি জায়গা সম্পর্কে জানাতে হবে। তার ঠোঁট, গোপনাঙ্গ ও পায়ুপথ। তাকে জানাতে হবে এই তিনটা তার বিশেষ জায়গা। এখানে বাবা-মা গোসল করানো বা পরিষ্কার করার সময় ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। কেউ সেটি করলে সে কী করবে সেটিও তাকে জানানো। সেটা বাবা মাকে যে জানাবে, সেটি শেখাতে হবে। এতে বাচ্চারা সচেতন থাকবে। জিনিসটা করতে হবে একটু খেলার ছলে, ছবি এঁকে অথবা গল্প করে ধীরে ধীরে ধারণাটা তার মাথায় দিয়ে দিতে হবে। বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মুখে বলা যেতে পারে। কিন্তু শিশুরা সবকিছু ভুলে যায়। তাদের মধ্যে সন্দেহ কম, তাই তাদের বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে হবে। শিশুকালেই শরীরবিজ্ঞান ও পরিবেশ প্রতিবেশ শিক্ষা দিতে হবে বাচ্চাদেরকে এবং কিশোর কিশোরীদের জন্য স্কুলে প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করতে হবে।

২. বাচ্চাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শারীরিক বিকাশের জন্য ব্যবস্থা রাখতে হবে। খেলার মাঠ, সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব উদযাপন কেন্দ্র করে ক্লাব কালচারকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সামাজিক আন্তঃযোগাযোগ এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-১৫৫ (৪) ধারা বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে। যেই আইনের বলে একজন ধর্ষণ মামলার অভিযোগকারী নারীকে কোর্টে তার সতীত্বের প্রমাণ দিতে হয় সেই আইন বাতিল করতেই হবে।

৪. নারীর প্রতি সহিংসতার মামলার তিন মাসের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার বার্তা মিডিয়ার মাধ্যমে, আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ এবং শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়-সমতলে আদিবাসী নারীদের ওপর সব ধরনের যৌন ও সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।

৫. সম্পত্তিতে, শিক্ষায় ও পেশায় নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৬. সরকারি, বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ণবিরোধী সেল গঠন করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন সেই ২০০৯ সালে। নতুন করে (১০ জুলাই, ২০১৯) শিশু নির্যাতন রোধে দেশের প্রতিটি স্কুলে অভিযোগ বক্স রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ধর্ষণ, হত্যাসহ সামাজিক অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণ-রোধ করতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়ার সমন্বয়ে জনসচেতনা মুলক কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগিয়ে পাড়ায়, মহল্লায় যৌন নিপীড়ন বিরোধী ‘সেল’ বা ‘কমিটি’ গঠন করা উচিত।
কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর করতে হবে। সিডো সনদে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব আইন ও প্রথা বিলোপ করতে হবে।

৭. নারীকে হেয়, হীন, ভোগ্যবস্তু, যৌনবস্তু ও অসম্মানমূলক হিসেবে উপস্থাপন করে এমন বই, ওয়াজ, লেখালেখি, নাটক সিনেমা, কমার্শিয়াল ইত্যাদি নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয়সহ সব ধরনের সভা-সমাবেশে নারীবিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে বিটিসিএলের কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চায় সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি অবমাননা ও বৈষম্যমূলক যেকোনো প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পরিচ্ছেদ, ছবি, নির্দেশনা ও শব্দ চয়ন পরিহার করতে হবে।

৮. আইনের সংশোধন এনে এমন আইন করতে হবে যাতে অভিযোগকারীকে দুই বারের বেশি ঘটনার বিবরণ জিজ্ঞাসাবাদ না করা হয়। এক বার পুলিশ, এবং এক বার ক্রস চেকিংয়ের জন্য আসামীর আইনজীবী। বিচার প্রক্রিয়ার নামে নারীকে আরেক বার ধর্ষণ করা যাবে না। তদন্ত চলাকালে ভিকটিমকে মানসিক নিপীড়ন-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ভিকটিমের আইনগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ বিজ্ঞান ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৯. ধর্ষণকে সম্ভ্রমহানি হিসেবে দেখা যাবে না। পাঠ্যপুস্তক ও যাবতীয় পাবলিক আলোচনায় ধর্ষণকে ইজ্জত চলে যাওয়া হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার লংঘিত হওয়া হিসেবে দেখতে হবে।

১০. আমাদের দেশে বিচারকের সংখ্যা কম, বিচারক নিয়োগ দিতে হবে অনেক বেশি। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে অনিষ্পন্ন সব মামলা দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মামলা দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে করতে হবে।

১১. গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং সেই বিষয়ে শহর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত তথ্য সরবরাহ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

 

বি:দ্র: এই লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে আমি প্রায় ৩৫ টা মতো নিউজ লিঙ্ক পড়েছি, কিছু পিডিএফ, কিছু বই আগেই পড়া ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে এই লেখাটা দাঁড়িয়েছে। এই লেখার ভেতর কোট না করেই আমি এমন অনেককিছু অ্যাজ ইট ইজ যুক্ত করেছি কারণ তার থেকে ভালো শব্দ সংযোজন আমি করতে পারিনি এবং রেফারেন্স ও ক্রেডিট দিতে পারছিনা কারণ যখন পড়েছি তখন কিছু নোট নিয়েছি কিন্তু লেখার লিঙ্ক আর রাখিনি, লেখকের নামও মনে থাকার কথা না। তাই এই লেখা আমার একক লেখা না। আমার ইনপুটের সাথে এখানে অনেক মানুষের ইনপুটও আছে। সবার জন্য কোন স্বত্ব ছাড়াই এই লেখাটি উন্মুক্ত।

আগের পর্বগুলোর লিংক:

পর্ব-১ https://womenchapter.com/views/36339

পর্ব-২ https://womenchapter.com/views/36349

পর্ব-৩ https://womenchapter.com/views/36363

পর্ব-৪ https://womenchapter.com/views/36378

পর্ব-৫ https://womenchapter.com/views/36383

শেয়ার করুন:
  • 203
  •  
  •  
  •  
  •  
    203
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.