ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কিছু কথা

সুমিত রায়:

ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ঠিক কিনা এই নিয়ে কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন আলোচনা দেখছি। ধর্ষণের পর হত্যার ক্ষেত্রে হত্যার দায়ে ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিৎ এমন কথা অনেকেই বলেন, সেটা উচিৎ কি অনুচিৎ সেই আলোচনায় যাবো না, সেটা হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিৎ কিনা সেই আলোচনায় যাবো। এখানে কেবল ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ড নিয়েই কিছু কথা বলবো। হত্যা ছাড়া ধর্ষণের ক্ষেত্রে উন্নত দেশে যারা মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে তাদের যুক্তিগুলো আগে দেখাচ্ছি।

মৃত্যুদণ্ড বিরোধিতায় তাদের প্রথম কারণটা এরকম: ধর্ষণ ও হত্যার ও শুধু ধর্ষণ উভয়ের শাস্তি যদি মৃত্যুদণ্ড হয় তাহলে ধর্ষক ধর্ষণের পর নিজের অপরাধ ঢাকবার জন্য বা মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী ভেবে ভিকটিমকে হত্যা করতে চাবে। এক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যার পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। অনেক ধরণের ধর্ষকের ক্ষেত্রেই ধর্ষণের পর হত্যা করার একটা প্রবণতা কাজ করে, আর ধর্ষণের পর হত্যা করার পরিমাণের হারও অনেক। ধর্ষণের পর হত্যার পরিমাণ যাতে কমে বা আরও না বাড়ে তাই এই দুই ক্ষেত্রে শাস্তির মধ্যে একটি পার্থক্যের প্রস্তাব করা হয়।

দ্বিতীয় কারণটা এরকম, ধর্ষণের পর ভিক্টিম এক ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। এখান থেকে তার সেরে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আসতে অনেক সমস্যা হয়। সমাজের একটা দায়বদ্ধতা থাকে তাকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেয়া। এক্ষেত্রে ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেয়াটা অনেক সময় এরকম ইমপ্লাই করে যে, আপনার সব শেষ হয়ে গেছে, ধর্ষণের মাধ্যমে আপনার সবকিছু শেষ করে দেবার ফলে ধর্ষককেও এর সমতুল্য শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা তার জীবন শেষ করে দেয়ার দণ্ড দেয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড দানের ফলে ভিক্টিমের উপর “দেহসর্বস্বা” আর “তার মর্যাদা, গুরুত্ব, জীবন সব শেষ হয়ে গেছে” এধরনের ইমপ্লিকেশন আসতে পারে, যা তার ধর্ষণ পরবর্তী স্বাভাবিকায়নে বাধার সৃষ্টি করে। শিশুধর্ষণের ভিক্টিমের বেলায় এধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়, কারণ তারা বেশি পরিমাণে সাইকোলজিকাল ট্রমার শিকার হয়।

উপরের কারণগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে চাইল্ড রেপের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও অনেক অঙ্গরাজ্যে তা নেই। এডাল্টদের বেলায় ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যু না হলে উন্নত দেশগুলোর কোথাও এজন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। অনেক জায়গায় ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প হিসেবে ৩০-৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এবার আসি আমার নিজস্ব ভাবনায়। উপরে আমি দুইটা পয়েন্ট দিয়েছি। এগুলো ক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা, বিশেষভাবে বলতে গেলে তৃতীত বিশ্বের দেশগুলোর ক্ষেত্রে আলাদা। কেন আলাদা তা উপরের পয়েন্ট দুটো ধরেই বলছি। উন্নত দেশগুলোতে ওই দুইটা পয়েন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ, সমাজের ক্ষেত্রে বেশ এফেক্টিভ হবে। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এগুলার এফেক্টিভনেস এতটা না।

উন্নতদেশগুলাতে রেপের হার আমাদের দেশের মত না। সেখানে অন্য ধরণের রেপ হলেও স্যাডিস্টিক রেপ, ড্রাগ ফ্যাসিলিটেটেড রেপ, বিশেষ সাইকোলজিকাল প্রোফাইলের কারণে রেপের পরিমাণ বেশি থাকে। এইসব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিলেও রেপ তেমন নাও কমতে পারে, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড না দিলে রেপের পর হয়তো হত্যাকাণ্ড কমতে পারে। তাই উন্নত দেশের বেলায় এই নিয়ম ওকে হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলাতে রেপের ধরণের কথা উঠলে দেখা যায় এঙ্গার রেপ, কারেক্টিভ রেপ, পাওয়ার এসার্টিভ রেপ, গ্যাং রেপের পরিমাণ অনেক বেশি। আর এগুলার কারণ শুধু সাইকোলজিকাল বা ড্রাগ না, আমাদের দেশের সোশ্যালাইজেশন, সোশ্যাল ফ্যাক্টরগুলাও এখানে অনেক বেশি অবদান রাখে। এর সাথে ছোটবেলা থেকে পুরুষের মধ্যে নারীদের নিয়ে তৈরি হওয়া দৃষ্টিভঙ্গি, সেক্সুয়াল অবজেক্টিফিকেশন, সমাজের স্লাট শেমিং, ভিক্টিম ব্লেমিং, সমাজ নির্ধারিত ডিসেন্সি ফলো করা মেয়েদের প্রতি (আমাদের দেশে ডিসেন্সি মানে হিজাব, পর্দা ইত্যাদি) বিশেষ অথোরিটি বায়াজ আর ফলস্বরূপ যারা সেই ডিসেন্সি ফলো করে না তাদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হওয়া ইত্যাদি জড়িত।

এই সোশ্যাল ফ্যাক্টরগুলো প্রত্যেকটাকেই আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু শেষেরটা যেন আমাদের সমাজের ক্ষেত্রে মনে হয় একটু বেশি কাজ করে। ব্যাপারটা তাই একটু ব্যাখ্যা করছি। ফ্রয়েড একবার পুরুষের মধ্যে থাকা এক বিশেষ সাইকোলজিকাল কমপ্লেক্সের ধারণা দিয়েছিলেন। এই কমপ্লেক্স এর নাম হচ্ছে “ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স”।

এই কমপ্লেক্সের কারণে একজন পুরুষ সমাজের সকল নারীকে দুটো বিশেষ ক্যাটাগরিতে ফেলে। একটা হচ্ছে ম্যাডোনা বা সেইন্ট বা ধার্মিক টাইপ ডিসেন্ট নারী (আমাদের সমাজে এখন “ডিসেন্সি” এর সমাজ কর্তৃক চাপানো অর্থ হচ্ছে হিজাব, পর্দা ইত্যাদি), আর একটা ক্যাটাগরি হচ্ছে হোর বা বেশ্যা। এই কমপ্লেক্স সকলের মধ্যেই থাকবে এমনটা না, কিন্তু সমাজের বেশ কিছু ফ্যাক্টরের কারণে এইটা প্রমোটেড হতে পারে।

নারীবাদী লেখিকা জেসিকা ভালেন্তি তার “দ্য পিওরিটি মিথ” নামক বইতে দেখান, আমাদের সমাজে সতীত্বের আদর্শিকরণ (idealization of virginity) এর জন্য সমাজে ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স প্রোমোটেড হয়। নাওমি ওলফ সহ আরও অনেকেই এটা নিয়ে বলেছেন। যাই হোক, আমাদের সমাজে ধর্মীয় বা অন্যান্য মহল থেকে একধরণের সিলেক্টিভ ডিসেন্সি ইমপোজ এবং প্রোমোট করার কারণে পুরুষদের মধ্যেও ডিসেন্সি ভেদে ধর্ষণযোগ্য নারী ও ধর্ষণ-অযোগ্য নারীর মধ্যে একটা ক্লাসিফিকেশন তৈরি হয়। এর মাধ্যমে রেপিস্টদের কাছে “হোর” বা “ধর্ষণযোগ্য” নারীদেরকে রেপ করার যেন একটা ইনভিজিবল জাস্টিফিকেশন তৈরি হয়ে যায়।

আর্মিদের মধ্যে রিসোশ্যালাইজেশনের কারণে আরও কিছু ফ্যাক্টর এড হবে, সেদিকে গেলাম না। কিন্তু এই ফ্যাক্টরগুলা উন্নত দেশে থাকলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলাতে অনেক বেশি। আর রেপের ক্ষেত্রেও এগুলা সম্পর্কিত। অনেক দেশের মানুষের অবস্থা যখন এই তখন মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখানো এদেরকে রেপ করা থেকে বিরত রাখার জন্য একটা কার্যকরী উপায়।

পোস্ট এসল্ট ট্রমা থেকে সেড়ে ওঠানোর জন্য মৃত্যুদণ্ড বিরোধী যুক্তি দেখানো হয়। কিন্তু সেটা উন্নত দেশগুলোতেই বেশি কার্যকরী। সেখানে ভিক্টিমদের কাউন্সেলিং এর জন্য অনেক প্রোগ্রাম এরেঞ্জ করা হয়, সমাজ ও পরিবার থেকে অনেক সাপোর্ট দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে কি করা হয়? আমাদের সমাজে নারীদের উপর এমনই পবিত্রতা আরোপ করা হয়, নারীদের “সতীত্বের” গুরুত্ব এতটাই বেশি যে রেপের পর তাকে যেন কেউ আর স্বাভাবিকভাবে নিতেই পারে না। জেসিকা ভালেন্তি এই অবস্থাটার নাম দিয়েছিলেন “দ্য পিওরিটি মিথ”। এই নামে তিনি ২০০৯ সালে একটা বই লেখেন, তিনি সেখানে দেখান নারীদের উপর এই চাপিয়ে দেয়া পবিত্রতা উলটে নারীদের উন্নয়নের জন্যই একটা বিশাল বাঁধার সৃষ্টি করে। আমাদের সমাজে এই পিওরিটি মিথের সাথে আবার যুক্ত হয় ভিক্টিম ব্লেমিং, যেখানে রেপ করার পর রেপিস্টকে দোষ না দিয়ে ভিক্টিমকেই রেপের জন্য ব্লেম করা হয়। সমাজের অবস্থা যেখানে এই তখন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়াটা ভিক্টিমের জন্য বিশেষ কোন উপকারে আসে না। এই সমাজে রেপের কারণে ভিক্টিম একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এরপর রেপের পর সমাজ কর্তৃক দ্বিতীয়বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে রেপিস্ট মৃত্যুদণ্ড পেলেই হয়তো ভিক্টিম ভাববে, তার সাথে ন্যয়বিচার হয়েছে। আর হয়তো সেটা তার পোস্ট এসল্ট ট্রমা কাটাবার জন্য উপকারী হবে।

না, আমি মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে কথা বলছি না, কেবল বলছি ভিক্টিমের সাথে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের সম্পর্কের ব্যাপারে। ভিক্টিম কোন শাস্তিতে খুশি হয়, কোন শাস্তি তার কাছে ন্যায়বিচার বলে মনে হয় অপরাধীর শাস্তি তার ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করিনা। অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা, একটি ক্ষেত্রে এর ভিক্টিম একজন ব্যক্তি হলেও সামগ্রিকভাবে এর জন্য ক্ষতির শিকার হয় সমাজ। ভিক্টিম শান্তি পাচ্ছে কিনা তা সেই সমাজের একটি উপাদান মাত্র, রাষ্ট্রকে আরও অনেক কিছু বিচার করেই শাস্তির কথা ভাবতে হবে। সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল কিসে হয় তার উপর ভিত্তি করেই শাস্তি ঠিক করা উচিৎ। এই বিষয়ে আজ আর কথা বলছি না, লেখা বেশি বড় করতে চাই না, তার আগে ভিক্টিমকে মৃত্যুদণ্ড শান্তি দেয়ার কারণে যদি ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তাহলে সমস্যাটা কী হবে দেখা যাক।

সুমিত রায়

মেরিটাল রেপ তৃতীয় বিশ্বের দেশে অহরহ হয়। ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে মেরিটাল রেপে স্বামীর শাস্তিও মৃত্যুদণ্ডই হবে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে সমাজের যে অবস্থা, কোন স্ত্রীই চাবে না মেরিটাল বা স্পোজাল রেপের কারণে তার স্বামী মৃত্যুদণ্ড পাক। এক্ষেত্রে ফলস্বরূপ যেটা হবে ভিক্টিম তাকে রেপ করার কথা আর রিপোর্টই করবে না। একুয়েইনটেন্স রেপের ক্ষেত্রেও একই রকম ব্যাপার দেখা যাবে। সেই ক্ষেত্রে ধর্ষক হচ্ছে ভিক্টিমের পূর্ব পরিচিত ব্যক্তি। ভিক্টিমের মামা, চাচা, প্রেমিক রেপ করলে এধরনের রেপ হয়।

পরিবার থেকেই চাপ আসবে যাতে রিপোর্ট না করে ক্ষমা করে দেয়া হয়, কারণ রেপের কারণে নিজের মামা, চাচা, প্রেমিক, স্বামীর মৃত্যু হোক তা ভিক্টিম নিজে থেকে চাইলেও পরিবার থেকে কি ভীষণ চাপ আসতে পারে বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যদি রেপিস্ট একবার বুঝে যায় যে সে হাজারবার রেপ করলেও ভিক্টিম কখনই রিপোর্ট করবে না, তাহলে রেপের পরিমাণ আরও বাড়বে। পত্রিকায় খুব একটা না আসলেও আমরা জানি এধরণের রেপের পরিমাণ আমাদের সমাজে কত বেশি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.