প্রেম, প্রতারণা, ধর্ষণ, নারীবাদ, যৌনতা ইত্যাদি…

সুমিত রায়:

একটি গ্রুপে একজন বাংলাদেশী নারীবাদীর পোস্ট তুলে ধরছি। এরকম চিন্তাধারা সারা বিশ্বেই দেখা যায়, তাই এখানেও শেয়ার করছি, আর সেই সাথে এই বিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়াটাও। সকলেরই এই বিষয়ে ধারণা থাকা উচিৎ বলে মনে করি।

এক মাস পরে গার্লফ্রেন্ড চেঞ্জ করার আচরণকে এখানে ডিমনাইজ করা হচ্ছে। এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী। কোন ব্যক্তি পুরুষ হোন আর নারী হোন, স্ট্যাবল রিলেশনশিপে যাবার আগে রিলেশনে যাবার আর ব্রেকাপ করার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে, এটা মেনেই রোমান্টিক রিলেশনশিপে যেতে হবে।

হ্যাঁ, তবে এটা অস্বীকার করা যায় না যে ব্যক্তি কেবল নারীকে “জয়” করার জন্য রিলেশনে যেতে পারে, এবং রিলেশনশিপের কিছুদিনের মধ্যে আগ্রহ হারিয়ে ব্রেকাপ করতে পারে। যারা এরকম করে তাদের মধ্যে নারসিসিজম থাকে। একাডেমিকালি কারেক্ট করে বললে নারসিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিজর্ডারে আক্রান্ত থাকে। এদের ক্ষেত্রেও প্রথম দুই তিনবার রিলেশনে গিয়ে সম্পর্ক ছেড়ে আসাকে সমস্যা মনে করি না, কারণ ব্যক্তির নারসিসিজম আছে এটা বুঝতেই অনেক সময় লেগে যায়। যাই হোক, নারসিসিস্টকে ধর্ষক বলা যায় না, সমাজে নারসিসিস্টদের সংখ্যা মাত্র ১%। নারীর মধ্যেও এটা থাকে।

মুক্তমনা, নাস্তিকরা অপরাধী হতেই পারে। নাস্তিক বলতে কেবল ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বোঝায়, মুক্তমনা বলতে কেবল বিভিন্ন ধারণাকে যে গ্রহণ করে যৌক্তিকভাবে বিচার করার সামর্থ রাখে তাকে বোঝায়। এরা অপরাধী হোক, খুনী হোক, ধর্ষক হোক, তারপরও এরা নাস্তিক, মুক্তমনাই থাকবে। আর লুচ্চামি অপরাধ না, লুচ্চামি বলতে ফ্লার্ট করা বোঝায়। ফ্লার্ট হচ্ছে প্রেমের উৎস্য। ফ্লার্ট করা খারাপ ভাবা মানে প্রেম করাই খারাপ। কিন্তু কথা হচ্ছে, ফ্লার্ট যাতে এমন না হয় যাতে যার সাথে ফ্লার্ট করা হচ্ছে সে বিরক্ত হয়। যার সাথে ফ্লার্ট করা হচ্ছে সে যদি বিরক্তি প্রকাশ করে, আর তারপরেও ফ্লার্ট করতে থাকা হয় তাহলে সেটা ক্রিপি ফ্লার্ট হয়ে যায়।

এধরনের লুচ্চামি খারাপ। তবে এক্ষেত্রে যার সাথে ফ্লার্ট করা হচ্ছে তাকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে যে এই ফ্লার্টিভ আচরণ তার ভাল লাগছে না। যে ফ্লার্ট করছে সে মানুষের মন, অঙ্গভঙ্গি বুঝে নেবে এরকম ভাবার কোন কারণ নেই, এই বোঝার অক্ষমতাটা কোন অপরাধ নয়। এখানেও উল্লেখ্য যে, ফ্লার্ট নারীও করতে পারে, পুরুষের সাথেও ফ্লার্ট করা যেতে পারে।

কমেন্ট সেকশনে নতুন চৌধুরী নামে একজন বলছেন, প্রেম করার পর ব্রেকাপের আগে যতগুলো ফিজিক্যাল রিলেশন হয় ব্রেকাপের পর সেগুলো ধর্ষণ হয়ে যায়।

এটাও বাজে যুক্তি। হ্যাঁ, কোন যৌনক্রিয়া কনসেন্ট বা সম্মতি ব্যতিত হলে তা ধর্ষণ হয়ে থাকে। এখন সম্মতি নানা প্রকার হতে পারে, যার মধ্যে শর্তাধীন সম্মতি একটি। অর্থাৎ যৌনক্রিয়ার আগে যদি বলা হয়, আমার সাথে তোমার অমুক সময়ের মধ্যে বিয়ে হবে, বা কোন না কোনদিন বিয়ে হবে এই শর্তে আমি যৌনক্রিয়া করতে রাজি। এরপর যৌনক্রিয়া হলো, কিন্তু পরে আর বিয়ে হলো না, ব্রেকাপ হয়ে গেল। অর্থাৎ পূর্বের যে শর্তের অধীনে যৌনক্রিয়ায় সম্মতি দেয়া হয়েছিল সেই শর্ত ফেইল করলো বলে সম্মতি ফেইল করেছে, মানে যৌনক্রিয়াটি সম্মতি ব্যতিত সাধিত হয়েছে, আর সম্মতি ছাড়াই যেহেতু যৌনক্রিয়া সাধিত হয়েছে, তাই এটি ধর্ষণ।

যুক্তিটা এরকমই। কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে সম্মতিতে এরকম কন্ডিশনাল কনসেন্টকে গ্রহণ করা হয় না। সঙ্গত কারণেই হয় না। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পুরুষকে এক্ষেত্রে প্রতারণার অপরাধে অপরাধী করা হয়। নারীর ক্ষেত্রে কোন অপরাধ ধরা হয় না। আর আসলেই কনসেন্ট দেয়া হয়েছিল কিনা, রিলেশনশিপটা কমিটেড ছিল কিনা সেটা দেখারও কোন উপায় নেই। নারীকে এক্ষেত্রে বেনিফিট অফ ডাউট দেয়া হয়। ফলে পুরুষকে সহজেই ফাঁসানো যায়।

যাই হোক, ধর্ষণে ছিলাম, সেখানেই ফিরে যাই। এরকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্রেকাপ করলেও নারী বা পুরুষ যেই কাজটা করে থাকুক তাকে দায়ী করা যায় না, ধর্ষক হিসেবে তো অবশ্যই না। কারণ প্রেমের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির ব্যাপারটা অন্যান্য রোমান্টিক আলাপচারিতারই অংশ হয়ে থাকতে পারে, আবেগের ফল হতে পারে, আর যদি সিরিয়াসলি কেউ দিয়েও থাকে তার মানেও এই না যে ভবিষ্যতের কথা ভালভাবে বিচার বিবেচনা করে সে দিয়েছে। আর মানুষের জীবনের পরিস্থিতি বিভিন্ন সময়ে বদলায়। যে পরিস্থিতিতে কমিটমেন্ট দেয়া হয়েছিল পরেও একই পরিস্থিতি থাকবে এমনটা বলা যায় না। হতে পারে যার সাথে প্রেম করা হচ্ছে তাকে ভালো করে আগে না বুঝেই যৌনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা হয়, কিন্তু পরে আচরণ দেখে মনে হয় যে তার সাথে সম্পর্ক রাখা আর সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে কি ব্যক্তি ব্রেকাপ না করে কন্ডিশনাল কনসেন্টের জন্য জোর করে প্রেম করে যাবে? প্রেম কখনও জোর করে হয়? তাহলে মানুষের কাছ থেকে ব্রেকাপ করার স্বাধীনতা কেন কেড়ে নেয়া হবে?

সুমিত রায়

প্রেম করলে ব্রেকাপ হতে পারে, এমনকি কমিটমেন্ট দিয়ে যৌনক্রিয়া করার পরও ব্রেকাপ হতে পারে এরকম ঝুঁকি নিয়েই প্রেম করতে হবে, সম্পর্কে জড়াতে হবে, যৌনক্রিয়া করতে হবে। যদি সেটায় সমস্যা থাকে তাহলে সেভাবেই যাচাই বাছাই করে প্রেমিক প্রেমিকা বাছাই করুন, আর তাতেও সমস্যা থাকলে প্রেম করারই দরকার নেই।

এক্ষেত্রে আরও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলে নেই।

যৌনতার মাধ্যমে সন্তান নেবার অধিকারও দুজনেরই, একজনের ইচ্ছা না থাকলে সন্তান নেয়া হবে না। যদি একসিডেন্টালি সন্তান চলে আসে তাহলে দুজনের ইচ্ছায়ই সন্তানের জন্ম হওয়া উচিৎ। কেবল নারীর ইচ্ছা থাকলে সন্তানের সমস্ত দায় সেই নারীর। সেটা না হলে এবরশন করাতে হবে। সন্তানের জন্ম হওয়া – না হওয়ার সমস্ত অধিকার নারীর একার এই ধারণাটাও আবেগীয় কথা ছাড়া কিছু না। সন্তানের দায় দায়িত্ব পিতা নিলেও তার ভূমিষ্ট হওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণেও পিতার অধিকার থাকবেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। এই যে লুচ্চামি করা, এক মাস পরপর সঙ্গী পরিবর্তন করা, এসব কেবল পুরুষই করে না, নারীরাও করে। এখন কি নারীদেরকে ধর্ষক বলা হবে?
এক্ষেত্রে অনেকে বলতে পারে, এইসব অপরাধে মূলত নারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পুরুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তাই অপরাধী এখানে সবসময়ই পুরুষ ও ভিক্টিম সবসময়ই নারী।
এরকম ধারণাতেই সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, ব্রেকাপ ও “প্রতারনা” এর শিকার হয়ে পুরুষেরা কষ্ট পায় না এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। কষ্ট পুরুষেরও হয়। পুরুষকে ভালোবাসা ও আবেগ-অনুভূতিহীন জীব বলে মনে করার কোন কারণ নেই।

দ্বিতীয়ত, কোনটা অপরাধ ধরা হবে, তার শাস্তি কী হবে তা কখনও কেবল ভিক্টিম কী অনুভব করছে তার উপর নির্ভর করে না। করা উচিৎও না। সেই সাথে লিঙ্গ নির্বিশেষে অপরাধের হার, তার গুরুত্ব, ফলাফল সহ অনেক কিছুই বিবেচনা করা উচিৎ।

তৃতীয়ত, যদি “ভার্জিনিটি” বা “সতীত্ব” নষ্ট হবার কথা বলেন, তাহলে বলবো “সতীত্বকে” এতোটা গুরুত্ব দেয়া কখনই উচিৎ নয় যার ফলে এটা হারালে মানুষ এতোটা দুঃখ পায়। বস্তুত সতীত্ব নিজে একটি পিতৃতান্ত্রিক ফল। উৎপাদন ব্যবস্থা যখন পুরুষের নিয়ন্ত্রণে আসে, যখন পুরুষ উদবৃত্ত সম্পদ নিজে জমানো শুরু করে তখন সে নিজের সম্পত্তির স্ট্যাবিলিটি তৈরির জন্য নিজের বংশের কাছেই যাতে বংশের নাম আর সম্পদ থাকে তা নিশ্চিত করতে চায়, আর এর ফলেই নিশ্চিত করতে চায় যে নারী যেন কেবল তার অধিকারেই থাকে, তার বংশে অন্য কারও স্পার্মের ফসল না আসে। আর এভাবেই সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসারে নারীর কাছে সতীত্ব ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। নারীদেরকে ও বিশেষ করে নারীবাদীদেরকে বরং এগুলোর কারণে পুরুষকে দোষারোপ করা বন্ধ করে এই সতীত্বের “পিতৃতান্ত্রিক কনসেপ্ট” এর বিরুদ্ধেই আন্দোলন করা উচিৎ। সতীত্ব না হারানোর ইচ্ছা নিয়ে বিবর্তনগত ও বায়োলজিকাল রিজনও আছে, যেমন নারীকে নয় মাস গর্ভধারণ করতে হয় বলে সন্তান ধারণে তার কষ্ট বেশি বলে ইভোল্যুশনই তাকে বেশি যাচাই বাছাই করে সঙ্গী সিলেকশনের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটা ওভারকাম করা যায় না, বা এটা হারালে অনেক ক্ষতি হয়ে গেল তা নিয়েই পড়ে থাকতে হবে। আর এখন যেখানে রিস্ক ফ্রি যৌনক্রিয়া করা সম্ভব তখন এগুলোকে ওভারকাম করাই যায়। নারীদেরকেই তাদের মুক্তির জন্য এরকম প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

সেক্সুয়াল রেভোল্যুশন কেবলমাত্র যৌনতার বিপ্লব ছিল না, এটি একই সাথে ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতার বিপ্লব, যেখানে মানুষ কোন বাধাহীনভাবেই যৌনতা ও প্রেমের স্বাধীনতা নিতে পারে। এইসময় যৌনতার সতীত্ব টাইপের গোড়ামিগুলো ধীরে ধীরে লুপ্ত হতে থাকে। এর পূর্বে সতীত্ব নারীবাদেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের ফ্রান্স ও ব্রিটেইন ভিত্তিক আদিনারীবাদীগণ এর ইতিহাস যদি পড়ে থাকেন তাহলে দেখবেন তারা সবসময় বলে আসছেন, নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি নৈতিক, নারীর নৈতিক অবস্থান পুরুষের চেয়ে উন্নত, আর তাই তারা পুরুষের চেয়ে বেশি শ্রেষ্ঠ।

কেন এমনটা বলছেন? কেননা পুরুষেরা “সেক্সুয়ালি এগ্রেসিভ”, আর নারীরা তাদের যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে, বিশেষ করে সেক্সুয়াল রেভোল্যুশনের পর যৌনতার নিয়ন্ত্রণকে ক্রেডিট হিসেবে দেখা বন্ধ হয়। যৌনতা হয়ে যায় স্বাধীন। প্রেম করা ও ব্রেকাপ করা উভয় ক্ষেত্রেই ব্যক্তিস্বাধীনতাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশ্চাত্যের নারীবাদও ধীরে ধীরে অবস্থান পরিবর্তন করা শুরু করে। আমাদের নারীবাদীদেরকেও এগুলো বুঝতে হবে, এই পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 213
  •  
  •  
  •  
  •  
    213
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.