নারীবাদী রাজনীতির কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা?

0

বেল হুকস (অনুবাদ: মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার):

তাঁর প্রকৃত নাম ছিলো Gloria Jean Watkins, কিন্তু বেল হুকস নামের আড়ালে প্রকৃত নামটি প্রায় হারিয়েই গেছে। হ্যাঁ তিনি বেল হুকস নামে লিখতেন, কিন্তু আজ সারা দুনিয়ার নারীবাদী ও নারীবাদের সমর্থকেরা তাঁকে তাঁর লেখক নাম বা “পেন নেইম” দিয়েই জানেন।

নারীবাদী তত্ত্বে দারুণ সব অসাধারণ ধারণার অবতারণা করা বেল হুকস জন্মেছিলেন ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৫ তারিখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের নারীবাদী লেখালেখি ও আন্দোলনে যখন শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীদের প্রবল প্রতাপ, তখন তিনি সেই বলয়কে চ্যালেঞ্জ করেন, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “কালো নারীরা কি নারী নয়?”
দারুণ সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন নারীবাদী তত্ত্বের নানান দিক, নিজে উপস্থাপন করেছেন কিছু মৌলিক চিন্তা, বিশেষত “ব্ল্যাক ফেমিনিজম” এর ভাবনায় তিনিই ছিলেন প্রধান চিন্তক। এই লেখাটি তাঁর “Feminism is for EVERYBODY: Passionate Politics” বইয়ের ভূমিকা।
তিনি দাবি করেছেন, একটি দারুণ সহজ বইয়ের অপেক্ষা করেছিলেন তিনি, যে বইটি খুব সহজ করে নারীবাদ বোঝাবে মানুষকে, অথচ সরলীকরণে আক্রান্ত হবে না, এই বইটিকে তিনি উল্লেখ করেছেন, বিশ বছর অপেক্ষার পরে পাওয়া সেই প্রয়োজনীয় বই হিসাবে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নারীবাদীরা এক সময় এই রকমের সহজ করে লেখা হাজার হাজার বই লিখবেন, যা মানুষকে নারীবাদের কাছে আসার আহবান করবে, মানুষ নারীবাদের সাথে যুক্ত হবার আহবান করবে।

(এখানে উল্লেখ্য যে, হুকসের সকল পর্বই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্তর দশকের নারীবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা এবং এই প্রবন্ধটির অনুবাদ দারুণভাবেই মূলানুগ, তাই এর বক্তব্য বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেবার দায় অনুবাদকের নয়। তবে অনুবাদ প্রসঙ্গে যেকোনো পরামর্শ, সমালোচনা সাদরে গৃহীত হবে।)

খুব সহজ করে বললে বলা যায় – “নারীবাদ হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদী শোষণের অবসান ঘটানোর সংগ্রাম, সকল রকমের পিতৃতান্ত্রিক শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির সংগ্রাম”।

প্রায় দশ বছর আগে আমার লেখা “Feminist Theory: From Margin to Center” বইটিতে আমি নারীবাদের সংজ্ঞা হিসাবে এই প্রস্তাবনাটি হাজির করেছিলাম। সেই সময় আমি ভেবেছিলাম হয়তো এটা নারীবাদের একটা সাধারণ সংজ্ঞা হয়ে উঠবে, সবাই নারীবাদের এই সংজ্ঞাটি ব্যবহার করবে। আমি এই সংজ্ঞাটি পছন্দ করেছিলাম, কেননা এই সংজ্ঞাটি পুরুষকে নারীবাদের প্রধান শত্রু হিসাবে হাজির করেনি। সেক্সিজম বা পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদী শোষণের উল্লেখ করার মধ্যে দিয়ে এই সংজ্ঞাটিতে আসলে সমস্যাটির মূলের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে।
বাস্তবত, এই সংজ্ঞাটি আমাদের বলছে যে সকল ধরনের পিতৃতান্ত্রিক বা লিঙ্গবৈষম্যবাদী শোষণমূলক চিন্তা ও অনুশীলন হচ্ছে মূল সমস্যা, সেটা যেই-ই সমর্থন করুক না কেনো, কী পুরুষ কী নারী কিংবা শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক।

আবার এই সংজ্ঞাটি যথেষ্টই বিস্তৃত যা পদ্ধতিগত প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গবৈষম্যবাদী শোষণ সম্পর্কে নানান ধরনের বোঝাপড়াকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এই সংজ্ঞাটি উন্মুক্ত, খোলা। ফেমিনিজম বা নারীবাদ বুঝতে হলে পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদকে বুঝতেই হবে, অন্তত এই বোঝাপড়াটা জরুরি।

নারীবাদী রাজনীতির সমর্থকদের প্রায় সকলেই জানেন যে বেশিরভাগ মানুষই আসলে পিতৃতান্ত্রিকতা বা পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদ বিষয়টা বোঝেন না, আর বুঝলেও তাঁরা মনে করেন এটা কোনো সমস্যা নয়। সাধারণ মানুষের বেশিরভাগেরই ধারণা যে ফেমিনিজম বা নারীবাদ মানেই হচ্ছে নারীর পুরুষের সমান হতে চাওয়া। আর এই সাধারণ মানুষদের একটা বিরাট অংশের ধারণা হচ্ছে নারীবাদ হচ্ছে “পুরুষ বিরোধিতা” করা।

নারীবাদী রাজনীতি নিয়ে এই বিরাট জনগোষ্ঠীর এই ভুল বোঝাপড়াটা আসলে এঁদের বাস্তবতাকেই তুলে ধরে যে এরা নারীবাদকে জেনেছেন এবং জানেন পিতৃতান্ত্রিক গণমাধ্যমের প্রচারণার মধ্য দিয়ে।

এরা নারীবাদ বলতে যা শোনেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হয়তো কোনো একজন নারীর কাছ থেকে যিনি প্রাথমিকভাবে হয়তো নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাসী অর্থাৎ লৈঙ্গিক সমতায় বিশ্বাসী, সমান কাজের জন্যে সমান মজুরি, আর কখনও কখনও হয়তো ঘরের কাজ আর সন্তান প্রতিপালনে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, এই হচ্ছে এঁদের নারীবাদের বোঝাপড়া। এরা দেখেন এই সকল নারীবাদীরা সাধারণত অভিজাত ও বস্তুগতভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির।

গণমাধ্যমগুলো থেকে এরা জানেন যে নারী স্বাধীনতার কেন্দ্রীয় আগ্রহ হচ্ছে গর্ভপাতের স্বাধীনতা, সমকামী হবার স্বাধীনতা, ধর্ষণ আর পরিবারে নারীর উপরে সহিংসতাকে চ্যালেঞ্জ করা। এই সমস্ত ইস্যুগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই কর্মক্ষেত্রে লৈঙ্গিক সমতা আর একই কাজের জন্যে সমান পারিশ্রমিক এই দুটি বিষয়ে একমত।

আমাদের সমাজ যেহেতু এখনও প্রাথমিকভাবে একটা ধর্মভিত্তিক সমাজ (মূলত খ্রিস্টিয় সংস্কৃতিভিত্তিক সমাজ), সাধারণ জনগণের ধারণা হচ্ছে পরিবারে নারীকে পুরুষের অধীনে থাকতে হবে, এটা হচ্ছে ঈশ্বর নির্ধারিত বিধান।
যদিও একটা বিরাট সংখ্যক নারী এখন ঘরের বাইরে কাজ করছেন, মূল শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন, এমনকি বহু পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিও হচ্ছেন নারী, তারপরেও পরিবার বিষয়ে আমাদের জাতিগত ভাবনায় পুরুষের আধিপত্যের বিষয়টি তার যৌক্তিকতা নিয়ে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে, তা সে পুরুষ ঘরে থাকুক কিংবা না থাকুক।

নারীবাদী আন্দোলনের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি যখন মনে করে যে এটা ছিলো পুরুষবিরোধী একটা অবস্থান এবং তখন মূলত এই ধারণাটি গড়ে ওঠে এমন একটি বোঝাপড়ার উপরে যে হয়তো শুধু নারীর যে এলাকা, শুধু নারীদের নিয়ে যে পরিবেশ সেখানে বুঝি পিতৃতান্ত্রিকতা কিংবা লিঙ্গবৈষম্যবাদী চিন্তাভাবনা থাকবে না, বিষয়টা মোটেও তা নয়। বহু নারী এমনকি নারীবাদী রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশ নেয়া বহু নারীও এই ধরনের পিতৃতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করেন।

এটাও ঠিক যে প্রথম দিককার নারীবাদীদের মাঝে বেশ ভালো রকমের পুরুষ বিদ্বেষ ছিলো, মূলত ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে নারীবাদী হয়ে ওঠার কারণে এবং যেহেতু তাঁদেরকে ক্রমাগতই পুরুষাধিপত্য’র বিরুদ্ধে জবাব দিতে হতো সেজন্যে। সেসময় নারীমুক্তি বা নারী স্বাধীনতার সংগ্রামগুলোর মূল প্রেরণাই ছিলো অবিচার আর অন্যায্যতার বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্রোধ আর ক্ষোভ।

প্রথম দিককার বেশিরভাগ নারীবাদী একটিভিস্টই (এঁদের একটা বড় অংশই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ নারী) পিতৃতান্ত্রিকতা ও পুরুষাধিপত্য সম্পর্কে তাঁদের সচেতনতাকে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন যখন তাঁরা আরও অপরাপর পুরুষদের সাথে শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, কিন্তু যে পুরুষেরা তাঁদেরকে বিশ্ব পরিস্থিতির কথা বোঝাতেন, বোঝাতেন স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্য, সেই পুরুষেরাই আবার নিজের সমসাময়িক নারীদের উপরে আধিপত্য জারি রাখতেন। নারী যে সংগ্রামেই থাকুক না কেনো, তা সে শ্বেতাঙ্গ নারী যদি সমাজতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করেন, কৃষ্ণাঙ্গ নারী যদি নাগরিক অধিকারের দাবিতে আর কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের স্বাধীনতার দাবিতে কিংবা আমেরিকান আদিবাসী নারী যদি আদিবাসী অধিকারের দাবিতে সংগ্রাম করেন, সকল ক্ষেত্রেই পুরুষ চাইতো নেতৃত্ব দিতে, তাঁরা চাইতো নেতৃত্ব তাঁদের হাতে থাকবে, নারী শুধু অনুসরণ করবে, নারী শুধু পুরুষের পায়ের ছাপ ধরে ধরে এগোবে।

এই সকল স্বাধীনতাকামী মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা সেই সময়ের প্রগতিশীল নারীদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ওঠার, প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রেরণা জুগিয়েছিলো এবং এই প্রেরণা তাঁদেরকে সমসাময়িক নারীমুক্তি সংগ্রামের দিকে ঠেলে দিয়েছিলো।

সমসাময়িক নারীবাদ অগ্রসর হওয়ার মধ্য দিয়ে নারী বুঝতে পারে যে কেবল পুরুষই আমাদের সমাজের পিতৃতান্ত্রিক ও লিঙ্গবৈষম্যবাদী চিন্তা ও অনুশীলনের সমর্থক নয়, বহু নারীও একই রকমের পিতৃতান্ত্রিক ও লিঙ্গবৈষম্যবাদী হতে পারে, এই বোঝাপড়া গড়ে ওঠার পর থেকেই পুরুষ বিদ্বেষী আবেগ – অনুভূতি আর কখনই নারীবাদী সংগ্রামের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেনি। তখন সমগ্র মনোযোগ সরে যায় লৈঙ্গিক সমতার দিকে, লৈঙ্গিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে। কিন্তু নিজেদের ভেতরের পিতৃতান্ত্রিকতার বিরোধিতা না করে নারীবাদকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে নারীদের পক্ষে একাট্টা হওয়া সম্ভব ছিলো না । নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্বগুলোকে দূর না করে নারীদের মাঝে ঐক্য বা এক ধরনের শক্তিশালী “ভগ্নীত্ববোধ” বা Sisterhood গড়ে ওঠা সম্ভব ছিলো না।

সকল নারীই পুরুষের দ্বারা কোনো না কোনোভাবে শোষিত, পুরুষাধিপত্যের শিকার এই ধারণাটিই ছিলো এক ধরনের কাল্পনিক ভগ্নিত্ববোধ গড়ে ওঠার একমাত্র ভিত্তি, যা আসলে ভেঙ্গে পড়ে যখন শ্রেণি ও বর্ণ প্রসঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সেই সময়ের নারীবাদের শুরুতেই আসে শ্রেণির প্রসঙ্গটি আর তার পরপরই আসে বর্ণ বা রেইস প্রসঙ্গটি।

মধ্য সত্তুরের দশকে শ্রেণি বৈষম্য নিয়ে ডায়ানা প্রেস (Diana Press) তাঁদের বিপ্লবী ভাবনাগুলো প্রকাশ করেন “শ্রেণি ও নারীবাদ” (Class and Feminism) এই শিরোনামে (* অনুবাদকের নোট: বইটির মূল লেখক Charlotte Bunch, Nancy Myron এর লেখা) । শ্রেণি ও বর্ণ নিয়ে এই সকল আলোচনা নারীবাদী আন্দোলনে নারীর ঐক্য ও ভগ্নিত্ববোধের প্রয়োজনীয়তাকে লঘু করে দেয় না, বরং এটা আরও বেশি করে গুরুত্ব আরোপ করে যে আমাদের ঐক্য ও ভগ্নিত্ববোধ সম্ভব হয়ে উঠতে পারে কেবল নারীদের ভেতরের সংগ্রামের ফলেই, নারীদের মাঝে যারা অন্যান্য নারীদের শোষণ করে শ্রেণি বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্যবাদী কিংবা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে, তাঁদের সাথে বোঝাপড়া না করে কখনই নারী ঐক্য বা ভগ্নিত্ববোধ গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। সুতরাং নারী ও নারীবাদীদের নিজেদের মাঝের এই তফাৎগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যে দিয়েই কেবল একটি সর্বসাধারণ রাজনৈতিক পাটাতন গড়ে তোলা সম্ভব।

যদিও কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীগণ ব্যক্তিগতভাবে নারীবাদী আন্দোলনের শুরু থেকেই এর সাথে দারুণভাবে সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু তাঁরা কখনই এই আন্দোলনের “তারকা” হিসাবে আবির্ভূত হননি, তাঁরা কখনই মূলধারার মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি। নারীবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ব্যক্তি পর্যায়ের এই কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা একেকজন দারুণ বিপ্লবী মানুষ ছিলেন (ঠিক শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীদের মাঝে সমকামী নারীরা যেমন ছিলেন)। এই বিপ্লবী নারীবাদীরা ইতিমধ্যেই সংস্কারপন্থী নারীবাদীদের তোপের মুখে থাকতেন, সংস্কারপন্থী নারীবাদীরা, যারা আসলে বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই নারীবাদী আন্দোলনের লক্ষ্য হিসাবে কেবল পুরুষের সমান অধিকার অর্জনকেই প্রধান করে দেখাতেন। এমনকি নারীবাদী চত্বরে বর্ণ বা রেইস প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়ে ওঠার আগেই কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীদের কাছে (এবং তাঁদের শ্বেতাঙ্গ বিপ্লবী সহযাত্রী নারীবাদীদের বেলাতেও) এই বিষয়টি প্রায় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে শ্বেতাঙ্গ আভিজাত্যবাদী পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে বজায় রেখে কখনই নারীর সম অধিকার অর্জন সম্ভব নয়।

একেবারে গোড়ার দিক থেকেই নারীবাদী আন্দোলনে এক ধরনের বিভক্তি বা মেরুকরণ ঘটেছে। সংস্কারবাদী চিন্তকেরা লিঙ্গভিত্তিক সমতা অর্জনের প্রতিই বেশি জোর দিয়েছেন, অর্থাৎ নারী পুরুষের অধিকারের সমতা। কিন্তু বিপ্লবী নারীবাদীরা কেবল খানিকটা বেশি অধিকার অর্জনের জন্যে বিদ্যমান পদ্ধতিটির একটু কাট-ছাঁট পরিবর্তনেই বিশ্বাস করেননি, বরং আমরা চেয়েছিলাম বিদ্যমান পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন, আমরা চেয়েছিলাম পিতৃতান্ত্রিকতা ও পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদের চিরঅবসান। যেহেতু মূলধারার পিতৃতান্ত্রিক গণমাধ্যমগুলো বিপ্লবী চিন্তা চেতনায় কখনই আগ্রহী ছিলো না, সেকারণেই নারীবাদের বিপ্লবী ধারাগুলো কখনই গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি।

সাধারণ মানুষের বোঝাপড়ায় “নারী মুক্তির” লক্ষ্য যা ছিলো কিংবা যা এখনও আছে তা হচ্ছে নারীর পুরুষের অধিকারের অর্থাৎ অধিকারের সমতার দাবি জানানো এবং অর্জন করা। বাস্তবত “সমান অধিকারের” এই দাবিটি অর্জন করাটা হয়তো অপেক্ষাকৃত সহজ ছিলো। দেশের অর্থনীতি, অর্থনৈতিক মন্দা, চাকুরির বাজারে হাহাকার এই সমস্ত অবস্থার অবসান ও পরিবর্তনের দাবিগুলো নারীবাদের স্বপক্ষে সহায়ক অবস্থা তৈরি করেছিলো, জনশক্তিতে বা শ্রমবাজারে লৈঙ্গিক সমতার বিষয়টিকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলো।

বর্ণবাদী বাস্তবতায়, শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা বরং নারীর সম-অধিকারের প্রশ্নটিকে বিবেচনা করার বিষয়েই বেশি আগ্রহী ছিলো, অন্তত: তাতে যদি সাদা আভিজাত্যবাদকে টিকিয়ে রাখা যায়। এটা তো ভোলার কোনো উপায় নেই যে শ্বেতাঙ্গ নারীরা তাঁদের স্বাধীনতার কথা বলতে শুরু করতে পেরেছিলেন কেবল নাগরিক অধিকার (Civil rights) অর্জনের পরেই, ঠিক যখন থেকে বর্ণবাদী বৈষম্যের অবসান হতে শুরু করেছিলো, বিশেষত যখন থেকে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী, নির্দিষ্টভাবে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ চাকুরির বাজারে শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মতো সমকক্ষতা অর্জন করতে শুরু করেছিলো।

আর সংস্কারপন্থী নারীবাদী চিন্তার প্রধান আগ্রহটিই হচ্ছে শ্রমবাজারে পুরুষের সাথে সমকক্ষতা অর্জন, কেবল এই বিষয়ের উপরে মনোনিবেশ আসলে সমসাময়িক নারীবাদের মূল উদ্দেশ্য ও সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্যটিকে আড়াল করে দেয়, সমসাময়িক নারীবাদ শুধু নারী-পুরুষের সমঅধিকারের জন্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারই চায় তা নয়, বরং এই সংস্কারের সাথে সাথে তারা দাবি করে আমাদের সমাজের আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন যা আসলে আমাদেরকে মৌলিকভাবেই লিঙ্গবৈষম্যবাদ বিরোধী হিসাবে গড়ে তুলবে।

বেশিরভাগ নারী বিশেষত অভিজাত শ্রেণির শ্বেতাঙ্গ নারীরা, বর্তমান সামাজিক কাঠামোতে মোটামুটিভাবে একটু অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের সাথে সাথেই নারীবাদী যে মৌলিক বিপ্লবী উদ্দেশ্য তা ভুলতে বসেন, তাঁদের চিন্তা থেকে সেসব উবে যায়। বরং খানিকটা পরিহাস্যকর হলেও বিপ্লবী নারীবাদী চিন্তাগুলো একাডেমিক বা বিদ্যায়তনিক নারীবাদীদের মাঝেই গৃহীত ও চর্চিত হয়েছে অনেক বেশি। বিদ্যায়তনিক চত্বরে বিপ্লবী নারীবাদী তত্ত্বগুলোর উৎপাদন ভালোই হয়েছে, কিন্তু প্রায়শই এই সকল তত্ত্ব সাধারণের মাঝে প্রচারিত হয়নি, সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। বরং এই সকল বিপ্লবী তত্ত্ব হয়ে উঠেছে নারীবাদের অভিজাত বয়ান এবং এই সকল তত্ত্বের পরিচিতি কেবল আমাদের মতো খুব উচ্চ শিক্ষিত , সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন মানুষ যারা বস্তুগত সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির তাঁদের মাঝেই বিদ্যমান বিদ্যমান থেকেছে।

“Feminist Theory: from margin to center” এর মতো একটি বই যা কিনা নারীবাদের এক ধরনের মুক্তিমুখিন আমূল পরিবর্তনের কথা ব্যাখ্যা করেছে, অথচ এটা মূলধারার নারীবাদের আগ্রহ অর্জন করতে পারেনি। সাধারণ জনগণ এই বইটির কথা কখনই শোনেনি, তাঁরা এই বইটির বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেনি কেননা তাঁরা জানেনই না কী লেখা হয়েছে এই বইটিতে।

এই ধরনের বিপ্লবী ও স্বপ্নদর্শী নারীবাদী চিন্তা, যা কিনা কথায় কথায় পুরুষ-বিদ্বেষী ছিলো না এবং যা কেবল নারী-পুরুষের সমতার দাবিতেই সীমিত ছিলো না, তাঁদেরকে দমিয়ে দেবার জন্যে, থামিয়ে দেবার জন্যে শুধু শ্বেতাঙ্গ আভিজাত্যবাদী পুঁজিবাদী পিতৃতন্ত্রই যে আগ্রহী ছিলো তা নয়, এই ধারার কন্ঠরোধ করার জন্যে সংস্কারপন্থী নারীবাদীরাও সমানভাবে আগ্রহী ছিলো। সংস্কারবাদী নারীবাদ হয়ে উঠেছিলো তাঁদের নিজ শ্রেণি থেকে উল্লম্ফনের পথ বা শ্রেণি গতিশীলতা (Class mobility) অর্জনের উপায়। তাঁরা হয়তো শ্রমবাজারের পুরুষাধিপত্যকে ছিন্ন করতে পারে এবং নিজেদের জীবনযাপনের ধরনে আরও অনেক বেশি স্বাধীন হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু লিঙ্গবৈষম্যবাদী পিতৃতন্ত্র তাতে শেষ হয়ে যায় না, তাঁরা বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই সর্বাধিক স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। এবং তাঁরা হয়তো সেখানে অধস্তন ও শোষিত নারীদের উপরে নির্ভর করতে পারে সব তুচ্ছ ও নোংরা কাজগুলো করানোর জন্যে, যে সকল কাজ করতে এক সময় তাঁরা অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো।

শ্রমিক শ্রেণির নারী কিংবা এসকল গরীব নারীদের এই অধীনতাকে মেনে নিয়ে এবং বাস্তবত বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে এক ধরনের অশুভ আঁতাত করে তাঁরা শুধু বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও তার লিঙ্গবৈষম্যবাদী শোষনের সঙ্গীই হোন না শুধু, বরং তাঁরা নিজেদের এক ধরনের দ্বৈত জীবনযাপনকে অনুমোদন করেন। একদিকে শ্রমবাজারে তাঁরা হচ্ছেন পুরুষের সমকক্ষ আর অন্যদিকে ঘরে তাঁরা পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার সংগ্রামে রত নারী। তাঁরা যদি সমকামী হোন, তাহলে একদিকে তাঁরা শ্রমবাজারে পুরুষের সমকক্ষ হয়ে ওঠেন, আর অন্যদিকে ঘরে তাঁদের শ্রেণি অবস্থানের উপরে নির্ভর করে হয়তো পুরুষের সাথে কোনো সংশ্রব না রেখেই নিজেদের জীবন চালিয়ে নিতে পারেন।

যেমন, “লাইফস্টাইল ফেমিনিজম” বা জীবনযাত্রাগত নারীবাদ এর শুরুই হয়েছিলো এটা নিশ্চিত করার জন্যে যেনো নারীর যত ধরনের মতামত রয়েছে তার সবকিছুকেই কোনো না কোনোভাবে নারীবাদের ভেতরে অনায়াসেই ঢুকিয়ে দেয়া যায়। খুব ধীরে ধীরে নারীবাদ থেকে রাজনীতির অংশটুকুকে সরিয়ে নেয়া হলো। এমন একটা ধারণাকে তুলে ধরা হলো যে একজন নারীর রাজনৈতিক অবস্থান যাইই হোক না কেনো, সে সংরক্ষণবাদী কিংবা উদারনৈতিক, সকলকেই অনায়াসে নারীবাদী হিসাবে গণ্য হতে পারেন।

নারীবাদের এই ধারণাটি দারুণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো, কেননা এই ধারণাটি এমন একটা সুবিধা করে দেয় যে নারী বিদ্যমান শোষণমূলক ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ না করেও নারীবাদী হতে পারেন, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে, সংস্কৃতিকে ভেঙ্গে ফেলার সংগ্রাম না করেও নারীবাদী হতে পারেন।

ধরা যাক, উদাহরণ হিসাবে আমরা যদি গর্ভপাত এর বিষয়টিকে দেখি, পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদের অবসান ঘটানোই যদি হয়ে থাকে নারীবাদের মূল সংগ্রাম এবং গর্ভধারণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি যদি নারীর অধিকার হয়ে থাকে, তাহলে কোনো একজন নারী একই সাথে গর্ভপাতবিরোধী ও নারীবাদী হতে পারেন না। নিজের বেলায় কোনো একজন নারী যদি মনে করেন যে তিনি নিজে কখনই গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেবেন না, কিন্তু অন্যদের গর্ভপাতের অধিকারকে সমর্থন করেন, এরকম একটা অবস্থান নিয়েও তিনি নারীবাদের সমর্থক হতে পারেন। কিন্তু একজন নারী গর্ভপাতের বিরোধিতা করে কখনই নিজেকে যৌক্তিকভাবে নারীবাদী দাবি করতে পারেন না। এমনকি “পাওয়ার ফেমিনিজম” বা শক্তিগত নারীবাদ বলেও কিছু হতে পারে না যদি সেই শক্তির উৎস হয় অন্যদের শোষণ করার শক্তি থেকে।

নারীবাদী রাজনীতি তার গতিবেগ হারাচ্ছে কেননা নারীবাদী সংগ্রাম এর স্বচ্ছ সংজ্ঞাটি হারিয়েছে। কিন্তু সেই সংজ্ঞাগুলো আমাদের আছে।

আসুন আমরা আমাদের সংগ্রামকে ফিরে পাওয়ার দাবি করি, আবার নতুন করে শুরু করি আর এই দাবি সকলের সাথে ভাগাভাগি করি। যতভাবে সম্ভব ছড়িয়ে দেই আমাদের দাবির কথা, সেটা কি ছাপানো রঙ্গীন টিশার্ট, নানান ধরনের স্টিকার, পোস্টকার্ড, জনপ্রিয় গানের সুরে, টেলিভিশন আর রেডিও বিজ্ঞাপনে আর যতরকমের প্রকাশনা দিয়ে সম্ভব, আসুন আমরা সারা দুনিয়াকে জানাই নারীবাদের কথা।

পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গবৈষম্যবাদ অবসানের লক্ষ্যে খুব সাদামাটা ভাষায় কিন্তু দারুণ শক্তিমান বক্তব্যগুলো আমরা ছড়িয়ে দিতে পারি সর্বত্র। আসুন শুরু করি, আসুন শুরু করি আবার নতুন করে।

শেয়ার করুন:
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares

লেখাটি ১৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.