শাড়ি পরা না পরার পছন্দটা আমার, আপনাদের নয়

ফওজিয়া খোন্দকার ইভা:

শাড়ি নিয়ে নারীর জন্য অত্যন্ত অপমানজনক একটি লেখা, যা নিয়ে কথা বলাটা জরুরি বলে মনে করায় কলম ধরলাম। যদিও এটা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি, আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। যা আমরা আলোকিত মানুষের কাছ থেকে আশা করি না। একই সাথে এই সংবাদপত্রের সম্পাদকের এহেন একটা লেখা ছাপা প্রমাণ করে কতটা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনিও বহন করেন।

এই শরীরটা আমাদের। এই শরীরে কী করলে এবং কী পরলে আমরা আরামবোধ করবো এটি একান্তই একজন নারীর ইচ্ছে, পছন্দ ও প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশের প্রায় ৮০ থেকে ৯০% নারীই শাড়ি পরেন। তারা এ কারণে পরেন না যে তাঁদের দেখতে সুন্দর দেখাচ্ছে বা আকর্ষণীয় লাগছে। তারা পরেন কারণ এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে, যা কিনা পুরুষতান্ত্রিক প্রাধান্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। অবশ্য এই সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্বও নারীর যতটা, পুরুষের ততোটা নয়। তাই শহুরে পুরুষেরা কর্ম উপযোগী পোশাক বেছে নিয়েছেন, যে পোশাকটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ নারীই শাড়ি ভালবাসেন। তারা যতই ভালবাসুক না কেন তা কিন্তু নারীর মবিলিটিকে কম বেশি বাধাগ্রস্থ তো করেই ।

শাড়ি, কপালের টিপ, বেলি ফুলের মালায় আমি যতোই নিজেকে সাজাই আর বলি, এ আমার একান্ত নিজের পছন্দের প্রকাশ, কিন্তু এর পেছনেও কাজ করছে নারীত্ব নির্মাণের প্রক্রিয়া।

আমিও আমার অবচেতন মনে নিজকে আকর্ষণীয় করে তুলতে চাই। অবশ্যই তা আমার বা আমাদের ভালোও লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগাটাও অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি। তাই অন্য পোশাকে নারীকে দেখলে পুরুষ কেন অন্য নারীরও তা মেনে নিতে কষ্ট হয়। এই পরিধানের সাথে ভালো নারী ও খারাপ নারীর সংজ্ঞা তৈরি করা হয়। কখনও পুরুষ, কখনও সমাজ, কখনও ধর্ম, কখনও আমাদের মেয়েলীপনা, কখনও পুরুষতান্ত্রিক চাপে সমাজের সব নিয়ম কানুন আমাদের মেনে নিতে হয়। না মানলেই খারাপ নারী। চরিত্রহীন।

প্রয়োজন, আবহাওয়া, কাজের ধরন, ঠাণ্ডা বা গরম থেকে নিজেকে রক্ষা করা এসবের কারণেই পোশাকের প্রয়োজন হয়। এক সময় তো মানুষ পোশাক পরতো না। পোশাকের প্রচলন খুব বেশিদিন আগের নয়, আজ থেকে ১,৭০,০০০ বছর আগে বরফ বা ঠাণ্ডা থেকে নিজদের রক্ষার জন্য মানব সভ্যতার ইতিহাসে এর ব্যবহার শুরু হয়। কালে কালে সেই পোশাকের সাথে মাত্রা যোগ করেছে ফ্যাশন।

শাড়ি পরার ইতিহাসও কিন্তু অনেক আগের নয়। সংস্কৃত শব্দ সাডি (Sadi) থেকে (saree) এর উত্থান। ইন্দোসভ্যালির সময়েই শাড়ি পরার প্রচলন শুরু হয়। তার আগে মেয়েরাও পুরুষের মতো ধুতি পরতেন। শাড়ির ধরনেও যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে। আর এই যে শাড়িকে বা নারীকে কেন্দ্র করে কবি, মহাকবিদের এতো লেখা, কাব্য সবই এক অর্থে পুরুষের নারীর ফেমিনিন নারী নির্মাণ প্রক্রিয়ারই অংশ। নারীকে কোমল, মায়াবতী, লাজুক, সুন্দরী দেখতে পুরুষ আনন্দ লাভ করে। এর সাথে নারীকে নিজের মতো করে ভাববার, পাবার অবদমিত আকাংখাও কাজ করে থাকে।

আসলে নারীর বেঁচে থাকা, বেড়ে উঠা সব কিছুর ধারক ও বাহক তো এ সমাজ। যার মূলে বা গোঁড়ায় পুরুষতন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যার সাথে জড়িয়ে আছে এক নেতিবাচক মতাদর্শ। যা বিশ্বাস করে নারী পুরুষের অধীনস্ত। যে কারণে নারী যা করে, যা বলে, যা পরিধান করে, যেভাবে চলে, এমনকি যদি সে একা একা হাসেও, সবটাতেই সমস্যা। আর তারই অংশ হিসেবে পুরুষতন্ত্র তার ইচ্ছে অনুযায়ী নারীকে ঢাকে, আবার ইচ্ছে অনুযায়ী নারী বা নারীর শরীরকে খোলামেলা দেখতে চায় বা অনাবৃত করে।

এই সমাজে নারী কখনও subject নয় সব সময়ই সে object. নারী কখনই mind নয় body। নারী rational নয় বরং emotional, তো এই শরীর সর্বস্ব (পুরুষতন্ত্রের কাছে) নারীর সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়ম না মানাটা প্রশ্নের। জবাবদিহিতার। তাই সামান্য পোশাক পরিধানেও সব সময়ই নারীকে অন্যের পছন্দকে মাথায় রাখতে হয়। কী পরলে তার চলাচল সাবলীল হবে, সাহসী হবে, কর্ম উপযোগী হবে তাতো নয়, বরং বেশির ভাগ সময়ই তাকে কাপড়ের পুটলি, নয়তো সুন্দরের পূজারী এমনভাবেই নিজকে উপস্থাপন করতে হয়। তাই যখন নারী নির্যাতনের শিকার হয় তখনো তার পোশাককেই একটি বড় কারণ হিসেবে পুরুষ দায়ী করেন।

যতই প্রিয় হোক শাড়ি এটা কর্ম উপযোগী পোশাক তো নয়? আমরা উদাহরণ দিতে পারি যে গ্রামের মেয়েরা তো শাড়ি পরেন এবং সব কাজই করেন। তাদের কি অসুবিধা হয়? কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি ভয়াবহ বন্যায়, সাইক্লোন, জ্বলোচ্ছাসে কি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ও কষ্ট তাকে নিতে হয়! এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে থাকে!

পাঠকের হয়তো জানা আছে যে জাপানে একটা সময় ভূমিকম্পে নারী বেশি মৃত্যুবরণ করতেন এবং যার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কিমানো (নারীর পোশাক)।

আমি অনেক নারীকে দেখেছি প্রচণ্ড বরফে শাড়ি পরে হাঁটতে। তা যে কতটা কত কষ্টের তা তারাই জানেন। অন্যের দেশে কেন নিজের দেশেও সাইকেল, মোটর সাইকেল চালাতে কতটা বেগ পেতে হয় মেয়েরা যদি পোশাকটি উপযোগী না হয়? কাজেই পোশাক এর সাথে নারীর জেন্ডার শ্রম বিভাজনেরও বিরাট সম্পর্ক তা ভুলে গেলে চলবে না।

তাই শরীরটা যেহেতু আমার, পছন্দটাও আমার, আপনার বা আপনাদের নয়। এটাই বলবো যে নারীর শরীরের যে বর্ণনা তিনি দিয়ছেন তার লেখায় তা খুবই লজ্জার ও একইসাথে অপমানের।

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.