পুরুষের চোখে নারী, নারীর চোখ নেই!

0

শিল্পী জলি:

ইনবক্সে মেসেজ, ‘আপু আছেন? একটু কথা ছিল, আপনাকে পাওয়া যায় না আজকাল, এখনও কাজে?’

চ্যাটিং একেবারেই পছন্দ নয়, সেখানে দরকার ছাড়া ওয়ান টু ওয়ান চ্যাটিং, ঐ সময়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লিখে ফেলা যায়।
তবু উত্তর দিলাম, কেন?
বললো, গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

ভাবছিলাম ইনি হয়তো সেই ব্যক্তি যিনি ক’দিন আগে একটি নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে বলেছিলেন।
ভুল ভাঙলো যখন প্রশ্ন করলেন, ‘নারীবাদ কী?
ওমুক মেয়েকে চেনেন? তিনি যে মাসিকের প্যাডের ছবি দেন এটা কি নারীবাদের আওতায় যায়?’

বললাম, তাকে চিনি না, তবে নারীবাদী হলেও ব্যক্তি বিশেষ, অবস্হান, জীবন, অভিজ্ঞতাভেদে মানুষের চিন্তায় ভিন্নতা থাকবেই।
তৎক্ষণাৎ প্রসঙ্গ বদলে বললেন, ‘আহা বেচারা!’
বললাম, এই বেচারা আবার কে?
বললেন, ‘আমাদের ভাই, যিনি গাড়ি চালান আর আপনি লাইভ করেন–তা উনি রোমান্টিক কেমন?’
প্রশ্নের পিঠে উল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘এই বয়সে রোমান্টিক বিষয়টি কি ততটা অর্থ বহন করে?’

মনে মনে ভাবছি, আমার বর রোমান্টিক কিনা তাতে তোমার দরকার কী, তোমার মায়ের বয়সী আমি আর তুমি জিজ্ঞেস করছো আমার বর রোমান্টিক কিনা! আর যাকে তোমার কাছে আগেই ‘বেচারা’ মনে হয়েছে আমি লাইভ করি তাই দেখে।

দেশের অনেক ছেলেমেয়েই দুইটা ফুল আর কয়েকটি মোমবাতি জ্বালালেই ভাবে ব্যক্তি বড় বেশি রোমান্টিক হয়ে গেল— নারীর জীবনকে কুক্ষিগত করে আর যাই হোক রোমান্টিকতা হয় না।

জনাব আসিফ মহিউদ্দিনসহ নানা জন অহরহ লাইভ করেন। দেশে খুব কম ব্যক্তিই আছেন যারা তাদের স্ত্রীদের বেচারি নামে ভূষিত করবেন। কিন্তু একজন নারী যদি লাইভ করে, লেখালেখি করে, তাহলেই খবর হয়ে যায়– তার পার্টনার হয়ে যান বেচারা, ব্যক্তির ঘরের খবর জানা থাক বা না থাক।

এখানে বলে রাখা ভালো যে যেই আতিককে বেচারা মনে করা হয়েছে সেই আতিক নিজের প্ল্যান মতো বছরে তিন/চারবার ছুটি কাটায়, প্রতিদিন একবার বা দু’বার বাইরে খায়, জিমে যায়, বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঘোরে, সিনেমা দেখে, মাসে একবার ম্যাসাজ নেয়, নিজের টাকা নিজের কাছে রাখে–যেকোনো বাঙালির চেয়েই স্বাধীন, আবার রোমান্টিকও।

কিছুদিন আগেই প্রথম আলোতে বাঙালি খাটো, মোটা, কালো মেয়েদের শাড়ি পরিয়ে নানাভাবে খুঁত ঢেকে পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হবার উপায় বাতলানো হলো। এভাবে ছোটবেলা থেকেই একজন নারীর ব্রেনওয়াশ করা হয় কী করলে, কোন পোষাক পরলে, কীভাবে সাজলে, কীভাবে কথা বললে, সে একজন পুরুষের চোখে আকর্ষণীয়া হবে! এই আকর্ষণ-বিকর্ষণে পুরুষ করবে ভোগ এবং নারী হবে ভোগ্যা। তার চাওয়া-পাওয়া-তৃপ্তি সবই থাকবে উহ্য। তথাপি দায় তারই–একজন পুরুষ জুটানো এবং পুরুষের কাছে বিক্রি হয়ে জীবনের গতি নিশ্চিতকরণের।

শুধু একজন পুরুষই নয়, অনেক নারীও তেমন ধারণাই রাখে–
শুধু কী বাংলাদেশেই?

এক ডক্যুমেন্টারিতে দেখলাম উগান্ডায় মেয়েদের বয়স দশ/বার হতেই তাদের ঠেসে খাওয়ানো হয় যেনো দ্রুত মোটাতাজা করতে পারে, পুরুষ তাকে পছন্দ করে, একজন ভালো বর জোটে কপালে। খেতে খেতে বাচ্চারা বমি করে ফেলছে তবুও খাচ্ছে, তারাও সুন্দর হতে চায়। এদিকে মোটাতাজাকরণের চাপে হাই ব্লাডপ্রেশার, ডাইবেটিস হয়ে যাচ্ছে, কিডনি ফেইল করছে তথাপি পুরুষের চোখে সুন্দর হতেই হবে। শুধু খাবারই নয় গরু মোটাতাজাকরনের স্টেরয়েড জাতীয় ওষধ দেয়া হচ্ছে সাথে। কেউ কেউ আবার নিজেরাই খুঁজে বের করে নিচ্ছে ওসব। এমনকি এই ওষধ সেবনে এক বোনের মৃত্যুর পরও আরেক বোন থামেনি। শুধু কি উগান্ডায়, ভারত বাংলাদেশের পতিতালয়গুলোতেও কি কিশোরীদের ওষুধ দিয়ে দ্রুত যুবতী বানাবার পাঁয়তারা চলে না? নারীর খাটো, কালো, মোটা, চিকনা জীবন প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায় না?
দেশে কী শুধু নারীরাই খাটো, মোটা, কালো, চিকনা– পুরুষরা নয়?

দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার একটি জায়গায় মেয়েদের প্রথম ঋতুস্রাব হতেই তাদের শুদ্ধিকরণ করা হয়। এতে নাকি তার রোগবালাই দূর হবে, পুরুষদের সন্তুষ্ট করতে শিখবে তারা। এই শুদ্ধিকরণ হয় একজন হায়নাস দ্বারা– এই ব্যক্তিকে মেয়ের বাবা-মা ক্যাশ দিয়ে অন্ধকারে মেয়ের ঘরে ঢুকিয়ে দেয় রেপ করতে। তারও আগে এলাকার বয়স্করা জুটি বেঁধে কোমর দুলিয়ে সেক্সি নাচের অনুষ্ঠান করে যেনো নাচ দেখে ঐ কিশোরীরা সেক্স বিষয়টি কী সেটা কিছুটা অনুমান করতে শেখে। এই প্রথা পালনের কারণেই অনেক কিশোরী ঐ এক ধর্ষণ থেকেই প্রেগনেন্ট হয়ে যায়, এইডসে আক্রান্ত হয়। এমনকি ঐ হায়নাসদের এইচআইভি পজেটিভ জেনেও বাবা-মা থামে না, তাদের নিযুক্ত করে মেয়েকে রেপ করতে।
সেখানে এইডস ছেয়ে যাওয়ায় মাত্র দুই হাজার ছ’য়ে আইন করে প্রথাটি বন্ধ করা হয়েছে।

বিশ্বের নানা জায়গাতেই মেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করা হয় পুরুষের স্বার্থ রক্ষায়– জেন্ডারভিত্তিক অলিখিত বিধিমালা, সমাজে নানাবিধ পাপ-পূণ্যের হিসেব-নিকেষ চালু রেখে, আদর্শ নারীর জীবনবিধির অজুহাতে। আর ঐ গণ্ডির ভেতরে কোনো একজন নারী চলতে না পারলেই তার জীবন নরক বানিয়ে দেয়।

সবই নারীকে কন্ট্রোলের কৌশল– সেটা শিল্পসাহিত্যের নামে হোক, অথবা বিধিনিষেধ-আইনকানুন করে, অথবা সম্পত্তি বণ্টনের মাধ্যমে। এই বিষয়ে অধিকাংশ পুরুষই একতাবদ্ধ।

পার্টনার খুঁজে পাওয়া, সেক্স সেটা কী শুধু নারীর প্রয়োজন, পুরুষের নয়? একই দরকারে একজন নারীকে কেন এতো ছাড় দিতে হবে?

শেয়ার করুন:
  • 61
  •  
  •  
  •  
  •  
    61
    Shares

লেখাটি ৫৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.