নারীবাদ নিয়ে বিতর্কের প্রয়োজন আছে

0

ফড়িং ক্যামেলিয়া:

প্রথমত বলে রাখা ভালো, নারীবাদ নিয়ে এটা কোন একাডেমিক ডিসকাশন না, কাউকে শেখানোর কোনো ইচ্ছে থেকেও লেখা না। যেহেতু নারীবাদ নিয়ে এতো আলোচনা, সেহেতু আমিও আলোচনা-ই করছি।

দ্বিতীয়ত, যদি কেউ ভাবে এটা বাঙালি নারীবাদীদের বকে দেয়া মূলক পোস্ট, সেক্ষেত্রে অবশ্য আপত্তি আছে। ঐ দলে যেহেতু আমি আছি, সেহেতু আপত্তি থাকা শতভাগ যৌক্তিক। বাঙালী নারীবাদীদের অর্জন কম না। সে প্রসঙ্গ ভিন্ন এবং অন্য সময় সেটা নিয়ে লিখবো, আপাতত আজকের প্রসঙ্গে থাকি।

কদিন ধরেই দেখছি কে নারীবাদী, কে না, এই বিষয় নিয়ে প্রচুর ঢিলাঢিলি হচ্ছে। নানা মুনির নানা মত। সহী নারীবাদ কী জিনিষ, সেটা নিয়ে এতো প্যাঁচ যে জিলাপির উপমা দিলে জিলাপিও লজ্জা পাবে। অবশ্য যেকোনো বিষয়ে ফুলস্টপ মানেই জ্ঞানের দার রুদ্ধ হওয়া, তাই আলোচনা নিয়ে সমালোচনা করার কিছু নাই, আলোচনা ভালো বিষয়।

যাই হোক এসব আলোচনা কিংবা সমালোচনা থেকে বের হয়েছে বহুদল। নারীবাদীদের একদলের দাবি, নারীবাদের অ, আ, ক, খ না জেনে কেউ নারীবাদী হতে পারবে না। মানে তার পুস্তক জ্ঞান থাকতে হবে। এই দাবি যারা করেন তারা করতেই পারেন। কিন্তু এই বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আমি অক্ষরজ্ঞান জানা একজন লোককে চিনি যে তার বৌকে এসএসসি পাশ করিয়েছেন এবং নিয়মিত বাসায় রান্না করেন, যেকোনো কাজেই বৌকে উৎসাহিত করেন। তিনি নিজে তার বৌ এর ইকুয়ালিটিতে বিশ্বাস করেন, কিন্তু সেইসাথে তসলিমা নাসরিনকে খুবই অপছন্দ করেন। এই লোকটা নিজের জীবনে যা পালন করেন, সেটা কে নারীবাদের নাম দিতে তিনি রাজি না, কিন্তু এখানে টুইস্ট হলো তিনি যা ধারণ করেন, পালন করেন, সেটাই তো নারীবাদ!

আবার উচ্চ শিক্ষিত ভদ্রমহিলা, যিনি নারীবাদ নিয়ে যথেষ্ট পড়েছেন, কিন্তু নিজে বিশ্বাস করেন নারী আর পুরুষ কখনো সমান হতে পারে না। তাকে অবশ্যই নারীবাদী বলা যাবে না।
তাহলে বিষয় কী দাঁড়ালো?
প্রশ্ন করলাম, উত্তর আপনি বের করবেন।

আর একদল আছেন যারা ধর্মীয় পোশাক ব্যবহার করা নারীদের নারীবাদীর তালিকা থেকে বাতিল করে দেন। আমার কথা হলো, নারীবাদ এর কোন সুরা নাই যে পড়লেই নারীবাদী হয়ে যাবে। কেউ যদি নিজেকে নারীবাদী দাবি করে এবং সেটা মানার চেষ্টা করে, তবে তাকে নারীবাদী বলতে আপত্তি থাকার তো কথা না।

এটা সত্যি যে তার ধর্ম নারীবাদের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সেই ধর্মের পালন করে সে তার ধর্মীয় পোশাক পরেন, কিন্তু নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন এবং অন্য নারীর স্বাধীনতায় বাঁধাও দেন না। তিনি চেষ্টা করছেন নারীবাদের বিষয়গুলো বোঝার, তাহলে তাকে কেন নারীবাদী বলা যাবে না? এরপরও যদি তাকে নারীবাদী বলতে আপত্তি থাকে, সে অর্থে কোন মুসলিম নারীকেই নারীবাদী বলা যাবে না।
এখানে বলে রাখছি সুইডিশ ফেমিনিস্ট পার্টিতে প্রচুর মুসলিম নারী আছে যারা হিজাব পরেন। যদি এদের নারীবাদী না বলে বাতিল করা হয় তবে মালালা ইউসুফ, কিংবা নাদিয়া মুরাদ এদের কেউ বাতিলের খাতায় ফেলতে হবে। অথচ এদের নারীবাদের সংগ্রামটা সত্যিকার অর্থেই নারী মুক্তির আন্দোলন, যা কিনা একটা পোশাক কিংবা ধর্ম পালনের অজুহাত দিয়ে হয়তো সহি নহে বলা যায়, বড় জোর ইসলামিক ফেমিনিজম বলে ক্যাটাগোরাইজ করা যায়, কিন্তু বাতিল করা যাবে না।

আর একটা দল আছেন যারা নারীবাদ মানেই পুরুষ বাতিল করে দেন। ভাইরে কোন পুরুষের নাম যদি হৃদয়ে লিখে রাখতে পারো, তবে তাদের বাতিল করার কিছু নাই। প্রেম ভাঙলে, সংসার ভাঙলে মানুষটা খারাপ ছিল সমস্ত পুরুষ জাত না। নারীবাদী পুরুষের সংখ্যা বাড়ছে। চারপাশে নারীবাদী পুরুষ আছে, হয়তো তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক আছে যারা মুখে বলে আর যারা বলে না, তারা বলার মতো জায়গায় এখানো সমাজটাকে নিতে পারেনি, তাই বলে না। কিন্তু হচ্ছে এবং হবে।

কথা হলো নারীবাদকে সহি নহের তত্ত্ব দিয়ে এতো বেশি জটিল করে ফেলা হয়েছে যে আজকাল মানুষ বুঝতে পারছে না আসলে নারীবাদ কী জিনিস! অথচ বিষয়টা বামতন্ত্রের মতো জটিল না হয়ে সরল হবার কথা ছিল।

নারীবাদ মানে নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিকতার অত্যাচার রোধ, তথা প্রভুভিত্তিক খবরদারি প্রথার বিলুপ্তি সাধন। তুমি আমি দুটা মানুষ, তোমার যা যা অধিকার আমারও তা পাবার অধিকার। তাই বলে তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে পেশাব করো, আর আমিও তাই চাইবো, তা না। তুমি অধম বলে আমি কেন অধম হবো, তার চেয়ে তুমি টয়লেট ব্যবহার শেখ আমি সেই দাবি করি। আমার মাসিকের রক্ত নিয়ে তোমার ঠাট্টা বন্ধ হোক, তুমি মেয়েদের মাসিক হওয়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে নিতে শেখো আর আমি বিব্রত হওয়া থেকে মুক্তি পাই, ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। খুব সহজ সরল বিষয়।

নারীবাদ নিয়ে তর্ক হওয়ার বিপক্ষে আমি না, বরং নারীবাদ নিয়ে যত কথা হবে মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে জ্ঞান তত বাড়বে। এই যে এত আলোচনা তার সুফলও আছে, আজকাল নারীরা নারীবাদী বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করছে, একটা গ্রহণযোগ্য অবস্থানও তৈরি হয়েছে এবং এর ক্রেডিট অবশ্যই নারীবাদীদের। তবে এটাও সত্যি, সহি তত্ত্ব দিয়ে একে ওকে নারীবাদী থেকে বাদ দিলে, দিন শেষে এক সদস্য বিশিষ্ট দল হবে প্রচুর কিন্তু যাদের জন্য এই আন্দোলন তাদের কাছে আর যাওয়া হবে না। মানুষ এটাকে এলিট শ্রেণির সৌখিন আন্দোলন ধরে নেবে। ধন্যবাদ ।

শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares

লেখাটি ৪১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.