মৃত্যু ভয়ের নয়, ‘আশাবিহীন’ বেঁচে থাকাটাই ভয়ের

0

দিনা খান:

ফেইসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করতে করতেই এক ভিডিওতে চোখ আটকে গেল। নাকে অক্সিজেন নল লাগানো এক তরুণী হাসিমুখে স্টেজে দাঁড়িয়ে মানুষের সামনে অনুপ্রেরণাদায়ক কথা বলে যাচ্ছে। যদিও তার কন্ঠস্বরে অসুস্থতা এবং নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধে হওয়াটা কান এড়ায় না। কৌতুহল হলো তাকে জানবার।

তার নাম ক্লেয়ার ওয়াইনল্যান্ড। আমেরিকান লেখক এবং এক্টিভিস্ট। জন্ম ১০ এপ্রিল ১৯৯৭ সালে আমেরিকায়। চার বছর বয়স থেকেই গান গাইতেন। বড় বড় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদও হয়েছেন। কিন্তু বিধি বাম, মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ফুসফুসের সংক্রমণে কোমায় চলে যান। বাঁচার সম্ভাবনা ছিল ১%। কিন্তু ১৬ দিন পর কোমা থেকে ফিরে আসেন।

এরপর অসুখের সাথে বাস করেই করেছেন অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ। বই লিখেছেন, ইউটিউবে কথা বলেছেন, মানুষকে উৎসাহ দিয়েছেন। Claire’s Place Foundation গঠন করে বিভিন্ন অসুস্থ মানুষ এবং তাদের পরিবারকে আর্থিক এবং মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন। তার জীবনের শেষ দিনগুলো নিয়ে ‘মাই লাস্ট ডেইস’ নামে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ হয়েছে।

তার ভিডিওগুলো এখনও ইউটিউবে লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণা হচ্ছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়েছেন হাসপাতালে। মেডিকেল টিমকে করে নিয়েছিলেন নিজের পরিবারের মতন আপন। হাসপাতালের রুমটিকেও সাজিয়েছিল মনের মতো করে। বাবা জন ওয়াইনল্যান্ড এবং মা মিলিশা প্রায় নিয়মিতই আসতেন তাকে দেখতে। বাবা শিখিয়েছেন, – “যা আসেনি তা নিয়ে ভয় পেও না, বরং যা আছে তাকে ভালোবাসতে শেখো।”

তিনি ভালোবাসতে শিখেছিলেন। অস্বীকার করেছেন অসুস্থতাকে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে মেনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকাকে, স্বীকার করেছেন বেঁচে থাকা প্রতি মুহূর্ত কাজে লাগানোকে। বিনিময় ছাড়াই দিয়ে গেছেন লক্ষ হতাশ মানুষকে অনুপ্রেরণা। অসুস্থতা সম্পর্কে সরল সত্যি কথা, মানুষের জীবনে নৈতিকতার অবস্থান বলে গেছেন হাসিমুখে। তার হাসি যাদের ছুঁয়েছে তারাই আত্মিক প্রশান্তি পেয়েছেন, পেয়েছেন বেঁচে থাকার আশ্বাস, জেনেছেন জীবনে বেঁচে থাকাটাই দারুণ ব্যাপার। মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মধ্যে সেই দারুণ ব্যাপারটা দ্বিগুণ সুন্দর হয়।

ফুসফুস ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশন করার পর মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মাত্র ২১ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ২ রা সেপ্টেম্বরে মারা যায় মেয়েটি। তার শেষ কথা ছিল, “Death is inevitable but living a life we are proud of, that is something we can control”- যেন এক টুকরো স্ফুলিঙ্গ! অনুপ্রেরণা আর আনন্দের।

আসলে কখনো কখনো আমাদের প্রত্যাশিত কিছু না পেলে অথবা হুট করে অনাকাঙ্ক্ষিত কোন বিপদ এলে আমরা সহজেই ভেঙে পড়ি। হতাশ হই। ব্লেইম দেই। আমার সাথেই কেন এমন হয়? হোয়াই মি? বেঁচে থাকতেই ইচ্ছে হয় না। মৃত্যুদূতকে ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমাই কখন জাগি তার পার্থক্য করা যায় না।

অথচ আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অন্তত তিনজনকে আমি জানি যারা ক্যান্সারের মতো মরণঘাতী রোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে আছেন এবং অন্য অনেক সুস্থ মানুষের চাইতেও বেশি প্রাণোচ্ছল। জীবনে হাসতে পারা, সবকিছু সহজে নিতে পারা, স্বপ্ন দেখতে পারা অনেক বড় গুণ। একজন মানুষের স্বপ্ন দেখা বন্ধ হলেই মূলত তার মৃত্যু হয়। তাইতো আমরা কেউ কেউ বেঁচে আছি একেকটা জ্যান্ত লাশ হয়ে।

যখন তার মাত্র ১৫ বছর বয়স, টেড টকে অংশ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “I’m not stuck in this belief that challenges are given to us to hold us back. I am lifted up by the belief that challenges are here to help us move forwards—and that is the difference. That is the only difference between people who are living a passionate, proud life and people who feel sad or people who get older and feel like they don’t know what they’re doing anymore.”

ক্লেয়ার ওয়াইনল্যান্ডের যে লাইনটা মন ছুঁয়েছে- Death is not the scary thing—living a life without a passion is the scary thing. ক্লেয়ার এমন একজন ছিলেন যিনি জানতেন দ্রুতই তিনি মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন এবং তরুণ বয়সেই তিনি চলে যাবেন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 273
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    273
    Shares

লেখাটি ৭৫৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.