#মিটু: আজও মনে পড়লে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাই আমি

0

দীপান্বিতা সেন রায়:
#MeToo
#Stop_child_abusing

অনেক অনেক ভাবনা চিন্তার পর আজ লিখতে বসলাম। এটাই শুধু ভাবছিলাম এই লজ্জা আমার হওয়ার কথা নয়, লজ্জা তার হবে যে এই অন্যায় করেছে।

তখন ক্লাস ফাইভে পড়তাম, এগারো বছর বয়স। আমি ঐ সময় খুবই চাপা স্বভাবের ছিলাম, কথা বেশি বলতাম না, অনেক রগচটা ছিলাম। এমনকি নিজের ঘরের মানুষের সাথেও দরকার ছাড়া কথা বলতাম না। কারোর সাথে মিশতাম না, কারণ ভাল লাগতো না। তো এটা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অন্য সব বাবা মায়ের মতো আমার বাবা মায়েরও চিন্তার অন্ত ছিল না। তো একদিন স্কুল থেকে ফেরার পর মা বললো খাওয়ার পরে আমরা একটা আংকেলের কাছে যাবো। আংকেলটা খুব মজার মানুষ।

গেলাম তারপর শান্তিনগরের সাইকো ভবনে। নাম আনোয়ার চৌধুরী জীবন। সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম উনি একজন কাউন্সিলর। প্রচুর পেশেন্ট আসে ওনার কাছে। সেই সাথে একসময় বাংলা সিনেমায় অভিনয় করতো। মিডিয়ার সাথে যুক্ত ছিল।তো চেম্বারের গ্লাস এমন ছিল যে বাইরে থেকে কিছুই দেখা যাবে না কিন্তু ভিতরের সব নজরে আসবে।

তো, ওনার চেম্বারে ঢোকার পর মা বাবার কাছ থেকে আমার সব সমস্যা শুনলো। অনেক ভাল ভাল কথা বললো।তারপর বললো আমাকে সাতদিনের জন্য মেডিটেশন প্র‍্যাক্টিস করাবে, এতে শরীর মন সব ভাল থাকবে, রাগও কমবে।এরপর মা বাবাকে বললো আপনারা একটু বাইরে যান,ওকে একা একা মেডিটেশন করার প্র‍্যাক্টিস দিবো!! মা বাবা বাইরে গিয়ে বসলো, আমি ভিতর থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। শয়তানটা উঠে মেইন লাইট অফ করে একটা ডিম লাইট অন করে দিল। এরপর কিছু সময় চোখ বন্ধ করিয়ে মেডিটেশনের প্র‍্যাক্টিস করানোর পর কাছে ডেকে কোলের উপর বসালো। ছোট ছিলাম, এসবের কিছুই বুঝতাম না, জানতামও না।

তারপরের ঘটনা যদি শুধুমাত্র লিপকিস আর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে লিখতে পারতাম। কিন্তু আর যা যা করা হয়েছিল আমার সাথে তা সত্যিকার অর্থে লেখার ভাষা নেই। সে প্রথমেই আমাকে দেখে বুঝে গিয়েছিল আমি কতটা চাপা স্বভাবের।মা বাবার সাথেও ফ্রেন্ডলি নই।তাই সেই সুযোগের সদব্যবহার অনেক ভাল ভাবেই করেছিল।

একটু হিন্ট দিচ্ছি,সে আমার জামা উপরে তুলে ফেলেছিল,আশা করি আর ভাল করে কিছু বোঝাতে হবেনা।এরপর মা বাবাকে ভিতরে ডাকার আগে আমাকে বললো এসব সে করেছে আমার ভালর জন্য।কিন্তু আমি যদি মা বাবাকে বলে দিই তাহলে আমার বড় ক্ষতি হবে।যদি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করে তাহলে আমি যেন বলি আমাকে চেয়ারে বসিয়ে মেডিটেশন প্র‍্যাক্টিস করানো হয়েছে।ক্ষতির কথা বলে আমার মনে আরো ভয় ঢুকিয়ে দেয়া হল।তাই বাসায় যাওয়ার পর যখন বাবা আমাকে আসলেও জিজ্ঞেস করলো যে আংকেল কি করেছিল,আমি তখন সত্যি কথা না বলে সেই শিখিয়ে দেয়া কথাই বলেছিলাম।।

এখানেই শেষ নয়,শয়তানটা বলেছিল সাতদিনের জন্য প্র‍্যাক্টিস করতে হবে।তার মধ্যে প্রথম দিনেই সে তার লালসা মিটিয়ে ফেলেছে,এমনটাই ভেবেছিলাম।সেদিন আমি সারা রাত শুধু কেঁদেছি,ভীষণ নোংরা লাগছিল সবকিছু।এর একদিন পর আবার স্কুল থেকে ফেরার পর মা বললো ওখানে যেতে হবে।আমি পুরোপুরি অসম্মতি জানালাম।মা বললো আংকেল ফোন করে যেতে বলেছে।কিন্তু মা তো আর ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে কেন যেতে বলেছে।আমার ঘরে ঠাকুরের একটা ছবি ছিল।যাওয়ার আগে খুব কান্নাকাটি করছিলাম ছবিটার সামনে আর সমানে প্রার্থনা করছিলাম যে আজ যেন এমনটা না করে।কিন্তু না!সেদিন আরো যন্ত্রণা দিয়েছিল আমাকে।যন্ত্রণায় কেঁদে দিয়েছিলাম চেম্বারের মধ্যেই।

আজও মনে পড়লে সেই যন্ত্রণা আমি ফিল করি। আমার দিদিও গিয়েছিল ওর কাছে। কিন্তু দিদি ছিল বড়,আমার মত চাপা নয়, মিশতে পারে সবার সাথে। তাই একদিকে আমার সাথে নোংরামি করে অন্যদিকে আমার দিদির সাথে খুব ভাল ফ্রেন্ডশিপ করে নিল। ওদিকে বাসায় দিদি খেয়াল করলো ওর কথা উঠলেই আমি খুব রেগে যাচ্ছি।

আরেকটা কথা বলে রাখি, আমাকে ঐ সাইকো ভবনে মোট চারবার যেতে হয়েছিল এবং প্রত্যেকবার সে আমার সাথে নোংরা আচরণ করেছে। আর প্রতিবার বাসায় ফিরে কাঁদতে কাঁদতে সাবান দিয়ে আমি সেকেন্ড টাইম স্নান করতাম, কারণ খুব ঘেন্না লাগতো। তবু মনের ভিতরের খারাপ লাগা তো আর সাবানের ফেনায় পরিষ্কার হতো না। এরপর একদিন দিদি মাকে বলে যে সাইকো ভবনে যাওয়ার কথা উঠলেই আমি প্রচণ্ড রেগে যাই। তখন মা আমাকে আলাদা ডেকে ভালো ভাবে এর কারণ জানতে চায়। হয়তো আমার আচরণে সন্দেহ করেছিল কিছু। আমি যখন উত্তরে বলি যে আমার ক্ষতি হবে তোমাকে বললে, তখন মা পুরোপুরি ভাবে বুঝে ফেলে আর আমাকে অভয় দেয় সব বলার জন্য। আমি আস্তে আস্তে সব বলি মাকে। মা সব শুনে বলে যা হয়েছে সব মন থেকে মুছে ফেলতে, আমরা আর সাইকো ভবনে যাবো না।

তারপর কী হয়েছিল আমি তা জানি না। কিন্তু আমার মধ্যে এর রেশ ছিল পুরো দেড় বছর। ক্লাস সিক্সের পুরোটা সময় আমার রেজাল্ট খারাপ হয়। মন দিয়ে পড়তে পারতাম না। রাতে শুধু কান্না করতাম। আর সিক্সে পড়ার সময় একদিন মা আমাকে ডেকে নিয়ে টিভিতে দেখালো যে আনোয়ার চৌধুরী জীবনকে পুলিশ এ্যারেস্ট করেছে। এরপর আস্তে আস্তে আমি সেই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসি, তবুও অনেক সময় লেগেছিল।

বিঃদ্রঃ অনেক খুঁজেও গুগলে ওর ছবি পেলাম না, যেহেতু জানতাম যে সে সিনেমা করতো, তাই তার সিনেমার অংশ থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে পোস্ট করলাম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 715
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    715
    Shares

লেখাটি ৭,৪২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.